ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

সিংগাপুরের মূল ভূখণ্ড থেকে মাত্র এক কিমি দূরে দক্ষিণ দিকে প্রায় পাঁচ বর্গকিমি আয়তনের সান্তোষা নামের দ্বীপটি সিংগাপুরের অন্যতম আকর্ষণ। সংস্কৃত ‘সন্তোষ’ শব্দ থেকে সন্তোষা শব্দের উৎপত্তি হয়েছে। দ্বীপটি পৃকত পক্ষেই পর্যটকদের সন্তোষের কারণ। এখানে প্রাকৃতিক পরিবেশের সাথে আধুনিক আকর্ষণ এমনভাবে যোগ করা হয়েছে যা যে কারো বিস্ময়ের উদ্রেক করবে। এখানে আছে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় আন্ডারগ্রাউন্ড একুরিয়াম্। ডলফিন লেগুনে স্তন্যপায়ী লেগুনগুলো কি অপরূপ কসরতে মানুষের মনোরঞ্জন করে তা না দেখলে কেউ বিশ্বাসই করতে চা্ইবেন না। এখানে আছে একটি ইউনিভার্সেল স্টুডিও যেখানে হলিউডের থ্রিলার মুভির অভিনয়কে ‘অভিনয়’ করে দেখানো হয়।

সন্তোষায় বাসে, মনোরেলে ও রোপওয়েতে যাওয়া যায়। রোপওয়েতে গেলে খরচ পড়বে ২৯ ডলার। কিন্তু বাস বা ট্রামে গেলে প্রবেশ মূল্য মাত্র ৪ ডলার। ইতোপূর্বে ২০০৫ সালে আমি বাসে গিয়েছিলাম। এবার আমার সহকর্মী এসি তাপসকে নিয়ে ট্রেনেই গেলাম। তবে তাপসের ‘কেবল কারে’ চড়ার বেশ শখ। তাই ভিতরের একটি স্টেশনে গিয়ে চেষ্টা করলাম। ইচ্ছে ছিল কেবল কারে ফেরা যায় কিনা। কিন্তু ১২টার পরে কেবল কার শুধু ভিতরেই চলে। টিকেট প্রতিজন ১৩ ডলার। এতে অবশ্য সুবিধাই হল। কারণ মাত্র ১৭ ডলারে আমরা সন্তোষাও গেলাম, কেবল কারের আনন্দও উপভোগ করলাম।

১১ সেপ্টেম্বর সিংগাপুরে নির্বাচন হচ্ছিল। তাই সন্তোষায় ভিড় অনেকটাই কম। সহকর্মী তাপসকে ওয়াটার ওয়াল্র্ডে ঢুকে দিয়ে আমি বাইরে অপেক্ষা করছি। কারণ আমি ইতোপূর্বে ওয়াটর ওয়াল্র্ডে ঘুরে এসেছি। সেটা ছিল ২০০৫ সালে। হয়তো অনেক পরিবর্তন এসেছে এর মাঝে। কিন্তু ওয়াটার ওয়ালর্ড ও ডলফিন শোসহ টিকেটের মূল্য পড়ে ২৯ ডলার যা আমার জন্য একটা বড় অংকের অর্থই। তাই আমি দ্বিতীয়বার একই জিনিস দেখে অনর্থক অর্থব্যয়ে উৎসাহী ছিলাম না। এর পরিবর্তে বাইরে বসে সময় কাটাতে লাগলাম।

ওয়াটার ওয়ার্লডের প্রবেশ পথের পাশে একটি স্ট্যান্ডে ক্যামেরা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে পিচ্ছি একটি মেয়ে। সিংগাপুরের মেয়েদের, বিশেষ করে চা্ইনিজ বংশদ্ভূত মেয়েদের এমনিতেই পিচ্ছি লাগে। তার উপর আবার মেয়েটি বয়সের তুলনায় আরো বেশি ছোট। যদিও মেয়েটি মালে, তবুও তার চেহারায় চায়নার ছাপ রয়েছে। অবশ্য সিংগাপুরে আন্তঃগোষ্ঠী বিবাহ উল্লেখযোগ্য হারে সংঘটিত হয়। তাই শুদ্ধ জাতিগোষ্ঠীর মানুষ পাওয়া ক্রমান্বয়ে কঠিন হয়ে পড়ছে।

বাংলাদেশের মতো সিংগাপুরে নির্বাচনী জ্বর-বিকার তেমন একটা নেই। নির্বাচনকে এরা অনেকটাই রুটিন ওয়ার্ক মনে করে। নির্বাচন আসবে, নির্বাচন যাবে। মাঝ খানে একটি সরকার গঠিত হবে। সে সরকারও এক প্রকারের রুটিন ওয়ার্ক করবেন। বলাবাহুল্য নতুনত্ব আর প্রগতিশীলতা সিংগাপুরে রুটিনওয়ার্কই বটে। এখানে সব কিছুই দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে। পরিবর্তনশীলতাও তাই এখানে চিরায়ত। তারপরও যে মানুষ জন নির্বাচন নিয়ে আলাপ আলোচনা করে না তা নয়। এ সন্তোষা দ্বীপেই লক্ষ করলাম ওয়াটর ওয়ার্লড গার্ডেনের সেই পিচ্ছি মেয়েটি বড় একটি মেয়ের সাথে রীতিমত তর্ক জুড়ে দিয়েছে। সে অনেকটা চিৎকার করে বলছে, উই ওয়ান্ট চেইন্জ, উই ওয়ানন্ট এ চেইন্জ। কিন্তু মেয়েটি নো, নো দি প্রেজেন্ট ইজ ওকে। উই নিড নট আদার পিপল। পিএপি ইজ ওকে।

আমি জানি সিংগাপুরে ‘আমরা পরিবর্তন চাই’ এ ধরনের একটি শ্লোগান জনপ্রিয় করে তুলেছে বিরোধী দলীয় ওয়ার্কার্স পাটি অব সিংগাপুর। গত ৬ সেপ্টেম্বরে সিংগাপুরে এসেই আমাদের লিয়াজোঁ অফিসার রানির মুখ থেকেও একই কথা শুনেছিলাম। কিন্তু আমরা পরিবর্তন চাই, এ শ্লোগানটি এখানে মূলত চাইনিজ বংশভূতদের বাইরে জনপ্রিয় হয়েছে। আমি যে মেয়েটার কথা বললাম, সে ছিল মালে, আর রানিও ইন্ডিয়ান। এ বছর সিংগাপুরের স্বাধীনতার অর্থশত বার্ষিকী পালনের প্রাক্কালে বিরোধীদল থেকে এ ধরনের শ্লোগান চালু করা হযেছিল। তবে সেই কাঙ্থিত পরিবর্তনটি শেষ পর্যন্ত হয়নি। বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে পূর্বের দল পিপলস অ্যাকশন পার্টিই ক্ষমতায় এসেছে।

এর অর্থ কিন্তু এ নয় যে সিংগাপুরের ভোটারগণ পরিবর্তন চান না। তারা অবশ্যই পরিবর্তন চান। কিন্তু যেহেতু পরিবর্তন তাদের জীবনযাত্রার মধ্যে একটি আটপৌরে রুটিন ওয়ার্ক হযে পড়েছে এবং যারা ক্ষমতাসীন তারাই সেই পরিবর্তনের অনুঘটক হিসেবে তাদের সর্বোচ্চ মেধামনন দিয়ে চেষ্টা চালিয়ে সাফল্যের পরিচায় দিচ্ছেন, তাই তারা পরীক্ষিত পিপলস অ্যাকশন পার্টির পরিবর্তে অন্য কাউকে ক্ষমতায় দেখতে চায়নি।
(১২ সেপ্টেম্বর, ২০১৫)