ক্যাটেগরিঃ ভ্রমণ

মুম্বাইর ছত্রপতি শিবাজী বিমান বন্দর থেকে কেনিয়ান এয়ার ওয়েজের বিমানটি নাইরোবির উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিয়েছিল স্থানীয় সময় বিকেল সাড়ে চারটায়। মুম্বাই থেকে সোজা রাস্তা। প্রথমে আরব সাগর। তারপর ভারত মহাসাগর হয়ে সোমালিয়ার দক্ষিণ দিক দিয়ে কেনিয়ার মোম্বাসা বন্দরের উপর দিয়ে আমাদের বিমানটি যাবে নাইরোবিতে। এই প্রথম আমি আফ্রিকান কোন এয়ারলাইন্সে ভ্রমণ করছি।

আমাদের বিমান চলছে পশ্চিম দিকে। আর সুর্যও যাচ্ছে সে দিকেই। আমরা আসলে ক্রমাগত সূর্যের কাছাকাছিই যাচ্ছিলাম। তাই গোধূলী হলেও সন্ধ্যা নামতে বেশ দেরি হচ্ছিল। বিমানের যাত্রাপথ ভূমির সাথে সরল রৈখিক সমান্তরাল নয়। কারণ ভূমিটিই তো সমতল নয়। তাই আমাদের যাত্রাপথটি আসলে একটি বক্র পথ। গোধূলী বেলায় বিমানে পশ্চিম দিকে যাত্রা করলে গোধূলীর এই দীর্ঘতাকে বলে- বা মহাকাশীয় গোধূলী। স্কুলে থাকতে বাঙলা একাডেমির বিজ্ঞান পত্রিকায় এ সম্পর্কে পড়েছিলাম।। কিন্তু আমার জীবনে যে সেই মহাকাশীয় গোধীলী দেখতে পাব তা ভাবতে পারিনি। তাই মনে হল, মুম্বাই থেকে নাইরোবির বিমান যাত্রাটা আমার জন্য একটি বিশেষ স্মরণীয় ক্ষণ।

কেনিয়ার লোকজন কালো। তাই বিমানবালাসহ অন্যান্য ক্রুগণও কালো। কিন্তু কালো হলেও বিমান বালাসহ অন্যান্যরা দেখতে দারুণ। একজন বিমান বালাকে তো আমার দারুণ সুন্দরী মনে হল। মাথার চুলগুলো লম্বা হলে সে বাঙালি মেয়েদের মতোই লাবণ্যময়ী হত। বিমান ক্রুদের সংখ্যা দশ জন। একজন ক্রুর কাছ থেকে জানতে চাইলাম এ বিমান সরকার পরিচালিত কিনা। তিনি বললেন, এখানে সরকারের বড় শেয়ার আছে। তবে বেসরকারি শেয়ারও আছে। অর্থাৎ এটা প্রাইভেট-পাবলিক পার্টনারশিপের ব্যবসা।

যতটুকু জানি আমাদের বাংলাদেশ বিমান পুরোটাই সরকারি। আর এটা প্রতিবছরই লোকসান দেয়। সেই তুলনায় কেনিয়ান এয়ার নাকি লাভজনক। এয়ারক্রুদের কথা পুরোপুরি বিশ্বাস না করলেও অনুমান করা যায়, যদি লাভজনক না হত, তাহলে কোন বেসরকারি ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান এখানে বিনিয়োগ করত না।

একটু আলাপের ফাঁকে ভাবলাম, এবার এ কেনিয়ান ক্রুর কাছ থেকে কিছু স্মারক সংগ্রহ করা যায় কিনা। তাই নিজ পকেট থেকে ২০ টাকার একটি বাংলাদেশি নোট বের করে দিয়ে তাকে বললাম, এটা আমার দেশের মূদ্রা। এটার মূল্য প্রায় এক ডলারের চার ভাগের এক ভাগ। তোমার কাছে তোমার দেশের কোন মুদ্রা বা নোট আছে কি? আমি স্মারক হিসেবে নিতাম। তখন সে আমাকে ৫০শিলিংএর একটি নোট বের করে দিল। এর মূল্য এক ডলারের কিছু কম।

এখন নাইরোবির স্থানীয় সময় প্রায় সন্ধ্যে সাড়ে সাতটা। আর আমাদের নাইরোবিতে পৌঁছার কথা স্থানীয় সময় রাত সাড়ে আটটায়। আমরা এখনও সোমালিয়ার আকাশেই আছি। সে অনুপাতে আমাদের আরো প্রায় সোয়া এক ঘন্টা আকাশে থাকতে হবে। মুম্বাই থেকে নাইরোবির আকাশ পথে দূরত্ব প্রায় ৪ হাজার তিনশত কিলোমিটার। আমাদের আকাশে থাকতে হবে মোট সাড়ে চার ঘন্টা।

কেনিয়ান এয়ারলাইন্সের ক্রুরা বেশ আন্তরিক। আপায়নও ভাল। পানি থেকে শুরু করে হুইস্কি পর্যন্ত সব ধরনের পানীয় এখানে পরিবেশন করা হয়। চাইলে এক সাথে তিনটে করে ক্যান দেয় এরা। বিয়ার বা অন্যান্য জুস জাতীয় পানীয়ের ক্ষেত্রেও তাই। আমাদের রাতের খাবার দিল সবজি দিয়ে। মাছ, মাংস বা মুরগীর আইটেম নাকি শেষ হয়ে গেছে। তবে সবজির খাবারটিও চমৎকার।

জোমো কেনিয়াত্মা বিমান বন্দর, নাইরোবি, কেনিয়া

কেনিয়ার স্থানীয় সময় রাত আটটা পঁয়ত্রিশ মিনিটে কেনিয়াত্মা বিমান বন্দরে অবতরণ করেছি। এখানে আড়াই ঘন্টার যাত্রা বিরতি। এরপর স্থানীয় সময় রাত ১১:৩০ মিনিটে বিমান ছাড়বে উগান্ডার এনটেবে বিমান বন্দরের উদ্দেশ্যে। নাইরোবি থেকে এনটেবে মাত্র দেড় ঘন্টার যাত্রা।

কিন্তু নাইরোবিতে নেমেও একই অবস্থার মধ্যে পড়তে হল। চেক ইন এর সময় পায়ের জুতা পর্যন্ত খুলতে হয়। তবে এদের বড়ি সার্চের বিষয়টি অত্যাধুনিক। আমাদের দেশের মতো খোলা স্ক্যানারের পরিবর্তে এখানে একটি প্রমাণ সাইজের স্ক্যানার স্থাপন করা হয়েছে। এটা একটা কামরার মতো এখানে ঢুকে দুহাত উপরের দিকে তুলতে হয়। এর পর কমান্ড দিলে পুরো শরীর স্ক্রিনে প্রদর্শিত হয়। তবে এর পরও ওরা শরীরে হাত দেয়। জানি না, এ যন্ত্রটি সম্পূর্ণ নির্ভরযোগ্য কিনা।

এনটেবের বিমান ধরতে আমরা খোঁজ খবর নিলাম। একজন বললেন স্ক্রিনে দেখেন। দেখলাম পাঁচ নম্বর গেট। ছুটলাম পাঁচ নম্বর গেটের দিকে। প্রায় এক কিলোমিটার পর্যন্ত গিয়ে জানতে পারলাম, এটা ‘জিও’ এয়ারলাইন্সের বিমান। কিন্তু আমাদের বিমান হচ্ছে কেনিয়ান এয়ার ওয়েজের। তাই ছুটলাম আবার ২৪ নম্বর গেটের দিকে। অনুসন্ধানে জানলাম, দোতলা থেকে নিচ তলায় নামতে হবে। এ মুহূর্তে বোর্ডিং পাশের দিকে তাকালাম। লেখার রয়েছে গেট নম্বর, ২৪। নিজের টিকেটের দিকে না তাকিয়ে বোকার মতো ঘুরে ঘুরে সহকর্মীদের কাছে গিয়ে দেখি ওরা সঠিক সময়ে ২৪ নম্বর কাউন্টারে গিয়ে বসে আছে।

নাইরোবি বিষুব রেখা মাত্র ১.১৯ ডিগ্রি দক্ষিণে। এই প্রথম উত্তর গোলার্ধ থেকে দক্ষিণ গোলার্ধে পদার্পণ করলাম। এখানে আবহাওয়া সারা বছরই প্রায় একই রকম থাকে। বর্তমানে বাইরের তাপমাত্রা ২৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এটা বাংলাদেশের শীতকালের গড় তাপমাত্রার প্রায় কাছাকাছি। কেনিয়াত্মা বিমান বন্দরটির চাক্যচিক্য তেমন নেই। তবে এটা ঢাকার হযরত শাহ জালাল(র) বিমান বন্দর থেকে অনেক বড়। পথ ভুলে ঘুরতে ঘুরতে এর প্রায় গোটাটিই দেখে নিলাম।

ব্রিটিশ উপনিবেশিক শাসকরা ১৯৫৮ সালে এ বিমান বন্দর টি নির্মাণ করেছিল। তখন এটার নাম ছিল ‘ইমবাকাসি এয়ারপোর্ট’। কারণ এয়ারপোর্টটি নাইরোবি থেকে ১৫ কিলোমিটার দূরে ইমবাকাসি এলাকায় অবস্থিত। ১৯৬৪ সালে কেনিয়া স্বাধীন হলে এর নাম করা হয় নাইরোবি ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট। এর পর কেনিয়ার প্রথম প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতি এবং কেনিয়ার স্বাধীনতা সংগ্রামের রূপকার জোমো কেনিয়াত্মার নামে এর নামকরণ করা হয়। কেনিয়াত্মা বিমান বন্দরটি আফ্রিকার নবম ব্যস্ততম বিমান বন্দর। এ বিমান বন্দর থেকে প্রায় ৫০টি দেশে বিমান চলাচল করে। প্রতি বছর এ বিমানবন্দর ব্যবহার করে ৫৮ লাখেরও বেশি যাত্রী।

পূর্বেই বলেছি, কেনিয়ান এয়ার ওয়েজটি পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপে গড়া। আমার পাশে এক ইন্ডিয়ান ভদ্রলোকের মদ্যপানের আধিক্য দেখে বিস্মিত হয়ে তার সাথে আলাপ জমিয়ে জানতে পারলাম, ভারতের টাটা কোম্পানিও নাকি কেনিয়ান এয়ারের অন্যতম পার্টনা। ঐ ভদ্রলোক ঢাটা গ্রুপের একজন পরিচালক হওয়ায় বিমানে ভালই আদোর আপ্যায়ন পাচ্ছিলেন। আর ঘন ঘন সাদা মদ পান করছিলেন।

ফেইস বুকিং এর পরিবর্তে ভ্রমণ কাহিনী
নাইরোবিতে থাকতে হবে আরো দুঘন্টা। কিন্তু ওয়াইফাই কানেকশন পাচ্ছি না। ভাবলাম, মুম্বাই এয়ার পোর্টের মতো এখানেও পাসপোর্ট দেখিয়ে পাস ওয়ার্ড নিতে হবে। ইনকোয়ারিতে গেলাম। ওরা পনের নম্বর কাউন্টারে যেতে বলল। পনের নম্বর কাউন্টারের দিকে ছুটলাম। গিয়ে জানলাম, এখানে ওয়াইফাই ফ্রি নয়। প্রতি ঘন্টার জন্য আট ডলার দিয়ে পাসওয়ার্ড কিনতে হবে। আট ডলার বাংলাদেশের টাকায় তিনশ বিশ টাকার সমান। এ টাকার অংকটি যে এক ঘন্টার ব্রাউজিং এর জন্য খুব বেশি তাও না। কিন্তু আমার কাছে মাত্র ১০০ ডলারের দুটো নোট আছে। আট ডলারের খরচে ওরা ১০০ ডলার ভাংতি দেবে বলে বিশ্বাস হল না। মনে মনে ভাবলাম, একবার সব কিছু লেখাজোখা করে ১০০ ডলারের নোট দিলে ওরা আবার আমাকে অপমান করে না বসে। তাই ফিরে এলাম। ভাবলাম, নেটে ঢুকে ফেইসবুকিং করার পরিবর্তে বসে বসে ভ্রমণকাহিনী লিখে ফেলি।

4. Daily Account of a Peacekeeper, Episode-4
৮ নভেম্বর, ২০১৫