ক্যাটেগরিঃ ভ্রমণ

 

জুবায় প্রথম বাজার
সকালে নাস্তা করব বলে গেলাম সেই সুদানিজ হোটেলে। এ হোটেল চালায় কয়েকজন স্থানীয় মহিলা। আমাদের বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীরা এ মহিলাদের নাম দিয়েছে ‘খালা আম্মা’। হোটেলটির সরকারি নাম যাই থাকুক আমার দলের সহকর্মীগণ একে খালা আম্মার হোটেল বলা শুরু করল। এখানে অল্প খরচে গোমাংস, মুরগীসহ অন্যান্য খাবার পাওয়া যায়। কিন্তু শনিবারে এখানে নাস্তা তৈরি হয় না। তবে খালা আম্মাকে বলে কয়ে চা আর পাউরুটির ব্যবস্থা করা গেল। খালা আম্মার হোটেলের বাইরে এখানে আরো দুটো হোটেল আছে। এগুলো চালায় চাইনজরা। খাবারের মেনু ইউরোপিয়ান। তবে স্থানীয় বা ভারতীয় আইটেমও আছে। কিন্তু আইটেম ভাল হলেও মাত্র দুরকটি ছাড়া অন্যান্য আইটেম মুখে দেয়ার মতো নয়। গতকাল আমাদের কয়েক সহকর্মী এখানে ব্রিয়ানি-চিকেন খেয়ে দিনের বাকিটা সময় আফসোসে কাটিয়েছেন। প্রতিজনের খাবরের মূল্য ৭০ সুদানিজ পাউন্ড করে পড়লেও তারা খাবারটি উপভোগ তো দূরের কথা ঠিক মত গিলতেও পারেননি। নন-ইন্ডিয়ানদের হাতে ইন্ডিয়ান খাবারের প্রস্তুতি জঘন্যভাবে খারাপ। এটা আমি অন্যত্রও দেখেছি।

খালা আম্মার দোকান থেকে একটু দূরে ‘টুকুল’ ক্যান্টিনে ইউএন ভলান্টিযার মাহবুরের কাছ থেকে জানা গেল প্রতি শনিবারে ইউএন ক্যাম্পাস থেকে জুবা শহরের দিকে বাজারের জন্য দুইটি বাস যায়। আমরা সেই বাসের যাত্রী হয়ে শহরে গেলাম। প্রথমে গেলাম কনিও কনিও বাজারে। ওখানে ফল-মুল, শাক সবজিসহ মুদির আইটেমগুলো কেনা হল। এরপর ‘ভাম্প’ নামের একটি ডিপাটমেন্ট স্টোরে নিল আমাদের। ভাম্প মার্কেটটিও বিদেশিরা চালায়। এখানে প্রায় সব জাতীয় বস্তুই পাওয়া যায়। কিন্তু দামটা একটু বেশি। আমি ২৮ পাউন্ড দিয়ে এক ডজন হ্যাংগার কিনলাম। আমার ডিএইচএল সার্ভিসে সবই দেয়া আছে। কিন্তু সেগুলো পেতে অনেক দেরি হবে। তাই বর্তমানের কাজ সারাবার জন্য কয়েকটি হ্যাংগার দরকার ছিল। কিন্তু এখানে এক ডজনের কমে হ্যাংগার বিক্রয় হয় না। তাই বাধ্য হয়ে পুরোটাই কিনলাম। তবে হিসেব করে দেখলাম, আমাদের দেশেও এগুলোর দাম এমনই হত।

ভাম্প মার্কেটের পাশেই একটি পাউরুটি তৈরির কারখানা আছে। আমরা কারখানার ভিতর থেকে গরম গরম পাউরুটি কিনলাম। প্রতিটি বান আকৃতির পাউরুটির মূল্য দু পাউন্ড করে। দু পাউন্ড হল বাংলাদেশের দশ টাকার সমান। তাই দামটা বেশি নয়। লক্ষ করে দেখলাম,এ রুটির কারখানাটি সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিদ্যুৎ শক্তিতে চলছে। আমাদের দেশের মতো এখানে অল্পদামে জ্বালানী গ্যাস নেই বলেই এ ব্যবস্থা।

বান-ইন্জিনিয়া
দক্ষিণ সুদানের রাজধানী জুবায় শান্তিরক্ষার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অবদান অনস্বীকার্য। মিশন শুরুর প্রথম থেকেই বর্তমান পর্যন্ত প্রায় প্রত্যেকটি ক্ষেত্রেই বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সদস্যগণ অবদান রেখে চলেছেন। তবে পূর্বের চেয়ে বর্তমানে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর উপস্থিতি এখানে কমেছে। এজন্য শান্তিরক্ষীদের সংখ্যা হ্রাস করা থেকে শুরু করে দক্ষিণ সুদানের আফ্রিকান নীতি পর্যন্ত অনেক কিছুই জড়িত আছে। জুবা সেক্টরের কম্ব্যাট ব্যাটালিয়ন থেকে শুরু করে প্রায় সকল সাপর্টিং ব্যাটালিয়ন এক সময় বাংলাদেশ সশস্ত্রবাহিনীরই ছিল। কিন্তু বর্তমানে মাত্র একটি ইন্জিনিয়ার ব্যাটালিয়ন ও একটি ফরমড ম্যারিন ইউনিট রয়েছে।

২০০৮/০৯ সালে আমি প্রথমবার মিশনে এসে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর জুবাস্থ ব্যাটালিয়নগুলোর আতিথ্য গ্রহণ করেছিলাম। এবারও তাই করব বলে ভেবেছিলাম। আজ সকালে ব্যান ইন্জিনিয়ারর্সের ক্যান্টিনে গিয়ে জানতে পারলাম এখানে অফিসারদের মধ্যে রংপুরের দুজন অফিসার মেজর বাসেত ও মেজর শাহ আলী রয়েছেন। তাদের ফোন নম্বর নিয়ে ফোন করলাম। তারা বিকেলে যেতে বলালেন। আমন্ত্রণেও আন্তরিকতার সুর আছে।

বিকালে দুই এডিশনাল এসপিকে নিয়ে বান-ইন্জিনিয়ারে গেলাম। মেজর আলীর বাড়ি কুড়িগ্রামের ভ্রুঙ্গামারিতে। মেজর বাসেতের বাড়ি রংপুর শহরের শালবন মিস্ত্রি পাড়ায়। তারা আমাদের ভালই আপ্যায়ন করলেন। জানতে চাইলেন, আমাদের কোন সমস্য আছে কি না। সমস্যা হিসেবে তখন ছিল, আমাদের মশারি খাটানোর রড বা কাঠির অভাব। আর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মহিউদ্দিনের সাথে মশারিও ছিল না।

বাংলাদেশে সেনাবাহিনীর ইন্জিনিয়ারিং ইউনিটের ভাইরা আমাদের সাহায্যে এগিয়ে এলেন। খাটের মশারি টানানোর জন্য তারা আমাদের পাঁচটা লোহার রড দিলেন। অ্যাডিশনাল এসপি মহিউদ্দীনের জন্য একটা মশারি দিলেন। মশা তাড়ানোর ক্রিম ওডোমাসও দিলেন এক টিউব। হয়তো মূল রংপুরে বাড়ি বলে মেজর বাসেতকেই বেশিই আন্তরিক মনে হল। তবে এ বিদেশ বিভূঁইয়ে কোন বাংলাদেশির সাহায্য সহযোগিতাকে খাটো করে দেখার কোন অবকাশ নেই। শ্রেণী, পেশা কিংবা ব্যক্তিগত বিদ্বেষ ভুলে একে অপরকে সহায়তা করেন। বিদেশ বিভূঁইয়ে দেশের পরিচিত জাতের গাছটিকেও আপন মনে হয়। আর মানুষ তো গোটা হৃদয়ের অধিকারী।
Daily Account of a Peacekeeper, Episode-17

১৪ নভেম্বর, ২০১৫
শনিবার