ক্যাটেগরিঃ ভ্রমণ

 

বিকেলে তাড়াতাড়ি করে ফিরলাম। শহরটি দেখব বলে। এনটেবে শহরে যাতায়াতের জন্য মাইক্রোবাস, টেক্সির পাশাপাশি ভাড়ায় চালিত মোটর সাইকেল রয়েছে। এখানে কোন রিকসা বা ঐ জাতীয় মানুষে টানা অযান্ত্রিক যানবাহন নেই। আজ অফিস সময়ের পর একটু ভিক্টোরিয়া লেকের ধারে গেলাম। হোটেলের বাইরে টেক্সিক্যাব ও মোটর সাইকেল রয়েছে। হোটেল থেকে বের হলেই ওরা ভাড়া নেয়ার জন্য পীড়াপীড়ি করে। আজ একটি টেক্সি ভাড়া করলাম। সে আমাদের কাছে থেকে ৪০হাজার শিলিং দাবি করে ২০ হাজার শিলিং এ রাজি হল। কিন্তু পরে জানলাম, এটা বেশ বেশিই ছিল। আসার সময় মাইক্রোবাসে এলাম, প্রতিজন এক হাজার শিলিং করে। এক হাজার শিলিং হল বাংলাদেশের ২৫ টাকার সমান।

মোটর সাইকেল সার্ভিসও খারাপ নয়। একজনকে টানতে ওরা এ ভাড়া মাইক্রোবাসে একজনের ভাড়ার সমানই নিত। মোটর সাইকেল ড্রাইভারদের একজন সেদিন আমাদের পরিচয় পেয়ে মন্তব্য করল, বাংলাদেশ অত্যন্ত গরিব। কিন্তু আমি তুলনা করে দেখলাম দারিদ্র্যের সূচকে বাংলাদেশ আর উগান্ডার অবস্থান প্রায় কাছাকাছি। কোন কোন ক্ষেত্রে বাংলাদেশ উগান্ডার চেয়ে এগিয়ে। গত কয়েক বছরে আমরা বেশ এগিয়ে গিয়েছি। কিন্তু ইতোপূর্বে যে ইমেজ বাংলাদেশের বহির্বিশ্বের কাছে ছিল এ যুবকের কাছে এখনও তাই রয়েছে।

এনটেবে উগান্ডার দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর। এটা আমাদের দেশের চট্টগ্রাম শহরের সাথে তুলনীয় হতে পারে। কিন্তু জাকজমক ও উন্নয়নে এটা অনেক পিছিয়ে রয়েছে। আমরা যে স্থানে হোটেল নিয়েছি সেই এলাকাটা বিমান বন্দরের কাছাকাছি। এটা অনেকটাই উন্নত এলাকা। কিন্তু গতকাল এ স্থান থেকে কয়েক কিলোমিটার ভিতরে গিয়ে বুঝলাম, আসলে এ শহর আমাদের চট্টগ্রাম শহরের চেয়েও অনেক অনুন্নত। রাস্তাঘাট থেকে শুরু করে দোকানপাট পর্যন্ত সব খানেই দারিদ্র্যের ছোঁয়া রয়েছে।

ভোডা ভোডা চালক যুবকটির সাথে পূনরায় তর্ক জুড়তে ই্চেছ করল। হয়তো আমাদের দেশ সম্পর্কে তারা সামান্যই জানে। অবশ্য বহির্বিশ্বে আমাদের ভাবমূর্তি তুলে ধরার চেষ্টাও খুব জোরাল বলে মনে হয় না। উগান্ডায় বাংলাদেশের কোন দূতাবাস বা হাইকমিশন নেই। পার্শ্ববর্তী দেশ কেনিয়া থেকে এদেশের সাথে আমাদের বৈদেশিক যোগাযোগ চলে। তাই ঐ ভোডাভোডা চালক কি করে জানবে বাংলাদেশ তাদের দেশের চেয়ে অনেক উন্নত।

ভিক্টোরিয়া লেইক
বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম মিঠাপানির আধার হল ভিক্টোরিয়া লেক। আয়তনে এর আকার আটষট্টি হাজার আটশত বর্গকিলোমিটার। উত্তর আমেরিকার লেক সুপিরিয়ারের পরেই এর স্থান। এর গড় গভীরতা ৪০ মিটারের মতো। সবচেয়ে নিচু স্থানটি ৮৪ মিটার গভীর। ভূতাত্ত্বিকদের ধারণা মতে এর গঠন হয়েছিল প্রায় ৪ লাখ বছর পূর্বে।

ভিক্টোরিয়া লেকের নামকরণ করা হয়েছিল তৎকালীন ব্রিটিশ রানী ভিক্টোরিয়ার নামানুশারে। ১৮৮৫ সালে জন হ্যানিং স্পেইক নামের এক ইউরোপিয়ান এ লেক আবিষ্কার করেন বলে মনে করা হয়। তিনিই এর নাম দেন। এই স্পেইকই নাকি প্রথম ঘোষণা করেছিলেন যে বিশ্বের বৃহত্তম নদী নাইলের উত্তপত্তিস্থল এই ভিক্টোরিয়া লেইক থেকেই। তবে ইতিহাস প্রমাণ দেয় যে আরব বণিকগণ তারও প্রায় সাতশত বছর পূর্বেই এ লেক এলাকায় পৌঁচেছিলেন এবং তারা পুরো লেইক এলাকার মানচিত্রও তৈরি করেছিলেন। কিন্তু ইউরোপীয় আগ্রাশনের তোড়ে আরবদের সেই কৃতীত্ব এখন ম্লান হয়ে গেছে। ভিক্টোরিয়া লেইকের নামের সাথে তাই জন স্পেইকের নামটিই অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে গেছে।

ভিক্টোরিয়া লেইক উগান্ডা, কেনিয়া ও তানজানিয়া – এ তিনটি দেশের মধ্যে অবস্থিত। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় অংশ পড়েছে তানজানিয়ার ভাগে (৪৯%)। উগান্ডার ভাগে পড়েছে ৪৫% অংশ। আর কেনিয়ার ভাগে পড়েছে মাত্র ৬% অংশ।

লেকের পাড়ের দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এ লেকের উপর দারুণভাবে নির্ভর করে। নিয়মিত ফেরি চলে এ দেশেগুলোর মধ্যে। মাঝে মাঝে ফেরি ডুবে অনেক মানুষের প্রাণহানীও ঘটে । এরূপ একটি ফেরি দুর্ঘটনা ঘটেছিল ১৯৯৬ সালে যেখানে প্রায় এক হাজারের মতো মানুষ প্রাণ হারিয়েছিল।

ভিক্টোরিয়া লেকের মৎস্য সম্পদের মধ্যে নাইলোটিকাই ছিল প্রধান। কিন্তু ১৯৫০ এর দশকে জেলেরা নাইলো পার্চ নামে একটি ভেটকি বা মেনি জাতীয় রাক্ষুসে মাছের চাষ শুরু করলে নাইলো পার্চই এখন ভিক্টোরিয়া লেইকের প্রধান মাছ হয়ে পড়েছে। এ মাছ বিশাল আকৃতির হয় এবং কাঁটাহীন ও সুস্বাদু বলে তা বড় জনপ্রিয়তাও পেয়েছে।

লেইকটির দৃশ্য মনোরম। স্থানীয় লোকজন লেইকের পাড়কে সৈকত বা বিচ বলে থাকে। আমরা বিশ হাজার শিলিং ভাড়া দিয়ে একটি টেক্সিব্যাবে করে সামান্য দূরে শিহাব ফ্রন্টলাইন বিচে গেলাম। স্থানটির নাম ছিল নাকিওগু। এখানে একটি ফেরিঘাট আছে। বিচের অন্যতম আকর্ষণ হল একটি রেস্টুরেন্ট। আমরা যেতে যেতে প্রায় সন্ধ্যা হয়ে এসেছিল। তাই তেমন ভালভাবে দেখা হল না। আর সূর্যও ছিল পশ্চিম দিকে। তাই সূর্যাস্তের সৌন্দর্য উপভোগ করলেও মনের মতো করে ছবি তুলতে পারিনি।

ইংরেজি জানা নিরক্ষর নারীটি
শিহাব বিচ থেকে ফেরার পথে একটি কাঁচা বাজারে ঢুকলাম। তখন সন্ধ্যা ঘনিয়ে রাত হয়েছে। মার্কেটে বিদ্যুতের আলো নেই। মোমবাতির আলোতে কয়েকটি দোকান খোলা পাওয়া গেল। আমরা সবজির দাম যাচাই করা শুরু করলাম। কিন্তু দোকানদাররা আমাদের ভাষা বুঝছিল না। উগান্ডায় সাধারণত ইংরেজি চলে। কিন্তু কাঁচা বাজারে শিক্ষিত লোকের দারুণ অভাব। তবে এরই মাঝে একজন মহিলা দোকানদান এগিয়ে এলেন। তিনি বেশ ভাল ইংরেজি বলেন। তিনি আমাদের সব কিছুর দাম বলে দিলেন। এ বাজারে সবজির দাম অনেকটাই চড়া মনে হল। এক কেজি আলুর দাম পড়বে প্রায় ৯৫ টাকা। টমেটোর দামও তেমনি। বেগুনকে এরা ‘বিনজেইয়া’ বলে। এটা ইংরেজি ব্রিঞ্জল শব্দের বিকৃত রূপ। আলুর বুগান্ডা ভাষার নাম অপমান্ডে ।আমাদের সাথে কথা বলা নারী দোকানদারটির কোন আনুষ্ঠানিক শিক্ষা নেই।

কিন্তু তিনি ইংরেজিটা ভালই আয়ত্ব করেছেন। আফ্রিকার দেশগুলোতে ইংরেজি জানা মানুষের সংখ্যা এশিয়া, বিশেষ করে আমাদের বাংলাদেশের চেয়ে বেশি মনে হয়। এর কারণ সম্ভবত, এরা নিজেরাই বহু ভাষাভাষির মানুষ। একজনের ভাষা অন্যজন বোঝে না। তাই একটি সাধারণ ভাষা বা ল্যাংগুয়া ফ্রাংকা হিসেবে এরা ইংরেজিকেই বেছে নেয়। অন্য উপজাতীর ভাষা কষ্ট করে শেখার চেয়ে আন্তর্জাতিক ভাষা ইংরেজি শেখায় উত্তম নয় কি?

উগান্ডার সবজির দোকানদার থেকে শুরু করে স্বর্ণের দোকান পর্যন্ত সবখানেই মেয়েদের আনাগোনা, পদচারণা উল্লেখযোগ্য । আমাদের এক সহকর্মী এ মহিলাকে জিজ্ঞাস করলেন, তোমাদের দেশের পুরুষগণ কি কাজ করেন না? তিনি বললেন, তারাও করে। আমরা রসিকতা করে বললাম, তারা কি বাসায় রান্নাবান্নার কাজ করে ? মহিলাটি বললেন, না। পরিবারের ভিতরে সব কাজই তাকে করতে হয়। মহিলার কথা শুনে বুঝলাম, নারীদের অবস্থা সবখানেই সমান এবং তা অধঃস্তন। পুরুষদের সাথে সমান তালে বাইরে কাজ করলেও নারীদের পরিবারের ভিতরের কাজের কোন ছাড় নেই। রান্নাবান্না, সন্তান লালনপালন সবই তাদের করতে হয়।

ইন্সপেক্টর মঞ্জুরের বিড়ম্ভনা
ইন্সপেক্টর মোহাম্মদ আবুল মঞ্জুর হল এনটেবেতে আমার রুমমেট। তার বাড়ি চট্টগ্রামে। চাকরি করতেন খাগড়াছড়িতে। এখানে এসে তিনি একটি বিপদেই পড়েছেন। তার কম্পিউটার ও ইন্টারনেট জ্ঞান অতি সামান্য। আর চাকরিস্থলও ছিল বেশ দূরবর্তী এলাকায়। তাই তিনি বাধ্যতামূলক চারটি অনলাইন পরীক্ষার একটিও সম্পন্ন করতে পারেননি। ইউএনএর নির্দেশনা ছিল এ চারটি কোর্স অনলাইনে পাশ করে সার্টিফিকেটগুলো সাথে আনতে হবে।

এনটেবেতে এসে প্রথম দিন চেকইন এর সময় আমরা সবাই সেই সার্টিফিকেটগুলো জমা দিলেও ইন্সপেক্টর মঞ্জুর তা দিতে পারেননি। তাই তাকে সাহায্য করা দরকার। এ জন্য কয়েকজনকে নির্দেশনা দিলাম। তারা প্রথম দিনই তাকে দুটো কোর্সে পাশ করিয়ে দিলেন। বাকি রইল আর দুটো। কিন্তু ইন্সপেক্টর মঞ্জুর তার ইউজার নাম আর পাসওয়ার্ড মনে রাখতে পারেননি। তাই হোটেলে এসে আমার নেটবুকে চেষ্টা করেও পারলাম না। দ্বিতীয় দিন প্রশিক্ষণ সময়ের পরে এক ঘন্টা সময় পাওয়া গেল। আবার তাকে সহায়তা করা শুরু হল। কিন্তু একই ধরনের সমস্যার মধ্যে পড়লাম । তার পাসওয়ার্ড মনে নেই। তিনি সে জন্য আবার তার সাহায্যকারীদেরই দোষারোপ করছেন। এতে অন্যরা বেশ মনক্ষূণ্নই হল।

আমি কোন প্রকারে একটি কোর্সে ঢুকে তাকে পাশ করিয়ে দিলাম। হোটেলে এসে তার সার্টিফিকেটখানা সেইভ করলাম। কিন্তু বাকি কোর্সটির জন্য আজও তার পক্ষে সময় ব্যয় করতে হবে।

জাতিসংঘের তিনটি কোর ভ্যালু
আজ আমাদের ইউএন কোর ভ্যালুগুলো পড়ানো হল। জাতিসংঘের মূলমন্ত্র হল- সততা, পেশাদারিত্ব ও বৈচিত্র্যের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ। সততার বিষয়টি ব্যাখ্যা না করলেও বোঝা যায়। পেশাদারিত্ব হল, কোন প্রকার পক্ষপাতিত্ব, অবহেলা কিংবা বিচ্যূতি ছাড়াই নিজ নিজ দায়িত্ব দক্ষতার সাথে সঠিক সময়ে পালন করা। সামাজিক সাংস্কৃতিক, ভৌগোলিক নানা প্রকার পার্থক্য ও বৈচিত্র্য নিয়ে জাতিসংঘের কর্মচারীগণ দায়িত্ব পালন করেন। তাদের দায়িত্বের এলাকাও সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ভৌগোলিক বৈচিত্র্যে ভরা। তাই স্থান, কাল, পাত্র ভেদে প্রত্যেক ব্যক্তি ও জাতির নিজ নিজ বিষয়গুলোকে শ্রদ্ধা করেই জাতিসংঘের কর্মচারীদের কাজ করতে হয়।

আমরা ইন্সপেক্টর মঞ্জুরকে পরীক্ষায় পাশ করিয়ে দেয়ার যে চেষ্টা করছি সেটা কিন্তু জাতিসংঘের কোর ভ্যালু বা মূলমন্ত্রের সাথে যায় না। এখানে আমরা অসততা ও প্রতারণার আশ্রয় নিচ্ছি। অন্যজনের পরীক্ষা দশজন মিলে পাশ করিয়ে দিচ্ছি। কিন্তু তারপরও কাজটা আমাদের করতে হচেছ। কারণ তার পরীক্ষা শেষ না হলে আমাদের পুরো গ্রুপটির যাত্রা থেমে যাবে। আর ইন্সপেক্টর মঞ্জুর নিজেকে অসহায় বোধ করবেন। ইতোমধ্যেই তিনি বেশ উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন। সারাক্ষণ এ বিয়টি নিয়ে টেনশনে থাকেন।