ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

চাঁদপুর জেলায় মাদক সমস্যা রয়েছে বলে স্থানীয় লোকজন কয়েকটি অনুষ্ঠানে উল্লেখ করলেন। পুলিশ প্রশাসন তাদের সর্ব শক্তি দিয়ে মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান চালাচ্ছে। কিন্তু এ কাজটি একা পুলিশের পক্ষে মোকাবেলা করা সম্ভব নয়। মাদক সমস্যা যাতটা না আইন-শৃঙ্খলা বিষয়ক তার চেয়েও বেশি সামাজিক। তাই মাদক বিরোধী কর্মকাণ্ডে গোটা সমাজকে অন্তর্ভুক্ত করা না গেলে এ থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব নয়। আমাদের মানীয় আইজিপিও তাদের সে কথাই বললেন। তিনি পুলিশকে নির্দেশ দিলেন, সবাইকে সাথে নিয়ে কাজ করতে। আবার জনগণকে, বিশেষ করে সাংবাদিকদের বললেন, পুলিশের সাথে কাজ করতে।

এ সময় চলছিল মাননীয় আইজিপির চাঁদপুরে সাংবাদিকব্রিফিং অনুষ্ঠান। এ অনুষ্ঠানে আমি মঞ্চে উপস্থিত থাকলেও অনেক দর্শকদের মতোই ছিলাম। কিছু কিছু বিষয়ে নোট নিচ্ছিলাম। এ সময় মনে হল, মাদক সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে কমিউনিটি পুলিশিং দর্শনের আলোকে এসপি চাঁদপুরকে কিছু পরামর্শ দেয়া দরকার। উপস্থিত বুদ্ধিতে একটি খসড়া পরামর্শ লিখে এসপির কাছে দিলাম। পরামর্শগুলোর পরিশীলিত রূপ নিন্মে তুলে দিলাম।

১. জেলার সকল মাদক ব্যবসায়ীদের তালিকা প্রস্তুত করে সাঁড়াসি অভিযান পরিচালনা করা। হেফাজতে মাদক পাওয়া যাক বা না যাক, মাদক ব্যবসায়ী হওয়ার প্রমাণ থাকলেই তাকে গ্রেফতার করতে হবে। এ জন্য পুলিশের হাতে নানা প্রকারের আইন রয়েছে। সম্ভব্য সকল আইনই প্রয়োগ করতে হবে।

২. মাদকের আড্ডাগুলে চিহ্নিত করে সেগুলোকে ধ্বংস করে দেয়া। এ ক্ষেত্রে পরিচিত আড্ডাগুলোর পাশাপাশি অপরিচিত আড্ডাগুলোকেও বিবেচনায় আনতে হবে।

৩. মাদক ব্যবসায়ীগণ কোন এলাকায় বাসা ভাড়া নিয়ে থাকলে বাসার মালিকদের বুঝিয়ে মাদক ব্যবসায়ীদের বাসা ভাড়া না দেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে এবং প্রয়োজনে তাদের ভাড়ার বাসা থেকে তাড়াতে হবে।

৪. যে সব মাদক ব্যবসায়ী সম্মানজন পেশায় আসতে চায় তাদের বৈধ পেশায় পুনর্বাসন করা যেতে পারে। এজন্য মোটিভেশনমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনাসহ সরকারি ও বেসরকারি সহায়তায় সম্মানজনক পেশায় আসতে আগ্রহীদের পুনর্বাসন করা যেতে পারে।

৬. মাদকাসক্তদের তালিকা তৈরি করে তাদের নিয়ে গোপন ও প্রকাশ্য মোটিভেশনমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা যেতে পারে।

৭. পুলিশ সুপার কিংবা থানার অফিসার ইন চার্জগণ মাদকাক্তদের পিতামাতা-অভিভাবকদের নির্দেশনামূলক চিঠি লিখে তাদের সন্তানদের মাদকাসক্ততা সম্পর্কে অবহিত করতে পারেন এবং তাদের এ ক্ষতিকর অভ্যাস বা আশক্তি থেকে দূরে রাখার জন্য পরামর্শ দিতে পারেন।

৮. মাদকাশক্ত ব্যক্তি ও তাদের পরিবারের সদস্যদের নিয়ে যৌথ মিটিং করে তাদের সমস্যাগুলো শোনা ও সেগুলো সমাধানের চেষ্টা করা যেতে পারে।

৯. মাদকাশক্ত ব্যক্তিদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করা। এক্ষেত্রে সরকারি-বেসরকারি মাদক নিরাময় কেন্দ্র/ হাসপাতাল ও সংগঠনগুলোকে সাথে নিয়ে কাজ করা যেতে পারে।

১০. স্থানীয় মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরকে সাথে নিয়ে কাজ করতে হবে। মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের স্থানীয় অফিসে জনবল বা লজিস্টিক সংকট থাকলে তা দূর করার জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করা। এক্ষেত্রে পুলিশ তাদের রিকুইজিসন করা গাড়ি দিতে পারে, তাদের সাথে দ্রুত পুলিশ ফোর্স সরবরাহ করতে পারে। মাদক দ্রব্যের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলে তাদের সাহায্য চাইতে পারে।

১১. মাদক আসক্ততার ঝুঁকিতে থাকা তরুণ তরুণীদের নিয়ে পরামর্শদান ও অনুপ্রেরণামূলক বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা যেতে পারে। এজন্য বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্রছাত্রী ও পাড়ায় মহল্লায় তরুণ তরুণীদের নিয়ে অনুষ্ঠান করা যেতে পারে। এসব অনুষ্ঠানে মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের কর্মকর্তাদের সম্পৃক্ত করা যেতে পারে। স্থানীয় কমিউনিটি পুলিশিং ফোরামগুলো এসব অনুষ্ঠান আয়োজনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে পারে।

দুটি উত্তম অনুশীলন

মাদক সমস্যা সমাধানের জন্য ২০১০ সালে নোয়াখালী জেলার সেনবাগ থানার তৎকালীন অফিসার ইনচার্জ জনাব মোঃ আলমগীর কিছু অভিনব পদ্ধতি অবলম্বন করেছিলেন। তার পদ্ধতিগুলো ছিল নিম্নরূপ:

জেলার সকল মাদক স্পট তিনি ক্রমান্বয়ে সাঁড়াসি অভিযান চালিয়ে ধংশ করে দেয়ার পরও দেখতে পেলেন একটি বাজারের দুইটি মুদির দোকানের আড়ালে মাদক ব্যবসা করা হয়। তিনি দোকান দুইটি সিলগালা করে দিলেন। এর পর সেই মুদির দোকানের ছদ্মবেশি মাদক ব্যবসায়ীদের নিরন্তর দৌড়ের উপর রাখলেন। ইতোমধ্যে ওরা জানতে পারল, পুলিশের কর্মকাণ্ডের ফলে তাদের মাদক ব্যবসা তো দূরের কথা বৈধ ব্যবসাও লাটে উঠছে, তখন ঐ দুই মাদক ব্যবসায়ী ওসির কাছে আত্মসমর্পণ করল। ওসি তাদের নৈতিক শিক্ষা দেয়ার জন্য থানার মসজিদে তাদের ৪০ দিনের তাবলিগি চিল্লা( অনুশীলন) শুরু করলেন। তাদের ওসির নিজ খরচে খাওয়ালেন, পরালেন ও শিক্ষা দিলেন। ৪০ দিন পরে উপজেলা অডিটরিয়ামে শতাধিক লোকের এ কটি সমাবেশ করলেন। এ সমাবেশে তিনি ঐ দুই মাদক ব্যবসায়ীকে তওবা পড়িয়ে তাদের দ্বারা শপথ নেওয়ালেন যে তারা আর কোন দিন এ ব্যবসা করবেন না। এরপর তাদরে দোকানঘরগুলো খুলে দেয়া হল। তারা তখন মাদক ব্যবসা ছেড়ে দিয়ে মুদির দোকানে আত্মনিয়োগ করলেন।

জয়পুর হাট জেলার আক্কেলপুর থানার পুলিশ ও স্থানীয় জনগণ মিলে প্রায় ১৭ জন মাদক ব্যবসায়ীকে বৈধ পেশায় পুনর্বাসন করেছেন। এদের অনেকের হাতে তুলে দিয়েছেন সেলাই মেশিন, রিকসা ভ্যান। কাউকে মুদির দোকান করার জন্য টাকা দিয়েছেন। কোন কোন মাদক ব্যবসায়ীর সন্তানকে চাকরি দেয়া হয়েছে। অনেকের সন্তানের পড়াশুনার খরচ চালিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এ কাজে উপজেলা নির্বাহী অফিসার, সমাজ সেবা অধিদফতরসহ স্থানীয় জনগণ অর্থের যোগান দিয়েছেন।

মাদক সমস্যাকে যতই আইন-শৃঙ্খলা সংক্রান্ত পুলিশি সমস্যা হিসেবে দেয়া হোক না কেন, এর মূল নিহিত আছে সমাজের হতাশা, বঞ্চনা, বেকারত্ম এবং সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোর অপারগতা ও অদক্ষতার উপর। সমাজের প্রাথমিক প্রতিষ্ঠান হচ্ছে পরিবার। কিন্তু আমাদের পরিবারগুলো তাতের সন্তানদের সঠিক পথে রাখতে পারছে না। এর পর বন্ধু-বান্ধব ও পিয়ার-গ্রুপগুলো শিশুদের চরিত্র গঠনে সহায়তা করে। এর পর আসে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ইত্যাদি। কিন্তু আমাদের এস ব প্রতিষ্ঠান অনেকটাই অকার্যকর হয়ে পড়েছে। তাই এসব প্রতিষ্ঠানকে কার্যকর করার মাধ্যমেই মাদক সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে অন্যথায় নয়। কোন জেলার পুুলিশ অফিসারগণ এসব প্রতিষ্ঠানকে সক্রিয় করার জন্য যতটুুকু পারেন ততটুুকুই চেষ্টা করবেন।(১৫ অক্টোবর, ২০১৫)