ক্যাটেগরিঃ ভ্রমণ

 

নাইলের উৎস নিয়ে যত বিতর্ক
নাইলের সোর্স বা উৎসমুখ নিয়ে কালে কালে যে তর্কবিতর্ক চলে আসছে এবং যার সমাপ্তি এখনও ঘটেনি, অদূর ভবিষ্যতে তার সমাপ্তি আদৌ ঘটবে কিনা না তাও নিশ্চিত নয়, সে বিতর্ক সম্পর্কে এখানে কিছুটা আলোকপাত করা বাঞ্ছনীয় বলে মনে করি।

প্রথমে মনে করা হত, বর্তমান দক্ষিণ সুদানের বৃহত্তর আপার নাইল রাজ্যের বিশাল এলাকা নিয়ে গঠিত অগভীর জলাভূমিই হল নাইলের উৎস। এই অগভীর জলাভূমির নাম সাড বা সুড। সুড মানে হল বাঁধা। এই এলাকায় বিভিন্ন জলজ আগাছা, গাছগাছড়া বছরের পর বছর একত্রিত হয়ে এমন অবস্থার সৃষ্টি করেছে যে এ এলাকা সেই সময় মানুষের কাছে ছিল অগম্য এবং বর্তমানেও অনেকটা তাই। উত্তর দিক থেকে নৌকা পাড়ি দিয়ে কেউ সুড অতিক্রম করতে পারত না। এজন্যই মনে করা হত এ সুডই ব্লু নাইলের উৎসমুখ।

কিন্তু পরবর্তীতে ১৮৬২/৬৩ সালের দিকে ইংরেজ অভিযাত্রী জন হানিং স্পেইক ভিক্টোরিয়া হ্রদের পানি যে জলপ্রপাত তৈরি করে উত্তরগামী নদী তৈরি করেছে সেখান থেকে রওয়ানা দিয়ে ভাটিতে নৌকা চালিয়ে আসেন। জন স্পেইক ভিক্টোরিয়া হ্রদের এই জল প্রপাতের নাম দেন ‘রিপন ফলস’। কিন্তু ১৯৫৪ সালে উগান্ডার তৎকালীন ব্রিটিশ সরকার এখানে একটি পানি বিদ্যুৎ প্রকল্প করতে গিয়ে বাঁধ নির্মাণ করলে সেই রিপন ফলসের সলিল সমাধী ঘটে। তবে পরবর্তী অবস্থা যাই হোক, জন স্পেইক রিপন জলপ্রপাত থেকে শুরু করে উত্তর দিকে নদীর ভাটিতে ভ্রমণ করে সেই সুড পর্যন্ত এসে ঘোষণা করলেন যে সুডের যে পানি তা ভিক্টোরিয়া হ্রদ থেকেই আসে। এর এ জন্য ভিক্টোরিয়া হ্রদই হল নাইলের পানির উৎস। আর উগান্ডার এই জিনজার রিপন ফলসই নাইলের সূচনামুখ।

আমাদের নৌকার মাঝি পলের দাবি অনুসারে নাইলের উৎসমুখের ভূগর্ভস্থ ঝরনা থেকেই ৭০ শতাংশ পানি আসার তথ্যটির সপক্ষে তেমন কোন সমর্থনমূলক সাহিত্য এখনও দেখিনি। আমার মনে হয়, এটা হারিয়ে যাওয়া রিপন জলপ্রপাতেরই পানির তোড় যা ঘূর্ণাবর্তের মাধ্যমে এখনও তার অস্তিত্ব প্রমাণ করছে। তবে এটাও ঠিক যে পানিতে ডুবন্ত ঝরনার অস্তিত্বও ভুরি ভুরি রয়েছে। পাহাড়ের ছিদ্র দিয়ে যদি কোন পানি প্রবাহ বের হয় এবং সেটা পরবর্তীতে পানির নিচে তলিয়ে যায়, তবে সেটা তো আর বন্ধ হবে না। তাই মাটির নিচ থেকে পানি তো উঠতেই পারে। আমার মনে হয়, পলের দাবির পিছনে আরো একটি উদ্দেশ্য আছে, সেটা হল এ স্থান সম্পর্কে মানুষের মনে একটা অজানা আগ্রহ সৃষ্টি করা। যা অসম্ভব, যা অপরিচিত এবং যা প্রকৃতিতে ততোবেশি স্বাভাবিক নয়, তাই তো আমাদের আকর্ষণ করে।

ভিক্টোরিয়া কি আসলেই নাইলের পানির উৎস
নাইলের দুরতম উৎস নিয়ে বিতর্কের সমাপ্তি এখনো ঘটেনি। অভিযাত্রীদের মধ্যে অনেকে বলেন, ভিকটোরিয়া হ্রদ থেকে পানি এসে হোয়াইট লাইলের সৃষ্টি এটা না হয় বোঝা গেল। কিন্তু ভিকেটারিয়া হ্রদের পানি আসে কোথেকে? যদি শুধু বৃষ্টির পানি দিয়ের ভিক্টোরিয়া হ্রদ সারাক্ষণ ভরা থাকত হবে কোন বিতর্ক ছিল না। কিন্তু ভিকেটারিয়া লেইকের চারদিকে হাজার হাজার ছোট বড় নদী, জলপ্রপাত ঝরণা, ছড়া রয়েছে যেগুলো মাধ্যমে বৃষ্টির পানি ছাড়াও ভিকেটারিয়া হ্রদ পূর্ণ হচ্ছে। তাই নাইলের উৎস হয় সেইসব উজানের সব ঝরনা ধারা কিংবা এদের মধ্যে সবচেয়ে বড় নদীটি। সে অনুসারে তানজানিয়া থেকে আগত কাগেরা নদীটিই নাইলের দূরবর্তী উৎস হিসেবে ধরতে হয়। তবে এর বাইরেও বুরন্ডি ও রুয়ান্ডা থেকে উল্লেখযোগ্য দুটো নদী হ্রদ ভিকেটারিয়া পড়েছে। এমতাবস্থায়, হোয়াইট নাইল বা এক কথায় নাইলের একক কোন উৎস নেই।

এখানে আমরা তো কেবল নাইলের দুটো উপনদীর মধ্যে কেবল হোয়াইট নাইলের কথাই বলছি। তাই গোটা নাইলের উৎস খুঁজতে গেলে আমাদের আরো একটু ভাটিতে যেতে হবে। যদি আমরা মিশরের আলেকজান্দ্রিয়া, যেখানে নাইল তার জলসম্পদ ভূমধ্য সাগরের কাছে সমর্পণ করছে, থেকে উজানে আসতে থাকি তবে দেখব সুদানের খার্তুম শহরের কাছে নাইল নদী, দুই ভাগে বিভক্ত হয়েছে। এর একটি চলে গেছে কিছুটা পূর্ব-দক্ষিণে ইথিওপিয়ার দিকে। এটার নাম হল ব্লু নাইল। এই ব্লু নাইলের উৎসস্থল হল ইথিওপিয়ার মালভূমিতে অবস্থিত তানা নামের হ্রদ থেকে।

অন্য একটি শাখা সোজা দক্ষিণ দিকে চলে গেছে দক্ষিণ সুদানের মধ্য দিয়ে উগান্ডার দিকে। এর নামই বল হোয়াইট নাইল। আমরা যে উৎসের কথা বলছি তা কিন্তু এই হোয়াইট নাইলেরই উৎস।

নাইলের উৎসমুখে গান্ধির চিতাভস্ম
নাইলের উৎসমুখ জিনজার গেলে আরও একটি দৃশ্য আপনার চোখে পড়বে। অনুচ্চ পাহাড় থেকে নদীতে নেমে নৌকায় চড়ার পূর্বেই ডানদিকে চোখে পড়বে একটি সাইনবোর্ড এতে লেখা আছে মহাত্মা গান্ধির চিতাভস্ম বিসর্জনের স্থান। আমরা উৎস থেকে ফিরে চলে এলাম মহাত্মা গান্ধির চিতাভস্ম বিসর্জনের স্থানে।

১৯৪৮ সলের ৩০ জানুয়ারিতে একজন উগ্রবাদি হিন্দু তরুণ নাথুরাম গডসের গুলিতে প্রাণ হারান ভারতের অহিংস আন্দোলন ও স্বাধীনতার স্থপতি মোহনদাশ করমচাঁদ গান্ধি। তার মরদেহ দাহ করে চিতাভস্মগুলো তার ইচ্ছা অনুসারে তার ভারতের সকল বড় বড় নদী ঝরনা জলাশয়ে ছড়িয়ে দেয়া হয়। একই সাথে গান্ধির মতবাদের বিশ্বজনীনতা দিতে কিছু চিত্রাভস্ম চলে যায় সারা বিশ্বের বড় বড় নদী যেমন নাইল, ভলগা, দানিয়ুব এমনকি লজ এঞ্জেলেস এর বিখ্যাত হ্রদের জলেও। সেই ১৯৪৮ সালেই গান্ধির চিত্রাভস্ম নাইলের উৎসমুখ জিনজার বিসর্জন দেয়া হয়। তখন নাইলের উৎসমূখে রিপন জলপ্রপাত স্বগৌরবে বহমান ছিল। ১৯৭৯ সালে উগান্ডায় বসবাসকারী ভারতীয় জনগোষ্ঠী এই স্থানে গান্ধির একটি আবক্ষমুর্তি তৈরি করে।

আফ্রিকার কালো মানুষগুলোর মুক্তি ও স্বাধীনতার আন্দোলনের সূচনা পর্বে মহাত্মা গান্ধির অবদান প্রভূত। তিনি এক পারসিক ব্যবসায়ীর কোম্পানীর আইনজীবী হিসেবে যৌবনের শুরুতেই আগমন করেছিলেন দক্ষিণ আফ্রিকায়। সে সময় তিনি প্রথমে দক্ষিণ আফ্রিকায় বসবাসকারী এশিয়ান/ভারতীয় নাগরিকদের প্রতি সাদা চামড়ার ইউরোপিয়ান শাসকদের অত্যাচার ও অবিচারের প্রতিবাদ শুরু করেন। প্রথমে প্রতিবাদ শুরু করেন ব্যক্তিগতভাবে। পরে তা সামাজিক চরিত্রলাভ করে। ক্রমন্বয়ে ভারতীয় জনগোষ্ঠীর প্রতিবাদ গোটা অস্বেতাঙ্গ সমাজে ছড়িয়ে পড়ে। সাদা চামড়ার শাসকরা কালো চামড়ার শোষিত শ্রেণির কাছে শেষ পর্যন্ত আত্মসমর্পণ করে। কিন্তু সেটা ছিল সাদাদের বিরুদ্ধে কালোদের প্রাথমিক বিজয়। আফ্রিকার অন্যান্য অংশের মানুষগুলো নিজেদের দেশ নিজেদের মতো করে নিজেদের দ্বারা শাসন করার সুযোগ পেলেও মহাত্মা গান্ধির গান্ধি হয়ে ওঠার ক্ষেত্রভূমি খোদ দক্ষিণ আফ্রিকাতেই বর্ণবাদী শাসন ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত অব্যহত ছিল। এখানে সংখ্যালঘু সাদা চামড়ার লোকজন সংখ্যাগুরু কালো চামড়ার লোকগুলোকে শুধু শাসনভার থেকেই বঞ্চিত করেনি, তাদের সাথে গরু-ছাগলসম ব্যবহার করত। সর্বশেষ নেলসন ম্যান্ডেলার দীর্ঘ সংগ্রামের ফলে ১৯৯৪ সালে দক্ষিণ আফ্রিকাতে কালোদের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সেখানে এখন গণতান্ত্রিক ধারায় সাদাকালোরা মিলে নিজেদের শাসন করছেন। তারপরেও সাদা চামড়ার মানুষগুলোর অমানবিক বঞ্চনার বিরুদ্ধে এখন আন্দোলন অব্যহত রয়েছে।

দক্ষিণ আফ্রিকায় এশিয়ানদের ন্যায্য দাবি প্রতিষ্ঠিত করে গান্ধি ভারতে প্রত্যাবর্তন করেন এবং তার অহিংস আন্দোলনের নীতি গোটা ভারত বর্ষে ছড়িয়ে দেন। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতৃত্ব তাই তার হাতে এসে পড়ে এবং তার অনুসৃত নীতি অহিংসার মাধ্যমেই ভারত ১৯৪৭ সালে ব্রিটেনের হাত থেকে স্বাধীনতা লাভ করে।

কিন্তু ভারত-পাকিন্তান বিভক্তিতে সমস্যার সম্পূর্ণ সমাধান হয়নি। ভূখণ্ড ভাগ হওয়ার ফলে মানুষ থেকে শুরু করে ধন-সম্পদ, পুলিশ, সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী সবই ভাগাভাগি হয়। কিন্তু ভারত পাকিস্তানকে তার ন্যায্য পাওনা দিতে গড়িমসি করে। তখন আবার এগিয়ে আসেন মহাত্মগান্ধি।

পাকিস্তানের ন্যায্য পরিশোধ করার জন্য তিনি ভারত সরকার ও নেতাদের নানাভাবে চাপ দিতে থাকেন। এজন্য তিনি আমরণ অনসনও শুরু করেন। এর ফলে ধর্মান্ধ কিছু হিন্দু তার উপর বিরক্ত ছিল। তারা তাকে হত্যা পরিকল্পনা করে। নাথুরাম গডসে নামে এক উগ্র তরুণ সম্মিলিত প্রাথর্না সভায় প্রার্থনার আড়ালে পিস্তলের গুলিতে গান্ধিকে হত্যা করে। নিরন্তর অত্যাচার, নির্যাতন ও শোষণে জড়িত ব্রিটিশ সরকার মহাত্মা গান্ধিকে রক্ষা করতে পারলেও স্বাধীন ভারত সরকার তাকে রক্ষা করতে পারেনি। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের প্রধানতম শত্রু হলেও মহাত্মা গান্ধিকে কোন ইংরেজ বা ব্রিটিশ হত্যা করতে সাহস করেনি। কিন্তু স্বাধীন ভারতের স্বজাতির মানুষই তাকে হত্যা করল।

আমরা গান্ধির চিতা ভস্ম বিসর্জনের স্থানে গিয়ে স্কুলের ইউনিফরম পরা ৩০/৪০ জন ছাত্রছাত্রীকে সোৎসাহে ছবি তুলতে দেখলাম। নাইলের উৎসমুখ দেখতে এসে তারা পৃথিবীর অহিংস আন্দোলনের পুরোধা মহাত্মাগান্ধি সম্পর্কেও প্রাথমিক জ্ঞান নিয়ে যাচ্ছে। তাই আফ্রিকার মহান নেতা নেলসন ম্যান্ডেলার পাশাপাশি ভারতের মহাত্মা গান্ধিকেও জানছে উগান্ডার শিশুরা। আমরা স্কুলের বাচ্চাদের সাথেও ছবি তুললাম।

হারিয়ে যাওয়া বুজাগালি জলপ্রপাত
প্রায় ঘন্টা খনিক ব্যয় করলাম নাইলের সোর্সে। এবার অঅমরা যাব অন্য কোন দর্শনীয় স্থানে। এখান থেকে কয়েক কিমি পশ্চিম উত্তর-পশ্চিম দিকে কাম্পালার দিকে যেতে পড়বে বুজাগালি জলপ্রপাত। খুবই আকর্ষনীয়। কিন্তু আমাদের ড্রাইভার কাম গাইড জন বলছিলেন, সেখানে কোন জলপ্রপাত নেই। আমরা ভাবলাম, হয়তো তার খরচ কমানো ও দ্রুত শেষ করার জন্যই জন এমন কথা বলছেন। তাই জনকে আমরা বুজাগালির দিকে গাড়ি চালাতে বাধ্য করলাম। কিন্তু সেখানে যে আসলেই এখন আর জলপ্রপাতের অস্তিত্ব নেই সেটা অর এক মজার গল্প।

প্রায় পড়ন্ত বিকালে আমরা বুজাগালিতে পৌঁছিলাম। আশেপাশের পরিত্যক্ত মদের দোকান ও ডাকবাংলোগুলো প্রমাণ করে এখানে এক সময় পর্যটকদের সরব আনাগোনা ছিল। এখানে জলপ্রপাতের মূল স্থানে নির্দিষ্ট ফি দিয়ে ঢুকতে হত। প্রতি জন ২০ হাজার শিলিং। আমি এখানে এসে আসল স্থানটি না দেখে ফিরে যেতে চাইলাম না। গোটা রাস্তা প্যাকপ্যাকা কাদায় ভর্তি আমার পরনে চামড়ার স্যান্ডেল। আমার সাথে কেউ যেতে চায় না। কারণ দ্বিবিধ- একই তো কাদা, তারপর আবার জল প্রপাতের স্থানে বাঁধ দিয়ে হয়েছে জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র। তাই অযথা ২০ হাজার শিলিং ব্যয় করে কি লাভ? শেষ পর্যন্ত আমার সাথে ইন্সপেক্টর জামিরুল যেতে রাজি হলেন। আমরা দুজন গেলাম। প্রথমে ভেবেছিলাম, কাছেই। কিন্তু হাঁটতে গিয়ে বুঝলাম, এটা আরো দূরে। কাদার রাস্তা দিয়ে হাঁটতে বড় কষ্ট হচ্ছিল।

নাইলের উৎসমুখের অনুরূপে এখানেও এক নৌকার মাঝি আমাদের দখল করে নিল। নদীর ধারে গিয়ে সে জানাল প্রতি জনের ২০ হাজার শিলিং করে আমাদের ৪০ হাজার শিলিং দিতে হবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত শেষে অর্ধেকে যেতে রাজি হল। আমরা নৌকায় উঠে সলিলে নিমজ্জিত জল প্রপাতের কাছে যেতে চাইলাম। নৌকার মাঝি আমাদের সেখানে না নিয়ে নিল নদীর ভাটিতে। ভেবেছিলাম, সে হয়তো বাঁধের কাছে নিবে। কিন্তু সামান্য দূর গিয়েই সে ফেরা জন্য নৌকো ঘুরাতে শুরু করল। সে বলল, অতদূরে যেতে হলে দ্বিগুণ ভাড়া দিতে হবে। ওর সাথে আর বাড়াবাড়ি করলাম না। কারণ সূর্য তখন অস্তগামী। আমাদের ফিরতে হবে।

বুজাগালি ফলসে নামার আগেই একটি জিপের বনেটের উপর একটি মজার দৃশ্য চোখে পড়ল। দুটো বৃহৎ সিং সহ একটি গরুর মাথার কঙ্কাল বনেটের উপর সুদৃশ্যভাবে স্থাপন করা হয়েছে। গাড়ি চালালে সামনের মানুষের কাছে মনে হবে একটি গরু একটা গোটা জিপ গাড়ি টেনে নিয়ে আসছে। আমরা নৌকায় ওঠার শুরুতেই এখানে ছবি ওঠালাম।

দ্রুত গাড়ির কাছে ফিরছিলাম। একটি বালকের সাথে দেখা হল। সে ধর্মে মুসলমান। তার বাবা একজন জেলে। সে স্কুলে যায়। আসতে আসতে তার সাথে গল্প হল। তার কাছ থেকে জানতে পারলাম, এই বুজাগালিতে মুসলমান আর খ্রিস্টানের সংখ্যা নাকি প্রায় সমান সমান। হাঁটতে হাঁটতে সে আমার কাছে একটি সোডা (এখানে কোকাকোলাকে সোডা বলে) খাওয়ার জন্য পাঁচ হাজার পাউন্ড চাইল। বুঝতে পারলাম, এ অঞ্চলের বাচ্চাকাচ্চাদের পর্যটকদের কাছ থেকে চেয়ে নেবার অভ্যাস আছে। তবে ছেলেটি আমার জন্য এমন কিছু করেনি যে তাকে কিছু টিপস দিব। আর সে ছাত্র হলেও সোডা খাওয়ার পয়সা চায়। যদি সে বই কেনার পয়সা চাইত, আমি হয়তো তা দিতাম। কিন্তু মদ খাওয়ার জন্য তো আর দান করতে পারি না। ছেলেটির সৌখিন ভিক্ষাবৃত্তি থেকে এটাও বুঝলাম যে বুজাগালি জলপ্রপাতের অদৃশ্য হয়ে যাওয়াটা তাদের জন্য কষ্টের কারণ হয়েছে। কেননা, জলপ্রপাত অদৃশ্য হওয়াতে পরিবেশের যে পরিবর্তন এসেছে তাতে এ অঞ্চলের মানুষের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। পর্যটন শিল্পের মাধ্যমে অর্জিত কাঁচা পয়সা আর নেই। তাই স্থানীয় মানুষ মৎস্য শিকারে নেমেছে।

বুজাগালি থেকে ফিরলাম সূর্য ডোবার পর। লাল মাটির পিচ্ছিল রাস্তায় চলতে গিয়ে আমাদের মাইক্রোবাসের চাকাই আটকে যাচ্ছিল। দক্ষ ড্রাইভার জন অতি কষ্টে গাড়িটিকে মাঝ রাস্তায় ধরে রাখার চেষ্টা করছেন। তবে সবচেয়ে বড় বিড়ম্বনার শিকার হলাম ইন্সপেকটর জামিরুল আর আমি। আমরা একটি হারিয়ে যাওয়া জল প্রপাতের সন্ধান করতে গিয়ে কেবল ত্রিশ হাজার শিলিংই হারাইনি, আমাদের স্যান্ডেলের সৌন্দর্যও হারিয়েছিলাম। দুই স্যঅন্ডেলের তলায় এমনভাবে আঠাল মাটি আটকে আছে যে তা স্বল্প পানিতে পরিষ্কার করা সম্ভব হল না। অগত্য কাদাযুক্ত সেন্ডেল পরেই আমাদের বাসে উঠতে হল।

গোকে পরখ
ফেরার পথে অন্ধকার। তাই বাইরের দৃশ্য দেখার ঝামেলা নেই। তবে বাঁশের কাঠিতে ফোঁড়া মুরগীর মাংসের স্বাদ নেবার সাধ তখনও যায়নি। তাই ড্রাইভার জনকে বললাম সেই বাজারটিতে দাঁড়াতে। অল্প পরেই আমরা সেখানে গেলাম। বরাবরের মতো গাড়ি থামতেই ডজন খানেক খাবারের ফেরিওয়ালা জড়ো হল। কিন্তু আমরা উৎসাহী ছিলাম শুধু মুরগীর রানের ব্যাপারে। তবে খাশীর কলিজার কাবাবও একই কায়দায় বিক্রয় হচ্ছে। দুপুরের পঁচিশ হাজার শিলিং এর বস্তু এবার মাত্র পাঁচ হাজার শিলিং এই মিলল। পরিচ্ছন্নতার বালাই ঝেড়ে খেতে শুরু করলাম। হ্যাঁ, চমৎকার বটে! এর নাম হল ‘গোকে’।

কাম্পালায় রাতে
এবার ক্যাম্পালা শহরে । রাজধানী শহর হলেও ঢাকার মতো আকাশচুম্বী, অট্রালিকার দারুন অভাব এখানে। আমাদের কুটনৈতিক জোনের মধ্য দিয়ে আনা হল। কিন্তু আমাদের গুলশান বারিধারার মতো উন্নয়নের কোন ধারাই এখানে চোখে পড়ল না। আবারও মনে হল, সেই ভোডা ভোডা চালক ছেলেটির কথা যে আমাকে বলেছিল বাংলাদেশ একটি অতি দরিদ্র দেশ। মনে মেনে ভাবলাম, তোরা নিজেদের উন্নত ভাবলেও আমাদের ইঁট-কাঠ-পাথরের কোন কারুকাজই তোমাদের খোদ রাজধানীতেই নেই। এন্টেবেতে তোদের রাষ্ট্রপতির বাসভরনও আমরা দেখেছি। ওটা আমাদের একটি জেলা শহরের সরকারি ডাক বাংলোর চেয়ে উত্তম নয়।

অনুপম মজুদারের উঞ্চ আতিথ্য
আমরা গেলাম জনাব অনুপম মজুমদারের ক্যম্পালার বাসায়। একটি বড়সড় বাসা নিয়ে এখানে ব্রাকের প্রায় সকল আন্তর্জাতিক কর্মকর্তাই থাকেন। একজন জার্মানও জুটেছে তাদের সাথে। ডাল-ভাতের চমৎকার রান্না! মাছের সাথে মুরগী আর খাশি। রান্নার কারিগর একজন উগান্ডার ছোকরা। সে এখানে দারোয়ানগিরির সাথে রান্না বান্নার কাজও করে। আমাদের ব্র্যাক কর্তারা সেই উগান্ডিকে এমন কোচিং দিয়েছেন যে তার হাতের রান্না যে কোন বাঙালি বাবুর্চির হাতের রান্নার মতোই সুস্বাদু হয়েছে।

খেতে খেতে চলল, গল্প গুজব আর ইন্টারনেটে যোগাযোগের কাজ। যারা ইতোপূর্বে পরিবারের সাথে যোগাযোগ করতে পারেননি তারা অনুপমের বাসায় ভিওআইপিতে কথা বললেন। আর মুহূর্তেই মধ্যেই আমাদের কাম্পালা ভ্রমণের ছবিগুলিও ছড়িয়ে গেল ফেইসবুকে।

ফেরার পথে আমার কর্দমাক্ত সেন্ডেল জোড়া ভুলে অনুপম মজুমদারের বাসায় রেখে এলাম। ১০/১৫ মিনিট গাড়ি চালানোর পর স্যান্ডেলের কথা মনে পড়ল। পায়ের দিকে তাকিয়ে দেখি আমি অনুপম মজুদারের দরোজায় রাখা চপ্পলই পরে আছি। সবাই বিরক্ত হলেও আবার ফিরতে হল অনুপমের বাসায়। কাদামাখা বলে ওগুলো বাইরে রেখে চপ্পল পরে ভিতরে ঢুকেছিলাম। কিন্তু ভুলো মনে তা ফেলে এসেছি। গভীর রাতে হোটেল ফিরলাম। আগামীকাল সকাল সাড়ে চারটার মধ্যেই ঘুম থেকে উঠে দক্ষিণ সুদানের জুবায় যাবার জন্য এনটেবে বিমান বন্দরে ইউএন এর ফ্লাইট ধরতে হবে।

Episode-14