ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা, ফিচার পোস্ট আর্কাইভ

 

pb
অনেক কাঠখড়ি পুড়িয়ে প্রতিষ্ঠার প্রায় ২৬ মাস পর পর গত ০৫ জানুয়ারি, ২০১৬ তারিখে পুলিশের তদন্তকাজে বিশেষজ্ঞ ইউনিট ‘পুলিশ বুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)’ এর একটি বিধিমালা গেজেট আকারে প্রকাশিত হলো। বলাবাহুল্য, বিপিআই পুলিশের একটি বিশেষায়িত ইউনিট হিসেবে যাত্রা শুরু করেছিল ২০১২ সালের ১৮ অক্টোবর। কিন্তু নতুন একটি ইউনিটের বিশেষ ধরনের কাজগুলো আটকেছিল একটি বিধিমালার অভাবে। কারণ, এটা পুলিশের অপরাপর ইউনিটের মতোই একটি ইউনিট হলেও এর কাজ বিশেষজ্ঞের । এই বিশেষজ্ঞতা দ্বিবিধ মাত্রার । প্রথমত, তদন্তকার্যটি নিজগুণেই একটি বিশেষায়িত কর্ম। দ্বিতীয়ত, এটি থানা বা অন্যান্য পুলিশ ইউনিট থেকে ভিন্নতর পরিধি ও পরিবেশে তদন্ত কাজে আত্মনিয়োগ করবে।

বিজ্ঞমাত্রই একমত হবেন যে তদন্তকার্যটি হররোজকার হল্লা ডিউটি বা পাবলিক অর্ডার পুলিশিং নয়। হল্লা ডিউটিতে মাঠের কাজ মাঠেই শেষ করা হয়। কিন্তু তদন্ত কাজের চূড়ান্ত পরিণতি ঘটে আদালতে কোন অপরাধের বিচার সম্পন্ন হওয়ার মাধ্যমে। যে অপরাধের তদন্ত করে দোষীদের বিচারের জন্য আদালতে প্রেরণ করা হয়, সেই দোষ প্রমাণের দায়িত্ব সরকারের প্রসিকিউশন বিভাগের। কিন্তু পুলিশের তদন্তকালে সংগ্রহ করা সাক্ষ্য-প্রমাণে শনাক্ত করা ব্যক্তিদের অপরাধ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত না হলে অপরাধের সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা ছাড়া পেয়ে যায়। তাই তো পুলিশি দায়িত্বে তদন্ত এতটা গুরুত্ব পায়।

কিন্তু বাংলাদেশে পুলিশের তদন্ত নিয়ে নানা প্রকার শ্রুতি-বিশ্রুতি রয়েছে। কেউ বলেন, পুলিশের দক্ষতার ঘাটতি রয়েছে; কেউ বলেন, পুলিশ সাংগঠনিকভাবেই দুর্বল। কেউ বলেন, পুলিশ নিরপেক্ষ তদন্ত করতে পারে না। আবার পুলিশের পক্ষ থেকেও দাবি করা হয় যে মাঠ পর্যায়ের পুলিশ তদন্ত ভিন্ন আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাজনিত কারণে এতটাই ব্যস্ত থাকে যে তাদের দিয়ে সঠিকভাবে ও সুষ্ঠুভাবে অপরাধের তদন্তের মতো একটি বিশেষায়িত কাজ সুচারুরূপে করিয়ে নেয়া দুস্কর। এমতাবস্থায়, তদন্তে জন্য একটি পৃথক সংস্থার সৃষ্টি করা দরকার যাদের অফিসারগণ দৈনন্দিন আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার মতো কাজ জড়িত হবেন না; শুধু তদন্ত নিয়েই থাকবেন।

বিষয়টি সাধারণ মানুষের পর্যায় থেকে বিশেষজ্ঞ পর্যায় পর্যন্ত আলোচিত হতে থাকে। এক পর্যায়ে সরকারও এটার গুরুত্ব অনুধাবন করতে পারে। কোন কোন বিশেষজ্ঞ পর্যায় থেকে এমনও প্রস্তাব আসছিল যে এ বিশেষায়িত তদন্ত সংস্থাটি পুলিশ থেকে ভিন্ন একটি সংস্থা হবে যারা পুলিশ সদস্য হবেন না এবং পুলিশ প্রধানের নিয়ন্ত্রণেও থাকবে না। পুলিশের দায়িত্ব ও তদন্ত ও প্রসিকিউশন সম্পর্কে অগভীর জ্ঞানসম্পন্ন কতিপয় স্বার্থান্বেষীয় ব্যাক্তিরাই মূলত এমন সুপারিস করত।

পুলিশের উৎপত্তি থেকে শুরু করে আধুনিক পুলিশের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে তদন্ত পুলিশি দায়িত্বের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তদন্তকে পুলিশ থেকে আলাদা করলে যেমন পুলিশ আর বনেদি অর্থে পুলিশ থাকে না, তেমনি নতুন একটি সংস্থাকে দিয়ে চিরায়ত পুলিশ-কর্ম করাতে জাতীয় ব্যয় বহুগুণে বৃদ্ধিও পায়। পুলিশ গবেষকগণ হিসেব কষে দেখিয়েছেন যে পুলিশ হতে ভিন্ন কোন আলাদা সংস্থাকে দিয়ে নিয়মিত ফৌজদারি অপরধের তদন্তের কাজ করাতে হলে তাদের সংস্থার পরিচালনা ব্যয় আক্ষরিক অর্থেই বহুগুণ বেড়ে যাবে। আর যে অর্থ দিয়ে সম্পূর্ণ নতুন কোন ব্যক্তিকে তদন্তকাজে পাকা করার চেষ্টা করা হবে, তার চেয়ে অনেক কম খরচে পুলিশ অফিসারদের অনেক বেশি পাকা করা যায়।

তদন্তকাজে নিরপেক্ষতা আর বস্তুনিষ্ঠতার একটি প্রশ্ন বিভিন্ন মহল থেকেই ওঠে। অনেকে বলেন, পুলিশকে দিয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত করান সম্ভব নয়। তাদের এ ধারণাকে যদি পাত্তাও দেই তবু বলতে হয়, তাদের জানা উচিৎ, তদন্তকাজে নিরপেক্ষতার বিষয়টি অনেক নিয়ামক দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। এসব নিয়ন্ত্রক শুধু পুলিশের নয়, তদন্তকাজের দায়িত্বপ্রাপ্ত যেকোন সংস্থার কাজকর্মকে নিয়ন্ত্রণ করে। আমাদের মতো অস্থির আর্থসামাজিক অবস্থা ও নিয়ন্ত্রণপ্রবণ রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে যে কাজে পুলিশের নিরপেক্ষতা বজায় রাখা সম্ভব হয় না, সেখানে অন্যকোন সংস্থা যে তাদের নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে পারবে, আমাদের অভিজ্ঞতায় সেরূপ কোন সংস্থা নেই এবং ইতিহাসও তেমন সাক্ষ্য দেয় না।

বলাবাহুল্য, তদন্ত একটি বিশেষায়িত কাজ হলেও তা পুলিশের দৈনন্দিন আভিযানিক কাজের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তদন্তকালে তথ্য-প্রমাণ-আলামত সংগ্রহ থেকে শুরু করে আসামী বা সন্দিগ্ধদের গ্রেফতার, গ্রেফতারকৃত ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ, তাদের পুলিশ রিমান্ড গ্রহণ, হেফাজত ইত্যাদি ক্ষেত্রে পুলিশের অন্যান্য ইউনিটগুলো এমনভাবে জড়িত যে পুলিশ থেকে আলাদা কোন তদন্ত সংস্থার ক্ষেত্রে ফৌজদারি মামলা/অপরাধের সুষ্ঠু তদন্ত শেষে অভিযুক্তদের শাস্তি আদায় করার বিষয়টি প্রায় অসম্ভব। সুখের বিষয়, আমাদের নীতিনির্ধারকগণ বিষয়টি বুঝতে পেরেছেন বলেই পুলিশের অভ্যন্তরেই একটি বিশেষায়িত তদন্ত সংস্থা গঠন করেছেন।

কিন্তু সমস্যা হচ্ছিল এ সংস্থার বিধিমালা নিয়ে। পুলিশ আইনের অধীন পরিচালিত যে কোন সংস্থার কর্মপদ্ধতি নির্ধারণের দায়িত্ব পুলিশ প্রধানের। তবে এটা সরকারের অনুমোদন সাপেক্ষ। কিন্তু আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কাকে বলে এবং তা সরকারের সুস্পষ্ট নির্দেশনাকেও কিভাবে বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শনে সক্ষম তা পিবিআই সংশ্লিষ্টরা হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছিলেন বলেই অনুমান করা যায়। তবে সরকারের সদিচ্ছার কাছে অনেক বাধার পাহাড়ই চুরমার হয়ে যায়। তাই পিবিআই সম্পর্কিত বাধাগুলোও দূর হয়েছে। এখন পিবিআই আইন ও বিধি অনুসারে ফৌজদারি মামলার নিয়মতিভাবে তদন্ত করতে সক্ষম।

বলাবাহুল্য, বিধিমালা জারির পূর্বেই বিপিআই দেশের সকল মেট্রোপলিন/বিভাগীয় শহর বৃহত্তর জেলাগুলোতে তাদের আঞ্চলিক অফিস স্থাপনের কাজগুলো সমাপ্ত করেছিল। সেই সব অফিসকে মোটামুটি গুছিয়েও নিয়েছিল। তারা তাদের কর্মপদ্ধতির সিংহভাগ কাজই বিধিমালার গেজেট জারির পূর্বেই সম্পন্ন হয়েছিল। তাদের অফিসারদের বিশেষভাবে প্রশিক্ষণ দিয়েছিল, এমনকি পুলিশের অন্যান্য ইউনিটকে সহযোগিতা দিতে ছায়া তদন্তও শুরু করেছিল। তাই বিধিমালা জারির এ সময়ে পিবিআই একটি কর্মক্ষম পুলিশ ইউনিটি বলেই ধরে নেয়া যায়।

গত প্রায় বছর খানেক ধরে পিবিআই আদালতের নির্দেশে বেশ কিছু মামলার তদন্ত সম্পন্ন করেছে। নরসিংদি জেলার এক আদালত থেকে নির্দেশিত হযে ২০১৫ সালের ১০ জানুয়ারি পিবিআই তাদের ইতিহাসের সর্বপ্রথম মামলাটি তদন্তের জন্য গ্রহণ করে। তাদের তদন্তের মান, ধরন ও আদালতে উপস্থাপিত পুলিশ প্রতিবেদনে সংশ্লিষ্ট আদালত সন্তুষ্ট হয়ে একাধিক আদালত তাদের অর্ডার সিটে পিবিআই এর উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছিলেন। এমন একটি অর্ডারসিট আমি নিজেই পড়েছি। দায়িত্ব শুরুর প্রাক্কালে বিজ্ঞ আদালত কর্তৃক প্রশংসিত হওয়া যে কোন পুলিশ ইউনিটের জন্য গর্বের বিষয় বলে মনে করি। কারণ পুলিশের তদন্তের গন্তব্য হল এই আদালতই। আদালত কর্তৃক অপরাধীদের শাস্তি প্রদানের মাধ্যমেই পুলিশের তদন্তের স্বার্থকতা প্রতিফলিত হয়।

রংপুর পীরগঞ্জ থানার একটি নারী নির্যাতনের অভিযোগ সংশ্লিষ্ট ট্রাইবুনালে গেলে ট্রাইবুনাল তা তদন্ত করার জন্য পিবিআই এর রংপুর অফিসকে দায়িত্ব দেন। আদেশটিও ছিল মনে রাখার মতো। আদালতের আদেশে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার, পিবিআইকে নির্দেশ দেয়া হয়েছিল উক্ত অভিযোগটি অফিসার-ইন-চার্জ, পীরগঞ্জ থানার মাধ্যমে নিয়মিত মামলা হিসেবে রুজু করে ট্রাইবুনালে প্রতিবেদন দিতে। এ ধরনের দায়িত্ব অর্পণ প্রমাণ করে আদালত পিবিআই নামক তদন্ত-সংস্থাটির প্রতি বেশ আস্থাশীল। তাই বিধিমালা জারির পর বিভিন্ন ট্রাইবুনাল থেকে জটিল প্রকৃতির অপরাধগুলোর তদন্তের ভার পিবিআইকে সরাসরি গ্রহণ করার জন্য প্রচুর সংখ্যায় আদেশ আসতে পারে। এর বাইরেও থানা পুলিশ বা পুলিশের অন্যান্য ইউনিট থেকে দাখিলকৃত তদন্ত প্রতিবেদনের উপর নারাজিজনিত অনেক মামলাই অধিকতর তদন্তের দায়িত্বও পিবিআই এর উপর বর্তাতে পারে। তাই পিবিআইয়ের কাজের আয়তন দ্রুত বৃদ্ধি পেতে পারে।

এখানে তদন্তের এখতিয়ার নিয়ে থানা পুলিশ, জেলা পুলিশের ডিটেকটিভ ব্রাঞ্চ, ক্রিমিনাল ইনভেস্টিগেশন ডিপার্টমেন্ট (সিআইডি), র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব)সহ অন্যান্য পুলিশ ইউনিট এবং পুলিশের বাইরে দুদক, মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর ইত্যাদি সংস্থার সাথে একটা আপাতত গোলমেলে অবস্থার সৃষ্টি হতে পারে বলে অনেকে মনে করতে পারেন। কিন্তু একটু তলিয়ে দেখলে বোঝা যাবে, উপরি উল্লিখিত পুলিশ ও পুলিশ বহির্ভূত তদন্ত সংস্থাগুলো একই সাথে বেশ কিছু প্রকৃতির মামলা তদন্ত করতে পারলেও প্রত্যেকের কর্মপরিধি সুনির্দিষ্ট বিধিবিধান ও সরকারি বা বিভাগীয় আদেশ দ্বারা সুনির্দিষ্ট করা আছে। তাই কর্তব্য পালনের ক্ষেত্রে অধিক্ষেত্র সম্পর্কে সম্মক ধারণা না থাকলে আপাতত সমস্যা হতে পারে। কিন্তু বিষয়গুলো তাৎক্ষণিক সমাধানের পথও রয়েছে।

থানা পুলিশের মামলা তদন্তের ক্ষমতা অসীম। সামান্য কিছু ব্যতীক্রম ছাড়া থানা পুলিশ সব ধরনের মামলাই তদন্ত করতে পারে। ছিঁচকে চুরি থেকে শুরু করে বোমাবাজির মামলা পর্যন্ত থানার অফিসারদের তদন্ত করতে বাধা নেই। তার চেয়েও বড় কথা হচ্ছে, বাংলাদেশের ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থায় থানার বাইরে আদালত ভিন্ন অন্য কোথাও সরাসরি মামলা রুজু হওয়ার অবকাশ নেই। সর্বপ্রথম ঘটনাস্থলে উপস্থিত হওয়া, অপরাধের ঘটনাস্থল (ক্রাইমসিন) সংরক্ষণের দায়িত্ব থেকে শুরু করে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে আইন শৃঙ্খলা রক্ষা করার আসল দায়িত্বই হল থানা পুলিশের। তাই তদন্তের ক্ষেত্রে কতিপয় দায়িত্ব পিবিআইসহ অন্যান্য পুলিশ ইউনিটের কাছে হস্তান্তরিত হলেও থানা পুলিশের কাজের ভার লাঘব হওয়ার কোন সুযোগ নেই। বরং প্রতিনিয়ত নিত্য নতুন পরিস্থিতির উদ্ভব হওয়ার ফলে থানা পুলিশকে তদন্তের বাইরেও আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি মোকাবেলা করতেই বেশি ব্যস্ত হতে হবে। তাই বিপিআই এর মতো একটি বিশেষায়িত তদন্ত সংস্থা থানার পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ ও জটিল প্রকৃতির মামলাগুলোর তদন্তভার গ্রহণ করলে থানার কর্মক্ষমতা বাড়বে বৈ কমবে না।

কিছুটা অপ্রাসঙ্গিক হলেও বলা উচিৎ যে তদন্তের চূড়ান্ত লক্ষ অপরাধ প্রতিরোধ করা হলেও এটি একটি প্রতিক্রিয়াশীল পুলিশি কর্ম। তাই অপরাধ প্রতিরোধের মূল কাজটিই বর্তায় থানা পুলিশের উপর। অপরাধ প্রতিরোধের তাত্ত্বিক ধারণা বহুলাংশে পরিবর্তিত হয়েছে। তথাকথিত পেশাদারিত্বের যুগ শেষ করে বিশ্বপুলিশ এখন কমিউনিটি পুলিশিং এর যুগে প্রবেশ করেছে। কমিউনিটি পুলিশিং এর মূল কথাই হল, জনগণকে সাথে নিয়ে, জনগণকে ক্ষমতায়িত করে, জনগণের সমস্যারই সমাধান করা। অপরাধ নিয়ন্ত্রণ কর্মটি প্রতিরোধ কর্মকে অতিক্রম করে এখন সমস্যা সমাধানের স্তরে পৌঁছে গেছে। তাই জনগণকে সম্পৃক্ত করার মতো একটি বিশাল দায়িত্ব এখন থানা পুলিশের উপর পড়েছে। পিবিআই এর মতো একটি তদন্ত সংস্থা দায়িত্ব পালন শুরু করলে থানা পুলিশ কমিউনিটি কার্যক্রমে পর্যাপ্ত সময় ব্যয় করতে পারবে।

এখানে পুলিশের সিআইডির সাথে পিবিআইয়ের একটি বড় ধরনের অধিক্ষেত্রগত সমস্যা হতে পারে। কারণ উভয় ইউনিটের তফসিলে প্রায় একই ধরনের মামলার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু আইন ও বিধির নির্দেশগুলো অক্ষরে অক্ষরে পালন করে পেশাদারীত্ব নিয়ে কাজ করলে এতে সমস্যা হবার কথা নয়। নীতি অনুসারে থানা পুলিশ থেকে মামলা গ্রহণের ক্ষেত্রে অন্য যে কোন তদন্ত সংস্থার চেয়ে সিআইডিই প্রাধান্য পাবে। অধিকন্তু সিআইডি হল একটি উচ্চমাত্রার বিশেষায়িত তদন্ত সংস্থা। এর বিধিবদ্ধ দায়িত্ব মামলা তদন্তের বাইরেও বিস্তৃত। কিন্তু পিবিআই এর কর্মক্ষেত্র সে তুলনায় অনেকটাই সীমিত হবে।

পিআরবি এর বিধান মতে, সিআইডি তাদের সিডিউলভুক্ত মামলার তদন্তভার যে কোন স্তরেই গ্রহণ করতে পারে। বিষয়টি যদি থানা বা পিবিআই এর কর্মকর্তারা সব সময় মনে রাখেন এবং এসব নির্দেশকে ব্যক্তিগতভাবে না দেখে পেশাগতভাবে দেখেন, তবে সমস্যা তৈরির কোন কারণই নেই।

সিআইডি উচ্চতর তদন্ত, অপরাধ বিশ্লেষণ, অপরাধ তদন্তে বিশেষজ্ঞ সহায়তা ইত্যাদির মাধ্যমে একটি উচ্চ মার্গের প্রতিষ্ঠান হলেও পিবিআই সিআইডির চেয়ে অনেক বেশি তৃণমূলের তদন্তরী সংস্থা হবে। কারণ অদূর ভবিষ্যতে প্রত্যেক জেলাতেই পিবিআই এর অন্তত একজন করে এসপি পদমর্যাদার অফিসারসহ নিজস্ব অফিস ও লজিস্টিক থাকবে। তারা ঘটনা সম্পর্কে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করবে এবং ঘটনা ঘটার পূর্বেই তা প্রতিরোধ করতে পারবে কিংবা ঘটনা ঘটার অব্যবহিত পরেই ঘটনাস্থলে যেতে পারবে। আরো একটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, পিবিআই অফিসারগণ সাধারণভাবে ইউনিফর্ম পরিহিত অবস্থায় তাদের ডিউটি পালন করবেন। তাই তাদের অভিযান পরিচালনার ক্ষেত্রে একটি বাড়তি সুবিধা থাকবে এবং থানা পুলিশের সাহায্য ছাড়াই আসামী গ্রেফতার কিংবা তল্লাসি অভিযান চালাতে পারবে।

র‌্যাবের সাথে পিবিআইয়ের অধিক্ষেত্রগত সমস্যা হওয়ার সুযোগ সীমিত। কারণ পিবিআই আগাগোড়াই একটি তদন্ত সংস্থা। তাদের কাজের সুনির্দিষ্ট সিডিউল আছে। সিডিউল মতো তারা নিজেরাই স্বউদ্যোগে মামলা তদন্তের জন্য গ্রহণ করতে পারে। কিন্তু র‌্যাব মূলত একটি পাবলিক অর্ডার ম্যানেজমেন্ট ও প্রতিরোধাত্মক কর্মকাণ্ড পরিচালনাকারী পুলিশ ইউনিট। যদিও র‌্যাবের তদন্তের ক্ষমতা রয়েছে তবুও সেটা পিবিআই বা সিআইডির মতো অবারিত নয়। সুনির্দিষ্ট শ্রেণির মামলাগুলো শুধু সরকারের অনুমতিক্রমেই র‌্যাব তদন্ত করতে পারে। তাই র‌্যাব ও পিবিআই বা সিআইডির মাঝখানে রয়েছে খোদ সরকার যারা তদন্তজনিত যে কোন জটিলতায় চূড়ান্ত ফয়সালা দিতে পারে যা প্রত্যেকটি ইউনিটের জন্য অশ্য পালনীয়।

তবে এত কিছুর পরেও বলতে হয়, পিবিআই এর পথচলা কুসুমাস্তীর্ণ হবে না। কারণ, ভূক্তভোগীরা একটি বিকল্প চায়। এজন্য তৃণমূলের বিশেষায়িত সংস্থা হিসেবে তাদের উপর জনপ্রত্যাশা থাকবে মাত্রাতিরিক্ত। যদি থানা পুলিশ কিংবা অন্যান্য ইউনিটের তদন্তের চেয়ে বিপিআই এর তদন্ত মানসম্মত না হয়, তাহলে এর স্বার্থকতা থাকবে না। তাই পিবিআইয়ের এ যাত্রা যেন তদন্তে ভিন্ন মাত্রা যুক্ত করে এটাই আমাদের প্রত্যাশা। ( ৬ জানুয়ারি, ২০১৬ জুবা, দক্ষিণ সুদান)

সূত্র:
১. http://pbi.gov.bd/pbi_history.php
২.http://newagebd.net/151123/police-bureau-of-investigation-starts-functioning-after-3-years/
৩.http://www.dpp.gov.bd/upload_file/gazettes/15051_92000.pdf