ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থায় কোন মামলার অভিযোগপত্র দাখিল করার পর পুলিশের স্বউদ্যোগে তেমন কিছু করার থাকে না। মামলাটির অভিযোগপত্র গ্রহণ করা, না করা আদালতের এখতিয়ারভুক্ত। আবার মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদনের ক্ষেত্রেও আদালত স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। পুলিশের প্রতিবেদন গ্রহণ করা আদালতের জন্য বাধ্যতামূলক নয়। অভিযোগ পত্র দেয়া হলেও যেমন আদালত তা গ্রহণ নাও করতে পারে, তেমনি কোন মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয়া হলেও আদালত অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে অপরাধ আমলে নিতে পারে।

কোন মামলায় অভিযোগপত্র দেয়া হলে আসামীদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা কিংবা ক্রোকি পরোয়ানা জারি করাসহ অন্যবিধও কাজের দায়িত্ব আদালতের । পুলিশ এখন শুধু আদালতের আদেশানুসারে কাজ করবে। ওয়ারেন্ট তামিল করবে, আসামীকে গ্রেফতার করবে কিংবা তাদের আদালতে উপস্থিত হতে বাধ্য করার জন্য পরোয়ানা মূলে তাদের মামলামাল ক্রোক করবে।

মামলাটি বিচারের জন্য প্রস্তুত হলে পুলিশের কাজ হল সাক্ষীদের উপস্থিত করা ও কোন পুলিশ সদস্য মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা, রুজুকারী কর্মকর্তা কিংবা সাধারণভাবে সাক্ষী হলে আদালতে গিয়ে সাক্ষ্য দেয়া।

বলাবাহুল্য, এসবের কোনটাই পুলিশ নিজ দায়িত্বে করে না বা করতে পারে না। এগুলো সবই আদালতের আদেশের অধীন। এমতাবস্থায়, কোন মামলার বিচারকার্য সঠিকভাবে দ্রুত গতিতে এগুতে না পারলে কোন একক পুলিশ অফিসারকে দোষারোপ করার কোন সুযোগ নেই। উপরিউক্ত কার্যক্রমে পুলিশের কোন সীমাবদ্ধতা বা গাফিলতি পরিলক্ষিত হলে তা গোটা পুলিশ বিভাগের সামগ্রিক কার্যক্রমের সীমাবদ্ধতাকেই প্রতিফলিত করবে।

কিন্তু অনেককে বলতে শুনি, মামলা নিষ্পত্তিতে পুলিশের গাফিলতির জন্য পুলিশ অফিসারদের দায়বদ্ধ করতে হবে। পুলিশের কার্যক্রমের জন্যই আদালতে নাকি মামলার জট লাগছে। কেউ কেউ আবার বলেন, পুলিশের তদন্তের দীর্ঘসূত্রতার জন্যই নাকি আদালতে মামলার জট লাগে। কিন্তু তদন্ত ও বিচার ভিন্ন জিনিস। তদন্ত অভিযোগপত্রের মাধ্যমে শেষ না হলে আদালতের বিচার করার কিছু থাকে না। তাছাড়া তদন্তাধীন মামলার হিসেবে তো বিচারাধিন মামালার অন্তর্ভুক্তই নয়।

বিষয়টি সাধারণ মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এটা অনেক সময় বিশেষজ্ঞদেরও গোলক ধাঁধাঁয় ফেলে। সম্প্রতি জালনোট প্রতিরোধ সংক্রান্ত একটি আইনের প্রাথমিক খসড়ার উপর আমাকে মতামত দিতে হল। আর্থিক প্রতিষ্ঠানসমূহকে নিয়ন্ত্রণকারী এ প্রতিষ্ঠানটিই এ আইনের খসড়া তৈরি করছে। আমি জালনোট প্রচলন প্রতিরোধ সংক্রান্ত একটি সভায় পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের প্রতিনিধিত্ব করায় আমাকে এর উপর মতামতের জন্য খসড়াটি পাঠানো হয়েছে।

খসড়াটিতে বিচার ত্বরান্বিত করার জন্য বেশ কিছু ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। এগুলোর মধ্যে একটি হল, নির্ধারিত সময়ে মামলাটির বিচার শেষ করতে না পারলে বিচারের দায়িত্বে থাকা আদালত জেলা ও দায়রা জজকে কারণ ব্যাখ্যা করে প্রতিবেদন প্রেরণ করবেন। একই সাথে মামলা পরিচালনাকারী সরকারী কৌশুলিও একটি প্রতিবেদন দাখিল করবেন।

কিন্তু এ ধারায় প্রস্তাব করা হয়েছে, বিচারিক আদালত ও সরকারি কৌশুলির পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট পুলিশ অফিসারও নাকি জেলা ও দায়রা জজ এবং সরকারের কাছে বিচার নির্ধারিত সময়ে সম্পন্ন না হওয়ার জন্য প্রতিবেদন দিবেন।

কিন্তু মামলা পরিচালনার ব্যাপারে এখন পুলিশের সিএসআই কিংবা কোর্ট ইন্সপেক্টরদের কোন সরাসরি হাত না থাকায় মামলার বিচারকার্য ত্বরাান্বত বা বিলম্বিত করার ক্ষেত্রে সিএসআই বা কোর্ট ইন্সপেক্টরদের কোন হাত নেই। তাই তাদের দায়ি করারও কোন সুযোগ নেই।

বলাবাহুল্য, তৈরিকৃত জালনোট প্রতিরোধ আইনের ঐ খসড়ায় বিচারকার্য নির্ধারিত সময়ে শেষ করতে না পারার জন্য প্রতিবেদন দাখিলের জন্য পুলিশ অফিসারদের বাধ্যবাধকতাটির অংশটুকু অবলিলায় কেটে দিয়েছি।

এ প্রসঙ্গে বলা সংগত হবে যে প্রত্যেক পুলিশ ইউনিটে গুরুত্বপূর্ণ মামলাসমূহ তদন্তকার্য থেকে শুরু করে তার বিচার কার্য পর্যন্ত মনিটর করার জন্য একটি করে কমিটি রয়েছে। উক্ত কমিটি গুরুত্বপূর্ণ কিছু মামলা তাদের তালিকাভুক্ত করে সেগুলোর তদন্তকাজের গতিবিধির উপর নজর রাখেন। মামলাটির অভিযোগপত্র দেয়া হলে যাতে সেটা খুব দ্রুত বিচারের জন্য প্রস্তুত হতে পারে সেজন্য পুলিশের উদ্যোগগুলোকে সমন্বয় করেন। পরবর্তীতে বিচার শুরু হলে ঐসব মামলায় যথাসময়ে সাক্ষীদের হাজিরা নিশ্চিত করার কাজটিও মনিটর করেন। কিন্তু এসবই পুলিশের নিজস্ব উদ্যোগ যা আইনি বাধ্যবাধকতার বাইরে।

তাই মামলার বিচারকার্য ত্বরান্তিত করতে না পারার জন্য যদি পুলিশকে দায়ি করতে হয়, তাদের সে বিষয়ে যথাযথ দায়িত্ব দিতে হবে। ২০০৮ সালের পূর্বে নিম্ন আদালতে পুলিশ অফিসারগণই সরকারের পক্ষে মামলা পরিচালনা করতেন। তাই মামলায় সরকারের সাফল্য-ব্যর্থতা ও তা দ্রুত সম্পন্ন করতে আদালতকে সহায়তার জন্য পুলিশের একটা হাত থাকত। এখন যেহেতু সেটা সরকারের নিয়োগপ্রাপ্ত পিপি/এপিপিগণই করেন, তাই পুলিশকে দায়ি করার কোন কারণ নেই। (১৮ অক্টোবর, ২০১৫)