ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা, ফিচার পোস্ট আর্কাইভ

 
27_gonojagoron+mancha_170815_0004

আইন মানুষের কতিপয় আচরণকে সংজ্ঞায়িত করে সেগুলোকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে। কিন্তু মানুষের সকল আচরণকে সংজ্ঞায়িত করা সম্ভব নয়। বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ উদ্দীপকগুলোর প্রতি মানুষের সতত পরিবর্তনশীল প্রতিক্রিয়া তথা পরিস্থিতিকে খাপ খাইয়ে নেয়ার বৈচিত্র্যই এর জন্য দায়ি।

আইনের নানাবিধ সংজ্ঞা রয়েছে। এগুলোকে আইনি, সমাজ বৈজ্ঞানিক, অপরাধ বৈজ্ঞানিক, দ্বান্দ্বিক বা মার্কসবাদীয় ইত্যাদি নানা ক্যাটাগরিতে ভাগ করা হয়। কিন্তু যে দৃষ্টিভঙ্গিতেই এগুলোকে ফেলান হোক না কেন আইনের উদ্দেশ্য হল মানুষের বিশেষ বিশেষ আচরণগুলোকে সংজ্ঞায়িত করে সেগুলো নিয়ন্ত্রণ করা

কিন্তু যারা আইন প্রয়োগ করেন তাদের আচরণ যদি নিয়ন্ত্রণ করা না যায়, তাহলে আইন যত কঠিনই হোক না কেন, সেই আইন দিয়ে সমাজের কোন উপকার হয় না। বরং তা সমাজের জন্য বিপত্তি ডেকে নিয়ে আসে।

বাংলাদেশে অনেক আইন নিয়ে নিরন্তর বিতর্ক রয়েছে। কিন্তু যত বিতর্কই থাক এগুলোর মধ্যে এমন সব আইন আছে যেগুলোর পরিবর্তনের কোন উদ্যোগ যেমন গ্রহণ করা হয়নি, তেমনি এগুলোতে পরিবর্তনের মতো তেমন কোন উপাদান নেই। ব্রিটিশ আমলের অনেক আইন পরিবর্তন না করার বা পরিবর্তিত না হবার এক মাত্র কারণ এই নয় যে আইনটি নিজেই কালোত্তীর্ণ । এ পরিবর্তনহীনতার অন্যতম ও প্রধানতম কারণ হতে পারে, দুই বা তিনশত বছর পূর্বে এ দেশের মানুষ যেমন আচরণ করত, এখনও কম বেশি তারা তেমন আচরণই করেন। যেহেতু মানুষের আচরণে খুব একটা পরিবর্তন আসেনি, তাই আচরণ নিয়ন্ত্রণ করার জন্য প্রণীত আইনেও পরিবর্তনের জরুরৎ নেই।

১৮৯৮ সালে রচিত ক্রিমিনাল প্রসিজিউর কোর্ড যাকে সংক্ষেপে আমরা সিআরপিসি বলে থাকি তার ৫৪ ধারাটি নিয়ে সীমাহীন বিতর্ক রয়েছে। কিন্তু আমার মতে সিআরপিসির ৫৪ ধারায় পুলিশের ক্ষমতা ন্যূনতম। এই ধারার নয়টি ক্ষেত্রের মধ্যে একটি মাত্র ক্ষেত্রের (প্রখম ক্ষেত্র)[১] শেষ অংশে একটু অস্পষ্টতা রয়েছে। কিন্তু অন্য ক্ষেত্রগুলো সুস্পষ্ট। এগুলো নিয়ে কারো কোন অভিযোগ নেই। প্রথম ক্ষেত্রের চতুর্থ অংশে যৌক্তিক সন্দেহ হলে যে কোন পুলিশ অফিসার যে কোন ব্যক্তিকে বিনা পরোয়ানায় গ্রেফতার করতে পারবে। এখন এই যে সন্দেহমূলকভাবে গ্রেফতারের ক্ষেত্রটি যদি সাধারণভাবে বিস্তৃত করা না হয়, অর্থাৎ অন্যগুলোর মতো সুস্পষ্ট করা হয় (যা কখনই করা সম্ভব না) তাহলে কোন ব্যক্তির বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট মামলা না হলে তাকে গ্রেফতারও করা যাবে না।

অর্থাৎ কোন ব্যক্তি যদি প্রকাশ্যে অপর কোন ব্যক্তিকে খুন করে বসে এবং তার বিরুদ্ধে যদি কোন নিয়মিত মামলা রুজু না হয় তাহলে তাকে তো গ্রেফতার করা যাবে না। অনেকে বলবেন, প্রকাশ্যে খুন করবে আর তার বিরুদ্ধে মামলা হবে না– এটা কেমন কথা। হ্যাঁ, অপরাধ সংঘটিত হওয়া, অপরাধের খবর পুলিশের কাছে যাওয়া, সেই খবরের প্রেক্ষিতে থানায় মামলা রুজু করা ইতাদি বিষয়গুলো তো অনেকটাই পদ্ধতিগত।

কম্পিউটারে একটা ক্লিক করার মতো ন্যূনতম সময়ের মধ্যে কোন পদ্ধতিতে পৃথিবীর কোন দেশেই আইনের আশ্রয় নেয়ার সুযোগ নেই। তাই অপরাধ সংঘটিত হওয়া ও মামলা হওয়ার মধ্যবর্তী সময়ের জন্য জন্য পুলিশের (এমন কি সাধারণ মানুষের জন্যও) হাতে কিছু না কিছু আইন থাকা দরকার। সিআরপিসির ৫৪ ধারটি মূলত এমনি একটি অন্তবর্তীকালীন সময়ের জন্য। তাই ব্রিটিশ আমল থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত যত সমালোচনাই হোক এটার গায়ে কেউ আঁচড় পর্যন্ত বসাতে পারেনি।

আইসিটি আইনের ৫৭ ধারা সম্পর্কেও আমার একই অভিমত। মানুষের সব আচরণকে সংজ্ঞায়িত করা সম্ভব নয়। তাই আইনকে সহজেই যে কেউ মনের মত করে, নিজের মতো করে, সরকারের মতো করে, ক্ষমতাশালীদের মতো করে, অর্থশালীদের মতো করে ব্যাখ্যা করতে পারে। সিআরপিসির ৫৪ ধারা বলেন, আর আইসিটি আইসিটি আইনের ৫৭ ধারা বলেন, কোন আইনই মানুষের অকল্যানের জন্য প্রণীত হয়নি। কিন্তু এগুলোর মাধ্যমে অকল্যানের সূচনা করে মানুষই। তাই আইন প্রণয়ন, পরিবর্তন, পরিবর্ধনের চেয়ে আইনের পিছনের মানুষগুলোকে পরিবর্তন, পরিবর্ধন, শিক্ষিত ও দক্ষ করে তোলা দরকার।

একটি সাদা মাটা উদাহরণ দেয়া যাক। মানুষ খুন করার জন্য আসলে কামান-বন্দুক-পিস্তল-রামদার দরকার হয় না। খালি হাতেও মানুষ খুন করা যায়। এ ক্ষেত্রে মানুষের হাতদুটোই ভিকটিমের বিরুদ্ধে বড় অস্ত্র। কিন্তু তাই বলে মানুষের হাত দুটো কেটে ফেলার পরামর্শ কেউ দিবেন না।

বলা বাহুল্য, সিআরপিসির ৫৪ কিংবা আইসিটি আইনের ৫৭ ধারার চেয়েও কঠিন আইন ও আইনের ধারা বাংলাদেশে রয়েছে। কিন্তু সেগুলোর অপব্যবহার সম্পর্কে তেমন কথা শোনা যায় না। ২০০৬ সালের আইসিটি আইনটির ৫৭ ধারা ২০১৪ তে এসে আলোচনায় আসল। এর কারণ কিন্তু আইনটি নয়, আইনের পিছনের মানুষগুলোর, আইনের পিছনের শক্তিগুলোর। তাই আইনের চেয়ে আইনের পিছনের মানুষ ও শক্তিগুলোর পরিবর্তনের কোন চেষ্টা করা যায় কি না, তাই দেখা বেশি কার্যকরি হবে বলে মনে করি।

টীকা/সূত্র:
[১] Any police-officer may, without an order from a Magistrate and without a warrant, arrest-
firstly , any person who has been concerned in any cognizable offence or against whom a reasonable complaint has been made or credible information has been received, or a reasonable suspicion exists of his having been so concerned;