ক্যাটেগরিঃ ভ্রমণ

 

সকাল নয়টার মধ্যেই আমাদের তৈরি থাকার কথা। হোটেল কেন্টিনে নাস্তাও তৈরি ছিল। ভাবলাম, সবাইকে নিয়ে গল্প করতে করতে নাস্তা করি। কিন্তু আমার অতিরিক্ত পুলিশ সুপারদ্বয় বড় দেরি করে এল। ওর আমার চেয়ে অনেক তরুণ। তাই বুঝি ওদের ঘুমের দরকার আমার চেয়ে বেশি। তাছাড়া আমার মতোই সবাই গত রাতে যে টুকু সময় পেয়েছিল, তা্ ঘুমের জন্য যথেষ্ঠ ছিল না। আমার ঘুম হয়নি জন্যই হয়তো আমি একটু তাড়াতাড়িই কেন্টিনে এসেছি।

নাস্তার আইটেম বেশি নয়। পাশ্চাত্যের কিংবা প্রতীচ্যের কোন দেশ নয় উগা্ন্ডা। আর এনটেবেও নয় সিংগাপুর বা দুবাই। তাই যা ছিল, তাও তুলনাহীন।। আমাদের অফিসারগণ শুরুতেই পরাটা/রুটি খুঁজল। কিন্তু ওসব নেই এখানে। তবে রেড বিনের তরকারি পাওয়া যায়। এটা আমার প্রিয়। পাউরুটি গরম করে রেড বিনের সাথে খেলাম।

একটি নতুন তরকারি পেলাম এখানে। গরুর মাংসের সাথে কাঁচা কলার চচ্চড়ির মতো। উগান্ডায় ভাল কলা জন্মে। তাই এরা কলা দিয়ে অনেক প্রকার খাবার তৈরি করে। এ খাবারটির নাম মেটোকই। নামটা মনে রাখতে কষ্টই হল। বার বার পরিবেশনকারী তরুণীটিকে জিজ্ঞাস করলাম। মেয়েটি বেশ চটপটে ও সুন্দরী।

কালো হলেই মানুষ অসুন্দর হয় না। এ হোটেল-বালাটির মতো অনেক কালো মেয়েই বেশ সুন্দর। এখানে আলু দিয়ে বাহারী ধরনের খাবারও তৈরি হয়। সিদ্ধ আলুকে এরা পুনর্বার ভাজি করে। খেতেও লাগে চমৎকার! তবে এ হোটেলের সবচেয়ে আকর্ষণীয় হল ফলাহারটা। কলাটি নিঃসন্দেহে সাগর কলা। দেখতে অনেকটা আমাদের দেশের নেপালি সাগরের মতো। কিন্তু অত্যন্ত সুস্বাদু। আনারস ও পেঁপেগুলোও অপরূপ মিষ্টি। আমাদের দেশের মতো কলাও যেমন ছোট নয়, আনারসও তেমনি পার্বত্য চট্টগ্রামী জাতের মতো মুঠে ধরার মতো নয়। আনারসের আকার যেন একটি কামানের গোলার মতো। আরও একটি অবাক করার মতো বস্তু দেখলাম। এটা হল গরম পানি রাখার ফ্লাক্স। ফ্লাক্সগুলো এতো বড় যে এক হাত দিয়ে ধরে গ্লাসে পানি ঢালাই ভার।

ইউএন ক্যাম্পাস-চেকইন
নাস্তা করতে করতেই অনেক সময় পার হল। হোটেলের লবিতে গিয়ে দেখি সুইডিস পুলিশ অফিসার রনি আদিলেভ যথা সময়েই গাড়ি নিয়ে হাজির। তার গাড়িতে আমরা গাদাগাদি করে উঠলাম। হোটেল থেকে ইউএন ক্যাম্প হাঁটা পথের দূরত্ব। কিন্তু প্রথম দিন বলেই রনি আমাদের নিতে এসেছেন। সকালে এয়ারপোর্ট রোডটি সম্পূর্ণ ফাঁকা। তবে আমাদের অনেক দূর ঘুরে আসতে হল।

ইউএন ক্যাম্পাসের বাইরের নিরাপত্তার দায়িত্ব নিয়েছে ‘পিনাকল সিকিউরিটি’ নামের একটি বেসরকারি সিকিউরিটি সংস্থা। তবে তারাও রীতিমত পুলিশি কায়দায় আমাদের পাসপোর্ট পরীক্ষা করল। আমরা ইউএন ক্যাম্পাসে ঢুকে পড়লাম। বেশ সাজানো ক্যাম্পাস।তবে তুলনামূলকভাবে ছোট।

সারাটা দিন গেল চেকইন এর কাজ করতে। আমাদের সহায়তা করছেন সুইডেনের রনি ও চিনের ই। এরা দুজনেই বেশ আন্তরিক। কিছু অত্যাবশ্যক ফর্ম পূরণ করে আইডি কার্ড শাখায় গিয়ে ছবি তুললাম। একটু পরেই আইডি কার্ড পাওয়া গেল। এর পর কিছু ফর্ম পূরণ করতে হয় অনলাইনে। কিন্তু কম্পিউটার নেটওয়ার্ক ভালভাবে কাজ না করায় ওরা আমাদের অন্য একটি বিল্ডিং এ নিয়ে গিয়ে নিজেরাই আমাদের জন্য ফর্ম পূরণ করে দিল। এ কাজে এক সামোয়ান পুলিশ অফিসার বেশ সাহায্য করল। সে আবার বেশ কিছু বাংলাও বলতে পারে। আমাদের বলে, কেমন আছু? ভাল আছি—এ ধরনের কিছু কথা সে ভালই শিখেছে।

আগামী কাল ইন্ডাকশন ট্রেনিং শুরু হবে। এটা চলবে দু দিন। তার পরের দিন, মানে শুক্রবারে জুবায় পাঠিয়ে দিবে আমাদের। ইন্ডাকশনে সম্ভবত আমাদের সাথে একজন ডেনিশ ও একজন সুইস নাগরিক থাকবেন। তবে ওরা পুলিশ নয়, মিলিটারি।
সামান্য সময়ের জন্য বড় লোক
অফিস থেকে ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যে হয়ে গিয়েছিল। হোটেলে ফিরে গোসল করে একটু বিশ্রাম নিয়ে বের হলাম । ইচ্ছে ছিল শহরটা দেখব। কিন্তু মোবাইলের সিম কার্ড কেনা, সোমাকে ফোন করা আর ডলার ভেঙ্গে শিলিং বানানোর চেষ্টাতেই অনেক সময় গেল। আমার সাথে ইন্সপেক্টর আবুল মঞ্জুর একটি সিম কার্ড কিনতে চাইল। ভাবলাম, এটাতেই কথা হবে। কিন্তু ওরা সেটা একটিভ করতেই পারল না।। বাইরে থেকে সোমাকে ফোন করতে চাইলাম। কিন্তু লাইন পেতে অনেক দেরি হল। এক হাজার সিলিং দিয়ে সমার সাথে যোগাযোগ স্থাপনের পরপরই ব্যালন্স শেয় হয়ে গেল। ১০০ শিলিং বাংলাদেশেভ ২৫ টাকার সমান। ভাবলাম, পরে ফোন করা যাবে।

একশ ডলার ভেংগে শিলিং কিনলাম। প্রতি ডলারের বিপরীতে পেলাম ৩২,৫০০ শিলিং। এখানকার মূদ্রার মান অসম্ভব রকমের কম। আমি ৫০ ডলার দিয়ে পেলাম ১,৬২,৫০০ সিলিং। শিলিং হাতে পেয়ে মনে হল, বেশ বড় লোক হয়ে গেছি। কিন্তু যখন কেনাকাটা করতে গেলাম, তখন বুঝলাম, যা পেয়েছি তা দুবেলা পেট পুরে খেতেই শেষ হবে।

বাংলাদেশের টাকার বিপরীতে শিলিং এর মানও কম। এখানে এক টাকা দিয়ে ৪০ টিওর বেশি শিলিং পাওয়া যাবে। এক দোকান থেকে দুটো অর্ধ লিটারের পানির বোতল কিনলাম দুহাজার শিলিং দিয়ে। এক হাজার শিলিং হবে ২৫ টাকা। অর্থাৎ এক লিটার পানির দাম প্রায় ৫০ টাকা।

পানি কিনতে গিয়ে গত রাতের কথা মনে হল। বেটারা এক বোতল পানির জন্য কত কিছুই না করেছে। এক বোতল পানির দাম নিয়েছে এক ডলার,মানে আশি টাকা করে। অথচ একই পানি হোটেলের সামনের রাস্তার ওপারে একটি ডিপার্টমেন্ট স্টোরে প্রতি লিটার মাত্র ৫০ টাকা। বিদেশিরা কোন হোটেলে উঠলেই হোটেল কর্তৃপক্ষ শুধু তাদের পকেট খালি করার ধান্ধায় থাকে।

রাতের খাবারের জন্য হোটেল খুঁজতে বের হলাম। একটি হোটেল পাশেই ছিল। এটা নাকি ইন্ডিয়ানরা চালায়। গিয়ে দেখলাম, শুধু মদ-বিয়ায়ের স্তুপ। ওখানে খাওয়া হল না। একটি সুপার মার্কেটে ঢুকলাম। আমাদের আগোরা, স্বপ্নের মতো ডিপার্টমেন্ট স্টোরে গিয়ে জিনিসপত্রের দাম যাচাই করলাম। দেখলাম ফলের মধ্যে কলা সাজানো আছে। দুখণ্ড পাউরুটির দাম দুহাজার শিলিং আর এক ডজন কলা কিনলাম ৩৫০০ শিলিং দিয়ে। বাংলাদেশি টাকায় এটার দাম প্রায় ৮৭ টাকার মতো। খাঁটি সাগর কলা। বাংলাদেশের চেয়ে একটু বেশি দাম আর কি। এক ডজন সাগর কলা ঢাকায় তো ৭০ টাকার কমে পাওয়া যায় না।

হোটেলে ফিরে তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়লাম। কাল রাতে ভাল ঘুম হয়নি। বিছানাটা একটু বেশিই নরম ছিল। রুমে এসিও নেই, নেই শিলিং ফ্যানও । তবে একটি টেবিল ফ্যান আমার বেডের কাছে উপরে ঝুলিয়ে দেয়া হয়েছে। এটা মূলত ওয়াল ফ্যান হয়েছে। হোটেলের সুযোগ সুবিধার দিক দিয়ে প্রতিদিন এক রুম ৪০ ডলার মানে ৩২০০ টাকা ঠিকই আছে। এর মধ্যে সকালের নাস্তাটা ফ্রি। ইচ্ছে মতো সকালে খেলে দুপুরে আর খিদায় লাগে না। তবুও ইউএন ক্যাফেতে খেয়েছিলাম। মিষ্টি আলু এক টুকরো, একটু ভাত, কিছু সবজি আর সাথে একটি কারকাডির জুসের বোতল নিল ৫ ডলার।

৯ নভেম্বর, ২০১৫
সোমবার
6. Daily Account of A Peacekeeper, Episode-6