ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

নিরাপত্তাবোধ নিয়ে আমাদের মনে নানা প্রশ্ন রয়েছে। কেউ কেউ মনে করেন, আমাদের সমাজে আমরা সম্পূর্ণ নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়েছি। কেউ কেউ মনে করেন আমাদের বাংলাদেশটা বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। এখানে রাস্তাঘাটে বখাটে, সন্তাসী, চাঁদাবাজ আর ছিনতাইকারীদের ভয়ে চলাচল করা যায় না। এসব কাজের অপারগ কাজি হিসেবে অনেকে দোষারোপ করেন পুলিশকে। কারণ তারা পুলিশকে মানুষের নিরাপত্তার প্রাথমিক কারক বলে মনে করেন। পত্রপত্রিকা, টেলিভিশনের টকশো, নাগরিক আড্ডা ইত্যাদিতে এক শ্রেণির মানুষ দেশটাকে বসবাসের অনুপযোাগী বলে প্রচার করতে বড়ই আনন্দিত বোধ করেন।

কিন্তু প্রচার মাধ্যমের প্রচারিত ও পরিচিত মুখগুলোর বাইরেও আমাদের সমাজে রয়ে গেছে লক্ষ লক্ষ মুখ, নারী-পুরুষ-শিশু, আবালবৃদ্ধবণিতা– এরা কি সবাই একই রকম চিন্তা করেন? তাদের সমাজ কি তাদের কাছে বসবাসের অনুপযোগী, তারা কি দিনে, রাতে সকাল, বিকাল তাদের নিজস্ব জনপদে চলতে ফিরতে নিরন্তর ভীতির মধ্যে থাকেন? তারা কি অভয়দানকারী পুলিশের প্রতি বিশ্বাস হারিয়েছেন?

সমাজে বিরাজমান অপরাধ, অপরাধভীতি, বিশৃঙ্খলা, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির প্রতি সাধারণ জনগণের মনোভাব কি তা পরিমাপের জন্য সনাতনী পদ্ধতি হল পুলিশের খাতায় বিধিবদ্ধ অপরাধ পরিসংখ্যান। থানায় রুজুকৃত মামলার ঘাটতি বাড়তি দেখে কোন সমাজের অপরাধ পরিস্থিতি সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা পাওয়া যায়। কিন্তু সব অপরাধের খবর থানায় এসে পৌঁছে না, আবার অনেক খবর থানায় এলেও সেগুলোর বিপরীতে নিয়মিত মামলাও রুুজ করা হয় না। আবার অনেক অপরাধ আছে যেগুলো থানা বেশি বেশি করে রিপোর্ট করা হয়। থানায় রুজুকৃত মামলাগুলোর মধ্যে একটি বড় অংশ থাকে মিথ্যা, অর্ধসত্য কিংবা রংচং দেয়া । তা ছাড়া অপরাধ পরিস্থিতিকে নিজেদের অনুকূলে দেখাবার জন্য পুলিশে নিজেরাও থানায় রক্ষিত অপরাধ পরিসংখ্যানকে নিজেদের মতো করে গড়ে নিতে সচেষ্ট থাকতে পারে।

তাই অপরাধ পরিস্থিতি ও নিরাপত্তাবোধ সম্পর্কে সঠিক ধারণা পাবার জন্য একটি দ্বিতীয় পদ্ধতি ক্রমশই জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। সেটা হল পাবলিক পার্সেপশন সার্ভে বা জন উপলব্ধি জরিপ। বিশ্বের দেশগুলোর নাগরিকদের মধ্যে তাদের সমাজে অপরাধ পরিস্থিতি ও নিরাপত্তাবোধ সম্পর্কে জনউপলব্ধি জরিপ চালানোর আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর মধ্যে প্রধানতম হল যুক্ত রাষ্ট্রভিত্তিক গ্যালাপ অর্গানাইজেশন । দেশে ও বিদেশে নানা বিষয়ের উপর জরিপ চালায় এ সংস্থাটি। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের জনগণ তাদের সমাজকে কতটুকু নিরাপদবোধ করেন তার উপর নিয়মিত গণজরিপ চালায় সংস্থাটি। তাদের সর্বশেষ জরিপে ১৪১টি দেশের মানুষের উপর জরিপ করে দেখান হয়েছে আমাদের বাংলাদেশি সমাজকে কতিপয় মানুষ যতটা অনিরাপদ বলে প্রচার করেন, আমাদের সমাজ আসলে ততটা অনিরাপদ নয়।

এদেশের অধিকাংশ মানুষ মনে করেন, এ দেশে বসবাসের উপযোগী। রাত বিরাতে চলতে ফিরতে তারা ততোটা অস্বাচ্ছন্দবোধ করেন না। তারা তাদের স্থানীয় পুলিশকে বিশ্বাস করেন, তাদের উপর আস্থা রাখেন এবং গত এক বছরে দেশের শতকরা ৮৫ ভাগেরও বেশি মানুষ কিংবা তাদের পরিবারের কোন সদস্য চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি কিংবা ঐ জাতীয় সম্পদ খোয়ানোর মতো অপরাধের শিকারে পরিণত হননি। বিশ্ব নিরাপত্তাবোধ সূচকে সর্বোচ্চ স্থানে রয়েছে সিংগাপুর, সর্বনিম্ন অবস্থানে রয়েছে লাইবেরিয়া। বাংলাদেশের অবস্থান ৩০তম। এ নিবন্ধে আমরা এ জরিপ সম্পর্কে বিস্তারিত জানব।

গ্যালাপের মতে পৃথিবীতে আইন-শৃঙ্খলা সংক্রান্ত বিষয়ে পূর্ণ স্কোর হল ১০০ এবং সব নিম্ন স্কোর হল শূন্য । অর্থাৎ কোন দেশ ১০০ পয়েন্ট পেলে বলা হবে সেই দেশ শতভাগ নিরাপদ। আর শূন্য হলে ধরা হবে এ দেশে সম্পূর্ণ বসবাসের অনুপযোগী। তবে এ আদর্শ অবস্থা সম্পূর্ণরূপে ইউটোপিক বা কাল্পনিক। আদতে কোন সমাজ যেমন শতভাগ নিরাপদ নয়, তেমনি সম্পূর্ণ বসবাসের অনুপযোগীও নয়।

সর্বোচ্চ ও সর্ব নিম্ন প্রাপ্ত পয়েন্টের মাঝে গড় ধরা হয়েছে ৬৯। অর্থাৎ ৬৯ পয়েন্টের নিচে প্রাপ্ত দেশগুলো গড় অবস্থার নিচে অবস্থান করছে। ১৪১ টি দেশের মধ্যে ৭০ টি দেশের স্কোর গড়ের নিচে।

গ্যালাপ পোলের বিশ্ব আইন-শৃঙ্খ সংক্রান্ত সূচক-২০১৫ এ সর্বোচ্চ স্কোর ৮৯ অর্জন করেছে সিংগাপুর। এর পরে ৮৮ পয়েন্ট নিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে উজবেকিস্তান ৮৭ পয়েন্ট নিয়ে তৃতীয় স্থানে রয়েছে হংকং ও ইন্দোনেশিয়া। সর্ব নিম্ন ৪০ পয়েন্ট পেয়ে তালিকার সর্ব নিম্নে রয়েছে লাইবেরিয়া। নিচ দিকে নিয়ে দ্বিতীয় হল ভেনিজুয়েলা ও তৃতীয় হল কংগো প্রজাতন্ত্র।

বাংলাদেশ গ্যালাপ পোলের সূচকে ৩০ তম অবস্থানে রয়েছে। এ ১০০ পয়েন্টের মধ্যে বাংলাদেশ পেয়েছে ৭৮ পয়েন্ট। সর্বোচ্চ স্কোর থেকে বাংলাদেশ পেয়েছে ১১ পয়েন্ট (৮৯-৭৮) কম। কিন্তু সর্ব নিম্ন পয়েন্টে থেকে এটা ৩৮ (৭৮-৪০) পয়েন্ট বেশি। বাংলাদেশের এ পয়েন্ট বিশ্ব নিরাপত্তাবোধের গড় স্কোরের চেয়ে তা ৬ পয়েন্ট (৭৮-৬৯) বেশি।

বাংলাদেশের সমান পয়েন্ট পেয়েছে বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর মধ্যে জাপান, তাইওয়ান, নিউজিল্যান্ড ও বেলজিয়াম। এর সাথে রয়েছে আরব দেশ মিশরও।

বিশ্বের পাঁচ পরাশক্তির মধ্যে একমাত্র যুক্তরাজ্য ৭৯ পয়েন্ট নিয়ে বাংলাদেশের উপরে রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ৭৭ পয়েন্ট নিয়ে রাংলাদেশের চেয়ে ৮ ধাপ পিছিয়ে রয়েছে।

মানুষের মনের নিরাপত্তাবোধ নিয়ে জরিপ চালান অনেক জটিল। প্রায় ক্ষেত্রে এ নিরাপত্তাবোধ পরিমাপ করা সম্ভব হয় না। জরিপ নিয়ে নানা প্রকার প্রশ্নও উত্থাপিত হয়। গ্যালাপ সারা বিশ্বের ১৪১ দেশের এক লাখ ৪২ হাজার প্রাপ্ত বয়স্ক মানুষের কাছে নিম্নলিখিত প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছিলেন:

১) আপনি যে এলাকায় বসবাস করেন সে এলাকার পুলিশের উপর আপনার কি আস্থা আছে ?
২) আপনি যে শহরে বসবাস করেন সেখানে রাতের বেলা হেঁটে বেড়াতে নিরাপদ বোধ করেন কি?
৩) গত এক বছরে আপনার বা আপনার পরিবারের কোন সদস্যের টাকা পয়সা বা সম্পদ চুরি হয়েছিল কি ?

প্রতিবেদন অনুসারে বিশ্বের ৬৩% মানুষে তাদের স্থানীয় পুলিশের প্রতি আস্থাশীল। বিশ্বের ৬০% মানুষ তাদের নিজ শহরে রাতের বেলা হেঁটে বেড়াতে নিরাপদ বোধ করেন। অন্যদিকে তাদের হিসেব মতে বিশ্বের মত ১৫% লোকের কিংবা তাদের পরিবারের সদস্যদের কেউ কেউ টাকা পয়সা বা সম্পত্তি চুরির শিকারে পরিণত হয়েছে।

নিবন্ধের এ পর্যায়ে গ্যালাপ ইন্সটিটিউশনের শুরু ও বর্তমান কার্যক্রম সম্পর্কে কিছু তথ্য প্রদান সমীচীন হবে বলে মনে করি। জর্জ হোরেম গ্যালাপ (১৯০১-১৯৮৪) নামের এক আমেরিকান গবেষক ১৯৩৫ সালে তার নামে আমেরিকার নিউ জার্সি অঙ্গ রাজ্যের প্রিন্সটন শহরে Gallup Institution of Public Opinion প্রতিষ্ঠা করেন যার মাধ্যমে নানা প্রকারের জরিপ ও গবেষ কম পরিচালনা করা হয়। পৃথিবীর ২০টি দেশে গ্যালাপের চারটি বিভাগের মোট ৩০টি অফিস রয়েছে যাদের মোট কর্মচারীর সংখ্যা ২ হাজারেরও বেশি। তার জরিপ কাজের নিরপেক্ষতা ও বস্তু নিষ্ঠতার বজায় রাখার জন্য গ্যালাপ নীতিগতভাবে এমন কোন জরিপ করেনা যেখানে স্বার্থ সংশ্লিষ্টগণ অর্থায়ন করে।

গ্যালাপের প্রথম জরিপ ছিল ১৯৩৬ সালের আমেরিকার রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সংক্রান্তে। এই জরিপে দেখান হয়েছিল যে রাষ্ট্রপতি প্রার্থী ফ্রাংকলিন রুজভেল্ট আলফ্রেড লন্ডনকে পরাজিত করবে। এটা সত্য প্রমাণিত হলে গ্যালাপ জরিপ অসম্ভব জনপ্রিয় হয়ে পড়ে। ১৯৩৬-২০০৮ পর্যন্ত আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি নির্বাবচনের পূর্বে প্রায় সবগুলো নির্বাচনেই প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের জনপ্রিয়তা তথা নির্বাচনে জয়লাভের সম্ভাবনা নিয়ে গ্যালাপ জরিপ চালিয়েছে। এর মধ্যে মাত্র ১৯৪৮ ও ১৯৭৬ সালর রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ছাড়া গ্যালাপের সকল জরিপই সঠিক প্রমাণিত হয়েছিল।

গ্যালাপ জরিপের সাথে বাংলাদেশের আইন-শৃঙ্খলা, নিরাপত্তাবোধ, পুলিশের প্রতি জনগণের আস্থা ইত্যাদি সংক্রান্ত ইতোপূর্বে পরিচালিত দেশিয় গবেষণা ও জরিপগুলোর একটা তুলানা আমরা করতে পারি।

ইতোপূর্বে ২০১৩ সালের আগস্ট মাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলোজি ও ক্রিমিনাল জাস্টিস প্রোগামের অধীন পরিচালিত এক জরিপে দেখান হয়েছিল ঢাকা মেট্টোপলিটন পুলিশের সেবাপ্রার্থী জনগণের প্রায় ৮২% পুলিশের উপর সন্তুষ্ট। ঐ জরিপটি নিয়ে সেই সময় বেশ সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছিল। কিন্তু গ্যালাপ পোলের ফলাফল প্রমাণ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐ জরিপেও নগরবাসির সঠিক মতামত প্রকাশিত হয়েছিল। কারণ বাংলাদেশ গ্যালাপ পোলে পেয়েছে ৭৮ পয়েন্ট যা পুলিশের কাছে সেবা নিতে আসা ঢাকাবাসীর পুলিশের প্রতি আস্থার প্রায় কাছাকাছি।

তবে আমাদের মনে রাখতে হবে যে, গ্যালাপ পোলের বিশ্ব আইন শৃঙ্খলা বা নিরাপত্তা বোধ এ সূচকটি কিন্তু সমগ্র বিশ্ববাসীর জন্য সার্বজনীন কোন নিরাপত্তাবোধ সূচক নয়। কারণ এ জরিপে মতামত প্রদানকারী ব্যক্তিগণ প্রত্যেকে তাদের নিজ নিজ শহর/দেশের/পুলিশের উপর তাদের মতামত দিয়েছেন। একজন আমেরিকান এ পোলে বাংলাদেশ সম্পর্কে কি ধারণা পোষণ করেন কিংবা একজন বাংলাদেশি জাপানের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় কতটা সন্তুষ্ট তা বলা হয়নি। তাই এ জরিপের পয়েন্টগুলো প্রত্যেক দেশের নাগরিকদের তাদের নিজ নিজ দেশ সম্পর্কে উপলব্ধি ও অভিজ্ঞতার জরিপ। হয়তো একজন সিংগাপুরবাসী সিংগাপুর সিটি ও বাংলাদেশ সম্পর্কে ভোটভোটিতে অংশ নিলে ফলাফল ভিন্ন রকম আসতে পারত। কারণ প্রত্যেক দেশের নাগরিকগণ তাদের সমাজ, পুলিশ ও সরকারের প্রতি ভিন্ন ভিন্ন প্রত্যাশা আরোপ করে।

পরিশেষে বলা যায়, বাংলাদেশের সমাজ বৈশ্বিক বিবেচনায় এখনও একটি নিরাপদ সমাজ। জাপান, বেলজিয়াম, নিউজিল্যান্ড প্রভৃতি উন্নত ও নিম্ন অপরাধপূর্ণ দেশের জনগণের মতোই এদেশের জনগণ তাদের দেশ/ শহরকে নিরাপদ মনে করেন। এ দেশের শতকরা ৭৮ ভাগ মানুষ তাদের স্থানীয় পুলিশের প্রতি আস্থাশীল। গ্যালাপের এ প্রতিবেদন শুধু সরকার বা পুলিশের জন্য স্বস্তিদায়ক নয় বরং দেশের প্রতিটি নাগরিকের জন্য তা সুসংবাদ।

সূত্রাবলী:
১. Dhaka Tribune, 21 August 2013
2. https://en.wikipedia.org/wiki/Gallup_(company)
3. http://www.gallup.com/services/185798/gallup-global-law-order-2015-report.aspx