ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

সিংগাপুর একটি পর্যটন সুবিধা ও সার্ভিস বিক্রেতা দেশ। সামান্য কিছু উচ্চ মার্গের শিল্পদ্রব্যের বাইরে তাদের রপ্তানী করার তেমন কিছু নেই। বেঁচে থাকার জন্য যেসব খাদ্যের প্রয়োজন তার পুরোটাই আমদানী করতে হয় বিদেশ থেকে। কৃষি উৎপান সিংগাপুরের অর্থনীতিতে মাত্র ০.০১ ভাগ অবদান রাখে। তাই আজকে যদি অন্য দেশগুলো সিংগাপুরে খাদ্যদ্রব্য রপ্তানী বন্ধ করে দেয়, তাহলে আগামী কাল থেকেই তারা উপোস থাকবে।

কিন্তু খাদ্যদ্রব্যের বাইরেও সিংগাপুরে আর একটি বস্তু বা সেবা আমদানী করা হয়। সেটা হল. আইন প্রয়োগ ও বল প্রয়োগের ক্ষেত্রে নিরপেক্ষতা। বিষয়টি অনেকের কাছ অবাক ঠেকলেও আমার এ নিবন্ধটি সম্পূর্ণ পড়লে পাঠক সহজেই বুঝতে পারবেন।
১৯৪৭ সালে ব্রিটিশগণ ভারত থেকে চলে গেলে তাদের সেনাবাহিনী থেকে ইউরোপীয় অফিসারগণ নিজ দেশে প্রত্যাবর্তন করে। বাকি অফিসার ও ফোর্স ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে ভাগ হয়ে যায়। কিন্তু এসময় ব্রিটিশ বাহিনীর গুর্খা ইউনিট থেকে কিছু সৈন্য নিয়ে একটি গুর্খা রেজিমেন্ট সিংগাপুর ও মালয় ভূখণ্ডে পাঠান হয়। এ সব গুর্খা সৈন্য দিয়ে পরে পুলিশ বাহিনীতে একটি গুর্খা কন্টিনজেন্ট তৈরি করা হয়।ব্রিটিশগণ সিংগাপুর ছেড়ে চলে গেলেও সিংগাপুরে গুর্খা সৈন্যরা থেকে যায় যাদের দিয়ে পরে পুলিশের একটি রিজার্ভ বাহিনী তৈরি করা হয়।

440px-Gurkha_IOC_1

গুর্খা রেজিমেন্ট সিংগাপুর পুলিশের একটি দাঙ্গাদমন বাহিনী হিসেবে বেশ দক্ষতার পরিচয় দেয়। ব্রিটিশ চলে যাবার পর সিংগাপুর ও মালয় ভূখণ্ডে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে। এ সময় চাইনিজ বংশদ্ভূত পুলিশ মালয় বংশদ্ভূত জনগোষ্ঠীর উপর গুলি চালাতে থাকে। একই ভাবে চাইনিজ জাতিগোষ্ঠীর পুলিশ সদস্যরাও মুসলিম মালয়দের উপর গুলি করে। কিন্তু সেই সময় মোতায়েন করা একমাত্র কন্টিনজেন্ট গুর্খারা সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ থেকে তাদের দায়িত্ব পালন করতে থাকে। এসব কথা সিংগাপুরের প্রথম প্রধানমন্ত্রী লি কু ইন এর জীবনী গ্রন্থেই সন্নিবেশিত হয়েছে।

বিবদমান দেশিয় গোষ্ঠীগুলোর বিপরীতে এই নেপালি ভাড়া করা প্যারামিলিটারি পুলিশের নিরপেক্ষ ভূমিকা, সিংগাপুরের পুলিশ বাহিনীতে প্রায় দুই হাজার সদস্যের একটি গুর্খা কন্টিনজেন্টের স্থায়ীত্বের ক্ষেত্রে অকাট্য যুক্তি হিসেবে উপস্থাপিত হয়। ১৯৬০ এর দশকে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাগুলো থেকে শুরু করে নানা ধরনের বিশৃঙ্খলা কঠোরতার সাথে নিরপেক্ষভাবে দমন করার জন্য নেপালি গুর্খাদের উপস্থিতি সিংগাপুরবাসীর কাছে শুধু প্রয়োজনীয়ই মনে হয়নি, এটা এখন সামাজিক ও আইনি স্বীকৃতিও পেয়েছে।

২০০০ সদস্যের গুর্খা কন্টিনজেন্ট এর নেতৃত্বে থাকেন একজন ব্রিটিশ অফিসার। তাকে ব্রিটিশ সেনাবাহিনী থেকে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে আত্মীকরণ করা হয়। সিংগাপুর পুলিশ পদবীতে তিনি একজন ডেপুটি এসিসটেন্ট পুলিশ কমিশনারের সমান। এ পদটি সুপার ইনটেন্ডেন্ট এর উপরে। অন্যদিকে গুর্খাদের বাছাই ও নিয়োগ চলে নেপালের পোখরানে যা ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষই সিংগাপুরের জন্য করে দেন। প্রতি বছর প্রায় ৩৭০ এর মতো গুর্খা যুবককে সিংগাপুর পুলিশের জন্য বাছাই করা হয়।

নেপাল থেকে চেঙ্গি এয়ারপোর্টে অবতরণের পর গুর্খা যুবকদের সরাসরি সিংগাপুরের মাউন্ট ভেরনোন পুলিশ ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে চলে তাদের কঠিন প্রশিক্ষণ। তাদের উন্নত প্রশিক্ষণ, বিশেষ করে জঙ্গল কোর্সের প্রশিক্ষণের জন্য ব্রুনাইয়ের পাহাড়ী জঙ্গলেও নিয়ে যাওয়া হয়।
মাউন্ট ভেরনোন ক্যাম্পে গুর্খাগণ মূলত নির্জন জীবন যাপন করেন। এখানে তাদের পরিবার নিয়ে বসবাসের অধিকার দেয়া হয়। তবে তাদের চলাচল এখানেই সীমাবদ্ধ। এ ক্যাম্পের মধ্যে উপাসনালয় থেকে শুরু করে সুপার মার্কেট পর্যন্ত রয়েছে। গুর্খা পুলিশ সদ্যদের প্রতি তিন বছর পর পর ছুটি যেতে দেয়া হয়। ছয় বছর পর তারা নেপাল থেকে তাদের পরিবার সাথে করে নিয়ে আসে। কোন গুর্খা পুলিশ সদ্স্য সিংগাপুরে কিংবা সিংগাপুরি মেয়েকে বিয়ে করতে পারবে না। তাদের চাকুরির মেয়াদ শেষে অবশ্যই দেশে ফিরে যেতে হবে।

প্রশিক্ষণ কালে গুর্খা কন্টিনজেন্ট এর উপস্থিতির কথা শুনে আমরা অনেকটাই অবাক হয়ে যাই। আমরা প্রশ্ন করি, এটা কি তাহলে জনবলের অভাব থেকেই করা হয়েছে?। কিন্তু পুলিশ প্রশাসন থেকে শুরু করে সাধারণ প্রশাসনের সবার কাছ থেকেই জানতে পেরেছি, সিঙ্গাপুর পুলিশ বাহিনীতে গুর্খা রেজিমেন্টের উপস্থিতি মূলত বহুধাবিভক্ত সমাজ সিঙ্গাপুরে নিরপেক্ষভাবে আইন প্রয়োগ, বিশেষ করে জনতার উপর বল প্রয়োগের ক্ষেত্রে নিরপেক্ষ ভূমিকার জন্যই অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। সবাই গুর্খাদের উপস্থিতিকে প্রয়োজনীয় বলেই মনে করেন।
গুর্খা পুলিশ সদস্যগণ দাঙ্গা দমনের বাইরেও বর্তমানে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, জাতীয় ও বিশেষ দিবসের অনুষ্ঠান ও সমাবেশগুলোতে কঠোর নিরাপত্তা দানের জন্যও মোতায়েন করা হয় ।সিংগাপুর পুলিশের রিজার্ভ বাহিনী মূলত এ গুর্খাদের দিয়েই তৈরি।কঠোর নিয়মানুবর্তীতা, নেতৃত্বের প্রতি সীমাহীন আনুগত্য ও অকুতোভয় চরিত্রের জন্য নেপালের গুর্খাগণ সিংগাপুরসহ আরো কিছু দেশে নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করছে।