ক্যাটেগরিঃ ভ্রমণ

দেশ থেকে চিঠি লিখেছে মেনথা। ডাকে পাঠানো চিঠি নয়। এটা পাঠানো হয়েছে ইহাহু ম্যাসেঞ্জারে। যদিও সে নিজেই মোবাইলের কি বোর্ডে কিছু কিছু শব্দ টাইপ করতে পারে, তবুও চিঠিটা সে নিয়ম মাফিকই লিখেছে। প্রথমে একটি কাগজে চিঠি লিখে তার ছবি তুলে ম্যাসেঞ্জারে ইমেজ আকারে প্রেরণ করেছে।ওর চিঠিটি এরকম-

প্রিয় বাবা,
আমার সালাম নিও। আমি তোমার সব মেসেজ পড়েছি। প্রথম বারের ফুল আর শেষে লাল দুটোই সত্যি খুব সুন্দর। তুমি নাই, এজন্য সবাই খুব দুঃখি। জানো, খগু খুব দুঃখি। কেন জানি না ও আগের মতো লাফালাফি, খেলাধুলা করে না। খালি খগুই না, আম্মু, আমি, ভাইয়া সবাই। তুমি ছয় মাস পরে আবার আসবা। আমি জানি।
আজকের জন্য এই পর্যন্ত থাক। তুমি আমাকে চিঠি লিখ। ফেসবুকে না চিঠিতে এখনই।
আমার ভালবাসা রইল।
ইতি
তোমার স্নেহের
মেনথা।

মেয়ের চিঠি পড়ে আমিও প্রশিক্ষণের মাঝেই বসে গেলাম চিঠির উত্তর দিতে। আমার চিঠিটি ছিল নিম্নরূপ:
এনটেবে, ইউএন বেইজ,
উগান্ডা
তারিখ-১১/১১/২০১৫
প্রিয় মেন্থা,
তোমার চিঠি পেয়েছি। আমি খুবই আনন্দিত যে তুমি সুন্দর করে লিখতে পারো। তোমার হাতের লেখা খুবই সুন্দর (আমার হাতের লেখা খারাপ)।
তোমাদের ছেড়ে এসে আমিও খুব দুঃখ পেয়েছি। সবসময় তোমাদের কথা মনে করি। বর্তমানে ট্রেনিং এ খুব ব্যস্ত থাকি। তাই তোমাদের সাথে কথা বলতে পারি না।
তোমার খগুকে ঠিক মতো ঘাস দিতে হবে। শুধু ভাত খেলে ওর অসুখ হবে।
আমি দ্রুত আসার চেষ্টা করব। তুমি ভাল করে পড়া শোনা কর। পরীক্ষা ভাল কর। সবার জন্য ভালবাসা রইল।
ইতি
তোমার বাবা

১২০ হাজার শিলিং এ জুতার যন্ত্রণা দূর
অবশেষে ১২০ হাজার শিলিং দিয়ে বাটার এক জোড়া জুতা কিনলাম। বাংলাদেশি টাকায় এটা প্রায় তিন হাজার টাকার মতো। তাই দামটা বেশি না।দেখতে ভাল হলেও বাড়ি থেকে পরে আসা জুতোর তলা কখন ফেটে গিয়েছিল তা টেরই পাইনি। ভাগ্যিস আজকের বৃষ্টিতে হাঁটতে হয়েছিল। নইলে অন্য রকম অবস্থা হত। সাউথ সুদানের যাওয়ার আগেই সাথে অন্তত দুই জোড়া নতুন জুতা থাকল।

এনটেবেতে ভিকেটারিয়া মলটি অত্যন্ত সুন্দর। এটা বাংলাদেশের বসুন্ধরা বা ইন্টার্ন প্লাজার মতো। একটু ছোট হলেও বেশ সাজান গোছান।
ভিকেটোরিয়া মলে গিয়ে কয়েকজন সেনা অফিসারদের সাথে দেখা হল। এদের একজন লে. কর্নেল কাউসার যিনি র‌্যাব খুলনাতে ছিলেন। ঐ সময় আমি খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের এসি (খালিশপুর) হিসেবে কর্মরত ছিলাম। অনেক দিন পর তার সাথে দেখা হয়ে ভালই লাগল।

উগান্ডার সিকিউরিটি সার্ভিস
সরকারি পুলিশ সেবার পাশাপাশি এখন সব খানেই বেসরকারি সিকিউরিটি সার্ভিস শুরু হয়েছে। বলতে কি যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল পুলিশিং এর বহু সিমাবদ্ধতা দূর করেছিল পিংকারটনের বেসরকারি নিরাপত্তা সেবা। অন্যান্য দেশের মতো আমাদের দেশেও উন্নয়নের আংশ্যিক শর্ত হিসেবে শুরু হয়েছে বেসরকারি নিরাপত্তা সার্ভিস। শুধু ঢাকায় নয়, প্রায় সকল বড় বড় শহরেই আজকাল বেসরকারি সিকিউরিটি সার্ভিস চালু হয়েছে।
উগান্ডাতেও বেসরকারি নিরাপত্তা সেবা রয়েছে। বস্তুত ইউএন ক্যাম্পাসের পুরো নিরাপত্তা দায়িত্ব বেসরকারি নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান ‘পিনাকল সিকিউরিটিস’ এর উপর। কথা হল, পিনাকল সিকিউরিটি গার্ড মুমব্রে বেনসনের সাথে। ২৩ বছর বয়সী এসএসসি সমমান পাশ এই যুবক দুই বছর থেকে এই প্রতিষ্ঠানে কাজ করে আসছেন। এখন সে একটি মানি এক্সচেঞ্জ কাউন্টার পাহারা দিচ্ছে। তার হাতে আছে চাইনিজ রাইফেল। ছোট খাট চেহারার এই যুবক মাসে এক লাখ আশি হাজার শিলিং বেতন পায়। তার কোম্পানিতে প্রায় ৫০০ জনের মতো সশস্ত্র নিরাপত্তা কর্মী কাজ করে। তাদের বেতন বাংলাদেশি টাকায় মাত্র সাড়ে চার হাজার টাকা। এ বেতন নিতান্তই অপ্রতুল। যে দেশে এক জোড়া জুতোর দাম এর চেয়ে অনেক বেশি, সেদেশের একজন যুবক এত অল্প বেতনে কিভাবে চাকুরি করে তা আমার মাথায় ঢুকছে না।

আমাদের দেশের বেসরকারি নিরাপত্তা কর্মীগণ কোন অস্ত্র বহন করতে পারে না। কিন্তু এখানে এদের হাতে রয়েছে চাইনিজ সেমি অটোমেটিক রাইফেল। আমার কাছ থেকে যখন মুমব্রে জানল, আমাদের দেশের বেসরকারি নিরাপত্তা কর্মীগণ অস্ত্র বহন করতে পারে না, তখন সে অবাকই হল। তবে আফ্রিকান সমাজ থেকে আমাদের এশিয় সমাজ অনেকটাই পৃথক। আফ্রিকার অস্ত্রের সহজলভ্যতাই বেসরকারি নিরাপত্তা কর্মীদের হাতে অস্ত্র তুলে দেয়ার পথ সুগম করেছে।

তবে একটি বিষয় নিশ্চিত হলাম যে বেসরকারি সিকিউরিটি কোম্পানিকে কর্মরত গার্ডগণ সব স্থানেই অপ্রতুল বেতনে কাজ করেন। আমার জানা মতে আমাদের দেশের সিকিউরিটি গার্ডগণও এমন সামান্য বেতনে কাজ করেন। এদেশের নিয়ম কি জানি না। তবে আমাদের দেশের সিকিউরিটি সার্ভিসের কোম্পানিগুলো তাদের কর্মচারীদের প্রথম এক বা দুমাসের বেতন সব সময় আটকিয়ে রাখেন। অর্থাৎ তাদের কর্মের প্রথম মাসে কোন বেতন নেই। পরের মাস থেকে বেতন দেয়া হয়। আমার এলাকার কয়েকজন ভুক্তভোগী আমার কাছে সেই পাওনা টাকা তুলে দেয়ার জন্য তদবির করেছিল।

Daily Account of a Peacekeeper, Episode-10
১১ নভেম্বর, ২০১৫
বুধবার