ক্যাটেগরিঃ চিন্তা-দর্শন

 

বিষয়টির সুত্রপাত অষ্টম জাতীয় বেতন স্কেল কে কেন্দ্র করেই। সরকার স্বউদ্যোগে সরকারি কর্মচারীদের বেতন ভাতা বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছিল। এ জন্য একটি কমিশনও গঠন করা হয়েছিল। কমিশনের প্রতিবেদন পাওয়ার পর চলে যাচাই বাছাই। চলে ঘাটতি-বাড়তির কূটচাল। কেবিনেট কমিটি, সচিব কমিটি আরো অনেক কিছু। এটা অবশ্য নতুন কিছু নয়। যে কোন কমিশনের প্রতিবেদন সরকারের কাছে বাধ্যতামূলক নয়। সরকার সেটা বাস্তবতার নিরিখে যাচাইবাছাই করেই বাস্তবায়ন করে। বিগত পে কমিশনগুলোর প্রতিবেদনের ক্ষেত্রেও একই প্রক্রিয়া চলেছিল। পরিবর্তিত পেস্কেল গ্রহণের সরকারি ঘোষণার পরেও এর গেজেট প্রকাশে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় অনেক সময় নেয়। পেস্কেল ঘোষণার পূর্বেই এর কতিপয় নীতি নিয়ে পেশাজীবীদের মনে সন্দেহ ছিল, সংশয় ছিল। এ সংশয়ে যোগ দিয়েছিলেন সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকগণও। তারা সরকারের উপর মহলে তাদের আসঙ্কার কথা আনুষ্ঠানিকভাবে দেখা-সাক্ষাতের মধ্য দিয়েও জানিয়েছিলেন। পেশাজীবী ও বিসিএস(প্রশাসন) ক্যাডার বহির্ভূত একটি সংগঠন তো প্রথম থেকেই বেশ কিছু বিষয়ের বিরোধিতা করে আসছিল।

কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক কিংবা প্রকৃচির মতো পেশাজীবী সংগঠন কোনটির কাছেই প্রকাশিত গেজেট সন্তোষজনক বলে মনে হয়নি। তাই বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো সরকারের স্বউদ্যোগে প্রকাশিত বেতনস্কেল নিয়ে যেন সবচেয়ে বেশিই আলোচনা সমালোচনা হচ্ছে।

পেস্কেল নিয়ে পেশাজীবীদের এ অসন্তোষের খবর পত্রিকাগুলোর বর্তমান সময়ে প্রধান শিরোনামগুলো দখল করে নিয়েছে। সরকারও যে এ অসন্তোষের বিপরীতে ক্ষুব্ধ পত্রিকায় প্রকাশিত খবরগুলো পর্যালোচনা করলেই তা বোঝা যায়।

অসন্তুষ্ট সরকারি কর্মকর্তা কর্মচারীদের বিবৃতি, পত্রিকায় লিখিত কলাম আর বিভিন্ন মাধ্যমে প্রকাশিত মতামতগুলো পর্যালোচনা করলে বুদ্ধিমান মানুষই অনুমান করতে পারেন যে বিক্ষুব্ধদের সকল রাগ, ক্ষোভ, অভিযোগ আর দোষারোপ কোন না কোনভাবে বিসিএস(প্রশাসন)ক্যাডারসহ বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় প্রশাসনের নিয়ন্ত্রকদের উপরই পড়ছে। টাইমস্কেলের অনুপস্থিতিতে স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরের স্কেলে পদোন্নতির খবর যে পত্রিকার খবরে বলা হয়েছে বিক্ষুব্ধরা মনে করেন, একমাত্র প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাগণ ছাড়া অন্যরা পাবেন না। তাই তারা পূর্বের টাইমস্কেল, সিলেকশন গ্রেড ইত্যাদিরই পূনর্বহাল চান।

বিষয়টি খুব সম্ভব এত বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়াত না যদি সম্প্রতিক কালে প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের পদ না থাকা সত্ত্বেও পদোন্নতি দেয়া না হত।

প্রত্যক পেশাজীবীদের আসঙ্কা, যদি পদোন্নতি ভিন্ন পরের গ্রেডে তারা যেতে না পারেন, তাহলে তাদের অনেকেই (যেমন ডাক্তার, কৃষিবিদ ইত্যাদি ক্যাডার) হয়তো চাকরি জীবনের শেষ দিনেও পরবর্তী স্কেল বা গ্রেডে যেতে পারবেন না।

তাদের আশঙ্কা হল, বিগত দিনের মতোই পদ না থাকা সত্ত্বেও পদোন্নতি নিয়ে প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তারা ঠিকই পরবর্তী গ্রেডে চলে যাবেন। আর একই সাথে সরকারি চাকরিতে প্রবেশ করা ডাক্তার কিংবা কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা পদ না থাকায় পূর্বের স্কেলেই পড়ে থাকবেন। এতে প্রতি বছর বেতন বৃদ্ধির ফলে তাদের বেতন হয়তো পরের গ্রেড অতিক্রম করবে কিন্তু বাস্তবে তারা পরের গ্রেডের কর্মকর্তাদের প্রাপ্য সম্মান কিংবা সুবিধা কোন কিছুই পাবেন না।

সবচেয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের বিষয়টি। বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকগণ পেস্কেলে সচিবদের নিচে নেমে গেছেন বলে মনে করছেন। বিষয়টি নিয়ে তারা পূর্বেও উদ্বিগ্ন ছিলেন। কিন্তু স্কেলের গেজেট প্রকাশের পর তারা রীতিমত কুপিত হয়েছেন। আর যেহেতু তারা পৃথক আইনের বলে সরকারের সমালোচনা করা থেকে শুরু করে পত্রিকায় রীতিমত কলাম লেখার অধিকার ভোগ করেন, এবং তাদের সহজাত লেখালেখির ক্ষমতাও আছে, তাই তাদের বিষয়টি সহজেই সামনে এসেছে। তারা বিক্ষোভ করছেন, কর্মবিরতি বা ধর্মঘট করছেন এবং একই গতিতে পত্রিকায় কলাম লিখছেন।

বেশ কয়েক মাস ধরে যাছাইবাছাই করা, বিভিন্ন কমিটিতে তা প্রতিপাদন করার জন্য বেশ কয়েক মাস সময় নেয়ার পরও ঘোষিত পেস্কেলের গেজেট অতি দ্রুতই সংশোধন করার জরুরতের বিষয়টি প্রমাণ করে যে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের যতটুকু দায়িত্বশীলতার পরিচয় দেয়া উচিৎ ছিল তা দেয় হয়নি, কিংবা সরকারের নীতি নির্ধারকগণ যে সব নির্দেশনা দিয়েছিলেন বাস্তবের কাজের সাথে সম্পর্কিত ব্যক্তিগণ তা অক্ষরে অক্ষরে পালনে ব্যর্থ হয়েছেন। পত্রিকার খবরে অবশ্য সামান্য কয়েকজন উচ্চ পদস্থ আমলাকে জড়িয়েও খবর প্রকাশিত হচ্ছে যে তারা স্বয়ং সরকার প্রধানের সুস্পষ্ঠ নির্দেশনাও বিকৃত করেছেন।

সাধারণত সরকারি কর্মকর্তা কর্মচারীগণ নতুন পেস্কেলের জন্য সরকারের কাছে দেন দরবার করেন, স্মারক লিপি দেন, আন্দোলন করেন, বিক্ষোভ করেন এবং আল্টিমেটাম দিয়ে ধর্মঘটও করেন। এসব কিছু করার পরও ক্ষমতাসীন সরকার তাদের বেতন বাড়াতে চান না। অথচ বর্তমান সরকার সরকারি কর্মচারীদের জন্য স্বউদ্যোগে বেতন বাড়িয়েছে। আবার একই সাথে এটাও সঠিক যে সরকারি কর্মচারীদের বেতন যতটা বাড়ানো হয়েছে, সরকারি কর্মচারীদের প্রত্যাশা হয়তো তার চেয়ে অনেক কম ছিল। এটা বাংলাদেশের ইতিহাসেই কেবল নয়, আমাদের মতো উন্নয়নশীল বা মধ্যম আয়ের দেশগুলোর জন্য নিঃসন্দেহে একটি ব্যতিক্রমী ঘটনা। এজন্য স্বাভাবিক প্রত্যাশা হল, সরকার সরকারি কর্মচারীদের অকুণ্ঠ শ্রদ্ধা, ভালবাসা, প্রণোদনা পাবে।

কিন্তু বিষয়টি হয়েছে তার উল্টো। পূর্বে সরকারি কর্মচারীগণ না পেয়ে আন্দোলন করত, এবার তারা পেয়েই আন্দোলন করছে। এই যে আন্দোলনের ধরনে দ্বিসমকৌণিক পরিবর্তন, সেটা যে যেকোন সরকারের নীতি নির্ধারকদের ক্ষুব্ধ করবে—এই তো স্বাভাবিক।

তাই উদ্ভূত পরিস্থিতিকে হালকাভাবে নেয়া উচিৎ হবে না। যা স্বাভাবিক তার সমাধানও স্বাভাবিক নিয়মে হয়। কিন্তু অস্বাভাবিক বা ব্যতীক্রমী বিষয়গুলোর সমাধান অত স্বাভাবিক নিয়মে আসে না। তাই বৃত্তের বাইরে গিয়ে সবাইকে চিন্তা করতে হবে। খুঁজে বের করতে হবে যে প্রাপ্তির পূর্বে তৃপ্ত সরকারি কর্মচারীদের কোন বিশেষ কারণটি বা কারণগুলো প্রাপ্তির পরে অসন্তুষ্ট করল? বিশুদ্ধ সরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে আধাসরকারি, স্বায়ত্বশাসিত, আধাস্বায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠানের কর্মচারগণও যখন সন্তুষ্ট হতে পারছেন না, তখন এর পিছনে অবশ্যই আমলযোগ্য কারণ রয়েছে। একই সাথে সকল পক্ষকেই পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধকে অক্ষুন্ন রেখেই দোষারোপ-পাল্টা দোষারোপের মতো মন্তব্যগুলো জনসম্মুখে ছেড়ে দেয়া উচিত। সবচেয়ে বড় কথা হল, সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মচারীদের যে কোন কর্মসূচি গ্রহণ কিংবা সরকারকে দোষারোপ করার পূর্বে সরকারের সদিচ্ছাকে মূল্যায়ন করতে হবে।
(১৩ জানুয়ারি, ২০১৬, ইউএন হাউজ, জুবা, দক্ষিণ সুদান)