ক্যাটেগরিঃ পাঠাগার

 

স্বাধীতার আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের উপর বই পড়া আমার যেন একটা নেশায় পরিণত হয়েছে। যতই পড়ি, ততই পড়ার তৃঞ্চা বেড়ে যাচ্ছে। তার সাথে এটাও মনে হচেছ এ সম্পর্কে যতটুকু জানা দরকার, তার চেয়ে খুবই কমই জানি। মরুভূমিতে দুচার ফোটা জল পড়লে যেমন তপ্ত বালিরাশি মুহূর্তেই শোষণ করে বালির তাপ আরো বাড়িয়ে দেয়, মুক্তিযুদ্ধের বইগুলো পড়ে আমার অনুভূতি ঠিক তেমনিই হচ্ছে।

দক্ষিণ সুদানে আসার সময় বেশ কিছু বই সাথে নিয়ে এসেছিলাম। মুক্তিযুদ্ধের উপর হাতের কাছে থাকা অপঠিত যেসব পুস্তক ছিল তা সাথে নিয়েছিলাম আগেই। কিন্তু আসার দু একদিন আগে প্রধানমন্ত্রীর দফতরের সামনে গাড়ি জামে পড়লে এক হকার বেশি কিছু বই জানালা দিযে বাড়িয়ে দিল। এগুলোর মধ্যে ইংরেজিতে লেখা দুই তিনটি বই বেছে নিলাম। তিনশ/চারশ পৃষ্ঠার এক একটি বই সে একশত টাকার কম দামেও দিতে রাজি হল। ধন্যবাদ, আমাদের পুস্তক প্রকাশনার চৌর্যবৃত্তিকে। কপিরাইটের অধিকারকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়ে এসব বই পাইরাইটদের কবলে না পড়লে কি এত অল্প দামে পাওয়া যেত? বাংলাদেশে পাইরাইটেট বইয়ের একটা বড় ব্যবসা রয়েছে। আজ যদি দেশে বা বিদেশে একটি বই বের হয়, আগামীকাল যদি তা বেস্ট সেলারের তালিকায় নাম লেখাতে পারে, তবে পরশুদিনই আপনি ঢাকার রাস্তায় সেই বইয়ের অবিকল প্রতিলিপি পেয়ে যাবেন। তবে প্রিন্টের ধরন, কাগজের মানসহ গেটআপ-সেটআপ দেখে যে কেউ সহজেই বুঝতে পারবেন যে এটা সেই আসল বইয়ের প্রতিরূপ হলেও আসল জায়গা থেকে আসেনি।

এটা বুঝতে যারা পারেন না, কিন্তু বই কিনতে চান, তারা বইয়ের গুণে নয়, ক্রেতার বিবেচনায় ঠকেন। আপনি যে দামেই বলবেন, ওরা সেই দামেই দিবে। তাই পাঁচশ রুপির বই আপনি একশ টাকাতে পাবেন, একশ পাউন্ডের বই আপনি দেড়শ টাকাতেই কিনতে পারবেন।

এই পাইরাইটেট কাজটি বেআইনী, অন্যায়। এতে আসল বইয়ের লেখক, প্রকাশক, বিপণনকারী সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কিন্তু এই মুহূর্তে আমি এ সম্পর্কে নীতিবোধের ধারক হতে পারিনি। আর সত্য কথা বলতে কি আমি জ্ঞানার্জনের ক্ষেত্রে চৌর্যবৃত্তিকে শুধু প্রশ্রয়ই নয়, এর সহযোগী হতেও রাজি আছি।

যাহোক সেই বইগুলোর মধ্যে একটি ছিল Liberation Bangladesh-1971। মেজর জেনারেল ধ্রুব সি কাতচ ও লে.কর্নেল কাজি সাজ্জাত আলি জহিরের সম্পাদিত এ বইটি আমাদের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী বীর যোদ্ধাদের অভিজ্ঞতা বা পরিচালিত যুদ্ধের কাহিনী।

২৮৭ পৃষ্ঠার বইটি। এতে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী বাংলাদেশি ও ভারতীয় যোদ্ধাদের যুদ্ধের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করা হয়েছে। বইটিতে ৪০ জনেরও বেশি যোদ্ধা তাদের অভিজ্ঞতার কাহিনী বর্ণনা করেছেন। তবে অধিকাংশ লেখকই ভারতীয় সশস্ত্রবাহিনীর সাবেক সদস্য।

আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাস পড়তে গিয়ে আমাদের সামনে কেবল দেশি যোদ্ধাদের বীরত্বের বা অভিজ্ঞতার কাহিনীই ভেসে ওঠে। কিন্তু আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধে ভারতের যে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ অবদান রয়েছে সেটা অনেকেই স্বীকার করতে কুন্ঠিতবোধ করেন। কিন্তু আমাদের আশ্রয় থেকে শুরু করে, প্রশিক্ষণ, অস্ত্রসশস্ত্র প্রদান এবং সর্বশেষ সরাসরি যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করা পর্যন্ত সব স্তরেই ভারতে অপরিসীম অবদান রয়েছে। সেটা আমাদের অকৃপণভাবে স্বীকার করা উচিৎ।

আমি প্রথম দিকে মুক্তিযুদ্ধের উপর যে সব বই পড়েছিলাম, স্বাভাবিকভাবেই সেগুলো ছিল দেশি লেখকদের লেখা। বিদেশিদের মধ্যে এন্থনি মাসকানেহান্স বেশ পঠিত হয়। কিন্তু পরবর্তীতে আমি যখন ভারতীয় এবং শেষে পাকিস্তানি লেখকদের বই পড়া শুরু করলাম তখন এ মহান যুদ্ধ সম্পর্কে আমার ধারণা অনেকটাই প্রসারিত হল।

তবে পাকিস্তানি লেখকদের বইগুলো অবশ্যই সাবধানতার সাথে পড়া উচিৎ। যারা আমাদের স্বাধীকার আন্দোলন ও সর্বশেষ মহান মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা না নিয়ে সরাসরি পাকিস্তানি জেনারেলদের বই পড়বেন, তারা শুরুতেই গোলক ধাঁধাঁয় পড়বেন। কারণ পাকিস্তানি লেখকদের অধিকাংশই হল সেই সব ব্যক্তি যারা আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সময় হত্যা, নির্যাতন, ধর্ষণ, লুন্ঠন, অগ্নিসংযোগের মতো মানবতাবিরোধী অপরাধের সাথে হয় সরাসরি জড়িত ছিলেন, কিংবা কমান্ডিং ভূমিকায় ছিলেন। এরা যত সত্যই বলুক সেটা তাদের মতো করে বলেছেন। আর অসংখ্য মনগড়া তথ্য, পরিসংখ্যান দিয়ে তাদের বই ভরিয়ে রেখেছেন। তারা পাক আর্মিকে পাকিস্তানের রক্ষাকর্তাই শুধু মনে করতেন না, পারলে স্বর্গের ফিরিস্তাদের সংগঠন বলেও দাবি করতেন। অনেকের লেখায় আছে প্রচণ্ড স্ববিরোধীতা।

তাই আমি মনে করি, প্রথম পর্যায়ে আমাদের দেশি লেখক, তারপর ভারতীয় ও সর্বশেষে পাকিস্তানিদের বই পড়া দরকার। আর পাকিস্তানিদের বই পড়ার পূর্বে মুনতাসির মামুনের লিখিত ‘পাকিস্তানি জেনারেলদের মন’ নামের বইটি পড়লে বিভ্রান্ত হবার ঝুঁকি অনেকটাই কমে যাবে।

অনেকে বলতে পারেন, আমাদের ইতিহাস জানতে আমরা আবার ভিন দেশিদের দারস্থ হব কেন? যৌক্তিক প্রশ্ন বটে। তবে ইতিহাসের ঘটনাগুলোকে ভিন্ন ভিন্ন আঙ্গিক, মাত্রা ও বর্ণনায় তুলনা করলে বিষয়গুলো বুঝতে ও উপলব্ধি করতে সুবিধা হয়।

আর অভিজ্ঞতার কাহিনী কিন্তু পুরোপুরি ইতিহাস নয়। এগুলো ইতিহাসের উপাদান মাত্র। হাজার হাজার অভিজ্ঞতার কাহিনী, খণ্ড খণ্ড দলিল-দস্তাবেজ কিংবা যোগাযোগের সূত্রাবলী থেকে প্রকৃত ঐতিহাসিকগণ যখন কোন বিবরণ তৈরি করেন, আমি মনে করি সেটাই হবে আমাদের প্রকৃত ইতিহাস।

স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের উপর আমার পঠিত অর্ধ শতাধিক গ্রন্থের মধ্যে আমি বহু ঘটনার ভিন্ন ভিন্ন বিবরণ পেয়েছি। আবার অনেক ঘটনা আছে যেগুলোর বিবরণ প্রত্যেকটি বিবরণে সম্পূর্ণ এক না হলেও বিশ্বাস করার মতো সাদৃশ্য রয়েছে।

মেজর জেনারেল ধ্রুব সি কাতচ ও লে.কর্নেল কাজি সাজ্জাি আলি জহিরের সম্পাদিত ‘লিবারেশন বাংলাদেশ-১৯৭১ বইটি আমাকে বহু ঘটনার ভিন্নতর কিংবা নতুনভাবে জানার সুযোগ দিয়েছে।

বিগ্রেডিয়ার সিদ্দিক সালিকের লেখা উটনেস টু সারেন্ডার বইটিতে রাজশাহীর রোহনপুরের এক কিশোর মুক্তিযোদ্ধার বীরত্বের কাহিনী বর্ণনা করা হয়েছিল তাকে গ্রেফতার করে পাক সেনারা যখন জিজ্ঞাসাবাদ করছিল, তখন সে কিছুতেই তাদের সহযোদ্ধাদের নাম ঠিকা কিংবা যুদ্ধ পরিকল্পনা প্রকাশ করছিল না। তখন একজন মেজর তার বুকে স্টেনগান ধরে বলেছিল,

This is the last change for you. If you don’t cooperate the bullets will pierce through your body.

কিন্তু এ বীর যোদ্ধার এতে কোন বিকৃতি হল না। সে মাথা নুইয়ে মাটিতে চুমু খেল এবং মাথা তুলে শান্তভাবে বলতে থাকল এভাবে

‘I am ready to die, now. My blood will certainly hasten the liberation of my sacred land.

এ বইয়ে মেজর(অব) সাজ্জাদ আলী জহিরের লেখা The Story of Hasan Ali’ পড়ে জানতে পারলাম যে ঐ যুবক ছিল রোহনপুরের ঝাবু মন্ডল ও খুশিমুন্নেসার সন্তান হাসান আলী।

এরূপ আরো বহু ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী বা ঘটনার নায়কদের লেখা পাওয়া যাবে, যা ঐতিহাসিক দ্বন্দ্বের অনেকটাই অবসান ঘটাতে পারবে।

(০৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৬; ইউএন হাউজ, জুবা , দক্ষিণ সুদান)

সূত্র:Liberation Bangladesh-1971
Editors
Maj Gen Dhruv C Katoch SM, VSM
Let Col Quazi Sajjad Ali Zahi, Swadhinata Padak , Bir Protic Bloomsbury(2015