ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

সম্প্রতি পুলিশের কতিপয় বিপদগামী সদস্যের অপকর্মের বিষয়টি নিয়ে লিখছেন অনেকেই। এ লেখকদের মধ্যে যেমন পেশাদার কলামিস্ট রয়েছেন, তেমনি রয়েছেন অপেশাদার ও সৌখিন ব্লগারগণও; যেমন আছেন প্রাক্তন বিচারবিভাগীয় বিজ্ঞগণ তেমনি আছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকগণও। অবশ্য এর সাথে যে সাবেক ও বর্তমান পুলিশ কর্মকর্তারা যে একেবারে নেই তাও নয়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেইসবুক, টুইটার ইত্যাদির বদলৌতে এখন লেখাপড়া জানা ব্যক্তিমাত্রই তার মনের ভাব, নিজের মতামত, নিজের ভাল লাগা, মন্দলাগার অনুভূতিগুলো অন্যের কাছে সহজেই ছড়িয়ে দিতে পারেন। এ অর্থে পুলিশের অসদাচরণ নিয়ে শুধু যে বিজ্ঞতারাই বিদ্যা বিতরণ করেন তা নয়, এখন অক্ষরজ্ঞান সম্পন্ন মাত্রই পুলিশের পক্ষে-বিপক্ষে দুচার কথা ছড়াতে পারে।

পুলিশ একটি সুবৃহৎ পণ্যবস্তু। বিষয়টি আমি একাধিকবার বলেছি, লিখেছি এবং এর সপক্ষে বহু যুক্তিতর্ক তুলে ধরেছি। পুলিশ ছাড়া পত্রিকা চলে না, সিনেমার গল্প তৈরি হয় না, আটপৌরে আড্ডায় পূর্ণতা আসে না। পুলিশ সম্পর্কে যদি পত্রিকার বা প্রচার মাধ্যমে কোন খবর আইটেম না থাকে, সেই সখবর আইটের নিতান্তই পানসে হয়। তাই তো পুলিশের কর্ম-অপকর্ম নিয়ে যদি তাজা খবর না থাকে, শুরু হয় ফিকশন বা কল্পকাহিনী। ডার্টি হেরি থেকে শুরু করে রোবকপ পর্যন্ত পথের সবটাই আসলে পুলিশকে পণ্য করার লাভালাভের সৃজনশীলতা; সাহিত্য কিংবা প্রযুক্তির উৎকর্ষ।

পুলিশ মানেই অপরাধ, অপরাধ থাকলে তা নিয়ন্ত্রণ, তদন্ত কিংবা প্রতিরোধের প্রশ্নটি এসে যায়। কিন্তু অপরাধ প্রতিরোধ বা নিয়ন্ত্রণের জন্য আমরা যাই করি না কেন, অপরাধ নিজেই একটি উত্তম পণ্য বস্তু বা বিষয়। এ নিয়ে ইংল্যান্ডের অপরাধ-ঐতিহাসিকগণ বলেন:

We fear crime but we also gain a vicarious pleasure from it through television series films, crime and detective novels and through true-crime’ accounts. Not does interests stop at mere entertainment. Popular and professional studies on the police, the prison, criminals the criminal law, the sociology of crime and the history of crime abound. [1]

যাহোক, এবার আসল কথায় আসি। আমার অভজ্ঞতায় একটি বিষয় লক্ষ করেছি, পুলিশ আমাদের নাটক-সিনেমা, প্রবন্ধ-উপন্যাস, হাসি-ঠাট্টা, আটপৌরে আড্ডা কিংবা বিচার বিভাগের আলোচনা-নির্দেশনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকলেও পুলিশ সম্পর্কে সংশ্লিষ্টরা খুব কমই জানেন। এটা অবশ্য মানুষের, মানে পুলিশ নিয়ে যারা পঠন-পাঠন-লিখনে ব্যস্ত, তাদের দোষ নয়। এ দোষটা পুলিশের অভ্যন্তরীণ গঠনের উপরও বেশ নির্ভর করে। কারণ, পুলিশ একটি সংগঠন হিসেবে যেমন অতি ব্যাপক, তেমনি তার কাজের পরিধিও সীমাহীন। কোন কাজটা পুলিশের, কোন কাজটা পুলিশের নয়; কিংবা কোনটা পুলিশ করতে পারবে, কিংবা কোনটা তাদের করা উচিৎ নয় বা করতে পারে না, সেটা সাধারণ মানুষ কেন, পুলিশ সদস্যরা অনেক সময় নিজেই জানেন না। তাই তো ডেভিড বেইলি বলেছেন—পুলিশের ডান হাত নাকি তার বাম হাতকে চিনে না। আর আইনী আকবরিতে আবুল ফজল মুঘল আমলের একজন কোতয়ালের প্রত্যহিক কর্মের যে ফিরিস্তি তুলে ধরেছেন, সেটা দেখলে অতীতের পুলিশের কর্মভার আর বর্তমান পুলশের কাজের বিস্তৃতি সম্পর্কে সবার ধারণাই পাল্টে যাবে। তাই পুলিশ সম্পর্কে বিস্তারিত জানা চুনোপুটিদের জন্য অনেকটাই অসম্ভব। এটা অন্ধের হাতি দেখার মতোই আংশিক সত্য ও আংশিক মিথ্যার সংমিশ্রণ।

এবার আমাদের আলোচনাকে আরো সংক্ষিপ্ত পরিসরে নিতে চাই। বলতে চাই পুলিশের অসদাচরণ বা বেপরোয়া হওয়ার সাম্প্রতিক ঘটনাবলী ও সেগুলোকে নিয়ে চর্বনকারী লিখনিগুলো সম্পর্কে। বাংলাদেশ ব্যাংকের কমিউনিকেশন বিভাগের কর্মকর্তা গোলাম রাব্বী এখন অনেকটাই হিরো। কেন হিরো হলেন? আরে সেটাও তো পুলিশের বদলৌতেই। ডিপার্টমেন্টাল দারোগা মাসুদ যদি অতবেশি সেন্টিমেন্টাল না হতেন, তাহলে তো রাব্বীও হিরো হতেন না, দারোগা মাসুদও ভিলেন হতেন না। রাব্বীর ঘটনা এখন কেবল পুলিশের ডিসি কিংবা আইজিপির কাছেই নেই, এটা চলে গেছে মহামান্য হাইকোর্ট পর্যন্ত। এখন রাব্বীর দরখাস্তের প্রেক্ষিতে পুলিশকে নিয়মিত মামলা রুজু করে তা তদন্ত করত আদালতে প্রতিবেদন দিতে হবে। আর এ প্রতিবেদন যে একটি অভিযোগপত্রের মাধ্যমে শেষ হবে, তা সহজেই অনুমান করা যায়। তাই আমাদের এই হিরো গোলাম রাব্বী আরো বহুদিন পর্যন্ত ‘পুলিশি নির্যাতন’ নামের ফিচার ফিলমের হিরো হিসেবেই পত্রিকার হেডলাইনসহ কলামিস্টদের সম্পাদকীয়-উপসম্পাদকীয় কিংবা ব্লগারদের হালকা লেখনির খোরাক হয়েই থাকবেন।

এখন প্রশ্ন হল, পুলিশ কর্তৃক হয়রানির ঘটনা বাংলাদেশের জন্য অনন্য কোন ঘটনা কি না। আমাদের পুলিশের আচরণের সাথে কি পৃথিবীর অন্যকোন দেশের পুলিশের কোন মিল নেই? নিরীহ মানুষকে হয়রানি করা, সুযোগ মতো ঘুষ গ্রহণ, মানুষকে জিম্মী করে আখের গোছান, কিংবা ব্যক্তিগত প্রাচুর্য তৈরির ঘটনাকি অন্য দেশে ঘটে না? অবশ্যই ঘটে। তবে সেগুলো আমাদের অল্পদর্শী লেখক, কলামিস্ট, ব্লগার, প্রফেসার এমনকি জজ-বারিস্টারগণও জানেন না। আর জানবেই বা কিভাবে? এদেশে তো পুলিশিং সাহিত্য খুবই বিরল। পুলিশ নিয়ে এখানে কোন পড়াশোনা হয় না, কোন গবেষণা হয় না, এমনকি কোন বিদগ্ধ শিম্পোজিয়াম, সেমিনারও হয় না।

তাই প্রত্যেকেই একটি স্বল্প পরিসরে, নিজস্ব অভিজ্ঞতা থেকে কিংবা পত্রিকায় প্রকাশিত কতিপয় একপেশে ও ফলোআপ-বহির্ভূত প্রতিবেদনের উপরই নির্ভর করেন। এদেশে তো পুলিশ নিয়ে গবেষণা হয় না; যা হয় তাহল, খিস্তিখেউড়ের পশরা। যত বেশি খিস্তি দিবেন, আপনি তত বেশি বুদ্ধিজীবী হবেন, ততোবেশি বিদগ্ধ পণ্ডিত কিংবা জনপ্রিয় কলামিস্ট হবেন।

আমাদের লেখক-বুদ্ধিজীবী ও হাল আমলের ব্লগার-টুইটার-ফেইসবুকের স্টাটাস কিংবা লেখার কারিগরদের প্রতিষ্ঠিত ধারণা হল, বিদেশে, বিশেষ করে উন্নত দেশের পুলিশ মানেই হল ফিরিস্তা। ওরা কোন অপকর্ম করে না, কোন মানুষকে হয়রানি করে না, ঘুষ খায় না, দুর্নীতি করে না, মিথ্যা সাক্ষ্য দেয় না, জজ মিয়া তৈরি করে না, আব্দুল কাদের কিংবা গোলাম রাব্বী তৈরি করে না, টহল গাড়িতে ঢুল ঢুল করে না, এমন কি আমেরিকার-ব্রিটেনের পুলিশ সদস্যরা জীবনে কোন দিন ঘুমিয়েও দেখে না। তারা রোবকপের মতেই সতত ক্রিয়াশীল, সালর্ক হোমসের মতো সীমাহীন সৃজনশীল কিংবা বলিউডের বাজিরাও সিংগামের মতোই মস্তবড় বীর যারা লেজ হয়েও সমাজের গোটা শরীরটাই ঝাঁকি দিতে সক্ষম এবং তা বাস্তবে করেও থাকে।

এখানে আমাদের সময়.কম এর ২১/০১/২০১৬ তারিখের একটি কলামের প্রথম কয়েকটি লাইন আমি উদ্ধৃত করতে চাই। আমার এ নিবন্ধের শিরোনামে কিন্তু সেই লেখনির শিরোনামটিও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। লেখক ইকতেদার আহমেদ একজন প্রাক্তন জজ আর বর্তমানে রাজনৈতিক বিশ্লেষক। ‘এরা কেন বেপরোয়া?’ শিরোনামে তিনি লেখা শুরু করেছেন এভাবে:

‘ পৃথিবীর উন্নত ও সভ্য দেশসমূহে পুলিশকে বলা হয় জনগণের বন্ধু। এসব দেশে একজন সাধারণ ও নিরীহ নাগরিক পুলিশের হাতে নিষ্পেষিত, নিগৃহীত, লাঞ্ছিত, হয়রানি বা অপমানিত হয়েছেন এমন ঘটনা শোনাও যায় না, দেখাও যায়না খুব’।

পুলিশ নিয়ে, তাও আবার গোটা পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোর পুলিশ নিয়ে এমন সাধারণ মন্তব্যে মনে হবে, পুলিশ সম্পর্কে এ লেখকের গভীর পড়াশোনা আছে। তিনি তুলনামূলক পুলিশ-সাইন্সে হয়তো পিএইচডি না করলেও এমফিল করেছেন। তিনি কেবল শোনেননি, দেখেছেনও। তার বহুদিনের দেখা-শোনার পরের উপলব্ধি হল উপরের এই উক্তি যা দিয়ে তিনি তার নিবন্ধটি শুরু করেছেন।

কিন্তু আজকের এই তথ্যপ্রযুক্তির মহাসড়কটি কেবল তার জন্যই যে উন্মুক্ত তা কিন্তু নয়। এটা উন্মুক্ত সবার জন্যই। যে কেউ তার স্মার্ট ফোনের বাটনে কয়েকটি ক্লিক করেই তার জ্ঞানের স্থূলতা উস্টা(হোঁচট) খাবেন। পাঠক বন্ধুরা এ মুহূর্তে আমার এ লেখা পড়া স্থগিত রেখে চলে যান না গুগুল সার্চে লিখুন Police Misconduct, Police Brutality আরো সংক্ষিপ্ত আকারে কেবল উন্নত দেশগুলোর পুলিশের বর্ববরতা, নিষ্ঠুরতা সম্পর্কে জানতে লিখুন 25 Shocking Facts About the Epidemic of Police Brutality in America

Police Misconduct in America, Los Angeles, Britain, England, Queensland ইত্যাদি। দেখবেন সেসব ওয়েবপেইজে উন্নত দেশের পুলিশরা কি কি অপকর্ম করে?

যদি আপনি চোখে দেখতে চান, চলে যান ইউটিউবে। সার্চ করুন Rodney King
Police Brutality, Police Misconduct in Britain, America ইত্যাদি ইত্যাদি। আপনি দেখবেন উন্নত দেশের ফিরিস্তা পুলিশদের আচরণ আমাদের দেশের শয়তান পুলিশের চেয়ে কতটা উন্নত, কতটা মার্জিত ও কতটা গ্রহণযোগ্য।

পাঠকদের তথ্যপ্রযুক্তির মহাসড়কে বিচরণ শেষে আমার এ নিবন্ধে আমি কয়েকটি মাত্র উদাহরণ তুলে ধরব:

সচেতন পাঠকমাত্রই আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের লজএনজেলস নগর পুলিশের রুডনি কিং অপকর্মের কথা জানেন। ১৯৯১ সালে রুডনি কিং নামের একজন কৃঞ্চাঙ্গ তরুণকে শুধুমাত্র সিগনাল অমান্য করায় তাকে ধাওয়া করে ধরে স্বেতাঙ্গ-কৃঞ্চাঙ্গ পুলিশ মিলে কি ধরনের তাণ্ডব চালিয়েছিল তা এখুনি ইউটিউবে সার্চ দিয়ে দেখুন। কিন্তু সেদেশের বিচার ব্যবস্থাতেও কতটা গোলযোগ ছিল। অপরাধীগণ নিম্ন, মধ্য সব আদালতেই খালাস পেল। এই নিয়ে ছড়িয়ে পড়ল সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা। এই দাঙ্গার ফলাফল কি জানেন? এই দাঙ্গা স্থায়ী হয় ৫ দিন। মারা যায় ৪০ জন, আহত হয় ২,৩৮২ জন, গ্রেফতার করা হয় ৫,৬৩৩ জনকে এবং ধ্বংস করা হয় ৫,২০০টি বাড়িঘর/ইমারত কর্মহীন হয়ে পড়ে ৪০ হাজার মানুষ্ । আর আর্থিক ক্ষতি হয় প্রায় ১০০ কোটি টাকার বেশি[1]

এই তো সেদিন, আমাদের দেশের ছাত্র ইউনিয়নের কর্মীরা যখন ডিএমপির সদর দফতর ঘেরাও করতে গিয়ে পুলিশি অ্যাকশনের শিকার হল। একজন নারী কর্মীকে হেস্তনেস্ত করার জন্য জনৈক হাবিলদারের বারটা বাজল, সেই সময়ও আমেরিকার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের উপর সে দেশের পুলিশ কি বর্বর আচরণটাই না করল। আমাদের দেশের অশিক্ষিত পুলিশগুলো তো কেবল মেয়েদের চুলের মুঠিই ধরল, কিন্তু আমেরিকার পুলিশ মেয়েদের মাটিতে ফেলে রীতিমত লাঠিপেটা আর জুতাপেটাও করল।২০১৪ সালের অক্টোবরেও চিকাগো শহরের এক পুলিশ অফিসার ১৭ বছরের এক বালককে কিভাবে হত্যা করল তার ভিডিও তো সারা বিশ্বেই ছড়িয়ে পড়েছে।

আমাদের এখানে তো জাতিভেদ নেই, কালো আর ধলোয় পার্থক্য নেই। কিন্তু আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্রের পুলিশের বিরুদ্ধে হরহামেসাই কালোদের প্রতি নিষ্ঠুর হওয়ার অভিযোগ ওঠে, সেসব অভিযোগ আবার সত্যও হয়।

পুলিশি নির্যাতনের শিকার একজন আমেরিকান কৃঞ্চঙ্গ আইনজীবী একটি গবেষণা চালিয়ে দেখেছেন সেদেশের পুলিশ যাদের রাস্তায় গাড়ি থামিয়ে আটক, তল্লাশি করে কিংবা অন্যকোনভাবে হযরানি করে, তাদের মধ্যে শতকরা ৭৫ জন হল কালো চামড়ার। আর মজার ব্যাপার হল আমেরিকার রাস্তায় যারা গাড়ি চালান তাদের মধ্যে মাত্র শতকরা ১৭ জন কাল চামড়ার।

১৯৮২ সালের দিকে আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্রেল লজ এনজেলস পুলিশ ডিপার্টমেন্ট তার কমিশনার ডেরিল এফ. গেইটস এর নেতৃত্বে অভিযুক্তদের গলাটিপে ধরার মতো কৌশলে গ্রেফতার অবলম্বন করে। এ সময় মানুষের দম বন্ধ হয়ে প্রায় ১৬ জন মানুষ মারা যায় যাদের অধিকাংশই ছিল কালো চামড়ার। এ বিষয়ে এক সাক্ষাৎকারে পুলিশ প্রধান মন্তব্য করেছিলেন, কৃঞ্চাঙ্গদের শিরা-ধমনীগুলো সাধারণ আমেরিকানদের মতো নরম নয়। তাই এগুলো সহজে ফুলে ওঠে না।( পাতা-১৩৬)

এভাবে উদাহরণের পর উদাহরণ দিয়ে হয়তো কয়েক হাজার পাতার নিবন্ধ তৈরি করা যাবে। তাই আমি আর উদারহণে আপনাদের সময় হরণ করব না। তবে এ উদাহরণ থেকে পাঠকগণ সিদ্ধান্তে আসবেন না যে উন্নত দেশের পুলিশ সদস্যরা তাদের নাগরিকদের হয়রানি করে বলে আমাদের দেশের পুলিশকেও তা করার জন্য ছাড়পত্র দিতে হবে। ওরা করে জন্য আমরাও করব। ওরা মেনে নেয় জন্য আমরাও নিব এমন কথা আমি ঘুনাক্ষরেও বলব না। এ ক্ষেত্রে আমার অবস্থান হল, দুইয়ে দুইয়ে চার হলেও দুটো অপরাধকর্ম এক সাথে যোগ করলে একটি শুভকর্মের সৃষ্টি হয় না। অপকর্ম, অসদাচরণ, দুর্নীতি, হয়রানি – এসব কিছুই তাদের নিজদোষেই নিন্দনীয়, অগ্রহণযোগ্য ও পরিত্যাজ্য।

আমাদের সময়ের কলামিস্ট জনাব ইকতেদার আহমেদ তার লেখনির শিরোনামে পুলিশ বেপরোয়া কেন সে প্রশ্ন তুললেও তার উত্তরটুকু সঠিকভাবে দিতে পারেননি। অবশ্য তার উত্তরটুকু দিতে পারার কথাও নয়। কারণ, তিনি যেমন পুলিশ বিভাগে কর্মরত ছিলেন না, তেমনি পুলিশ সাইন্স নিয়ে পড়াশোনাও করেননি। পেশাগত জীবনেও তিনি পুলিশের বিচার নিয়ে ব্যস্ত থাকতে হয়ে, পুলিশের আচার নিয়ে নয়।

তবে এ নিবন্ধে ঐ বেপরোয়া আচরণের কিছুটা কারণ অনুসন্ধান করব। মানে অন্যরা করেছেন, আমরা সেটা জানব। আমেরিকার পুলিশ অফিসারগণ কেন মানুষকে হয়রানিতে প্রবৃত্ত হন, কেন তারা হরহামেশাই পত্রিকার শিরোনামে পরিণত হন তার একটি গবেষণালব্ধ ব্যাখ্যা দিয়েছেন মার্ক হলার(১৯৯২) নামের একজন গবেষক। উনবিংশ শতাব্দীর বিশের দশকে আমেরিকান পুলিশের অসদাচরণের তিনটি কারণ উল্লেখ করেছেন তিনি।

প্রথমত, সেই সময় পুলিশ সদস্যরা মনে করত যে কতিপয় অপরাধীকে শাস্তি দেয়ার জন্য জনগণ পুলিশকে ছাড়পত্র দিয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে ছোটখাট অপরাধে পুলিশ অভিযুক্তকে গ্রেফতার না করে তাকে ধরে আচ্ছাতারে জনতার সামনেই পিটুনি দিয়ে ছেড়ে দিত। এতে অভিযোগকারী তো বটেই উপস্থিত জনতাও পুলিশের কাজকে সঠিক বলে মনে করত। এ বিনা বিচারে শাস্তিদানের পুলিশি প্রক্রিয়াকে জনগণ প্রকাশ্যেই অনুমোদন দিত। একই ভাবে তারা বিচার বহির্ভূত হত্যাকেও শুধু অনুমোদনই নয়, এমনকি মহিমান্বিত করত।

পুলিশ-নৃশংসতার দ্বিতীয় কারণ হল, পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদের প্রাচীন ধরন। কোন অপরাধীর কাছ থেকে তথ্য প্রাপ্তী ও স্বীকারোক্তি প্রদানের জন্য পুলিশ মূলত অভিযুক্তকে শারীরিক নির্যাতন বা তথাকথিত তৃতীয় মাত্রার পদ্ধতিকেই একমাত্র পদ্ধতি বলে মনে করত। তাই পেশার খাতিরেও তারা গ্রেফতারকৃত ব্যক্তির প্রতি নৃশংস আচরণ করত।

পুলিশ নির্যাতনের তৃতীয় ও বড় কারণটি হল, পুলিশের অভ্যন্তরস্ত উপ-সংস্কৃতি বা পুলিশ সাবকালচার। পুলিশ সংগঠনের মধ্যে ক্ষমতার অপব্যবহার, উগ্রবাদিতা, পরষ্পর বিচ্ছিন্নতা ও পুলিশ-পাবলিক পারস্পরিক অবিশ্বাসের একটি বোধ রয়েছে। এ জন্য পুলিশ সদস্যরা তাদের নিজেদের অজান্তেই এবং অনেক সময় তাদের বড়ত্ব বা শক্তিমত্তা জাহিরের জন্যও অভিযুক্তদের উপর অযথাই বল প্রয়োগ করে থাকে।

মার্ক হলার পুলিশের নৃশংসতার পিছনের এ সব কারণ প্রায় একশত বছর পূর্বে বিরাজ করত বলে মনে করলেও এসব কারণ খোদ আমেরিকান সমাজে আজও বিরাজমান। আর আমি মনে করি, দেশ-কাল-পাত্রের ভিন্নতা সত্ত্বেও মার্কের দেয়া পুলিশ অসদাচরণের কারণগুলি আমাদের বাংলাদেশের সমাজেও বিরাজমান।

আমাদের আলোচনার শেষ পর্যায়ে আমরা বলতে চাই, পুলিশের অসদাচরণ কেবল আমাদের দেশের জন্যই অনন্য কোন ঘটনা নয়। যেখানে পুলিশ আছে সেখানে পুলিশি হয়রানির অভিযোগ থাকবেই। ‘পুলিশ যেমন সমাজের অপরাধ সমস্যাকে কোন দিনই সম্পূর্ণভাবে সমাধানে কৃতকার্য হবে না, তদ্রুপ পুলিশের অসদাচরণ কিংবা পুলিশের দুর্নীতির সমস্যাও মম্পূর্ণরূপে সমাধান করা সম্ভব হবে না। পুলিশ অফিসারদের ভূমিকা ও কার্যাবলী এমনই যে অফিসারদের সামনে অসদাচরণ ও দুর্নীতির করার অনুকূলে অসংখ্য সুযোগ তৈরি হয়। যত দিন পর্যন্ত এসব সুযোগ থাকবে তত দিন পর্যন্ত আমাদের পুলিশকে বিশুদ্ধ করার যাবতীয় সদিচ্ছা সত্ত্বেও পুলিশের অসদচারণ বা দুর্নীতি চলতেই থাকবে’।

তাই আমাদের দেখতে হবে এসব কারণ দূর করার জন্য আমরা কি জাতীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করি। সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে, কোন ঘটনাতেই পুলিশ কর্তৃপক্ষ সংশ্লিষ্ট অপকর্মকারী অফিসারদের ছাড় দেয়নি। অভিযোগ ওঠান সাথে সাথেই তাদের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেয়া হয়েছে, তাদের অভিযোগের অনুসন্ধানের জন্য উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তাদের নিয়োগ করা হয়েছে, কমিটি তৈরি করা হয়েছে। আবার মাঠ পর্যায়ের ইউনিটগুলোর নিজস্ব ব্যবস্থার বাইরেও খোদ আইজিপির নির্দেশনায় পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স থেকেও আলাদা তদন্ত কমিটি তৈরি করে প্রতিবেদন সংগ্রহ করা হয়েছে। কমিটিগুলোর তদন্তের প্রেক্ষিতে সংশ্লিষ্ট পুলিশ অফিসারদের সাময়িক বরখাস্ত করা থেকে শুরু করে তাদের বিরুদ্ধে নিয়মিত ফৌজদারি মামলা রুজু করে, তাদের গ্রেফতার করে, রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে, তাদের সাধারণ কয়েদিদের মতো জেলখানায় পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে। এর অর্থ হল, পুলিশ অসাদরচণের ঘটনায় পুলিশ নেতৃত্ব শূন্যসহনশীলতার নীতি গ্রহণ করেছে।

তবে এসব প্রতিক্রিয়াশীল বা ঘটনাতাড়িত ব্যবস্থা দিয়ে পুলিশ বাহিনীর সকল সদস্যকে মানবিক করে তোলা যাবে না। এর জন্য কিছু প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে, পুলিশের গোটা মূল্যবোধকেই পলটাতে হবে। কিন্তু সেটা কি পুলিশের একার পক্ষে সম্ভব? পুলিশ তো এ সমাজেরই সদস্য। গোট সমাজ যদি অসদচারণে নিমজ্জিত হয়, সমাজের মূল্যবোধে যদি গিরিখাদের মতো দৈর্ঘ-প্রস্ত বিস্তৃত ফাটল দেখা দেয়, সেই ফাটল থেকে শুধু কি পুলিশ সদস্যদের রক্ষা করা সম্ভব হবে?

লন্ডন মেট্রোপলিটন পুলিশের প্রাক্তন কমিশনার স্যার, রবার্ট মার্কের ভাষা, পুলিশ সমাজিক আচরণের উৎকৃষ্ট প্রতিফলন। সমাজ যদি উচ্ছৃঙ্খল হয়, পুলিশও উচ্ছৃঙ্খল হবে; সমাজ যদি দুর্নীতিগ্রস্ত হয়, পুলিশও দুর্নীতিগ্রস্ত হবে। অন্য দিকে সমাজ যদি সহনশীল, শিক্ষিত ও মানবিক আচরণে অভ্যস্ত হয়, পুলিশও একই রকম সহনশীল ও মানবিক আচরণে অভ্যস্ত হয়ে পড়বে।

(২১ জানুয়ারি, ২০১৬, ইউএন হাউজ, জুবা, দক্ষিণ সুদান)
রচনা সূত্রঃ

1. (John Briggs, et al:1996: Crime and Punishment in England: An Introductory History: UCL Press, Page-vii
Forces of Deviance: Understanding the Dark Side of Policing (Second Edition) 1998); Waveland Press Inc. Page-252
by Victor E. Kappeler (Author), Richard D. Sluder (Author), Geoffrey P. Alpert