ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

driver
নিজে তেমন ভালভাবে গাড়ি চালাতে পারি না। ১৫ বছর আগে বাংলাদেশ লোক প্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের (বিপিএটিসি) প্রশিক্ষণ শেষে প্রাপ্ত ড্রাইভিং লাইসেন্সখানা শুরুতেই ছিল একটা বড়সড় বিড়ম্বনামাত্র। ঐ সময় প্রশিক্ষণ নেয়া সব অফিসারদের ড্রাইভিং লাইসেন্স দেয়া হয়েছিল। সাভারে হত প্রাথমিক পাঠ, মাঠ অনুশীলন ও তাত্ত্বিক পরীক্ষা । আর গাজীপুরের বিআরটিএর অফিসে হয়েছিল চূড়ান্ত মাঠ পরীক্ষা।

কিন্তু আমাদের পরীক্ষার ধরনটা এমনি ছিল যে সেটা বড়দের জন্য ‘ছোটদের গাড়ি গাড়ি খেলা’ বললেও ভুল হত না। পরীক্ষার শুরুতেই অনেক অফিসার গাড়ির স্টিয়ারিং ধরলেন। কযেকজন যেনতেন করে পাশও করলেন। এভাবে চলল কিছুক্ষণ। কিন্তু আমাদের বিসিএস(ট্যাক্স) ক্যাডারের শেলী আপা গাড়িতে চড়ে স্টিয়ারিং ধরে এক্সেলারেটরে দিলেন চাপ । আরে বাপরে বাপ! গাড়ি ‘ওয়াউউ’, ওয়াউউ’ শব্দ করে পরীক্ষণরত গাড়িখানা কাছেই একটি বেঞ্চিতে গিয়ে দিল বাড়ি। অমনি বেঞ্চিটা ছিটকে গিযে লাগল আমাদের তথ্য-সাধারণ ক্যাডারের আবু তৈয়বের হাঁটুতে। ও মাগো! বলে তৈয়বুদ্দিন বসে পড়ল। কিন্তু আঘাতটি যতই সামান্য হোক, আবু তৈয়বকে এ ক্ষত নিয়ে বিছানায় পড়ে থাকতে হয়েছিল প্রায় ছয় ছয়টি মাস।

এরপর আমাদের পোয়াবার। যারা পরীক্ষার পূর্বে ইয়া নফসি! ইয়া নফসি!! করছিলাম তাদেরসহ আর কাউকে ব্যাবহারির পরীক্ষার জন্য গাড়ির স্টিয়ারিং ধরতে হয়নি। সবাই বিনাপরীক্ষায় পাশ! তবে এখানে একটি কথা সবাই মেনে নিয়েছিলেন, আর যাই হোক, বিসিএস ক্যাডার অফিসার এরা। এদের হিতাহিত জ্ঞান আর নিরাপত্তাবোধ আছে। তাই এরা ব্যবহারিক পরীক্ষা না দিযে ড্রাইভিং পাশ করে লাইসেন্সের অধিকারী হলেও ঐতিহ্যবাহী হেলপার থেকে ড্রাইভার হওয়া পেশাদার ড্রাইভারদের মতো কোন বিপত্তি ঘটাবেন না। হ্যাঁ, আমরা কোন বিপত্তি ঘটাইনি। ২০০ অফিসারের মধ্যে কাউকেই এ যৎ সামান্য প্রশিক্ষণ নিয়ে পরবর্তীতে যথাযথ অনুশীলন না করে গাড়ি চালনা করে এ পর্যন্ত দুর্ঘটায় নিজের কিংবা অপরের জীবন বিপন্ন করতে শুনিনি।

কিন্তু তারপরও আমি নিজেই রযে গেছি অনেকটাই অপক্ক গাড়ি চালক। একা একা গাড়ি নিয়ে ফাঁকা রাস্তায় গাড়ি চালাতে আমার রাজ্যের আত্মবিশ্বাস। কিন্তু গলি-ঘুপছি, সরু রাস্তা, একটু বেশি ভিড় এসব স্থানে গাড়ি চালাতে নিজেকে বড় আত্মবিশ্বাসহীন বলে মনে করি।

জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে আসতে হলে পুলিশ অফিসারদের দুই পর্যায়ে গাড়ি চালনা পরীক্ষা দিতে হয়। প্রথমত পরীক্ষা হয় ঢাকায়। সেখানে আমাদের নিজেদের গাড়ি থাকে। কিন্তু পরীক্ষকগণ থাকেন বিদেশের, মানে কোন ফিল্ড মিশনের। ওখানে সরাসরি মাঠের পরীক্ষা হয়। প্রথমত পার্কিং, দ্বিতীয়ত রাস্তায়। আমাদের দেশের অনেক বাঘা বাঘা পুলিশ অফিসারগণও রাজ্যের ত্রুটি-বিচ্যূতির স্বাক্ষর রেখে এ পরীক্ষায় অকৃতকার্য হন।

মিশন এলাকায় এসে তারা আবার একটি পরীক্ষার মুখোমুখী হন। এটার অবশ্য হাল আমলে নাম দেয়া হয়েছে এসেসমেন্ট; টেস্ট নয়। যারা এখনও ড্রাইভিং লাইসেন্স পানি তাদের জন্য নেয়া হয় টেস্ট। আর এসেসমেন্ট হল, যারা ইতোমধ্যে ড্রাইভিং লাইসেন্স পেয়েছেন তাদের হাতে গাড়ি সমর্পণের পূর্বে তাদের দক্ষতার পুর্নমূল্যায়ন করা।

মিশন এলাকায় এসে এই মূল্যায়নে অন্যান্য দেশের অফিসারদের মতো আমাদের বাংলাদেশের পুলিশ অফিসারগণও গড় পড়তায় প্রথম দিন ডাব্বা মারেন। তবে অধিকাংশই দ্বিতীয়বারের মূল্যায়নে উৎরে যান। আর কিছু কিছু অফিসার আছেন, তারা তৃতীয়বার গিয়ে কোন রকম ইজ্জত রক্ষা করেন। আমি অবশ্য তৃতীয় দলে। বর্তমান মিশনে এসে আমি তৃতীয় মূল্যায়নে উৎরিয়েছি। তবে এর জন্য এর ওর কাছ থেকে গাড়ি নিয়ে বেশ কসরত করতে হয়েছে। ঐ যে বললাম, ফাঁকা স্থানে আমি রাজার হালে গাড়ি চালাতে পারি। কিন্তু জনাকীর্ণ স্থানেই বাঁধে সব ঝামেলা।আর পরীক্ষার কথা উঠলেই আমার দক্ষতায় ভাটা শুরু হয়।

ড্রাইভিং নিয়ে এত কথা বলার পিছনে একটি ঘটনা আছে। পাঠক বন্ধুরা, এবার সেই ঘটনাটাই বর্ণনা করি। গত ২৬ জানুয়ারি, ২০১৬ সালের পুলিশ সপ্তাহে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে দেশের ইতিহাসে প্রথম বারের মতো একজন নারী অফিসারের নেতৃত্বে উপভোগ্য এক প্যারেড উপহার দেয়া হযেছিল। এ নারী অফিসারটি ছিলেন আমারই ব্যাচমেইট সামসুন্নাহার যার প্যারেডসহ পুলিশের অন্যান্য ক্ষেত্রগুলোতে দক্ষতার মাত্রা প্রবাদতুল্য। বর্তমানে সামসুন্নাহার চাঁদপুর জেলার পুলিশ সুপার হিসেবে কর্মরত আছে। জেলার এসপি হিসেবে বর্তমানে যে দুজন নারী অফিসার সুনামের সাথে দায়িত্ব পালন করছেন, তাদের মধ্যে সামসুন্নাহার একজন। অন্যজন হলেন নরসিংদি জেলার পুলিশ সুপার জনাব আমেনা বেগম।

আমার সৌভাগ্য যে এ দুজন অফিসারের সাথেই আমার ব্যক্তিগতভাবে মেশার ও সরকারি দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা রয়েছে। আমেনা স্যার যখন ১৮শ বিসিএস এ পুলিশে যোগদান করে বাংলাদেশ লোকপ্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করছিলেন, আমি তখন বিসিএস-তথ্য সাধারণ ক্যাডারে ছিলাম এবং আমেনা স্যারের সাথে একই সেকশন-বি তে প্রশিক্ষণরত ছিলাম। আমাদের ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রাপ্তি সম্পর্কে লেখার শুরুতেই যে গল্প ফেঁদেছি, আমেনা বেগমও তার অন্যতম প্রতক্ষদর্শী।

দেশের প্রথম নারী অফিসার দিয়ে পুলিশ সপ্তাহের প্যারেড পরিচালনার বিষয়টি অবশ্যই পুলিশিং এর ইতিহাসে একটি মাইল ফলক। লেখা-পড়া, আইন-বিধি এবং প্রশাসনে দক্ষতা আমাদের অনেক নারী অফিসারই অর্জন করেছেন। বাংলাদেশের ইতিহাসে জনাব ফাতেমা বেগম প্রথম অতিরিক্ত আইজিপি এবং তা গ্রেড-১ ভুক্ত। তিনি বর্তমানে দেশের পুলিশিং জগতের সর্বোচ্চ এবং দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সর্ব প্রথম পুলিশ স্টাফ কলেজের কর্ণধার। এর বাইরেও অন্যান্য সব ক্ষেত্রেই নারী পুলিশ অফিসারগণ পুরুষ পুলিশ সদস্যদের পাশাপাশি এমনকি অগ্রগামী হয়েও দায়িত্ব পালন করছেন। তাই বাংলাদেশ পুলিশ নারী-পুরুষের ক্ষেত্রে সংখ্যাসাম্য সৃষ্টি করতে না পারলেও দক্ষতার সাম্য প্রতিষ্ঠায় অনেক দূর এগিয়েছে।

কিন্তু নারীদের দক্ষতার কথা যখন বলি, তখন আমরা যেন শুধু সিনিয়র অফিসারদের কথাই বলি। অথচ বাংলাদেশ পুলিশের সকল স্তরেই নারী সদস্যরা যে যোগ্যতা ও দক্ষতার স্বাক্ষর রেখে চলেছে সেটা আলাদা আলাদাভাবে আমরা কখনই বলি না। এটা যেন বড় গাছের নিচে ছোট গাছের অদৃশ্য হওয়ার মতোই অবস্থা। কিন্তু গাছ যত ছোটই হোক, তারও যে উপকারিতা, উপযোগিতা ও স্বকীতা রয়েছে সেটা তো ভুললে চলবে না।

আমাদের সামসুন্নাহার পুলিশ সপ্তাহের ইতিহাসে দেশের প্রথম নারী কমান্ডার হিসেবে প্যারেড পরিচালনা করেছেন। এটা আমরা টিভির পর্দায় সরাসরি দেখেছি, পত্রিকায় তার ছবি দেখেছি কিংবা সোসাল মিডিয়ায় তার ভূয়সী প্রশংসাও শুনেছি। আমি নিজেও সামসুন্নারকে নিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে তার ছবি আমার ফেইসবুকের পাতায় শেয়ার করে স্টাটাসে গর্বমুগ্ধতা প্রকাশ করেছি।

কিন্তু সামসুন্নাহার প্যারেড পরিচালনা করলেও সামসুন্নাহারকে যে পরিচালনা না করলেও চালনা করেছেন আর একজন নারী পুলিশ সদস্য সেটা কি আমরা লক্ষ করেছি? কিংবা লক্ষ করলেও তাকে নিয়ে কি দুচার কথা বলা, দুচারটি পত্রিকায় ছবি দিযে ক্যাপসন দেয়া ইত্যাদির কোনটাও করেছি? না, সেটা আসলে করা হয়নি। কারণ ঐ আগেই বলেছি, বড় গাছের ছায়ায় ছোটগাছ অদৃশ্য না হলেও তার অস্তিত্ব আমাদের নজরে পড়ে না। তাই একই গর্বিত ঘটনা ও ইতিহাসের অংশ হয়েও এই নারী গাড়িচালকটি অনেকটাই অনুলেখ্য থেকে গেল।

কে এই নারী গাড়ি চালক যিনি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর মুখ থেকেই প্রশংসাবাক্য শ্রবণ করেছেন? হ্যাঁ, ইনি হলেন, পুলিশ কনস্টেবল মিতা বিশ্বাস। ঝিনাইদহ জেলার মদন মোহন বিশ্বাস ও অঞ্জলি রানীর মেয়ে হল মিতা। ২০০৭ সালে পুলিশবাহিনীতে কনস্টেবল হিসেবে যোগ দেন তিনি। ২০০৯ সালে ডিএমপির ট্রান্সপোর্ট শাখায় তার স্থায়ী পোস্টিং হয়। ওই সময় ঢাকা মহানগর পুলিশের ১৫ জন নারী কনস্টেবলকে গাড়ি চালানোর প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। পরে ১৪ জনই পদোন্নতি পেয়ে অন্য বিভাগে চলে যান। মিতা একাই গাড়িচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন। তিনি ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারের দায়িত্বে থাকা আর একজন নারী পুলিশ অফিসার উপপুলিশ কমিশনার ফরিদা ইয়াসমিনের গাড়ির ড্রাইভার।

এ গল্পের শুরুতেই গাড়ি চালনা সম্পর্কে আমার নিজের যে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও বাংলাদেশ পুলিশের ঊর্ধ্বতন পুলিশ অফিসারদের গাড়ি চালনায় দক্ষতার সংকট নিয়ে যে সব কথা বলেছি সেটা মিতার গাড়ি চালনার দক্ষতাকে বর্ণনা করার জন্যই। আমার ভাবতে অবাক লাগে! অনেক দক্ষ পুলিশ অফিসার গাড়ি চালনার জন্য দক্ষ হলেও পরীক্ষায় অবতীর্ণ হওয়ার সময় গোটা শরীর নিয়েই কাঁপতে থাকেন। ১৯৯৯ সাল হতে এক খানা ড্রাইভিং লাইসেন্সের মালিক হয়েও আমার মতো অফিসারগণ মিশনের গাড়ি চালনার দক্ষতা মূল্যায়নে প্রথমবার, দ্বিতীয়বার ডাব্বা মারেন। কিন্তু এই কনস্টেবল মিতা গাড়ি চালনায় কতটা পারদর্শী হলে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে গাড়ি চালিয়ে তার দক্ষতার মূল্যায়নটুকু সমাপ্ত করে?

সাবাশ মিতা! আপনি শুধু পুলিশ সপ্তাহের প্যারেডে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকেই বহন করনি, আপনি গাড়িতে বহন করেছেন গোটা পুলিশ বাহিনীর দক্ষতা এবং গোটা বাংলাদেশের নারী অগ্রগতির পতাকাকেও।

একই সাথে বাংলাদেশের বর্তমান পুলিশ নেতৃত্বকে নিয়ে গর্ব না করেও কি উপায় আছে? তারা নিজেদের যোগ্যতা, দক্ষতাকে নানা মাত্রায় প্রদর্শন করতে উদ্যোগী হয়েছেন। তার শুধু তাদের পুরুষ সদ্যদেরই চৌকশ করে তোলেননি, প্রায় পৌনে দুই লাখ পুলিশ সদস্যের মধ্য থেকে তারা তারা সম্ভাবনাময়ী নারীদেরও খুঁজে বের করেছেন, তাদের যথাযথভাবে দক্ষ করে গড়ে তুলেছেন এবং সেই দক্ষতা জাতির সামনে উপস্থাপনও করেছেন। এ সব কিছুই বাংলাদেশ পুলিশ-নেতৃত্বের উৎকর্ষের পরিচায়ক। আমাদের পুলিশ নেতৃত্ব এখন আর হেঁটে হেঁটে, পা পা করে নয়; রীতিমত দৌড়াতে শিখেছে। (৩০ জানুয়ারি, ২০১৬; ইউএন হাউজ, জুবা, দক্ষিণ সুদান)