ক্যাটেগরিঃ ভ্রমণ

 

জুবা বিমানবন্দরে দ্বিতীয়বার প্রথম দিন
২০০৮ সালের মে মাসের শেষ দিকে প্রথমবার জুবা আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরে অবতরণ করেছিলাম। তখন এসেছিলাম খার্তুম থেকে। ঐ সময় দক্ষিণ সুদানের নেতারা উত্তর সুদানের জাতীয় সরকারের সাথে একটি সমন্বিত শান্তি চুক্তির বাস্তবায়ন করছিল। আমরা ছিলাম সেই চুক্তিবাস্তবায়নের অংশ। খার্তুম থেকে ইউএন ফ্লাইটে জুবায় অবতরণের পর আমাদের তেমন কোন দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মধ্যে পড়েতে হয়নি। কিন্তু এবার পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখন দক্ষিণ সুদান একটি সম্পূর্ণ স্বাধীন দেশ। তাদের একটি নিজস্ব সরকার, প্রশাসন ও ইমিগ্রেশন রয়েছে। বাইরে থেকে যারা আসেন, তারা স্বভাবতই একটি ইমিগ্রেশনের খুঁটিনাটির যন্ত্রণা ভোগ করেন। তবে আমাদের জন্য বিষয়টি ছিল আরো বেশি কঠিন।

আমরা সকাল (১৩ নভেম্বর, ২০১৫) নটার মধ্যেই জুবা এয়ারপোর্ট অবতরণ করেছিলাম। বিমান থেকে নেমে ইউএন বাসে করে আমাদের ইমিগ্রেশনে আনা হল। ইমিগ্রেশনে দাঁড়ালে কতর্ব্যরত পুলিশ অফিসার আমাদের আটকে দিলেন। তারা ভিসা কিংবা ইউএন এর আমন্ত্রণপত্র চায়। আমাদের সাথের কোন দলিলই কাজ দিলনা। আমি বললাম, ইউএন থেকে বলা হয়েছে, আমাদের ওসব লাগবে না। ইমিগ্রেশন পুলিশটি রাগান্বিত স্বরে বলল, এটা কি তোমার দেশ? আমি আর তর্কে গেলাম না। নতুন একটি দেশ যা দীর্ঘ প্রায় অর্ধ শতাব্দী লম্বা সশস্ত্র সংগ্রামের মধ্য দিয়ে স্বাধীন হয়েছে, তাদের দেশের পুলিশ বাহিনী তথা সরকারী কর্মকর্তাদের মধ্যে এধরনের অংহবোধ অবস্বাভাবিক নয়। ওদের আবেগকে আমাদের মূল্য দিতে হবে।

পূর্বেই আমাদের বলে দেয়া হয়েছিল, জুবা বিমান বন্দরে ইউএন এর নতুন স্টাফদের অযথাই হয়রানি করা হয়। এর প্রথম কারণ হল, বর্তমান সরকার মনে করে ইউএন তাদের বিপক্ষে কাজ করছে। তারা উৎসাহীভাবে বিরোধীদের সহায়তা দিচ্ছে। এক দিক দিয়ে বিষয়টি অবশ্য সেরকমই। কারণ সরকারি বাহিনীর আক্রমণ বা অভিযানের মুখে যে লোকগুলো ইউএন কম্পাউন্ডে আশ্রয় নিয়েছে সেগুলো সবই বিরোধী পক্ষের। ইউএন এদের শুধু আশ্রয় ও নিরাপত্তাই দেয়নি, ওদের খাইয়ে পরিয়ে বাঁচিয়েও রেখেছে।

হয়রানির দ্বিতীয় কারণ হল সম্পূর্ণ অবৈধ সুবিধা আদায়। বিদেশিদের একটু বেকায়দায় ফেলে তারা কিছু বাড়তি আদায় করতে চায়। এর কিছুটা সম্পূর্ণ ঘুষ, কিছুটা সরকারি রাজস্ব আদায়। বিদেশিদের দেশে প্রবেশ করতে দিলে সব সরকারই একটা ফি আরোপ করে। এটা ভিসার মাধ্যমেও আসে, আবার সারচার্জ হিসেবেও আসে। কিন্তু ইউএন কোন ভাবেই সরকারকে রাজস্ব দেয় না। তবে কোন ভাবেই যেন কোথায় একটা কানাকড়িও দেয়া না হয়, সে সম্পর্কে এনটেবেতেই আমাদের সতর্ক করে দেয়া হয়েছিল।

ইমিগ্রেশনে আমাদের পাসপোর্টগুলো জব্দ করা হল। আমাদের কয়েকজন অফিসার অস্থির হয়ে পড়ল। কিন্তু আমি তাদের ধৈর্য ধরতে বললাম। দেখলাম, বিষয়টি শুধু আমাদের বাংলাদেশি ১০ জন পুলিশ শান্তিরক্ষীর জন্যই নয়, আমাদের সাথে আরো দুজন বাঙালি রয়েছেন, তার সাথে রয়েছেন অন্যান্য বেশ কয়েকটি দেশের শান্তিরক্ষীগণ। একটু পরেই ইউএন এর একজন ইথিওপিয়ান লিয়াজোঁ অফিসার আসলেন। তিনি ইউএন এর দায়িত্বশীলদের সাথে কথা বললেন। ঘন্টা খানেক পরে আমাদের পাসপোর্টগুলো ফেরত দেয়া হল। পরে আমরা শুনেছি, অনেক দেশের শান্তিরক্ষীদের পাসপোর্টগুলো কয়েক সপ্তাহ ধরে আটরে রাখা হয়েছিল। সে দিক দিয়ে আমরা বেশ ভাগ্যবানই বলতে হবে। কারণ বিদেশে পাসপোর্টটিই হল একজন নাগরিকের পরিচয়। পাসপোর্ট নেই তো আপনি পৃথিবীর কোন দেশেরই কেউ নন।

আসা-যাওয়ার ঠিকান-রোটেশন অফিস
ইমিগ্রেশনের বাইরে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিলেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মাসুদ। জুবায় বর্তমানে আমাদের দুজন অফিসারের পোস্টিং আছে। এদের অন্যজন হল অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মাহমুদ হাসান। ইমিগ্রেশনের বাইরে এসে দেখি আমাদের মালপত্রগুলো মিশনের মুভকনে পড়ে আছে। অতিদ্রুত এগুলো আমরা একটা গাড়িতে তুললাম। এর পর আমাদের নিয়ে যাওয়া হল ‘আনপোল’ রোটেশন অফিসে। এই অফিস থেকে মিশনে কর্মরত পুলিশ অফিসারদের কর্মস্থলে স্বাগত জানান হয়। যারা নতুন আসবেন কিংবা যারা মিশন শেষ করে চলে যাবেন, উভয় শ্রেণির শান্তিরক্ষীদের ঠিকানা হল, এই রোটেশন অফিস। জুবা সেকটরের রোটেশন শাখার প্রধান ইন্দোনেশিয়ান পুলিশের আঙ্গুইন আমাদের ব্রিফ দিলেন। প্রয়োজনীয় কিছু কাগজে সই করতে হল। তারা বললেন, পরের দিন নয়টায় আসতে হবে। তবে এক সপ্তাহের ট্রেনিং শুরু হবে সোমবার থেকে।

ডলার নিয়ে বিড়ম্বনা
তেমন ক্ষিদে না পেলেও দুপুরে থেতে গেলাম টমপিং ক্যাম্পাসের সুদানিজ ডাইনিং এ। আমার কাছে পাউন্ড ছিল না। ভাত, মাংস আর বিনের দাম ১৫ পাউন্ড। আমি ডলারে দিতে চাইলে কালো মহিলাটি আমার কাছে ১০ ডলার দাবি করে। কিন্তু বাজারে ১০ ডলার ৬০ পাউন্ডের সমান। আমি তাকে ডলার নেয়ার জন্য পিড়াপীড়ি করতে থাকি। আর মহিলা ১৫ পাউন্ড না হলে ১০ ডলার নিবেন বলেই গো ধরলেন। আমি এক প্রকার বিপদেই পড়লাম। আশে পাশে কোন সহকর্মীও নেই যে আমাকে ১৫টি পাউন্ড ধার দিয়ে সহায়তা করবেন। আমি দামও পরিশোধ করতে পারছি না, খাবারটি ফেরতও দিতে পারছি না।

আমার এ দুরস্থা দেখে অবশে এক সুদানিজ আমার কাছ থেকে তিন ডলার নিয়ে দাম পরিশোধ করলেন। পরে যখন একশ ডলার ভেংগে সুদানিজ পাউন্ড কিনলাম, তখন বুঝলাম তিন ডলার মানে ৪৮ পাউন্ড। তার মানে পাউন্ড সাথে না থাকায় আমাকে শেষ পর্যন্ত ১৫ পাউন্ডের খাবার ৪৮ পাউন্ড দিয়ে কিনতে হল।

জুবার পরিবর্তন
বিকেলে অতিঃ পুলিশ সুপার মাসুদের সাথে একটু বাইরে গেলাম। দেখলাম, অনেক জুবায় ইউএন ক্যাম্পাসের আসেপাশে অনেক সুন্দর সুন্দর বিল্ডিং হয়েছে। অধিকাংশ বিল্ডিং এর মালিক ভারতীয় ব্যবসায়ীগণ।কিছু কিছু বাঙালি ছেলেও, দেখলাম, ব্যবসা বাণিজ্য করছে। তবে এরা বিপদে পড়েই এখানে থেকে গেছে। তারা প্রতারিত হয়ে অনেক আশা নিয়ে প্রথমে সুদানে ও পরে দক্ষিণ সুদানে এসে কামলা-কুলির কাজ করতে করতে অনেকেই নিজস্ব ব্যবসা প্রতিষ্ঠানও খুলেছেন।