ক্যাটেগরিঃ আন্তর্জাতিক

সভা সমাবেশ, বিক্ষোভ, শোভাযাত্রা ইত্যাদি গণতান্ত্রিক দেশে স্বীকৃত অধিকার হলেও এসব অধিকার প্রয়োগ করা সর্বাংশেই বাধাহীন নয়। জনগণের জান-মালের নিরাপত্তা, নাগরিক দুর্ভোগের মাত্রা ইত্যাদি বিবেচনায় এসব কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণের বিধান সব দেশেই রয়েছে। কিন্তু সিংগাপুরে এ ধরনের কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণ বেশ চোখে পড়ার মতো ভাবেই হয়ে থাকে। সিংগাপুরে কেউ চাইলেই যে কোথাও জনসভা কিংবা বিক্ষোভ প্রদর্শন করতে পারেন না। সিংগাপুরের রাস্তাঘাট বন্ধ করে ঘন্টার পর ঘন্টা জনসভা করার কথা কেউ চিন্তাও করতে পারে না।

সমাবেশ বা বিক্ষোভ করতে গেলে তাদের হোং লিম পার্কের একটি নির্দিষ্ট স্থানে কর্তৃপক্ষের পূর্ব অনুমতি নিয়ে করতে হবে। পার্কের এ স্থানটির নাম দেয়া হয়েছে ‘স্পিকারর্স কর্নার’। লন্ডনের হাইড পার্কের আদলে হোং লিম পার্কে স্পিকার্স কর্নার গঠন করা হয় ২০০০ সালে। সিংগাপুরের সংবিধানে সভাসমাবেশ করা ও মতামত প্রকাশের স্বাধীনতা স্বীকৃত হলেও তা বিধি নিষেধ সাপেক্ষ।

স্পিকার্স কর্নারে বিক্ষোভ সমাবেশ বা জনসভা করার জন্য বেশ কিছু বিধি নিষেধও রয়েছে। সিংগাপুরের নাগরিক কিংবা স্থায়ী বাসিন্দা ছাড়া অন্য কেউ এখানে সমাবেশ করতে পারবে না। সিংগাপুরের চারটি সরকারি ভাষা যথা- ইংরেজি, মালয়, ম্যান্ডারিন(চাইনিজ) ও তামিল ভাষা ভিন্ন অন্য কোন ভাষায় বক্তব্য রাখা যাবে না। সভায় মাইক ব্যবহার করা যাবে না। তবে ব্যাটারি চালিত লাউ স্পিকার বা হেলার ব্যবহার করা যাবে। জাতীয় নিরাপত্তা, ধর্মীয় কিংবা জাতিগত বিদ্বেষপূর্ণ বক্তব্য দেয়া যাবে না। সকাল সাতটা থেকে শুরু করে সন্ধ্যা সাতটার মধ্যেই সমাবেশ শেষ করতে হবে। অধিকন্তু স্পিকার্স কর্নারের পুরোটাই সিসিটিভি দ্বারা আবৃত। তাই এখানকার কার্যক্রমের ধারাবাহিক রেকর্ড ডিভিতে/ভিডিওতেই ধারণ করা থাকে।

সভাসমাবেশ ও মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে স্পিকার্স কর্নার ব্যবস্থা অনেকটাই সংকুচিত করেছে। কারণ একটি নির্দিষ্ট স্থানে শর্ত সাপেক্ষা সভা করা হলে হয়তো শ্রোতার ঘাটতি পড়বে। অধিকন্তু মাইক বা বিদ্যুৎচালিত লাউড স্পিকার ব্যবহার করতে না দেয়ায় স্পিকার্স কর্নারের বক্তব্য খুব বেশি সংখ্যক মানুষ শুনতে পায় না। দেশ-বিদেশের মানবাধিকার ও গণতন্ত্রের কর্মগণ সিংগাপুরের এ ব্যবস্থার কড়া সমালোচনাও করে। ২০১১ সালে প্রকাশিত ওয়ার্লড জাস্টিস প্রকল্পের আইনের শাসনের যে সূচক প্রকাশ করা হয়েছিল সেখানে সিংগাপুর শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা, দুর্নীতিহীনতা এবং কার্যকর ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থা শিরোনামগুলোতে উচ্চ্চচতর স্কোর পেলেও মত প্রকাশ ও সভাসমাবেশের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে খুব নিম্ন স্কোর লাভ করে। কিন্তু এর পরেও সিংগাপুরের সরকার পাইকারি হারে তাদের রাস্তায় বা শহরের কোথাও জনসভা করার অনুমতি দিতে রাজি নয়।

নির্বাচনী প্রচার সিংগাপুরে অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত হয়। ২০১৫ সালের সংসদ নির্বাচন হয়েছিল ১১ সেপ্টেম্বর। পহেলা সেপ্টেম্বর তফসিল ঘোষণা, ২ সেপ্টেম্বর থেকে ০৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রচার।১০ দিন সেপ্টেম্বর প্রস্তুতি দিবস। আর তার পরদিন নির্বাচন। নির্বাচনী প্রচারণার জন্য মাত্র আট দিন সময়। এ সময়ের মধ্যে দি স্পিকার্স কর্নার বন্ধ থাকে। এর বাইরে বিশেষ কিছু স্থানকে জনসভা বা প্রচারণার জন্য নির্দিষ্ট করে দেয়া হয়। প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলো চাইলে আগাম বুকিং দিয়ে সেই সময় স্থানে জনসভা করতে পারেন।

বাড়িঘর, রাস্তাঘাট আর এখানে সেখানে চিকা মারার বিধান সিংগাপুরে নেই। কিছু কিছু স্থানে ব্যানার টানানো যাবে। কিন্তু সেগুলোর অপসারণের ভার প্রচারকারীদেরই নিতে হবে। ৬-১১ সেপ্টেম্বর আমি সিংগাপুরে অবস্থান করেছিলাম। এ সময় ছিল নির্বাচনী প্রচারণার মূল সময়। কিন্তু কয়েকটি স্থানে কিছু লাঠির সাথে পতাকার মতো লাগানো ব্যানারে নির্বাচনী শ্লোগান দেখেছি। কয়েকটি বহুতল ভবনে ঝুলছিল বড় বড় ব্যানার। কয়েকটি বাড়ির জানালা দিয়ে ছোট ছোট লাঠিতে কিছু কাপড়ের প্লেকার্ড দেখেছি। এ ছাড়া গাড়ি-বাড়ি-দালান-কোটা-ট্রেন-বাসে কোন পোস্টার দেখিনি। কোথাও মাইকে প্রচারণা দেখিনি। ভোট চাওয়ার দলও রাস্তায় বা মার্কেট প্লেসে পাওয়া যায়নি।

সিংগাপুরের গণতন্ত্রকে অনেকে নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্র মনে করেন। এ নিয়ে মানবাধিকার কর্মী, ডেমোক্র্যাসি ওযাচ ধরনের আন্তর্জাতিক সংগঠনগুলো থেমে থেমে কথা বলেন। অবশ্য আমাদের দেশের অবস্থা নিয়ে যেমন নিরবিচ্ছিন্নভাবে তারা রেকর্ড বাজান, সিংগাপুরের ক্ষেত্রে তা করেন না বা করতে পারেন না। হাজার হলেও ওদের দেশ ঋণ নিয়ে চলে না, ঋণ দিয়ে চলে। কিন্তু অবস্থা যাই হোক, সিংগাপুরের রাস্তায় রাজনীতির নামে বিশৃঙ্খ লা আর পাবলিক হয়রানি হয় না। এখানে হয়তো অনেকে অসন্তুষ্ট থাকতে পারেন, কিন্তু আমাদের দেশের মতো নাগরিকগণ রাজনীতির নামে যানজন, মানবজট আর শ্লোগানে, বিক্ষোভে অতিষ্ট হয়ে গণতন্ত্রকে তুলোধূনো করেন না।

 

( ২০ সেপ্টেম্বর, ২০১৫)