ক্যাটেগরিঃ ভ্রমণ

আজ হোক আর কাল হোক কুইবেক স্বাধীন হবে

এনটেবে ফ্লাইট মোটেলের রিসিপশনের চেয়ারে বসে আছেন একজন সাদা চামড়ার লোক। কাছে গিয়ে পরিচিত হলাম। কোন দেশের নাগরিক জানতে চাইলে বলল, কুওবেক। আমি বুঝে উঠতে পারলাম না। আরো পরিষ্কার করে বললে বুঝতে পারলাম, তিনি কানাডার কুইবেক প্রদেশের বাসিন্দা। তবে কানাডা না বলে বলছেন, কুইবেক। তার নাম এরিক মিমেরি। তিনি একজন জাতিসংঘ স্বেচ্ছাসেবক। আমাদের মতোই এনটেবেতে ইনডাকশন ট্রেনিং নিচ্ছেন। হোটেল থেকে ইউএন বেইজে যাওয়ার জন্য গাড়ির অপেক্ষায় আছেন। আমিও অপেক্ষা করছি আমার সহকর্মীদের জন্য। ওরা এখনো নাস্তার টেবিলে আছে।

পরস্পর পরিচয়ে মধ্যে উঠে এল দেশের কথা, জাতির কথা। ত্রিশ লাখ প্রাণের বিনিময়ে আমরা স্বাধীন হয়েছি এসব বললাম আমি। এরিক বললেন, তারাও কানাডা হতে স্বাধীন হতে চায়। স্বাধীনতার পক্ষে-বিপক্ষে তারা ১৯৯৫ সালে গণভোটে অল্পের জন্য হেরে গেছে। তবে ভবিষ্যতে তারা আবার গণভোটের দাবি তুলবে।

কানাডা একটি বৃহৎ দেশ। শুধু কুইবেকের আয়তনই ফ্রান্সের আয়তনের চেয়েও বেশি। বহু ভাষাভাষির কানাডার প্রাধান্য ইংরেজি ভাষার হলেও কুইবেক ফরাসী ভাষী। শুধু আয়তনেই বৃহৎ নয়, অর্থনৈতিক দিক দিয়েও কুইবেক অন্যান্য প্রদেশের চেয়ে বেশি সম্মৃদ্ধিশালী। তাই তাদের স্বাধীনভাবে বেঁচে থাকার সামর্থ্য আছে। এরিকের কথার জোরে মনে হল, আজ হোক আর কাল হোক, কুইবেক একদিন স্বাধীন হবেই।

 

মুকানো ইয়াঙ্গে (আমরা বন্ধু)
উগান্ডার নিজস্ব ভাষা হল বুগান্ডিয়ান। বুগান্ডা রাজ্য থেকেই মূলত উগান্ডা নামের উৎপত্তি। বুগান্ডার রাজপরিবার এখনও উগান্ডার নিয়মতান্ত্রিক রাজতন্ত্রের অংশ। আমাদের রাষ্ট্রপতির মতো ওদের রাজা রয়েছেন, যিনি সরকারের অন্তবর্তীকালীন সময়ে বেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। বুগান্ডি ভাষা নাইলোটিক গ্রুপের অন্যতম প্রভাবশালী ভাষা।

এনটেবের মুভকন (Movement Corner) এ আমাদের জিনিসপত্র সিএমআর (Cargo Movement Request) এ করতে গেলে একজন উগান্ডিয়ান কর্মচারী আমাদের দেখেই বলল, ‘ও বন্ডু’। আমাদের মাতৃভাষা উগান্ডিয়ানের মুখে শুনে বেশ ভালই লাগল। এই সেকশন থেকে কার্গো বিমানে জিনিসপত্র কঙ্গো, দক্ষিণ সুদানসহ অন্যান্য স্থানে পাঠান হয়। সেই সুবাদে ডেনিস নামের এই উগান্ডিয়ানের সাথে বহু বাঙালি সেনা ও পুলিশ অফিসারের দেখা হয়। তাদের কাছ থেকেই এটা সে শিখেছে। আমাদের ভাষার সে কয়েকটি শব্দ শিখেছে বলে আমরাও তার ভাষার কয়েকটি শব্দ জানতে চাইলাম। সে জানাল, ‘মুকানো ইয়াঙ্গে’- মানে ‘আমরা বন্ধু’।

 

গোকে
ছুটে চলছি নাইলের উৎস স্থল জিনজার দিকে। এনটেবে থেকে কামপালা পার হয়ে আমাদের যেতে হবে প্রায় ১২০ কিমি। কাম্পালা পার হয়ে আমাদের ভাড়া করা মাইক্রোবাসটি মেয়োলোজ্জোলো নামের একটি বাজারের কাছে এসে ট্রাফিক জ্যামে পড়ল। গাড়ির গতি একটু স্লো করতেই গাড়ির জানালায় তিন চারটি ফেরিঅলা ছেলে-মেয়ে তাদের সামগ্রি বিক্রয় করার জন্য এক প্রকার আক্রমণই করে বসল। কেউ নিয়ে এসেছে কলা, কেউ মুরগীর কাবার করা রান, কেউ স্থানীয় কমলা/মাল্টা। বাঁশের কাঠিতে করে মুরগীর রান ফুঁড়ে ফুঁড়ে বেশ মনোহারি করেই আমাদের সামনে ধরল তারা। দাম হাঁকাল প্রতি পিছ কাবাব ২৫ হাজার শিলিং। কিন্তু তাদের পরিছন্নতার ধরণ দেখে আমরা কিনতে উৎসাহিত হলাম না। কেউ কেউ বলল, এগুলোতে কোন তেল মসলা নেই। তাই বিছরি লাগবে খেতে।

কিন্তু স্থানীয় খাবারকে পরখ না করে আমি জিনজা থেকে ফিরতে চাইলাম না। ফেরার পথে ড্রাইভারকে বললাম ঐ স্থানে গাড়ি থামাতে। পূর্বের মতো আবারও আমরা খাবারের ফেরিঅলাদেও তোপের মুখে পড়লাম। তবে এবার দাম জানাই শুধু নয়। এবার কিনলাম একটি মুরগির রান মাত্র পাঁচ হাজার শিলিং দিয়ে। এক হাজার শিলিং বাংলাদেশের পঁচিশ টাকার মতো। তাই এর দাম পড়ল বাংলাদেশি মুদ্রায় পচাত্তর টাকা। দামটা কিন্তু খারাপ না। ওরা মুরগীকে বলে ‘গোকে’। গোকের কাবাব আসলেই সুস্বাদু। আমি খেয়ে অন্যদের পরখ করতে দিলাম। পরিচ্ছন্নতার মাথা খেয়ে সবাই গোকের স্বাদ নিল। আসলেই চমৎকার!

১২ নভেম্বর, ২০১৫
বৃহস্পতি বার
Daily Account of a Peacekeeper, Episode-11