ক্যাটেগরিঃ দিবস প্রসঙ্গ

 

আমাদের সমাজে প্রেমিক প্রেমিকার প্রকাশ্যে চুমু খাওয়াটা এখন পর্যন্ত অতটা প্রকাশ্য হয়নি। তবে যেভাবে আমরা বিশ্বায়নের ধারায় পরিবর্তিত হচ্ছি তাতে মনে হচ্ছে একদিন এটা আমাদের কেবল গায়েই এসে পড়বে না, গা সওয়াও হয়ে যাবে।

ছোট কালে টেলিভিশনে সিনেমা দেখার সময় নায়ক-নায়িকার আলিঙ্গণের ক্ষণ এলে আমরা মুখ লুকিয়েছি। বড়দের কাছে আমাদের ঐ মুহূর্তটা ছিল লজ্জাজনক। চুম্বন তো নয়ই, শুধু আলিঙ্গণের দৃশ্য এলেই আমরা উসখুস করতাম। গভীর অস্বস্তিতে মাথা নিচু করতাম।

আমার এক দুলাভাই তো ব্যাখ্যা দিত, এসব আলিঙ্গন কিংবা বুকে জড়ানোর দৃশ্য আসলে ক্যামেরর কারসাজি। কেউ কি এভাবে অভিনয় করতে গিয়ে পরপরুষের গায়ে পড়ে! আমরা ছোট বলে ছোট বেলায় তা মেনে নিতাম।

সাবানা-ববিতা-কবরীদের অভিনয়কালে নায়কের বুকের কাছাকাছি দেখা যেত। বুকে জড়ানোটা ছিল ব্যতীক্রম। কিন্তু বর্তমানের সাবনুর,-পূর্ণিমা-মৌসুমী-মাহিনদের নিয়ে নায়করা রীতিমত থ্যাকনা-থ্যাকনি করে ।(রংপুরের আঞ্চলিক ভাষা)। আমরা তাতে মনে কিছু করি না। প্রেমের আবেগের বহিঃপ্রকাশ তো হবেই। এতে মাইন্ড করার কি আছে?

নব্বইর দশকে বাংলা সিনেমায় প্রেমিক প্রেমিকার যে অন্তরঙ্গ মুহূর্ত দেখেছি, এখন সেটা অবশ্য ঘরোয়া নাটকেও পাওয়া যায়। কাহিনীর প্রয়োজনে প্রচণ্ড আবেগে নারী-পুরুষ একে অপরকে চুম্বন করলে এখন আমরা পরিবারের ছোট-বড়রা নাটক-সিনেমায় মাইন্ড করি না। এখন আমাদের থাকে উন্নত শির। এ প্রেমরস আমরা উপভোগ করি।

আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে, শহরের ব্যস্ত পার্কে প্রেমিক-প্রেমিকা যুগোলের অন্তরঙ্গ বসে থাকা, মাঝে মাঝে চুমু খাওয়াটা খুব বেশি আপত্তিকর বলে মনেই করি না। যেহেতু মানুষ আপত্তি করে না, তাই পুলিশও এসব নিয়ে মাথা ঘামায় না। যদি পুলিশ জনগণের আপত্তিহীন কাজে মাথা ঘামায় তাহলে পুলিশকে এসব নিয়েই থাকতে হবে। আর হয়রানির অভিযোগ তো উঠবেই।

১৪ ই ফেব্রুয়ারিতে নাকি একখান বিশেষ দিবসের বায়না এসেছে। আমি যতটুকু জানি এ দিবসটি বাংলায় আমদানি করেছেন যায় যায় দিনের সম্পাদক শফিক রেহমান। তার প্রবোধ-প্রশ্রয় আর প্ররোচনায় এটা এখন বাংলায় স্থান করে নিচ্ছে। এখন ঢাকা শহরের বাইরেও এ দিবস উজ্জাপন ছড়িয়ে পড়েছে। এ দিন ফুল দেয়া নেয়া, কার্ড বিনিময়, ম্যাসেস আদান-প্রদান দেদারচে হচ্ছে।

আমাদের দেশের জন্মদিন পালনের বিদেশি রীতির মতো ভ্যান্টোইন ডে বা ভালবাসা দিবস পালনটাও একটা রীতিতে পড়ে যাচেছ। আর কোন রীতি যদি আমার সংস্কৃতিতে তার নিজগুণে স্থান করে নেয়, আমি মনে কিছু করি না। কারণ সংস্কৃতির বিস্তৃতির সূত্র এটাই। যা নিজগুণে কোন সমাজে আশ্রয় করে নিতে পারে, সেটাকে সমাজে স্থান না দেবার আমি কে?

তবে এ বছরে প্রকাশ্যে পুলিশ প্রহরায় প্রেমিক প্রেমিকাদের চুমু খাবারের উৎসবের ঘোষণা বেশ বৈপ্লবিক বটে। হয়তো শেষ পর্যন্ত ঐ ধরনের কিছু হবে না, হলেও হয়তো কোন বিবাহিত প্রেমিক যুগোল এটা উদ্বোধন করবেন, কিন্তু এ ধারণাটা যখন মাথায় ঢুকেছে, সেটার বাস্তবায়নকর্মটি যে কৃত্যকগণ এত সহজে ছেড়ে দিবেন, আমার তা মনে হয় না। শফিক রেহমান তো শুধু ভালবাসা দিবশকেই আমদানি করেছেন। এখন তারই পথ ধরে কেউ যদি প্রকাশ্য চুম্বনের উৎসব চালু করার প্রচেষ্টা অব্যহত রাখেন, তবে তার কিছু না কিছু সাফল্য তো আসবেই। বিশ্বে ক্রমবর্ধমান সন্ত্রাস-হত্যা-নির্যাতন-নিপীড়ন আর হানাহানি, মারামারির বিপরীতে ভালবাসার বিস্তৃতি মন্দ কী!

ঠোঁটে-মুখে-গালে- চিবুকে চুমু খাওয়ার প্রকাশ্য মহড়া আপত্তিকর হলেও এটা শ্লীলতা-অশ্লীলতার বিতর্কটি আরো অনেক দিন চলমান থাকবে। তবে সামাজিক সূত্রানুসারেই আমরা পরিবর্তিত হই; আমাদের পরিবর্তিত হতেই হয়। আমরা পছন্দ করি বা না করি সমাজ কিন্তু তার নিজের গতিতেই পরিবর্তিত হবেই। এই পরিবর্তনের গতিকে শ্লথ বা ত্বরান্বিত করা যেতে পারে, কিন্তু রুদ্ধ করার কোন উপায় নেই।