ক্যাটেগরিঃ পাঠাগার

আমার কাছে ঔপন্যাসিক হিসেবে শওকত ওসমানের প্রথম পরিচয় ঘটেছিল ১৯৮৩/৮৪ সালে। তখন আমি নবম-দশম শ্রেণির ছাত্র ছিলাম। না তখন আমাদের পাঠ্যসূচিতে তার কোন উপন্যাস ছিল না। পাঠ্য হিসেবে ছিল কাজি ইমদাদুল হকের বিখ্যাত উপন্যাস ‘আব্দুল্লাহ’। এ বইয়ের শুরুতেই বাংল সাহিত্যের উপন্যাস শাখার ক্রম বিবর্তনের ইতিহাস দেয়া ছিল। সেই ইতিহাস পড়তে গিয়েই জেনেছিলাম শওকত ওসমানকে। সেই সময় তার ‘জননী’ ও ‘ক্রিতদাসের হাসি’ এ দুটো উপন্যাসের কথাই জেনেছিলাম কিংবা আমার মনে ছিল। এর পর ‘জননী’ উপন্যাস্যটি পড়েছিলাম সম্ভবত কলেজে উঠে। ‘ক্রিতদাসের হাসি’ পড়েছিলাম কিনা মনে নেই।

বহু বছর পর আবার শওকত ওসমানের লেখা পড়তে শরু করেছি। সাথে নিয়ে এসেছি শওকত ওসমানের উপন্যাস সমগ্রের দুটি খণ্ডই। ছোটভাই আশরাফুল আমার স্ত্রীকে এ বই দুটি উপহার দিয়েছিল ২০১১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে। উপহার বাণীতে সে লিখেছিল, ‘এই বইটি শুধু ভাবীর জন্য’। কিন্তু ওর ভাবী এটা পড়েছিল কিনা আমার জানা নেই। তবে মিশনে আসার সময় এটা আমি হস্তগত করেছি। এখন তা ধৈর্যসহকারে পড়ছি।

বণী আদম উপন্যাস টি শওকত ওসমানের প্রথম উপন্যাস হলেও ছাপা হয়েছে অনেক পরে। সম্ভবত তার প্রথম প্রকাশিত উপন্যাস ছিল ‘জননী’। তাই বণী আদমের কথা পাঠক আদমগণ অনেকেই ভুলে গেছেন। কিন্তু এটাও একটি চমৎকার উপন্যাস!উপন্যাসের কাহিনীর পটভূমি ১৯৩০ এর দশকের বাংলার সামাজিক জীবন। তবে এটা কোলকাতা ও তার পার্শ্ববর্তী গ্রামগুলোকেই চিত্রায়িত করেছে।

গল্পের নায়ক হারেস একজন এতিম যুবক। সে অবুঝ বয়সে তার মায়ের সাথে এসেছিল গ্রামের ধনাঢ্য ব্যক্তি সলিম মুন্সির বাড়িতে। তার বাবা ছিলেন তাঁতি বা জোলা। বাবার মৃত্যুর পর অসহায় মা মুন্সির বাড়িতে বান্দির কাজ করত। কিন্তু তারও একদিন মৃত্যু হয়। বালক হারেস ছিল হাবাগোবা। কিন্তু কাজে কর্ম সে মুন্সির কাছে ছিল বেশ গুরুত্বপূর্ণ ও বাধ্যগত। তার কাজে যেমন ছিল না অনীহা, তেমনি বঞ্চনা, লাঞ্ছনা আর শাস্তিতেও ছিল না কোন অভিযোগ। গ্রামের মানুষ তাকে নিয়ে হাসি-ঠাট্টা করত।

কিন্তু এই হারেসই একদিন হটাৎ বিদ্রোহী হয়ে ওঠে। সলিম মুন্সিকে সে বলে বসে, গত পনের বছর আপনার বাড়িতে কাজ করছি, তার মজুরি কোথায়? সলিম মুন্সি প্রমাদ গোনেন। এ নিয়ে কথা কাটাকাটি হয়। হারেস সলিম মুন্সিকে লাথি ঘুষি মেরে সাথের সামান্য সঞ্চয় নিয়ে বেরিয়ে পড়ে অজানার উদ্দেশ্যে। পথে আরিফ নামে এক যুবকের সাথে তার দেখা হয়। তার বাড়ির খবর সে নেয়। তার গ্রামের নাম ছিল সামগড়ে। এরপর সে শহরে চলে যায়। সেখানে এক রাজমিস্ত্রির আশ্রয়ে কাজ করতে শুরু করে। ধীরে ধীরে তার চোখ মুখ ফোটে । সে জগতকে ভিন্ন আঙ্গিকে দেখার সুযোগ পায়। শহরের বিভিন্ন পরিবেশ, বিভিন্ন চরিত্র, বিভিন্ন তলার জীবনাচার এখানেই সে দেখার সুযোগ পায়।

এরপর সে তার নতুন পরিচয় হওয়া বন্ধু আরিফের খোঁসে সামগড়ে যায়। আরিফের সাথে তার বন্ধুত্ব গাঢ থেকে গাঢতর হয়। আরিফ তাকে দাম্পত্য জীবনের স্বপ্ন দেখায়। এক সময় চাচীর আশ্রয়ে পলিত এতিম মেয়ে সোহাগকে সে বিয়ে করে। আরিফ আর হারেস গ্রামেই গড়ে তোলেন তাদের সুখের সংসার। কিন্তু হারেসের কর্মক্ষেত্র তখনও রয়ে যায় শহরে। সে শহর ও গ্রাম উভয় স্থানেই তার জীবীকার সন্ধান করে। ঘরে তার সন্তান আসে।

এরই মাঝে গ্রামে বন্যা দেখা দেয়। গ্রামকে রক্ষা করা বাঁধটি ভেঙ্গে যায়। ভেসে যায় তাদের সাধের সংসারের জমানো সবকিছু। তারা কোন রকম জীবন বাঁচায়। বন্যার পানি নেমে গেলে তারা আবার শুরু করে ঘর গোছান। এরপর হারেস চলে যায় শহরে জীবীকার সন্ধানে। এদিকে শুরু হয় গান্ধীর ভারত ছাড় আন্দোলন। এ আন্দোলনে যুক্ত হয় গ্রামের অনেক মানুষ যাদের মধ্যে জেলে, মজুর থেকে শুরু করে জমিদারগণও ছিল। কিন্তু পুলিশ সে আন্দোলন দমনের চেষ্টা করে। আরিফ ও হারেসের গ্রাম সামগড়েও হানা দেয় পুলিশ। তারা নির্বিচার নির্যাতন চালায়। গ্রামের মানুষ আশ্রয় নেয় দূরবর্তী গ্রামের বাঁধেরর উপর। এ সময় হারেস থাকে শহরে জীবীকার খোঁজে।

এরপর সে পরিবারের কাছে ফিরে আসে। কিন্তু গ্রামে কাউকে পায় না। অবশেষে সে তার বন্ধু আরিফসহ পরিবারের সবাইকে খুঁজে পায়। তাদের জীবনের ঐশ্বর্য না থাকলেও সুখ ফিরে আসে। আরিফ প্রস্তাব দেয় তারা গ্রামে ফিরে না গিয়ে শহরে চলে যাবে। কিন্তু হারেস শহরকে পছন্দ করে না। তার গ্রামই পছন্দ। এখানে জীবীবা সংগ্রহের তেমন কোন বিকল্প না থাকলেও এখানে আছে খোলা আকাশ, বিস্তীর্ণ মাঠ। এখানে সূর্যের আলো কিনতে হয় না। কিন্তু শহর বড় কৃপণ। এখানে সব কিছুই কিনতে হয়। তবে আরিফ তা মানতে নারাজ। যদিও তারা আপাতত সামগড়ে ফিরে যায়, তবুও আরিফের বিশ্বাস তাদের একদিন না একদিন শহরে যেতেই হবে। কারণ শহরে দুঃখ-কষ্ট থাকলেও তা নিবারণের নানাবিধ বিকল্প উপায় রয়েছে।

সাবলিল ভঙ্গিমায় বলা এই প্রান্তিক মানুষগুলোর সাদামাটা গল্পই শওকত ওসমানের শিল্পীর হাতে অসাধারণ হয়ে উঠেছে। এ উপন্যাস পড়ে পাঠক যেমন জানতে পারে নিম্নমধ্যবিত্ত শহুরে জীবনাভ্যস্ত মিহির আলীর পরিবারের কষ্টের কাহিনী, তেমনি জানতে পারে খান বাহাদুরের প্রাচুর্যে ভরা আধুনিক জীবনযাপনের কলুষিত কাহিনীও। পরহেজগার বলে পরিচিত খান বাহাদুর সাহেব রীতিমত নামাজও পড়েন, আবার ইংরেজি বইতে উলঙ্গ নারীদের ছবিও দেখেন। অন্যদিকে আধুনিক শহুরে জীবনের অবিচ্ছেদ্য অনুসঙ্গ পতিতালয়ের উপস্থিতি এ গল্পে রয়েছে। তবে লেখক তার সমাজের নিম্ন প্রান্তের নায়ককে এসব পঙ্কিলতা থেকে সচেতনভাবেই বাঁচিয়ে রেখেছেন। এটাই তার আদর্শ।

উপন্যাসটির কলেবর বেশ ছোট। স্বাভাবিক আকারের বইয়ে মাত্র ১০০ পৃষ্ঠার মতো। তবে এ উপন্যাসে বেশ কিছু শব্দ আমার কাছে অপরিচিত। কিছু কিছু শব্দ অপরিচিত হলেও পড়তে পড়তেই সেগুলো অর্থ বোঝা যায়। কিন্তু কিছু শব্দ সত্যিই আমার মতো পাঠকের কাছে অজানা থেকে যায়। এসব হতে পারে কালীক ও দৈশিক দূরত্ব এবং সেই সময়ের সুসলিম লেখকদের সচেতনভাবে আরবি-ফারসি শব্দ ব্যবহারের উদ্যোগের কারণে। আমি পড়তে পড়তে সব অপরিচিত শব্দের একটি তালিকা তৈরি করে ফেলেছি। হাতের কাছে বাংলা-বাংলা অভিধান নেই। তাই অর্থ জেনে নেতে পারছি না। কোন অজানা শব্দ ডিকশনারিতে দেখে তার ব্যবহারের বৈচিত্র্য ও উৎপত্তির ইতিহাস না জানলে আমার অবশ্য স্বস্তি আসে না। তাই এগুলো ইন্টারনেটে সার্চ দিয়ে খুঁজতে হবে, নয়তো দেশে গিয়ে বাংলা-বাংলা অভিধান ঘাঁটতে হবে। শব্দগুলো নিম্নরূপ:

শ্বনিচ্যত্ত, আবস্বামী, উর্ণায়ূ, রগড়, দরমা, হামেহাল, কেয়ারী, বাখারী, নেঘাবান, সারগাদা, চরাট, ভদ্রাসন, জয়ীফ, পৈঁচি, মুনিশ, কামিন, বাউরী, বেওয়া, আশনাই, আঞ্জির, ভিষগ, নধর, পয়মন্ত, চেড়ী, দ্বিরাগমন, বলীবর্দ, হাউড়ী, লোটান, জাকানদানী, ঢেউরী, স্তোক।

আরো একটি কথা এখানে প্রাসঙ্গিক। পুলিশিং ও পরাধ বিজ্ঞানের পাঠ নেয়ার পর থেকে আমি বিনোদনমূলক তেমন কোন বইই পড়ি না আজ প্রায় দশ বছর হল। এর মাঝে মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলার ইতিহাস নিয়ে কিছু পড়াশোনা করেছিলাম। কিন্তু উপন্যাস পড়া হয়ে ওঠেনি। বলা যায়, গত দশ বছরে শওকত ওসমানের ‘বণী আদমই’ হবে আমার একমাত্রা পড়া উপন্যাস। আশা করছি, সামনের এক মাসের মধ্যেই শওকত ওসমানের সব কয়টি উপন্যাস পড়ে শেষ করব। ( ২৭ জানুয়ারি, ২০১৬;ইউএন হাউজ, জুবা, দক্ষিণ সুদান