ক্যাটেগরিঃ মানবাধিকার

 

বাংলাদেশ সরকারের সকল স্তরের মহিলা কর্মচারীগণ তাদের চাকরিজীবনে দুবার সন্তান প্রসককালীন মাতৃত্বছুটি পেয়ে থাকেন। পূর্বে এ ছুটি ছিল তিনমাস। পরবর্তীতে তা বৃদ্ধি করে করা হয়েছে ছয় মাস। তবে এ ছুটির সাথে অন্যান্য ছুটি আগে পিছে নিয়ে মাতৃত্বকালীন কর্মে অনুস্থিতির সময় প্রয়োজন মতো দীর্ঘায়িত করা যায়।

মানব কল্যাণের জন্য সপথ গ্রহণকৃত যে কোন সরকারকেই তার নাগরিকদের সর্বাধিক সুবিধা বা কল্যাণ নিশ্চিত করার জন্য সর্বদাই সচেতন থাকতে হয়। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশ সরকারও পিছিয়ে নেই। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করতে এসে আমি বহুদেশের সরকারি চাকরীজীবীদের সুযোগ সুবিধার খবর নিয়েছি, এক দেশের সাথে অন্যদেশের তুলনা করেছি। ব্যতীক্রম ছাড়া প্রায় সব দেশেই নারীদের মাতৃত্বকালীন ছুটির বিষয়টির উপস্থিতি লক্ষ করেছি।

যে দক্ষিণ সুদানে বর্তমানে কর্মরত আছি সে দেশেও কযেক বছর আগে এ ধরনের সুযোগ পর্যাপ্ত ছিল না। ২০০৮/০৯ সালে একই দেশে শান্তিরক্ষার কার্যক্রম চালাতে গিয়ে আমি ওয়াউ পুলিশ স্টেশনসহ আরো কয়েকটি পুলিশ পোস্টে মহিলা পুলিশ সদস্যদের প্রায় সদ্য প্রসূত সন্তানসহ অফিস করতে দেখেছি। সেই সময় খোঁজ নিয়ে জেনেছিলাম, যে তাদের দেশে মাতৃত্বকালীন ছুটির প্রচলন নেই। সেই ক্ষেত্রে বাংলাদেশ অনেক বেশি এগিয়ে বলে মনে করি।

বাংলাদেশের সরকারি কর্মচারীগণ প্রতি তিন বছর বছর পর পর চিত্তবিনোদন ছুটি পেয়ে থাকেন। তারা এক মাসের মূলবেতনের সমপরিমাণ ভাতাসহ ১৫ দিনের জন্য এ ছুটি পান। আমি মনে করি, চিত্ত বিনোদন ছুটির অনুরূপে মহিলা কর্মচারীদের মাতৃত্বকালীন ছুটির সাথে অন্তত তিন মাসের মূল বেতনের সমপরিমাণ মাতৃত্বভাতা দেয়া দরকার।

চিত্তবিনোদনের ছুটি ঘরে বসেও কাটান যায়। এজন্য কোন খরচ নাও লাগতে পারে। কিন্তু সন্তান জন্মদানকালীন অনেক খরচ হয়। প্রসূতির স্বাস্থ রক্ষা থেকে শুরু করে দর্শনার্থীদের আপ্যায়ন পর্যন্ত খরচের তো আগামাথা নেই। একই সাথে আছে হাসপাতাল বা ক্লিনিকের বিল কিংবা যদি মা ও শিশু অন্যকারণে অসুস্থ হয়ে পড়ে তার জন্য বাড়তি চিকিৎসা ব্যয়।

আমি মনে করি, একজন নারী সন্তান ধারণ ও প্রসব করে একই সাথে তিনটি দায়িত্ব পালন করেন। প্রথমত, তিনি একই সাথে অফিসের কাজ করেন যার জন্য তিনি বেতন-ভাতা পান। দ্বিতীয়ত, তিনি জনসংখ্যার ভারসাম্য বজায় রেখে জাতীয় অস্তিত্ব রক্ষার কাজ করেন। এর ফলে কোন জাতি তার সক্ষম জনশক্তির অভাবমুক্ত হয়। বিষয়টি আমাদের মতো অধীক জনসংখ্যার অধিকারী জাতিগুলো হয়তো তেমন সম্মকভাবে জনসংখ্যার ঘাটতি সমস্যা উপলব্ধি করতে পারবে না। কিন্তু ইউরোপ, আমেরিকা এমন কি সিংগাপুরের মতো এশীয় উন্নত রাষ্ট্রগুলো বহুদিন থেকেই হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছেন যে জনসংখ্যার আকাল তাদের জাতীয় অস্তিত্বকে কিভাবে তিলে তিলে বিপন্ন করে তুলছে। ঐসব দেশে জনসংখ্যার বৃদ্ধির হার ঋণাত্মক হ্ওয়ায় তারা অধীক সন্তানের জননীদের পুরস্কৃত করছেন। তাই সন্তান জন্মদানতার্য একটি জাতিকে তার নিজস্ব ভূখণ্ডে টিকিয়ে রাখার পূব শর্ত। আমাদের নারীগণ সেই শর্তটিই পূরণ করছেন। এতে অবশ্যই পুরুষদেরও ভূমিকা আছে। কিন্তু নারীর ভূমিকা সিংহভাগ।

তৃতীয়ত এবং সবেচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল, মেয়েরা সন্তান ধারণ, প্রসব ও তাদের লালন পালন করে কেবল রাষ্ট্রীয় কাজই করছেন না, তারা খোদ মানবজাতীকে টিকিয়ে রাখার মতো মহতী কাজটি করছেন। মানছি, মানব জাতিকে টিকিয়ে রাখার জন্য নারী পুরুষ উভয়েরই ভূমিকা স্বীকার্য। কিন্তু নারীপুরুষের মিলনে যে সন্তানের জন্মসূচনা হয়, তার বেড়ে ওঠার স্থানটি তো নারীদের জঠরেই। যে প্রক্রিয়ায় একটি মানব শিশুর জন্ম হয়, তার পূর্বকর্ম সংঘটিত হয় মানব মানবীর যৌন মিলনের ফলে। যৌন মিলনে প্রেম থাকতও পারে, নাও থাকতে পারে। এটা ধরে নেয়া ভাল যে মানবমানবীর প্রেমের ফসল হচ্ছে এ পৃথিবীর তাবৎ জনগোষ্ঠী। কিন্তু এই প্রেম বা যৌন মিলনের সিংহাভাগই তো প্রাকৃতিক তাড়না। এর সাথে মাতৃত্ব কিংবা পিতৃত্বের আবেগ বা আবেদন নাও থাকতে পারে।

আধুনিক কালে গর্ভধারণের ঝুঁকি ছাড়াই অবাধ যৌনমিলন সম্ভব। নারীর স্বাস্থের কোনরূপ ক্ষতি না করেই গর্ভের সন্তানকে অস্তিত্বহীন করা যায়। অধিকন্তু একটি সন্তান গর্ভে অস্তিত্বশীল হওয়ার পর তার পিতার কোন বাড়তি সংশ্রব বা পরিচর্যা অপরিহার্য নয়। এমতাবস্থায়, মানব জগতে সন্তানের পরবর্তী প্রজন্মে সহজ স্থান-দখল তো কেবল মা বা নারীটিরই একক কৃতীত্ব।

তাই আমি মনে করি সন্তানের জননীদের জন্য সভ্য মানুষকে বাড়তি সুযোগসুবিধা ও বাড়তি গুরুত্ব দেয়া বা সম্মান প্রদর্শন করা; বৃহত্তর অর্থে গোটা জগদ্বাসীর এবং সংকীর্ণ অর্থে রাষ্ট্রের নৈতিক দায়িত্ব। মাতৃত্বকালীন ছুটিরকে তাই নারী কর্মচারীদের জন্য সুবিধা নয়, অধিকার হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। এই অধিকার তিনি জন্মসূত্রেই লাভ করবেন। আর তাকে কিছু বাড়তি অর্থ দিয়ে পুরস্কৃত কিংবা উৎসাহিত করা হবে রাষ্ট্রের জন্য তাকে প্রদত্ব সুবিধা। ( ১৭ জানুয়ারি, ২০১৬; ইউএন হাউজ, জুবা, দক্ষিণ সুদান)