ক্যাটেগরিঃ পাঠাগার

 
IMG_0048

অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের আত্মজীবনী ‘কাল নিরবধি’ পড়ছি। চমৎকার ভঙ্গির লেখা তার। আত্মজীবনী হলেও বইটির বড় অংশ ভাষা, সাহিত্য, ইতিহাস, রাজনীতি, সমাজ ও সংস্কৃতি নিয়েই। এখন পর্যন্ত ৩৩৪ পৃষ্ঠায় এসেছি। অবশ্য মাঝের কিছু পৃষ্ঠা ইতোপূর্বে বিছিন্নভাবে পড়েছিলাম।

আমার আবার এমন একটি অভ্যাস আছে। যখন কোন সুবৃহৎ কলেবরের বই পড়তে বসি, তখন এ বইয়ের ভিতরের কিছু পৃষ্ঠা বিচ্ছিন্নভাবে পড়ে ফেলি। এতে বইয়ের প্রথমের অবতরণিকায় যে গাঢ় কিংবা অনার্ষণীয় কথাগুলো থাকে, সেগুলোর প্রতি আকর্ষণ বাড়ে।

যা হোক, অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের বইতে আজকের প্রগতিশীলতার পথিকৃৎ ঢাকা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অতীতের প্রতিক্রিয়াশীলতার কিছু চিত্র পাওয়া যায়। প্রতিষ্ঠালগ্নে এ বিশ্ববিদ্যালয় বেশ কিছু প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হয়েছিল। কোলকাতা কেন্দ্রীক বুদ্ধিজীবীদের অনেকেই মনে করতেন, ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলে কোলকাতার গুরুত্ব কমে যাবে এবং ঢাকা কেন্দ্রীক জাতীয়তাবাদের সৃষ্টি হবে যা তাদের বঙ্গভঙ্গ রদের উদ্দেশ্যকে বিপন্ন করবে।। রবীন্দ্র নিন্দুকরা বলেন, আমাদের কবিশ্রেষ্ঠও নাকি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন। তবে ছাত্রজীবনে দৈনিক সংগ্রাম কিংবা দৈনিক ইনকিলাবে জনৈক কলামিস্টের কলামে ছাড়া আমি এর কোন বস্তুনিষ্ঠতা খুঁজে পাইনি। তবে যারা এ তথ্যে বিশ্বাস করেন, তাদের কাছে হয়তো তার প্রমাণ থাকতেও পারে। আমার রবীন্দ্রপীতির কারণে আমার ঢাকা বিশ্বদ্যালয়ের ঘনিষ্ঠতম সহপাঠীটিও রবীন্দ্রনাথের সেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে অবস্থানকে নিয়ে আমাকে টিটকারি করতে ছাড়ত না।

যা হোক, আমাদের ছাত্রজীবনেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে কম প্রতিক্রিয়াশীলতা লক্ষ করিনি। এমনকি ১৯৯১/৯২ সালেও একটি বড় বিতর্ক শুরু হয়েছিল। এটা ছিল সেই বহুল কথিত বিশ্ববিদ্যালয়ের সূর্যাস্ত আইন নিয়ে। আসলে এই নামে কোন আইনের অস্তিত্ব না থাকলেও আমাদের সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক ছাত্রীদের সন্ধা সাতটার মধ্যেই হলে প্রবেশের বাধ্যবাধকতার রীতিটিকে আমার সূর্যাস্ত আইন নাম দিয়েছিলাম। এই সময় আমাদের ছাত্রী বোনরা এ রীতির বিরুদ্ধে আন্দোলন করে। তারা চেয়েছিলেন, অন্তত রাত নয়টা কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরি যতক্ষণ খোলা থাকে ততোক্ষণ পর্যন্ত তাদের হলের বাইরে থাকার অনুমতি দেয়া হোক। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সেটা দিতে অস্বীকার করে। এর ফলে মেয়েরা আন্দোলনে নামে। এ নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক, অফিসার-কেরানি এমনকি ছাত্রীদের অভিভাবকগণ পর্যন্ত দুটো পক্ষে বিভক্ত হয়ে যান। বলাবাহুল্য, সেই সময় আমি এ রীতির বিরুদ্ধে ছিলাম। তবে আমার সহপাঠীদের অনেককেই মেয়েদের দাবিকে অগ্রাহ্য করতে দেখেছি। অনেকে এমনও মন্তব্য করত যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেয়েরা যদি রাতন নয়টা পর্যন্ত বাইরে থাকার সুযোগ পায়, তবে তারা এত বেশি অকামে জড়িয়ে পড়বে যে অনাকাঙ্খিত গর্ভধারণ পর্যন্ত হতে পারে। অনেক প্রতিক্রিয়াশীল ক্রিড়ণককে এমনও মন্তব্য করতে শুনেছি, এই নিয়ম রদ করা হলে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ যেন প্রত্যেকটি ছাত্রী হলের সাথে একটি করে নিরাপদ গর্ভপাতের জন্য বিশেষ ক্লিনিক খোলেন।

তবে প্রতিক্রিয়াশীলদের মুখে চুনকালি দিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তখন এ সূর্যাস্ত আইনকে অনেকটাই শিথীল করেছে। এখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীগণ সম্ভবত রাত নয়টা পর্যন্ত হলের বাইরে থাকতে পারে। আর প্রতিক্রিয়াশীলদের ভয়টাও অমূলক প্রমাণিত হয়েছে। রাত নয়টা পর্যন্ত হলের বাইরে থাকে বলে এখন পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীদের বিরুদ্ধে অনাকাঙিখত গর্ভধারণ কিংবা ক্যাম্পাসে রাত নয়টা পর্যন্ত অবস্থান, লাইব্রেরিতে পড়াশোন এমন কি বাইরে টিউশনি করে রাত নয়টার দিকে হলে ফেরার পথেও সম্ভ্রমহানীর মতো ঘটনায় নিপতিত হয়নি কিংবা তারাও কোন ঘটনার জন্ম দেননি।

যাহোক অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের ‘কাল নিরবধি’ পড়ে আমরা জানতে পারি যে ১৯৫৩ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে অনার্স প্রথম বর্ষে ভর্তি হওয়ার পূর্বে ‘শিক্ষকেরা ছাত্রীদের কমন রুম থেকে মেয়েদের সঙ্গে করে ক্লাসে নিয়ে আসতেন এবং ক্লাস শেষে আবার তাদের সেখানে পৌঁছে দিতেন’। তবে তাদের ‘সময়ে আর সে নিয়ম ছিল না, তবে ছাত্রীরা যথাসময়ে এসে করিডোরে দাঁড়িয়ে থাকতো, ক্লাসঘরে শিক্ষক প্রবেশ করার পরেই তারা সেখানে ঢুকতো এবং তাদের জন্য সামনের সারিতে একটা বেঞ্চি খালি রাখা হত’।

সেই সময়ও বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই ছাত্র-ছাত্রী এক সাথে কথা বলার মতো পরিবেশ ছিল না কিংবা আইন বা বিধিতে তা অনুমোদিত ছিল না। প্রক্টরের কাছে দরখাস্ত করে ‘এক সময়ে সুনির্দিষ্ট কারণ দেখিয়ে — প্রক্টরের উপস্থিতিতেই কেবল ছেলেমেয়ের বাক্যালাপ হতে পারত’। লেখকের ভাষায় সে নিয়ম ফাঁকি দেয়ার জন্যই হয়তো, দেখতে পেতাম, কোন ছাত্রী একটু আগে এবং একটু পেছনে কোন ছাত্র হাঁটতে হাঁটতে জীবনের লেনদেন করছেন’।

ঐ সময় সত্যিই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীগণ একে অপরের সাথে ক্লাসে কিংবা ক্লাসের বাইরেও তেমন বাক্য বিনিময়ও করতেন না। তাই যদি কোন ছাত্রী কোন ছাত্রের কাছে সময়ও জানতে চাইত, সেই ছাত্র কৃতার্থতায় গদগদ হয়ে যেত। লেখকের অভিজ্ঞতায়:

‘ আমাদের এক সহপাঠির কাছে সময় জানতে চেয়েছিল একটি মেয়ে। তাতেই সহপাঠী কেমন ঘোরের মধ্যে পড়ে গেল—রাফ খাতার অর্ধেকটা জুড়ে তার বিবৃতি আর জিজ্ঞাসা: পাখির নীড়ের মতো চোখ তুলে মেয়েটি কটা বাজে জিজ্ঞেস করলো’।

যাহোক, এসব কিছুই এখন ইতিহাসের বিষয়। কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই সময়ের প্রতিক্রিয়াশীলতা কেবল যে প্রশাসনকেই আবিষ্ট করেছিল তাও নয়। এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বনামধন্যদের মধ্যেও অনেকেই এই প্রতিক্রিয়াশীলতা শুধু অন্তরে লালনই করতেন না, তা রীতিমত অনুশীলনও করতেন। অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের ‘কাল নিরবধি’ ঠিক এমনি একটি হৃদয় বিদারক ঘটনার উল্লেখ করেছেন। অবশ্য ঘটনাটি সেই সময় হৃদয় বিদারক তো দূরের কথা, আলোচনার বস্তুও ছিল না। কিন্তু একজন তরুণ শিক্ষক হিসেবে এই ঘটনার সাথে লেখকের নামটি ভিন্নভাবে জড়িয়ে পড়ায় তিনি তখন বেশ মর্মাহত হয়েছিলেন। ঘটনাটি ঘটেছিল ১৯৫৯ সালের মাঝামাঝি সময়ে। কি সেই ঘটনা? লেখকের জবানিতেই শুনি:

অল্পদিন পর কোন শ্রেণীকক্ষে আমাদের বিভাগের এক অনুষ্ঠান হয়েছিল। তাতে মেয়েটি গেয়েছিল তখনকার জনপ্রিয় একটি গান, ‘ময়ূরকণ্ঠী রাতের নীলে/ আকাশে তারাদের ওই মিছিলে/তুমি-আমি আজ চলো ভেসে যাই/শুধু দুজনে মিলে’। সুরেলা কণ্ঠে গানটি সে ভালো গেয়েছিল, কিন্তু ওই গানের কথায় ও ভাবে প্রমাদ গণলেন বিভাগের অধ্যক্ষ। অনুষ্ঠানের শেষে শিক্ষকেরা যখন তাঁর অফিসকক্ষে জমায়েত হলাম, তখন তিনি উষ্মা প্রকাশ করে বললেন, ‘মেয়েটি কেমন—এমন একটা গান সে ছাত্র-শিক্ষকদের সামনে গাইতে পারল!’

পরবর্তী ঘটনাটি বেশ করুণ। তার (বিভাগীয় প্রধানের) ক্ষোভ শুধু মন্তব্য করেই প্রশমিত হলো না, ছাত্রীটিকে তিনি বাধ্য করলেন, ট্রান্সফার সার্টিফিকেট নিতে’। তার মানে, ছাত্রীটি শুধু এক অনুষ্ঠানে একটি প্রেমের গান গাওয়ার অপরাধে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কৃত হয়েছিল। বলাবাহুল্য, এই বিভাগীয় প্রধান বা অধ্যক্ষ ছিলেন বাংলা সাহিত্যর স্বনামধন্য অধ্যাপক, গবেষক ও লেখক মুহম্মদ আব্দুল হাই। আনিসুজ্জামানের ভাষায়, ‘সাহিত্যের অধ্যাপক হলেও মুহম্মদ আব্দুল হাইয়ের মধ্যে একটা প্রবল রক্ষণশীলতা ছিল। প্রেম ব্যাপারটাকে বোধ হয় তিনি একটা সামাজিক অপরাধ বলে গণ্য করতেন’।

আত্মজীবনী শুধু পাঠকদের জীবনীকারের আত্মা সম্পর্কেই জ্ঞানলাভে সহায়তা করে না, এটা এমন সব বিষয় পাঠকের সামনে তুলে ধরে যেগুলো কোন ইতিহাস বা সাহিত্য পুস্তকে পাওয়া যাবে না। আত্মজীবনী এমন সব ইতিহাস আমাদের কাছে তুলে ধরে সেগুলো ঐতিহাসিক বা ইতিহাসবেত্তাদের জন্য অতি নগণ্য। কিন্তু সমসাময়কি সমাজ ও রাষ্ট্রকে বোঝার জন্য এগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বিংশ শতাব্দীর পঁঞ্চাশের দশক আর একবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকের মধ্যে সময়ের ব্যবধান খুব বেশি নয়। কিন্তু এরই মাঝে আমাদের সমাজ, রাষ্ট্র ও সংস্কৃতিতে কত বেশি পরিবর্তন এসেছে তা ভাবলেও অবাক হতে হয়! ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সুরেলা কণ্ঠে গান গাওয়া সেই মেয়েটির মতো আমাদের বর্তমান সময়ে কোন ছাত্রী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কৃত হবে, এখন সেটা আমরা কল্পনাই করতে পারি না। সামাজিক ও সাংস্কৃতিকভাবে আজ আমরা এত বেশি অগ্রসর হয়েছি বহিষ্কৃত ঐ ছাত্রীকে আজ আমরা আমাদের অগ্রগতির আন্দোলনের বিরুদ্ধ শক্তির হাতে প্রথম নির্যাতিতা বলে শনাক্ত করতে পারি।

অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের ‘কাল নিরবধির’ এই ঘটনাটি আমরা ভিন্ন আঙ্গিকে ব্যাখ্যা করতে পারে। ঐ ছাত্রীটি সেই সময় যে ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছিলেন, আমরা ইচ্ছে করলে তা পুষিয়ে দেয়া কিংবা তাকে অগ্রগতির আন্দোলনের প্রথম শিকার হিসেবে তার ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থাও করতে পারি। এটা হতে পারে, তাকে খুঁজে বের করে তাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সম্মানজনক ডিগ্রি প্রদান করা, নয়তো অন্যূনপক্ষে তাকে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে একটি সংবর্ধনা দেয়া যেতে পারে। আর যদি তিনি জীবীত না থাকেন, তবে তার উত্তরাধীকারদের সংবর্ধিত করা যেতে পারে। পৃথিবীতে অনেকে নজির আছে যেখানে দেখা যায়, অনেক প্রতিষ্ঠান, এমনকি অনেক রাষ্ট্রও তার ইতোপূর্বে কৃত অপরাধ বা অপকের্মর জন্য ভুক্তভোগীদের কাছে আনুষ্ঠানিক ক্ষমা প্রার্থণা করেছে। এমনটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ও আমাদের বঙ্গবন্ধুর বাতিলকৃত ছাত্রত্ব ফেরত দিয়েছে। তাই আমাদের জোরপূর্বক ট্রান্সফার সার্টিফিকেট নিতে বাধ্য করা (যেটা অবশ্যই বহিষ্কারের সামিল) অগ্রজ সতীর্থ বোনটির জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কি কিছু্ই করতে পারে না? ( ২৫ জানুয়ারি, ২০১৬, ইউএন হাউজ, জুবা, দক্ষিণ সুদান)