ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

১. ভূমিকা
পুলিশ রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা তথা শান্তিরক্ষা এবং ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থাকে কার্যকর করার একটি উল্লেখযোগ্য হাতিয়ার। প্রশাসন পরিচালনার জন্য সরকারের যতগুলো সংস্থা রয়েছে, পুলিশ সেসব সংস্থা বা বিভাগ থেকে বহুলাংশে পৃথক। পৃথিবীর সকল সমাজেই পুলিশকে বাহিনী বলে অভিহিত করা হয়। তবে সশস্ত্র বাহিনীর চেয়ে পুলিশের মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। পুলিশ একটি বাহিনী হলেও তা সিভিল সার্ভিসের অন্তর্ভুক্ত। বাহিনী হলেও পুলিশ মূলত জনগণকে সেবা দিয়ে থাকে। তাই পুলিশ একটি সেবা প্রদানকারী বাহিনী; যুদ্ধ পরিচালনাকারী বা কম্ব্যাটিং বাহিনী নয়। এমতাবস্থায়, পুলিশের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা ও অসদাচরণ সংক্রান্ত বিষয়গুলো সিভিল ও মিলিটারি উভয় উপাদানের সংমিশ্রনে গঠিত। পুলিশের অসদাচরণ মোকাবেলায় তাই সব দেশেই বিশেষ ব্যবস্থা রয়েছে।

২. পুলিশ শৃঙ্খলা পদ্ধতির প্রকারভেদ
পৃথিবীর সকল দেশেই পুলিশ বিভাগগুলো সংসদ কর্তৃক পাশ করা সুনির্দিষ্ট আইন ও সে আইন বলে তৈরিকৃত বিধি বা রেগুলেশন দ্বারা পরিচালিত হয়। এ আইন বা বিধিতে পুলিশ বাহিনীর প্রশাসন থেকে শুরু করে দায়িত্ব পালনের বিষয়গুলো অনেকটাই বিস্তারিতভাবে লেখা থাকে। কিন্তু পুলিশ যেহেতু একাধারে একটি শৃঙ্খলাবাহিনী ও সিভিল সংস্থা এবং এর কর্তব্য পালনের ধরন ও আইনি ক্ষমতা ও দায়দায়িত্ব সিভিল এবং মিলিটারি সংস্থার থেকে বহুলাংশে পৃথক, তাই এর প্রশাসন ও শৃঙ্খলার জন্য বিশেষ কিছু বাড়তি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়।

অভ্যন্তরীণ প্রশাসনের বাইরেও পুলিশ সদস্যদের অসদাচর সংক্রান্ত বিষয়গুলোর অনুসন্ধান, তদন্ত ও প্রতিকারের জন্য কতিপয় বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। এজন্য সারা বিশ্বে দুটো পদ্ধতি প্রচলিত রয়েছে। পদ্ধতির ধরন অনুসারে এগুলোকে অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থা(Internal oversight) এবং বহির্বিভাগীয় ব্যবস্থা(External Oversight) নামে অবিহিত করা হয়। অবশ্য এ দুই ব্যবস্থার সমন্বয়ে একটি তৃতীয় ব্যবস্থার উদ্ভব হয়েছে যা মিশ্র ব্যবস্থা নামে পরিচিত। অভ্যন্তরীণ ও বহির্বিভাগীয় ব্যবস্থাগুলোর ভাল দিকগুলো নিয়ে এ ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে।

২.১ ইন্টারন্যাল ওভারসাইট বা অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থা
এ ব্যবস্থাটি পুলিশের সম্পূর্ণ নিজস্ব বিষয়। পুলিশের মধ্য থেকেই একটি পৃথক ইউনিট পুলিশ সদস্যদের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলার গোপন কিংবা প্রকাশ্য খবর সংগ্রহ করে। খবর সংগ্রহ হতে পারে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বা কর্তৃপক্ষের নির্দেশ মতো, অভ্যন্তরীণ ইউনিটের নিজস্ব তথ্যমত কিংবা সংস্থার বাইরে থেকে পাওয়া পাবলিক পিটিশন অনুসারে। ইন্টারন্যাল অভার সাইট তাদের পাওয়া তথ্যগুলো ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে দেয়। অনেক সময় তারা নিজেরাও অভিযুক্ত পুলিশ অফিসারের বিরুদ্ধে বিভাগীয় কিংবা ফৌজদারি মামলা রুজু করে। ইন্টারন্যাল ওভারসাইটের কর্মকর্তারা অনেক সময় ফাঁদ পেতেও অভিযুক্ত অফিসারদের অপরাধের আলামতসহ হাতে নাতে গ্রেফতার করে।

অনেক দেশে ইন্টারন্যাল অভার সাইট শুধু গোপন তথ্য ও প্রমাণ সংগ্রহ করে পুলিশ প্রধানকে অবহিত করে। পুলিশ প্রধান পরবর্তীতে এসব তথ্য প্রমাণের ভিত্তিতে প্রকাশ্য অনুসন্ধান চালানোর জন্য অন্য শাখার কর্মকর্তাদের নিয়োগ করে অভিযুক্ত পুলিশ অফিসারের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করে।

২.১.১ ইন্টারন্যাল অভার সাইটের সুবিধা-অসুবিধা
অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় ত্রুটি বা অসুবিধা হল, এক্ষেত্রে অসদাচরণকারী ব্যক্তি ও তাদের বিরুদ্ধে তথ্য-প্রমাণ ও বিভাগীয় কিংবা ফৌজদারি ব্যবস্থা গ্রহণকারী উভয়েই পুলিশ সদস্য। একই বিভাগে কাজ করে, একই উপসংস্কৃতির অংশীদার হয়ে একজন পুলিশ অফিসার তারই সহকর্মীর বিরুদ্ধে যত নিরপেক্ষ ও কঠোরভাবে আইন প্রয়োগ করুক না কেন, জনগণের মনে একটি সন্দেহ থেকেই যায়। তা ছাড়া জনগণ থেকে পাওয়া অভিযোগগুলো প্রকৃতপক্ষেই সঠিকভাবে অনুসন্ধান করা হচ্ছে কিনা তা মনিটর করার মতো নিরপেক্ষ কোন পদ্ধতি এখানে নেই। যে পুলিশ অফিসারের বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হবে সেই সব পুলিশ অফিসার তার অনুসন্ধানকারী সহকর্মীদের উপর একটা কোন না কোন মাত্রার প্রভাব থাকা অস্বাভাবিক নয়।

কিন্তু ইন্টারন্যাল অভার সাইটের বড় সুবিধা হল, এটা পুলিশের নিজস্ব বিষয়। পুলিশ অফিসারগণ একে অপরকে যেমন ভাল করে চিনেন, জানেন তেমনি তাদের কর্মপদ্ধতি সম্পর্কেও সম্মক অবগত থাকেন। কোন অফিসারের বিরুদ্ধে কৃত অভিযোগ একটি রীতিমত তদন্তের দাবী রাখে। পুলিশ অফিসারগণ সাধারণত তদন্তে দক্ষ হন। কোন তথ্য কিভাবে কোথা থেকে সংগ্রহ করতে হবে, সেগুলো কিভাবে আদালত কিংবা বিভাগীয় তদন্ত কমিটির কাছে উপস্থাপন করতে হবে এবং এসবের বিরুদ্ধে অভিযুক্ত পুলিশ অফিসার আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য কি কি সম্ভাব্য ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে, একজন পুলিশ অফিসার তা ভালভাবেই জানেন। এমতাবস্থায়, অভিযোগ তদন্ত কিংবা কোন পুলিশ অফিসারের সম্ভাব্য অসদাচরণের তদন্ত তিনি বহির্বিভাগীয় তদন্তকারীদের চেয়ে অধিকতর সুষ্ঠু ও গভীরভাবে করতে পারবেন। আর একটি সুবিধা হল, পুলিশ অফিসারদের মধ্যে একটি পারস্পরিক গোপনীয়তার নীতি বিদ্যমান। তাই বাইরের কোন তদন্তকারীদের কাছে পুলিশ অফিসারগণ তাদের সহকর্মীদের বিরুদ্ধে তথ্য সরবরাহে কার্পণ্য কিংবা নিরুৎসাহিত বোধ করে। কিন্তু বিভাগীয় অফিসার হওয়ায় পুলিশ তদন্তকারীগণ পারস্পরিক গোপনীয়তার পর্দাকে কিছুটা হলেও ভেদ করে প্রকৃত তদন্ত করতে পারবে।

২.২ এক্সটার্ন্যাল ওভারসাইট বা বহির্বিভাগীয় ব্যবস্থা
এ ব্যবস্থায় পুলিশ অফিসারদের অসদাচরণ ও অপরাধ উদ্ঘাটন, অনুসন্ধান ও তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের কার্যক্রম গ্রহণ কিংবা মনিটর করার জন্য পুলিশ বিভাগের বাইরের লোকদের নিয়োগ করা হয়। পৃথিবীর অনেক দেশে এটাকে পুলিশ কমপ্লেন কমিশন, কোথাও পুলিশ কম্পেলেন অথরিটি কিংবা অনেক স্থানে পুলিশ অথরিটিও বলা হয়। বহির্বিভাগীয় ব্যবস্থা দুপ্রকারের হতে পারে। প্রথম প্রকার ব্যবস্থায় গোটা প্রক্রিয়া পুলিশ-বহির্ভূত কর্মকর্তা কর্মচারীদের দ্বারা পরিচালিত হয়। তখন এটা পুলিশ থেকে সম্পূর্ণ স্বাধীন একটি সংস্থা হয়ে থাকে। দ্বিতীয় ক্ষেত্রে পুলিশ কমান্ডের সাথে গভীর সম্পর্কযুক্ত কিন্তু পুলিশ থেকে সম্পূর্ণ পৃথক সংস্থা পুলিশ অফিসারদের বিরুদ্ধে তদন্ত করে। তবে পুলিশ থেকে সম্পূর্ণ স্বাধীন হলেও অনেক এক্সটারন্যাল ওভারসাইট ব্যবস্থায় পুলিশ অফিসারদের বিরুদ্ধে প্রাপ্ত অভিযোগগুলোর অধিকাংশই সংশ্লিষ্ট পুলিশ বিভাগের অফিসারদের দ্বারাই তদন্ত করান হয়। ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট পুলিশ বিভাগের ইন্টারন্যাল অভারসাইটের মতোই এক্সটারন্যাল ওভার সাইট সংস্থা থেকে প্রাপ্ত অভিযোগগুলো তদন্ত করা হয়।

ব্রিটেনের ইন্ডিপেন্ডেন্ট পুলিশ কমপ্লেইন কমিশন (আইপিসিসি) এমন ধরনের একটি আদর্শ বহির্বিভাগীয় পুলিশ ওভারসাইট। আইপিসিসি ব্রিটেনের ৪১টি পুলিশ ফোর্সের অফিসারদের বিরুদ্ধে অভিযোগ অনুসন্ধান করে তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য পুলিশ প্রধানদের কাছে সুপারিস করেন কিংবা নিজেরাই পুলিশ অফিসাররেদ রিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা রুজুর প্রক্রিয়া শুরু করে। এ জন্য তাদের নিজস্ব তদন্তকারী অফিসার রয়েছে যারা তদন্ত ক্ষেত্রে পুলিশ অফিসারদের মতোই ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব ভোগ করে।

আইপিসিসি তিন প্রকারের অনুসন্ধান করে। প্রথম প্রকার তারা সম্পূর্ণ নিজেদের তদন্তকারীদের দ্বারা পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্ত করে। দ্বিতীয় প্রকার ব্যবস্থায় তারা পুলিশ অফিসারদের রিরুদ্ধে প্রাপ্ত অভিযোগগুলো সংশ্লিষ্ট পুলিশ বিভাগের মাধ্যমে তদন্ত করে প্রতিবেদন গ্রহণ করে। পুলিশ বিভাগ কর্তৃক তদন্তকার্য তারা নিবিড়ভাবে মনিটর করে। তৃতীয় প্রকার ব্যবস্থায় তারা প্রাপ্ত দরখাস্ত পুলিশ বিভাগের কাছে পাঠিয়ে দিয়ে সেগুলোর বিষয়ে অনুসন্ধান করে পুলিশ প্রধানকেই যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ করা হয়।

২.২.১ বহির্বিভাগীয় ব্যবস্থার সুবিধা-অসুবিধা
বহির্বিভাগীয় অনুসন্ধান ব্যবস্থার প্রধান সুবিধা হল, এটি পুলিশ কর্তৃপক্ষ থেকে সম্পূর্ণ পৃথক একটি ব্যবস্থা। পুলিশের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের তদন্ত এখানে পুলিশকে দিয়ে করান হয় না। এর ফলে এটা সাধারণ মানুষের কাছে বেশি গ্রহণযোগ্য, বিশ্বাসযোগ্য ও নিরপেক্ষ মনে হয়। পুলিশ কর্তৃক কৃত তদন্তের চেয়ে এ ব্যবস্থায় তদন্তের মান নিচু হলেও জনগণ সেটাকে সঠিক বলেই মনে করে। অর্থাৎ এ ব্যবস্থায় তদন্তের নিপপেক্ষাতাই শুধু বজায় থাকে না, নিরপেক্ষতাকে প্রদর্শন করাও হয়।

এ ব্যবস্থার প্রধানতম অসুবিধা হল, এটি অত্যন্ত ব্যয়বহুল। কোন পুলিশ বিভাগের অফিসারদের বিরুদ্ধে প্রতিনিয়তই হাজার হাজার দরখাস্ত জমা পড়ে। পুলিশ যেহেতু দুটি বিবদমান পক্ষের মাঝখানে দাঁড়িয়ে পেশাগত দায়িত্ব পালন করে এবং তাদের দায়িত্ব পালনের মধ্যে গ্রেফতার থেকে শুরু করে সাধারণ বল প্রয়োগ হয়ে প্রাণঘাতী বল প্রয়োগের বিষয়টি আইনগতভাবেই স্বীকৃত থাকে তাই পুলিশের প্রতি অসন্তুষ্ট হওয়ার লোকের অভাব নেই। প্রতিদিন পুলিশের বিরুদ্ধে যে সব অভিযোগ আসে তা অনুসন্ধান করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য যে জনবল ও লজিস্টিক্স ও অর্থ প্রয়োজন তা একান্ত উন্নত দেশগুলো ছাড়া অন্যরা ব্যয় করার সামর্থ রাখে না। পুলিশের বিরুদ্ধে সকল অভিযোগের অনুসন্ধান করতে হলে একটি পুলিশ বাহিনীর প্রায় সম আয়তনের লোকবল প্রয়োজন হতে পারে।

অন্য একটি অসুবিধা হল, পুলিশ বিভাগের সম্পূর্ণ বাইরে হওয়ায় পুলিশের পারস্পরিক গোপনীয়তার পর্দাকে এ ধরনের ব্যবস্থার তদন্তকারীগণ প্রায়শই ভেদ করতে অসমর্থ হন। তাই দেখা যায়, পুলিশ কর্তৃক তদন্ত করার অভিযোগগুলোর চেয়ে বহির্বিভাগীয় তদন্তকারীগণ অনেক কম অভিযোগকে সত্য বলে প্রমাণ করতে পারেন।

৩. পুলিশিং দি বাংলাদেশ পুলিশ- বাংলাদেশের ব্যবস্থা
বাংলাদেশে পুলিশের অসদাচরণগুলোর অনুসন্ধান, তদন্ত ও শাস্তি প্রদানের জন্য পুলিশের নিজস্ব ব্যবস্থা রয়েছে। প্রথম শ্রেণির ব্যবস্থাগুলো পুলিশ আইন, বিধি ও রেগুলেশন দ্বারা সরাসরি নিয়ন্ত্রিত। এ গুলোকে আমি সনাতনী ব্যবস্থা বলে অবিহিত করছি।

৩.১ সনাতনী ব্যবস্থা
পুলিশকে নিয়ন্ত্রণের আদি আই হল, পুলিশ আইন-১৮৬১ । পুলিশ সৃষ্টির আদিতেই এ আইন তৈরি হয়। এ আইন যেমন পুলিশের সংগঠন, নিয়ন্ত্রণ ও দায়িত্ব পালনের গাইডলাইন রয়েছে, তেমনি রয়েছে পুলিশ অফিসারদের অসদাচরণের শাস্তির বিষয়টিও। এ আইন বলে ভুক্তভোগীরা আদালতের আশ্রয়ও নিতে পারেন। কিন্তু ১৮৬১ সাল থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত এই আইনে নির্দেশিত শাস্তির জন্য আদালতে গিয়েছেন কিনা কিংবা কোন ম্যাজিস্ট্রেট পুলিশকে শাস্তি দিয়েছেন কি না আমার জানা নেই।

পুলিশ আইনের ১২ ধারা মতে তৈরি করা হয়েছে পুলিশ রেগুলেশনস, বেঙ্গল বা সংক্ষেপে পিআরবি। এ পিআরবিতে অসদাচরণের দায়ে পুলিশ অফিসারদের শাস্তির ধরন, মাত্রা ও পদ্ধতি বর্ণিত রয়েছে। পুলিশ অফিসারদের শৃঙ্খলা বিধানে ১৯৭৬ সালে প্রণিত হয়েছে আরও একটি আইন। পুলিশ অফিসার্স (বিশেষ বিধান)-১৯৭৬ নামের এ আইনটি অত্যন্ত কঠিন। এ আইন বলে একজন নিম্ন পদস্থ পুলিশ অফিসারকে সাজাদানকারী কর্মকর্তা চাকরি থেকে সহজেই বিদায় করতে পারেন। এসব আইনের বাইরেও প্রত্যেকটি মেট্রোপলিটন পুলিশ আইন (যেমন ডিএমপি রুল), বিশেষ ভাবে তৈরি পুলিশ সংগঠন যেমন আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন, র‍্যাপিড় অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন, এ সবের আওতায় পুলিশ অফিসারদের অসদাচরণের শাস্তির জন্য বিশেষ ব্যবস্থা রয়েছে।

উপরিউক্ত ব্যবস্থাসমূহ মূলত অধঃস্তনপুলিশ অফিসারদের( ব্যতীক্রমসহ এসআই থেকে নিম্ন পদের) জন্য। সিনিয়র পুলিশ অফিসারগণ (ব্যতীক্রমসহ ইন্সপেক্টর থেকে থেকে উপরে) সরকারের সিভিল সার্ভিসের অন্তভুর্ক্ত। ইন্সপেক্টরগণ নন-ক্যাডার, অন্যরা ক্যাডার অফিসার। তাই তাদের জন্য সরকারি আচরণ বিধিমালা-১৯৭৯, সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা-১৯৮৫ এর অন্তর্ভুক্ত। তাই তাদের অসদাচরণ অন্যান্য সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য প্রযুক্ত পদ্ধতিতেই হয়ে থাকে।

আমাদের দণ্ডবিধিসহ অনেক বিশেষ আইনে পুলিশের কর্তব্য পালনকালে গ্রহণকৃত অসদাচরণের জন্য শাস্তির ব্যবস্থা রয়েছে। এসব ব্যবস্থায় সংশ্লিষ্ট পুলিশ অফিসার তার বিভাগীয় নিয়মে নয়, সরাসরি সাধারণ মানুষ কর্তৃক কৃত অপরাধের প্রতিকারের পদ্ধতি অবলম্বন করা হয়। যেমন, কোন পুলিশ অফিসার তার কর্তৃত্ব বহির্ভূতভাবে কোন বাড়িতে মাদক দ্রব্যের জন্য তল্লাশি চালালে মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনেই তার বিরুদ্ধে বিক্ষুব্ধ ব্যক্তি আদালতে যেতে পারেন।

গ্রেফতারকৃত ব্যক্তিকে নির্যাতন করা হলে দণ্ড বিধি কিংবা হাল আমলের পাশ করা হেফাজতে নির্যাতন ও মৃত্যু আইনে পুলিশ অফিসারের বিরুদ্ধে সরাসরি মামলা করা যায়। পুলিশের ক্ষমতা অপব্যবহার করে কোন পুলিশ কর্মকর্তা চাঁদাবাজি, ছিনতাই কিংবা ডাকাতির মতো অপরাধ করলে তার বিরুদ্ধে সরাসরি ফৌজদারি মামলা করা যায়। এসব ব্যবস্থা অনেকটাই সনাতনী নিয়মে পরিচালিত হয়।

৩.২ পুলিশ অসদাচরণ নিয়ন্ত্রণের আধুনিক ব্যবস্থাসমূহ
পুলিশ আইন এবং পুলিশ আইন বলে প্রস্তুতকৃত পিআরবির অধীন পুলিশ অসদারচণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার বাইরে অন্যকোন ব্যবস্থা বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত প্রচলিত ছিল না। এ ব্যবস্থার সূত্রপাত ঘটে স্বাধীনতার পরে। বর্তমানে বাংলাদেশে দু প্রকার আধুনিক ব্যবস্থা প্রচলিত রয়েছে। এগুলোকে প্রো-একটিভ বা প্রতিরোধমূলক ও রিএকটিভ বা ঘটনতাড়িত বা প্রতিকারমূলক এ দুভাগে ভাগ করা যায়। প্রো একটিভ ব্যবস্থার মধ্যে রয়েছে পুলিশ ইন্টারন্যাল ওভার সাইট বা পিআইও এবং প্রতিকারমূলক ব্যবস্থার মধ্যে রয়েছে ডিসিপ্লিশ শাখা। এ দুটো ব্যবস্থাই পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স থেকে নিয়ন্ত্রিত হয়।

৩.২. ১. প্রতিকারমূলক বা ডিসিপ্লিন শাখা
১৯৭৬ সালে পুলিশ অফিসারদের রিরুদ্ধে আনীত অভিযোগসমূহ কেন্দ্রীয়ভাবে অনুসন্ধান এবং পুলিশ অফিসারদের অসদচারণমূলক কর্মকাণ্ডের গোপন খবর সংগ্রহের উদ্দেশ্যে নির্বাহী আদেশ বলে পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সে একটি সিকিউরিটি সেল গঠন করা হয়। সরকারি আদেশে সিকিউরিটি সেলের দুটি অংশ ছিল। একটি ছিল পুলিশের বিরুদ্ধে আনীত/প্রাপ্ত অভিযোগসমূহ প্রকাশভাবে অনুসন্ধান করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা। অন্যটি ছিল পুলিশ অফিসারদের বিরুদ্ধে অসদাচরণের গোপন তথ্য অনুসন্ধান করা।

এ জন্য একজন ডিআইজির নেতৃত্বে একটি আলাদা সেল গঠনের অনুমোদনও ছিল। কিন্তু সেই সময় কেবল প্রথম অংশটুকুর বাস্তবায়ন হয়। অর্থাৎ পুলিশ অফিসারদের বিরুদ্ধে প্রাপ্ত দরখাস্ত বা অভিযোগসমূহের প্রকাশ্য অনুসন্ধানের জন্য ১৯৭৬ সালে পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সে একজন এআইজির অধীন সিকিউরিটি সেল গঠিত হয়। বলাবাহুল্য পুলিশের অন্যান্য ইউনিটগুলোর মতো সিকিউরিটি সেলের জনবল ও লজিস্টিক পর্যাপ্ত ছিল না। তাছাড়া পুলিশ বিভাগের দ্রুত বিবর্তন ও বিস্তৃতির সাথে খাপ খাইয়ে নেয়ার মতো করে সিকিউরিটি সেলকে সময় মতো পুনর্গঠন করা হয়নি। একজন এআইজির নেতৃত্বে মাত্র এক বা দুই জন এএসপি, কয়েকজন পুলিশ ইন্সপেক্টর দিয়েই চালান হত সিকিউরিটি সেল।

বাংলাদেশ পুলিশের দ্রুত বিস্তৃতি শুরুহয় মূলত ১৯৯০ সালের পর। তবে আমূল পরিবর্তনের সূচনা হয় ২০০০ সালের পরে। সর্বশেষ ২০১০ সালে পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের সিকিউরিটি সেলে নাম পরিবর্তনসহ এর গঠন ও কার্যাবলীতে ব্যাপক পরিবর্তন আনা হয়। বর্তমানে সিকিউরিটি সেলের নাম হল, ডিসিপ্লিন শাখা। একজন অতিরিক্ত ডিআইজির নেতৃত্বে এ সেলে দু জন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার, কয়েকজন এএসএসপি ও পর্যাপ্ত সংখ্যক ইন্সপেক্টর ও সাব-ইন্সপেক্টর কাজ করছে।

ডিসিপ্লিন শাখাটি একজন অতিরিক্ত ডিআইজির নেতৃত্বে পরিচালিত হয়। মূলত পুলিশ অফিসারদের সকল প্রকার অসাদাচরণ ও শৃঙ্খলা নিয়ে কাজ করে। এর কার্যক্রম প্রকাশ্য ও আনুষ্ঠানিক। সকল শ্রেণির পুলিশ অফিসারদের বিরুদ্ধে প্রাপ্ত অভিযোগ অনুসন্ধানের দায়িত্ব এ শাখার উপর থাকলেও শৃঙ্খলাজনিত প্রতিকারের জন্য পুলিশ ইন্সপেক্টরসহ নিম্ন পদের পুলিশ অফিসারদের নিয়েই এ শাখা কাজ করে। এ শাখার কার্যক্রম অনেকটাই নির্বাচিত। অতি গুরুত্বপূর্ণ না হলে সাব-ইন্সপেক্টর ও তার নিম্নপদের অফিসারদের অসদাচরণের প্রতিকারের বিষয়টি সাধারণত ফিল্ড কমান্ডের উপরই ছেড়ে দেয়া হয়।

পুলিশের এএসপি থেকে ঊর্ধ্বতন পদের অফিসারদের বিরুদ্ধে অনানুষ্ঠানিক অনুসন্ধান পরিচালনা করলেও ডিসিপ্লিন শাখার প্রধান কাজ হল, পুলিশ ইন্সপেক্টর ও তদনিম্ন পদের পুলিশ অফিসারদের নিয়ে। এসব অফিসারদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অনুসন্ধান করা থেকে শুরু করে তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা পরিচালনার জন্য এক শাখা দায়িত্বপ্রাপ্ত। এ শাখার কাজ ব্যাপক হলেও তা আনুষ্ঠানিক এবং এ শাখার কর্মকর্তা-কর্মচারীগণ মূলত পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স ভিত্তিক কাজ করে। প্রয়োজনের তাগিদে তারা মাঠ পর্যায়ে ভ্রমণ ও সরেজমিনে অনুসন্ধান করে। তাছাড়া ডিসিপ্লিন শাখায় গৃহীত সিংহভাগ দরখাস্তের অনুসন্ধান মাঠ পর্যায়ের অফিসার/কমান্ডারদের হাতেই ছেড়ে দেয়া হয়।

৩.৩ প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা-পুলিশ ইন্টারন্যাল ওভারসাইট
পিআইও বাংলাদেশ পুলিশের শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য একটি নতুন সংযোজিত ব্যবস্থা। পৃথিবীর অনেক উন্নত দেশের ইন্টারন্যাল এফেয়ার্স বুরো/ইউনিটের আদলে এটির যাত্রা শুরু হয় ২০০৮ সালে। পিআইও পুলিশ প্রধানের কাছে সরাসরি প্রতিবেদন পেশ করে।

পিআইও মূলত পুলিশ অফিসারদের বিরুদ্ধে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করে। একজন এআইজির নেতৃত্বে সারা দেশের পুলিশ স্থাপনাগুলোর উপর নজরদারি করার জন্য এ শাখার অধীন কয়েক হাজার পুলিশ সদস্য গোপনে কাজ করেন। প্রতিদিন মাঠ পর্যায় থেকে এসব গোপন তথ্য সংগ্রহকারীগণ পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সে প্রতিবেদন প্রেরণ করেন। এসব প্রতিবেদন যাচাই যাচাই এবং প্রয়োজনে প্রাথমিক তথ্যের ভিত্তিতে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ ও গভীর অনুসন্ধানের জন্য ঊর্ধ্বতন অফিসারগণও মাঠ পর্যায়ে গমন করেন। তবে তাদের তথ্য সংগ্রহ তখন অনেকটাই খোলামেলা হয়ে যায়।

পিআইও কর্তৃক সংগ্রহীত তথ্যের ভিত্তিতে কোন পুলিশ অফিসারকে দোষি সাব্যাস্ত করা সম্ভব হবে এমন ধরনের অবস্থার সৃষ্টি হলে পিআইও প্রতিবেদন গুরুত্বভেদে মাঠ পর্যায়ের ইউনিট কমান্ডারদের নিকট কিংবা পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের ডিসিপ্লিন শাখায় পাঠান হয়। তখন এসব অনুসন্ধান হয় প্রকাশ্যে এবং এর ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট পুলিশ অফিসারদের বিরুদ্ধে হয় বিভাগীয় মামলা কিংবা ফৌজদারি মামলা রুজু করা হয়। বলাবাহুল্য, এ ধরনের অসাদাচরণের বিরুদ্ধে তথ্য সংগ্রহ, অনুসন্ধান ও তার প্রেক্ষিতে ব্যবস্থাগ্রহণ একটি চলমান প্রক্রিয়া।

৪. অন্যান্য ব্যবস্থাসমূহ
সনাতনী, আধুনিক উপরিউক্ত আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থার বাইরেও পুলিশ অফিসারদের অসদাচরণ বা বেআইনি কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণের জন্য বেশ কিছু বাড়তি ব্যবস্থা রয়েছে। এগুলোর মধ্যে আদালতের নজরদারি ও মাঠ পর্যায়ের ইউনিট কমান্ডারদের কাছে পুলিশ অফিসারদের বিরুদ্ধে সাধারণ জনগণ কর্তৃক লিখিত বা মৌখিক অভিযোগ ও সে অভিযোগের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থাগ্রহণ অন্যতম।

৪.১ আদালতের নজরদারি
পুলিশের অসদাচরণের প্রতিকার পাওয়ার একটি স্বীকৃত ও বহুল ব্যবহৃত উপায় হচ্ছে আদালতের তদারকি। কতব্যকর্মে গাফিলতি, কিংবা ইচ্ছাকৃতভাবে আলামত ধ্বংস করা ইত্যাদির ক্ষেত্রে অনেক আইনে (যেমন নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ আইন, এসিড অপরাধ নিয়ন্ত্রণ আইন) পুলিশ অফিসারদের আদালত কর্তৃক শাস্তির বিধান রয়েছে। এর বাইরে নানা কারণে আদালত প্রায় সকল পদের পুলিশ অফিসারদের এজলাসে তলব করছেন, আদালত অনেক পুলিশ অফিসারের বিরু্দ্ধে ফৌজদারি কিংবা বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য পুলিশ কর্তৃপক্ষকে নির্দেশও দিচ্ছেন।

৪.২ ইউনিট প্রধানদের কাছে জনগণের অভিযোগ
বাংলাদেশ পুলিশের বিশৃঙ্খল অফিসারদের অসদাচরণের বিরুদ্ধে জনগণ প্রতিনিয়তই সিনিয়র পুলিশ অফিসগুলোতে নামে বেনামে দরখাস্ত করছেন। এসব অভিযোগ যথাযথভাবে অনুসন্ধান করে সংশ্লিষ্ট পুলিশ অফিসারদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় এবং প্রয়োজন মতো ফৌজদারি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। ঊর্ধ্বতন পুলিশ অফিসার/ দফতরের বাইরেও প্রতিনিয়তই সরকারের অন্যান্য ঊর্ধ্বতন মহলে যেমন মহামান্য রাষ্ট্রপতির দফতর, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দফতর, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী, স্বরাষ্ট্র সচিবসহ অনেকের কাছেই পুলিশ অফিসারদের বিরুদ্ধে দরখাস্ত করা হয়্ । এসব দরখাস্ত পুলিশ অফিসারদের মাধ্যম ছাড়াও অন্যান্য সংস্থা/গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মাধ্যমে অনুসন্ধান করান হয়। দোষী প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট পুলিশ অফিসারদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়।

৫.উপসংহার
বাংলাদেশের পুলিশের শৃঙ্খলা রক্ষা ও অসদাচরণ নিয়ন্ত্রণ তথা পুলিশিং দি পুলিশ ব্যবস্থার প্রায় পুরোটাই অভ্যন্তরীণ। এখানে সনাতনী ব্যবস্থাগুলোর বাইরে সামান্য কিছু ব্যবস্থা রয়েছে, যেমন, পিআইও, যা আধুনিক ব্যবস্থাগুলোর অনুরূপ। তবে বাংলাদেশে পুলিশের বর্তমান ব্যবস্থাগুলো কতটা কার্যকর সে নিয়ে জনমনে ও বিশেষজ্ঞ পর্যায়ে যথেষ্ঠ আলোচনা, সমালোচনা ও পর্যালোচনার সুযোগ রয়েছে। বাংলাদেশ পুলিশের আইনি নিয়ন্ত্রণ, তত্ত্বাবধান রাজনৈতিক সংস্কৃতির বিবেচনায় এখানে ব্রিটেনের আইপিসিসি আদলের কোন সম্পূর্ণ পুলিশ নিরপেক্ষ কোন বহির্বিভাগীয় ব্যবস্থা গঠন করা যেমন বাস্তব সম্মত হবে না , তেমনি সম্পূর্ণরূপে পুলিশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ের মতো কোন সনাতনী ব্যবস্থাও রেখে দেয়া উিচৎ হবে না। পৃথিবীর অনেক দক্ষ, সৎ ও আধুনিক পুলিশ বিভাগ সনাতনী ব্যবস্থাতেও ভাল কাজ দিচ্ছে। অন্য দিকে আধুনিক ও বহির্বিভাগীয় অনেক ব্যবস্থাও শুধু কাগজে কলমে রয়ে গেছে। তাই ‘পুলিশিং দি পুলিশ’ বিষয়টি নিয়ে ব্যপক গবেষণা ও নিরীক্ষার প্রয়োজন রয়েছে। (২৮ অক্টোবর, ২০১৫)