ক্যাটেগরিঃ চিন্তা-দর্শন

কোন প্রাণী যখন স্বেচ্ছায় নিজের জীবনকে বিপন্ন করে অর্থাৎ এমন কোন কর্মের মাধ্যমে নিজেই নিজের মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায় তখন সে প্রাণীর ঐরূপ কর্মকে আত্মহত্যা বলা হয়। অক্সফোর্ড লার্নার্স ডিকশনারিতে বলা হয়েছে, Suicide হল ‘the action of killing oneself intentionally’.

বাংলাদেশের কোন আইনে আত্মহত্যার কোন সংজ্ঞা দেয়া হয়নি। ১৮৬১ সালের পেনাল কোডে বলা হয়েছে, ‘Whoever attempt to commit suicide and does any act towards the commission of such offence, shall be punished with simple imprisonment for a term which may extend to one year, or with fine, or with both’ ( Penal Code-1861, section-309)

অর্থাৎ এখানে আত্মহত্যা প্রচেষ্টাকে অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করে তার জন্য শাস্তির বর্ণনা দেয়া হয়েছে। এমনিভাবে প্রাপ্ত বয়স্ক মানুষকে আত্মহত্যায় সহায়তা করা (পেনাল কোড, ধারা-৩০৬) এবং শিশু ও অপ্রকৃতিস্থদের আত্মহত্যায় সহায়তা (পেনাল কোড, ধারা ৩০৫) করার শাস্তির কথা বলা হয়েছে।

এর বাইরেও নারী ও শিশু নির্যাতন আইনে আত্মহত্যায় প্ররোচনাদানের জন্য শাস্তির বিধান রয়েছে। কিন্তু কোন আইনেই আত্মহত্যার সংজ্ঞা দেয়া হয়নি। কারণ অবশ্য সাধারণ। আত্মা বা জীবন যেমন স্বাভাবিকভাবে সাধারণের কাছে সংজ্ঞায়িত, তেমনি আত্মহত্যাও। যদি আমি আত্মা বা জীবনকে বুঝি, তাহলে মরণ বা আত্মহত্যাও বুঝব।

আত্মহত্যা বৈধ কি অবৈধ সে প্রশ্ন অপ্রাসঙ্গিক। কারণ হত্যাকারী ভিন্ন ব্যক্তি হলেও আত্মহত্যাকারীর ভিন্নতর সত্ত্বা নেই। যে আত্মহত্যা করে সে পৃথিবীর সকল নিয়ম কানুনের ঊধ্র্বে চলে যান। তাই তাকে শাস্তি দেয়া সম্ভব হয় না। তাই আত্মহত্যা নয়, বরং আত্মহত্যায় সহায়তা, প্ররোচনা ও আত্মহত্যার প্রচেষ্টাকেই আইনে নিষিদ্ধ করে শাস্তির আওতায় আনা হয়েছে। কারণ আত্মহত্যাকারীর বাস্তব সত্ত্বা না থাকলেও তাকে সহায়তা, প্ররোচনাকারীর অস্তিত্ব রয়েছে। তেমনি আত্মহত্যায় ব্যর্থ ব্যক্তিটিও একজন বাস্তব ব্যক্তি । তাই তাকে শাস্তির আওতায় আনা সম্ভব। এমতাবস্থায়, কোন হতভাগ্য ব্যক্তি যদি আত্মহত্যা করতে গিয়ে কোন কারণে যদি ব্যর্থ হন, তাহলে তাকে আইনের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে।

যতটুকু জানি আত্মহত্যার পক্ষে-বিপক্ষে হাজারও মত আছে। ফ্রয়োডিয় দর্শনে আত্মহত্যা বা মৃত্যুর ইচ্ছা প্রাণীর সহজাত। মানুষের অন্তরে যেমন বেঁচে থাকার ইচ্ছা(eros) রয়েছে তেমনি রয়েছে মরণের ইচ্ছা(thanatos)। কিন্তু সমাজ বা রাষ্ট্র মানুষের এই অন্তরের ইচ্ছাগুলোকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে। এ চেষ্টা করাটাই কিন্তু আমাদের সভ্যতা বিকাশের প্রধানতম উপাদান।

প্রত্যেক সভ্যতাই মানুষের মনোগত ও বস্তুগত বিকাশকে বিশেষভাবে নিয়ন্ত্রণ করে। যে সব ইচ্ছা আচরণে পরিণত হয়ে সমাজকে বিশৃঙ্খল করে বলে সমাজপতিরা কিংবা সমাজের অধিকাংশ মানুষ মনে করে, সে সব ইচ্ছার বহিঃপ্রকাশকে বাধাগ্রস্ত বা প্রতিরোধ করাই আইনের উদ্দেশ্য।

উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, নারী-পুরুষের যৌন মিলন একটি স্বাভাবিক আচরণ। কিন্তু এ আচরণটি যদি সমাজসিদ্ধ বিবাহ সম্পর্কের বাইরে হয়, সেটা হয় অবৈধ। আবার বিবাহপূর্ণ সম্পর্কের মধ্যেও যদি নারী-পুরুষ তা জনসম্মুখে সম্পন্ন করে সেটা শুধু অবৈধই নয়, অশ্লীলও বটে। রাষ্ট্র বা সমাজ শুধু অবৈধ কর্মকাণ্ডকেই নিবারণ করবে না, অশ্লীলতার মুখেও লাগাম পরাবে। সভ্য মানসুরা কিন্ত এটাও প্রত্যশা করে। তাই জনগণের কাছে রাষ্ট্রের এটা প্রধানতম প্রতিশ্রুতি।

আত্মহত্যাকে ব্যক্তির মৌলিক অধিকার বলে প্রচার করার ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর অভাব নেই। কিন্তু জীবন যদি মানুষের শতভাব নিজের না হয়, তাহরে মরণও তার নিরঙ্কুশ অধকারে থাকার কথা নয়। তাহলে সমাজের কোন ব্যক্তি তার জীবনের উপর নিরঙ্কুশ অধিকার ভোগ করেন কী? আমি মনে করি না। ব্যক্তির জীবন ব্যক্তির একান্ত নিজের নয়। জীবনকে মানুষের ব্যক্তিগত বিষয় বলে যতই প্র্রচার করি না কেন, নানা বিবেচনায ব্যক্তির জীবনের নিরঙ্কুশ মালিকানা ব্যক্তির নেই। ব্যক্তির জীবনের অনেকাংশই ব্যক্তিগত সম্পত্তির চেয়ে পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি। তাই মানুষের আত্মিক হওয়াটা দোষের কিছু না। কিন্তু আত্মকেন্দ্রীক হওয়াটা দোষের বটে।

মানব জন্ম অন্যান্য প্রাণীর জন্ম থেকে বহুলাংশে পৃথক। একটি পশুর বাচ্চার শৈশব আর একটি মানুষের বাচ্চার শৈশবকাল তুলনা করুন। অনেক প্রাণী ডিম পেড়েই খালাস। বাচ্চারা ডিম ফুটে বের হয়ে নিজেদের মতো করে বড় হয়। স্তন্যপায়ীরা বাচ্চাদের স্তন্যদান করে অসহায় অবস্থা দূর হওয়া পর্যন্ত বাচ্চাদের কাছে রাখে। কিন্তু মানুষের বাচ্চারা কত বেশি অসহায়! তারা অন্য মানুষের সাহায্য ছাড়া বেঁচে থাকতে পারে না, খাদ্য গ্রহণ করতে পারে না, নিজেদের অন্যপ্রাণী থেকে আলাদাও করতে পারে না। একটি শিশুকে মা-বাবা শুধু খাদ্য দিয়েই বাঁচিয়ে রাখেন না, তাদের পোশাক পরাটুকুও শিখিয়ে দেন। এর পর আসে তাকে সামাজিক আচরণে অভ্যস্ত করা, তাকে শিক্ষা দেয়া, তার কর্মসংস্থান করা এবং চূড়ান্ত পর্যায়ে তার জন্য পৃথিবীতে কিছু কিছু সম্পদ রেখে যাওয়া।

একজন মানুষ যে নিজেকে পরিবার, সমাজ বা রাষ্ট্র থেকে আলাদা করে তার জীবনটাকে কেবলি নিজের বলে ভাববেন, আমার এ বিশ্লেষণ-বিবেচনায় তার উপায় কোথায়? যে জীবনটা আমি আমার একান্ত নিজের বলে বিবেচনায় নিয়ে তা শেষ করার জন্য চরম স্বাধীনতা চাইছি, সেই জীবনটা কতটুকু আমার আর কতটুকু অন্যদের, সে বিষয়টি ভাবুন দেখি?

একজন পরিণত বয়সের মানুষের জীবন আর একজন সদ্যজাত শিশুর জীবনকে এক করে ভাবলেও একটি শিশুর জীবনের উপর পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র যে বিনিয়োগ করেছে সেটা বিবেচনা করলে একজন পরিণত মানুষের জীবনের মালিকানা শুধু কেবল ব্যক্তিরই থাকে না। এ মালিকানার বহুলাংশ চলে যায় অন্যদের হাতে। আমার পিছনে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র যে বিনিয়োগ করেছে তার প্রতিদান কি আমি দিব না, আমাকে দিতে হবে না?

পৃথিবীর তাবৎ ধর্মই আত্মহত্যাকে পাপকার্য বলে ঘোষণা করেছে। কিন্তু আইনানুসারে আত্মহত্যা কোন অপরাধ নয়; আত্মহত্যার চেষ্টা, সহায়তা ও প্ররোচনাই হল অপরাধ। তবে এমন কোন আইন যৌক্তিক নয় যে আত্মহত্যাকে বৈধ বলে স্বীকার করবে। যদি আত্মহত্যাকে বৈধ বলি তবে হত্যাকেও তো বৈধ বলতে হবে। কারণ আত্মহত্যাও তো এক প্রকারের হত্যাই। পার্থক্য শুধু এখানে ভিকটিম নিজেই অপরাধী।

অনেকে প্রলম্বিত বার্ধ্যক্য, প্রতিবারহীন জ্বরা, ইত্যাদির ক্ষেত্রে কোন ব্যক্তিকে আত্মহত্যার অধিকার প্রদানের জন্য দাবি জানান। কিন্তু এসব ক্ষেত্রে যদি রাষ্ট্রীয় বা সামাজিক অনুমোদন থাকে, তবে সমস্যার সমাধানের পরিবর্তে সমস্যা আরো বাড়বে। অসহায় মানুষটির সহায় হওয়া যাদের কর্তব্য তারা তাকে আত্মহত্যায় প্ররোচিত করে, কিংব আত্মহত্যার আড়ালে খুন করে তা আত্মহত্যার নামে চালিয়ে দিবেন। এ জাতীয় উদাহরণ অনেক রয়েছে।

যদিও একাডেমিক, দার্শিনিক, রাষ্ট্রী, সামাজিক, ধর্মভিত্তিক এমনকি বৈজ্ঞানিক দিক দিয়েও আত্মহত্যার সপক্ষে বিপক্ষে হাজারও মত আছে, তবুও আত্মহত্যাকে নিঃশর্তভাবে বৈধ বলে ঘোষণাকারী কোন সমাজ পাওয়া মুসকিল। কেউ ‘মরিতে চাহে না, এ সুন্দর ভুবনে’। ;মানবের মাঝে; সবাই এখানে সামান্য আশ্রয়টুকু চায়। ‘এই সূর্যকরে, এই পুষ্পিত কাননে জীবন্ত হূদয় মাঝে’ যখন কারো স্থান হয় না, তখনই মানুষ আত্মহত্যার কাথা চিন্তা করে। তাই আত্মহত্যাকে কোন অধিকার নয়, অধিকারহীনতার ফল হিসেবে বিবেচনা করা দরকার। প্রেম-বিরহ, প্রত্যাশা-প্রাপ্তি, অধিকার-বঞ্চনা ইত্যাকার বিষয়গুলো নিশ্চিত করতে পারলে আত্মহত্যাকে আর কেউ অধিকার বলে দাবি করতে পারবে না।