ক্যাটেগরিঃ ভ্রমণ

পূর্বের রাতের চেয়ে আজ রাতে অনেক ভাল ঘুম হয়েছে। তারপরও মাঝে মাঝেই ঘুম ভেঙ্গে গিয়েছিল। ঘুম থেকে উঠলাম স্থানীয় সময় সাড়ে পাঁচটার দিকে। আমার রুমমেট ইন্সপেক্টর মঞ্জুর তখনও ঘুমাচ্ছিলেন। আমার চেয়ে তিনি অনেক বেশি গভীর ঘুম দেন বলে মনে হল।। আমার আগে ঘুমিয়ে পড়েন; আবার আমার অনেক পরে ঘুম থেকে ওঠেন। আমি বেশিক্ষণ ধরে ঘুমালে হয়তো তিনি আরো বেশি ঘুম দিতে পারতেন। কিন্তু আমি আগে ওঠায় তার জন্য ঘুমিয়ে থাকাটা বেশ বেয়াদবি হয় বলেই তিনি আমার পরপরই উঠে পড়েন।

বৃষ্টির যন্ত্রণা
হঠাৎ করে বৃষ্টি শুরু হল। চিন্তায় পড়ে গেলাম। ইউএন বেইজ থেকে গাড়ি আসার সম্ভাবনা নেই। তবে হোটেল থেকে একটা মাইক্রোবাসে লিফট পেলাম। ঝিম ঝিম বৃষ্টির মধ্যে ইউএন ক্যাম্পাসে নামলাম। পায়ে হাঁটা শুরু করতেই পায়ের তলায় কেমন যেন ঠাণ্ডা অনুভূত হল। কয়েক কদম হাঁটার পরেই বুঝলাম, পায়ের তলার মোজা ভিজে পানি ঢুকছে পায়ের পাতার মাঝামাঝি স্থানে। একটু পরে দুপায়ের গোটা পাতাই ভিজে গেল।

একটু আরাম পাব বলে পুরাতন জুতাই নিয়ে এসেছিলাম দেশ থেকে। কিন্তু কোন খানে কোন সময় যে জুতোর তলা ফুটো হয়ে গেছে তা বুঝতেই পারিনি। কারণ দেশে থাকতে ছিপ ছিপ পানিতে জুতা পরে সাম্প্রতিক কালে হাঁটতে হয়নি।

এখন ক্লাসে বসে। জুতার তলায় পানি। যদিও ধীরে ধীরে গরম হচ্ছে পায়ের তলায় ভেজা মোজা নিয়ে গোটা দিনটা পার করা কষ্টকরই শুধু নয়, অস্বাস্থকরও বটে। আরো একজোড়া জুতো আছে বলেই বেঁচে যাব। কিন্তু এ সময়ের অস্বস্তিটুকু সহ্য করতেই হবে।

এইডস ক্লাস ও যৌনতা
শান্তিরক্ষা মিশনের ইন্ডাকশন ক্লাসে বাধ্যতামূলকভাবে সংযোজন করা কয়েকটি লেকচারের মধ্যে একটি হল, এইডস ও এইচআইভি। এইচআইভি ভাইরাস নানাভাবে ছড়াতে পারে। তবে আসতর্ক যৌন মিলনের ফলেই এটা ছাড়ায় বলে একটি ব্রান্ড ধারণা হয়ে গেছে। আর এজন্যই এইডস্ লেকচারে যৌনতার প্রশ্নটি এসে যায়। লেকচারার ইউসুফ এসেই আমাদের ক্লাসে যৌনতার ভাব ছড়িয়ে দিলেন।

ইউএন এর নীতি নিসেবে শান্তিরক্ষীদের জন্য পতিতাদের সাথেও যৌন মিলন নিষিদ্ধ। অথচ এনটেবেতে ছুটি কাটাতে এসে পুলিশ, মিলিটারি, সিভিল সব ধরনের ইউএন কর্মচারীদের একটা অংশ পতিতালয়ে যায়। উগান্ডায় পতিতাবৃত্তি বৈধ। কিন্তু ভয়াভহ হিসেব হল, উগান্ডায় ৭.৪% মানুষের শরীরে এইচআইভি বা এইডস ভাইরাস রয়েছে। আবার এনটেবেতে এই হার ৯.৮% এবং এনটেরের পতিতাদের মধ্যে এইডস ভাইরাসধারীর হার ২২%। এমতাবস্থায়, ইউএন শান্তিরক্ষীগণ এনটেবেতে এসে এইডস ভাইরাসে আক্রান্ত হলেও তা গোপন থেকে যায়।

বিষয়টি আমাদের জন্য তেমন চিন্তার বিষয় না হলেও ইউএন এর জন্য এটা একটা বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ পৃথিবীর নানা ধর্মের বর্ণের, নানা বিশ্বাসের ও মূল্যবোধের মানুষ জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে কাজ করে। তারা এইডস ভাইরাসে আক্রান্ত হলে সেটা জাতিসংঘেরই সমস্যা। কারণ বিশ্বব্যাপী রোগ নিরাময় ও প্রতিরোধের দায়িত্বটিও অন্য একটি সংগঠন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মাধ্যমে ইউএনকেই দেখতে হয়।

মুসলমানি করানো এইচ আইভি প্রতিরোধ করে
এইডস/এইচআইভি ক্লাসে এ ভাইরাসের বিস্তার প্রতিরোধের নানা কৌশলের মধ্যে পুরুষদের মুসলমানি করান (Maদe Circumcision) অন্যতম প্রধান উপায় বলে আমাদের এইডস/এইচআইভি ক্লাসের ইন্সট্রাকটর জনাব ইউসুফ উল্লেখ করলেন। মুসলমানি করানটা অনেকটা হাইজেনিক বলে সবাই মনে করেন। এর প্রধান কারণ হল,মুসলমানি করান হলে যৌন মিলনে নারী যৌনাঙ্গে কোন ক্ষত হয় না। কারণ ক্ষত হলে এইচআইভি ছড়ানোর সম্ভাবনা বেড়ে যায়। মুসলিম বিশ্বের সব স্থানেই এইডস এর সংক্রামণের হার খুবই কম। কঠোর ধমীয় বিধিনিষেধ মানার বাইরেও মুসলমানি করানোর বিষয়টি এক্ষেত্রে বিশেষ অবদান রাখে বলে গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে। তবে অনেক দেশে মেয়েদেরও মুসলমানি করান হয়। ঐসব দেশে আবার এইডস বা এইচআইভি ভাইরাস সংক্রমণের হার বেশি। ।

ইউএন এর আইডিপি সমস্যা
দক্ষিণ সুদানের বর্তমান সমস্যার মধ্যে প্রধানতম হল, প্রেসিডেন্ট সালভাকির ও তার প্রথম ভাইস প্রেসিডেন্ট রিয়াক ম্যাচারের মধ্যে ক্ষমতার ভাগাভাগি নিয়ে গৃহযুদ্ধ। এভূখণ্ডে এই যুদ্ধের ধরনটা এমনি যে তারা একে অপরের শত্রু এলাকার বেসামরিক ব্যক্তিদের শুধু হত্যাই নয়, নিশ্চিহ্ন করার মতো নৃশংসতা প্রদর্শন করে। তাই হাজার হাজার নিরীহ মানুষ প্রাণ ভয়ে তাদের বাস্তুভিটা ও লোকালয় থেকে পালিয়ে বনে জঙ্গলে গিয়ে আশ্রয় নেয়। আন্তর্জাতিক সীমানায় বসবাসকারী নাগরিকগণ পাশ্ববর্তী দেশে আশ্রয় নেয়। কিন্তু বর্তমানে এদেশে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশন চালু থাকায় হাজার হাজার মানুষ মিশন এলাকার নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিচ্ছে।

গত ২০১৩ সালের ডিসেম্বর মাসে শুরু হওয়া গৃহযুদ্ধের প্রেক্ষিতে এ পর্যন্ত জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনের সদর দফতর ও আঞ্চলিক অফিস কমপাউন্ডে প্রায় ২,০৯,২৮৭ জন নারী পুরুষ ও শিশু আশ্রয় নিয়েছে। এসব মানুষকে খাওয়ানো পরানো ও তাদের স্বাস্থ্য সেবার জন্য জাতিসংঘকে কাজ করতে হচ্ছে। এজন্য জাতিসংঘের প্রায় সকল প্রকার অংগ সংগঠন ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থাগুলো কাজ করে যাচ্ছে। আমরা হলাম জাতিসংঘের শান্তিরক্ষার পুলিশ মিশনের সদস্য। আমাদের বর্তমান কাজ হল, ইউএন ক্যাম্পাসে আশ্রয় নেয়া এসব শরাণার্থীদের সুরক্ষা ও তাদের মধ্যে শৃঙ্খলা রক্ষাকরাসহ অন্যান্য ধরনের সহায়তা দেয়া।

গৃহযুদ্ধের নৃসংশতা
ইনডাকশন ক্লাসে একটি ভিডিওতে দেখান হল, সাউথ সুদানের সরকার ও বিরোধী সেনাবাহিনীর মধ্যে যুদ্ধ চলছে। যুদ্ধের স্থান দেশের উত্তরের ইউনিটি রাজ্যের বান্টিও শহরের ইউএন কমপাউন্ডের পাশেই। বান্টিও এলাকায় সরকার বিরোধী রিয়াক মাচারের দল অত্যন্ত শক্তিশালী। প্রবল যুদ্ধের পর সরকারী সৈন্যগণ ছত্রভঙ্গ হয়ে পালিয়ে যাচ্ছে। যুদ্ধের মধ্যে একটি শিশু পালানোর চেষ্টা করছে। যুদ্ধরত একটি সৈনিকের কাছ থেকে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী বাহিনীর একজন সদস্য শিশুটিকে গ্রহণ করছেন। চার দিকে চলছে প্রচণ্ড গোলাগুলি । শিশুটি আতঙ্কে কাঁদছে।

সরকারি পক্ষের পলায়নরত একজন নিহত সৈনিকের হাত থেকে বিরোধী সৈন্যদের একজন অস্ত্রটি নিয়ে চলে গেল। পরে অন্যরা এসে তার শরীর থেকে যাবতীয় বস্ত্র খুলে নিচ্ছে। একজন নিহতের হাত থেকে একটি আংটি খুলে নিয়ে নিজ হাতে পরল। কী ভয়ংকর এই দৃশ্য! কিন্তু এই সৈন্যরাই যখন অন্য কোন স্থানে যুদ্ধে আহত হবে, নিহত হবে তখন তারাও একই অবস্থার শিকার হবে। ভিডিওটি ধারণ করেছে ইউএন কমপাউন্ডের মঙ্গোলিয় সেনাবাহিনীর সদস্যরা।

নাইলো পার্চ
ভিকোটারিয়া লেকের সবচেয়ে বড় প্রজাতির মাছটির নাম হল, নাইলো পার্চ। মাছটি দেখতে আমাদের দেশের মিনি মাছের মতো। কিন্তু এর আকার হল অত্যন্ত বৃহৎ। এটা লম্বায় প্রায় দুই মিটার পর্যন্ত হতে পারে। আর ওজনে হতে পারে দুইশ কেজি পর্যন্ত। খেতেও বড় সুস্বাদু। মাছটির জনপ্রিয়তার অন্য একটি কারণ হল, ভেটকি বা কোরাল মাছের মতো এর মেরুদণ্ডটি ছাড়া গায়ে তেমন কোন কাঁটা নেই। তাই যারা কাঁটার ভয়ে মাছ পরিহার করেন, তারাও এটা সহজেই খেতে পারেন এবং যে কোন অনুষ্ঠানে এটা পরিবেশন করা যায়। তবে এনটেবের বাজারে বড় আকারের নাইলো পার্চ পাওয়া যায় না। কৌতুহলবসত গতকাল এখানকার একটি কাঁচা বাজার পরিদর্শন কালে একটা ছোট আকারের (আধা হাত লম্বা হবে) নাইলো পার্চ দেখলাম। ধরে দেখলাম। কিন্তু দোকানদার মেয়েটি ছবি তুলতে দিলনা। সে বলে, আগে কিন, পরে ছবি তোল। দুপুরে ইউএন বেইজের কেন্টিনে নাইলো পার্চ খেলাম। অনেক বড় পিছটা ছিল। তবে হাতের পাঞ্জার মতো পাতলা। এর সাথে ভাত নিলাম। মোট দাম নিল ১৪ হাজার শিলিং মানে ২১০ টাকা। গোটাটা খেতেই পারলাম না।

১১ নভেম্বর, ২০১৫
বুধবার

Daily Account of a Peacekeeper, Episode-9