ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

কমিউনিটি পুলিশিংএর উপর সিংগাপুরের পুলিশের সাথে আমাদের প্রশিক্ষণ শেষ হ্ওয়ার কথা ছিল ১১ সেপ্টেম্বর। কিন্তু সিংগাপুরের দ্বাদশ সংসদ র্নিবাচনের তারিখ পড়েছে ১১ সেপ্টেম্বরে। তাই আমাদের প্রশিক্ষণ এক দিন কমিয়ে ৭-১০ তারিখ করা হয়েছে। নির্বাচনের কারণে প্রশিক্ষণকাল সংক্ষিপ্ত হ্ওয়ায় আমাদের একটু বেশিই খাটুনি হচ্ছে। কারণ তারা পাঁচ দিনের কোর্স চার দিনে শেষ করাবেন। এমতাবস্থায়, সিংগাপুরের নির্বাচন নিয়ে একটা কৌতুহল বোধ করলাম। পুলিশ সহকর্মী-প্রশিক্ষক ও অন্যান্যদের কাছ থেকে তাই এ বিষয়ে বাড়িত তথ্য সংগ্রহ করলাম। ওয়েব সাইটে গিয়ে বিস্তারিত পড়ে নিলাম। দেখলাম, নগর রাষ্ট্র এ সিংগাপুর অনেক দিক দিয়েই বৃহৎ শক্তিগুলোর বিকল্প মডেল হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের গণতন্ত্র, উন্নয়ন ও অগ্রগতি সত্যিই অনুকরণীয়।

 

সিংগাপুরে প্রতি পাঁচ বছর পর পর সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে প্রার্থীরা এককভাবে ও দলগতভাবে অংশগ্রহণ করতে পারেন।। প্রত্যেক সিংগাপুরবাসীর নাগরিক সনদপত্র রয়েছে। একটি নির্দিষ্ট এলাকায় স্থায়ীভাবে বসবাস করলে সিংগাপুরিয়ানরা একটি করে পিঙ্ক কলারের পরিচয়পত্র পান। ভোটার তালিকা নাম উঠলে এ পরিচয়পত্র দেখিয়ে নির্বাচনে ভোট দিতে পারেন তারা। আর ভোট দেয়া বাধ্যতামূলক। এক নির্বাচনে ভোট না দিলে পরের নির্বাচনে ভোটার হওয়া মুসকিল হয়ে পড়ে।  ভোট না দিলে অনেক নাগরিক সুবিধাও হারাতে হয়। সিংগাপুরের নাগরিকগণ বিদেশে থাকলেও সাধারণ নির্বাচনে ভোট দিতে পারেন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তাদের দূতাবাস বা হাইকমিশনগুলোতে ১০টি বৈদেশিক ভোট কেন্দ্র রয়েছে। এসব ভোট কেন্দ্রের ভোটার হতে হলে পূর্বে নিবন্ধিত হতে হয়। সিংগাপুরে নাগরিকদের ভোটার হতে হলে ২১ বছর বয়সে উপনীত হতে হয়।

 

সিংগাপুরে বহুদলীয় গণতন্ত্র বিদ্যমান। তবে ক্ষমতাসীন পিপলস একশন পার্টি(পিএপি) ১৯৫৬ সালে স্বাধীনতার পর থেকেই ক্ষমতায় রয়েছে। চলতি নির্বাচনটি দেশের ইতিহাসে ১৭শ সংসদ নির্বাচন ।কিন্তু স্বাধীন সিংগাপুরের জন্য  এটা ১২শ সংসদ নির্বাচন। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী লি সেহন লুঙ  গত দুই বছর থেকে প্রধানমন্ত্রী আছেন। চলতি বছর নির্বাচিত হলে তিনি হবেন তৃতীয় বারের মতো প্রধানমন্ত্রী ।

 

যদিও সিংগাপুরে ৮টি বিরোধী দল আছে তবুও সরকার পরিবর্তনের মতো জনসমর্থন তাদের নেই। এমনকি বিরোধী দলগুলো সবাই একত্রিত হয়ে জোট গঠন করে একক প্রার্থী দিলেও ক্ষমতাসীন পিপলস অ্যাকশন পার্টিকে পরাজিত করার সম্ভাবনা ক্ষীণ। গত ২০১১ সালের নির্বাচনে সরকারি দল পিপলস অ্যাকশন পার্টি সর্বমোট ৮১টি আসন ও ৬০% ভোট পেয়েছিল। তাদের নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বিগণ ওয়ার্কাস পার্টির লো থিয় খিয়াং  এর নেতৃত্বে পেয়েছিলেন মাত্র ৬টি একক আসন ও ২টি দলগত বা গ্রুপ আসন। আর ভোট পেয়েছিলেন ১২.৮%। তৃতীয় শক্তি হিসেবে চিয়াম সি টং  এর নেতৃত্বে সিংগাপুর পিপলস পার্টি কোন আসনই না পেয়ে মাত্র ৩.১% ভোট পেয়েছিঠ। বাকি দলগুলো নিতান্তই নাম সর্বস্ব।  সিংগাপুরের মোট জনসংখ্যা ৫৪ লাখ ৭০ হাজার। কিন্তু ভোটার সংখ্যা ২৪ লাখ ৬১ হাজারের মতো। ভোটার সংখ্যা জনসংখ্যার অনুপাতে একটু কম হওয়ার কারণ হল, এখানে অনেক ব্যক্তি স্থায়ীভাবে বসবাস করলেও তার ভোটার নন। সিংগাপুরের সংসদ নির্বাচনের একটি অভিনব ব্যবস্থা রয়েছে যা অন্য কোন গণতাত্রিক দেশে দেখতে পাওয়া যায় না। এটা হল দলবদ্ধ আসন বা গ্রুপ মেমবার কন্সটিটিউয়েন্সি। এই ব্যবস্থায় একটি আসনে একটি গ্রুপের সব সদস্যকেই নির্বাচন করতে হয়।

 

সিংগাপুর একটি বহু জাতিগোষ্ঠীর দেশ হওয়ায় রাজনীতিবিদগণ সংসদে সকল জাতিগোষ্ঠীর সদস্যদের প্রতিনিধিত্ব রাখার সংবিধানে নির্বাচন বিষয়ে বিশেষ ব্যবস্থা রাখেন। একটি আসনে একজন প্রার্থী নির্বাচনের বিধান থাকলে সেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠ জাতির সমর্থিত প্রার্থীর জয়লাভের সম্ভাবনা বেড়ে যায়। এতে সংসদে সংখ্যালঘু জাতিগোষ্ঠীগুলোর প্রতিনিধিত্ব অনেক সময় শূন্যের কোটায় নেমে আসে। দলীয় প্রার্থী যদি ক্ষুদ্র বা সংখ্যালঘু জাতিগোষ্ঠীর সদস্য না হন, তবে সেই আসনে সংখ্যালঘুদের জয়লাভ করা সম্ভব নয়।

 

এ অবস্থা নিরসনের জন্য সিংগাপুরে গ্রুপ প্রার্থী আসন বা জিএমসি নির্বাচনী আসনের বিধান চালু করা হয় ১৯৮৮ সালে। এ ব্যবস্থায় একক আসনে একজন প্রাথী অন্যান্য প্রার্থীদের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। ভোটারগণ ভোটের মাধ্যমে একটি আসন থেকে মাত্র একজন ব্যক্তিকেই নির্বাচিত করবেন। কিন্তু দলগত বা গ্রুপ মেম্বার আসনে কয়েকজন প্রার্থী সম্মিলিতভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। কোন ভোটার যখন ভোট দিবেন তখন তাকে গ্রুপের সকল প্রার্থীকেই ভোট দিতে হয় বা বেছে নিতে হবে।

 

বিধিমত ৪, ৫ ও ৬ সদস্যের গ্রুপ রয়েছে। বলাবাহুল্য কোন কোন নির্বাচনী এলাকায় গ্রুপ মেম্বার নির্বাচন হবে, কোথায় একক প্রার্থী নির্বাচন হবে তা স্থায়ী নয়। প্রতি নির্বাচনের পূর্বেই তা নতুন করে নির্দিষ্ট করা হয়। নির্বাচনী এলাকায় বসবাসকারী জাতিগোষ্ঠীর সংখ্যার উপর গ্রুপ সদস্যের সংখ্যা নির্ভর করে। প্রত্যেক গ্রুপে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর লোককে অংশ গ্রহণ করতে হয়। যেমন ৪ সদস্যের গ্রুপ মালয়, চাইনিজ, ইন্ডিয়ান ও স্থানীয় সম্প্রদায়ের সদস্য থাকতে হবে। একক জাতি গোষ্ঠীর সদস্যেদের নিয়ে গ্রুপ তৈরি করা যাবে না। গ্রুপ আসনে নির্বাচনের জন্য কোন রাজনৈতিক দলের সদস্য হওয়ার বাধ্যমূলক নয়। নির্দলীয় নাগরিকগণ প্রয়োজনীয় সংখ্যক জাতিগোষ্ঠীর সদস্যদের সমন্বয়ে দল গঠন করে রাজনৈতিক দলের বাইরেও নির্বাচন করতে পারে। ২০১৫ সালের নির্বাচনে সিংগাপুরের সংসদে সর্বমোট ৮৯টি আসন রয়েছে যার মধ্যে একক প্রার্থী আসন ১৩টি , ৪ সদস্যের গ্রুপ মেম্বার আসন ৬টি, ৫ সদস্যের গ্রুপ মেম্বার আসন ৮টি, এবং ৬ সদস্যের গ্রুপ আসন ২টি।

 

সিংগাপুরে নির্বাচনী প্রচার অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত হয়। বর্তমান সংসদের তফসীল ঘোষণা করা হয়েছে পহেলা সেপ্টেমবর। ১-৯ সেপ্টেম্বর মাত্র দশ দিন প্রচারের সময়। ১০ সেপ্টেম্বর প্রস্তুতি বা কুল ডে। এর পরদিন মানে ১১ সেপ্টেম্বর নির্বাচন। অর্থাৎ নির্বাচন প্রক্রিয়াটি বাংলাদেশের নির্বাচনে তুলনায় অত্যন্ত সংক্ষিত। নির্বাচনী প্রচারের জন্য এখানে ফ্রিস্টাইলে যেখানে সেখানে সভা সমাবেশ করার সুযোগ নেই। সিংগাপুরের পুলিশ নির্দিষ্ট করে দিবে কোন কোন দিন কোন কোন এলাকায় সমাবেশ করা যাবে। কোন দল বা প্রার্থী তা করতে চাইলে পূর্বেই অনুমোদন নিতে হবে। অন্যদিকে সমাবেশ করার জন্য নির্ধারিত স্থান ‘স্পিকার কর্নারটিও’ এ সময় নিয়ন্ত্রিত থাকে। এই এলাকা নির্বাচনকালে মোটামোটি বন্ধই থাকে।

 

ক্ষুদ্র রাষ্ট্র হলেও সিংগাপুর একটি বহুজাতিক রাষ্ট্র। চিনা বংশদ্ভ’তগণ সংখ্যা গরষ্ঠি হলেও মালয় ও ভারতীয়দের যথেষ্ঠ প্রভাব রয়েছে এখানে। তা ছাড়াও রয়েছে ইউরেশিয়ান সম্প্রদায়ের লোকজন। ভাষা ও ধর্মের দিক দিয়েও সিংগাপুরের বৈচিত্র্য লক্ষণীয়। হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, মুসলিম, তাও-লাও প্রায় সব ধর্মের অনুসারীই এ দেশে আছে। এতমতাবস্থায়, সিংগাপুরের রাজনীতিবিদগণ তাদের জাতীয় সংহতি রক্ষার জন্য যা যা করা দরকার তাই করেন। এদেশের নির্বাচন ব্যবস্থাই তার বড় প্রমাণ। অন্য দিকে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় সিংগাপুর একটি অনুরকরণীয় রাষ্ট্র। এদেশে অপরাধ হয়। কিন্তু অপরাধ করে কেউ পার পায় না। এখানে রাজনীতি হয়, কিন্তু রাজনীতির নামে কেউ শোষণ-তোষণ বা প্রতারণা করতে পারে না। গণতন্ত্র, উন্নয়ন, অগ্রগতি ও জাতিগত সংহতির একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ এ নগর রাষ্ট্রটি।(০৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৫)