ক্যাটেগরিঃ ধর্ম বিষয়ক

  • Major Ren Yonhui China

    Techtical Operation Center (TOC) এ তিন পালায় ডিউটি করে পুলিশ, সেনাবাহিনী ও ফর্মড পুলিশের অফিসারগণ। একই রুমে ভিন্ন ভিন্ন ডেস্কে চলে প্রত্যেক পালার ডিউটি। নেপালের একটি ফর্মড পুলিশ ইউনিট ও একটি সেনা ইউনিট আছে মিশন হেডকোয়ার্টারে। এর বাইরে আছে চিন ও ইথিওপিয়ার একটি করে সেনা ব্যাটালিয়ন। তাই এখানে নেপালের দুজন, চিনের একজন ও ইথিওপিয়ার একজন সেনা অফিসারের সাথে আমাদের ডিউটি করতে হয়। এসব ইউনিট তাদের নিজ নিজ দেশের পুলিশ বা সেনাবাহিনীর সদস্য নিয়ে মোটামুটি এককভাবেই দায়িত্ব পালন করে। তাদের রেডিও সেটে ভিন্ন ভিন্ন চ্যানেলে তারা নিজেদের ভাষায় কথা বলেন। তাই যোগাযোগটাও হয় খুবই ভাল। তবে আমাদের পুলিশ অ্যাডভাইজারদের মধ্যে কথাবার্তা চলে ইংরেজিতে।

    গত ১২ তারিখ রাতে প্রথম ডিউটি করলাম এই টেকটিক্যাল অপারেশন সেন্টার বা টক-এ। এখানে সকালের চেয়ে বিকেলে কাজ বেশি। রাতের ১০টা বাজলে তেমন কোন ঝামেলাই থাকে না। তখন গল্পগুজব করে, ফেইসবুকিং কিংবা ইন্টারনেট ঘাঁটাঘাঁটি করে সময় কাটানো যায়। রাত 10 টার পরে আমরা তাই করছিলাম । তবে এখানে আমি নতুন বলে সবার সাথে এখনো পরিচিত হয়ে উঠতে পারিনি।

    কোন দেশের নাগরিকদের সাথে পরিচয়ের এক সমযে তার সামগ্রিক বিষয়গুলোর পরে চলে আসে তাদের ধর্মীয় পরিচয়টি। কেউ খ্রিস্টান, কেউ মুসলিম, কেউ হিন্দু, কেউ বৌদ্ধ — এসবই ধর্মীয় পরিচয়ে আসে। আমরা সোৎসিদ্ধভাবে ধরে নেই যে পৃথিবীর তাবৎ মানুষ কোন না কোন ধর্মের অনুসারী। কিন্তু ব্যতিক্রম হলেও এ পৃথিবীতে ধর্মহীন মানুষ রয়েছে।

    ডিউটির ফাঁকে কথা হল চাইনিজ সেনাবাহিনীর মেজর রেন উখোয়ে( Ren Younghui) এর সাথে। সাধারণ কুশল বিনিময়ের কিছু পরেই চলে এল ধর্মীয় পরিচয়ের প্রসংগটি । কিন্তু জানা গেল মেজর রেন এর কোন ধর্মীয় পরিচয় নেই। তার মানে তিনি পৃথিবীতে প্রচলিত সার্বজনীন, গোষ্ঠীগত কিংবা গোত্রগত কোন ধর্মেরই অন্তুর্ভুক্ত নন। আমি জানতাম চিনের জনগণের কাছে লাওৎসে ও কনফুসিয়াস নামে দুজন দার্শনিক বেশ জনপ্রিয়। কনফুসিয়াস কোন ধর্মের প্রবর্তন না করলেও অনেকে নাকি নিজেদের কনফুসিয়াসিস বলে পরিচয় দেয়। আর লাওৎসের তাও ধর্ম নাকি চিনে বেশ প্রচলিত। কিন্তু আলাপে জানা গেল মেজর রেন এই দুটো ধর্ম বা মতবাদের কোনটিরই অন্তুর্ভুক্ত নন। তিনি জানালেন, তিনি মূলত ধর্মহীন, তার ধর্ম প্রকারন্তরে কমিউনিজম।

    হ্যাঁ, বিষয়টি আমি পূর্বেও জানতাম। আমার সহকর্মী চিনের সানজু প্রদেশের জংফুরও কোন ধর্মীয় পরিচয় নেই। জংফুর কাছ থেকে আমি জানতে চেয়েছিলাম, সে কি তাহলে কোন প্রকার প্রার্থনাই কর না? সে জানিয়েছিল না, সে কোন প্রার্থনা করে না, কোন উপাসনালয়ে যায় না।

    আমার সাথের টক- এ ডিউটি পালনকারী মেজর রেনও তাই। সে জানাল, চিনের সাধারণ নাগরিকগণ নানা ধর্ম পালন করতে পারেন। তারা মসজিদে যেতে পারেন, মন্দিরে যেতে পারেন। কিন্তু সরকারি কর্মচারী হলে তাদের উপাসনালয়ে যাওয়াটা এক প্রকারের নিষিদ্ধ। ধর্মীয় কোন আচার অনুষ্ঠান চিনের সরকারি কর্মকর্তারা পালন করতে পারেন না। আর তাদের বাধ্যতামূলকভাবে চিনা কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য হতে চায়।

    আমি মেজর রেনকে বললাম, তুমি তাহলে কোন সৃষ্টিকর্তায় বিশ্বাস কর না। তার অতি সরল উত্তরটি ছিল, না। আমি বললাম, প্রত্যেক বস্তুরই একটা না একটা মালিকানা থাকে। প্রত্যেক বস্তুকেই কেউ না কেউ তৈরি করে। যেমন, এই মোবাইল ফোনটি (চাইনিজ একটি ফোন সেট এগিয়ে দিলাম) তোমার দেশ তৈরি করেছে, এই খাবারটি (তখন আমি মুড়ি খাচ্ছিলাম) আমার দেশের মানুষ তৈরি করেছে। কিন্তু এই পৃথিবী বা এ মহাজগতখানা কে তৈরি করেছেন? এ পৃথিবীর প্রাণিকুল কিংবা মানবকুলকে কে তৈরি করেছেন। তোমাকে কে তৈরী করেছেন?

    রেন বলল, কেন আমাকে আমার পিতামাতাই তৈরী করেছেন। আমি বললাম, পিতার শুক্রাণু আর মায়ের ডিম্বানু একত্রিত হয়ে তুমি তৈরি হযেছ। এতে তোমার বাবা মার একটি প্রচেষ্টা রয়েছে। কিন্তু এ থেকে কিভাবে বুঝব যে তোমার পিতামাতা তোমাকে তৈরি করেছেন? যে শুক্রাণু ও ডিম্বাণু থেকে তোমার জাইগোট তৈরি সেটা কে তৈরি করল? এবার মেজর রেন বিপদেই পড়লেন। তিনি বললেন, আমি তো বিষয়টা এভাবে কোন কোন দিন ভাবিনি।

    এবার আসল এ মহাবিশ্ব সৃজনের ইতিহাস বা উপাখ্যান। ধর্মীয় মতবাদগুলো তাকে বললাম। ইসলামিক মতবাদটি একটু ভাল করেই ব্যাখ্যা করলাম। আল্লাহ ইচ্ছা করলেন যে তিনি মহাবিশ্ব তৈরি করবেন। তিনি বললেন, হয়ে যাও। অমনি সব হয়ে গেল। অন্যদিকে বিগ ব্যাং নামের বৈজ্ঞানিক বা ম্যাটাফিজিক্যিাল তত্ত্বটিও তাকে ব্যাখ্যা করলাম।

    বিগব্যাং থিওরি বলে, আদিতে মহাবিশ্বের সকল বস্তু একত্রিত ছিল। এক সময় হটাৎ করে এক বিস্ফোরণে এসব বস্তু একে অপরের থেকে দূরে সরে যেতে থাকল। দূরে সরে যাওয়া বস্তুগুলোর মধ্যে ক্রমান্বয়ে দূরত্ব বাড়তে থাকল, তাদের পরষ্পর তো বটেই নিজেদের মধ্যে ঘনত্বের পার্থক্য হতে থাকল। বেশি ঘনত্বে থাকা বস্তুগুলো মিলে ছায়া পথ নক্ষত্র গ্রহ উপগ্রহ ইত্যাদির সৃষ্টি হল।

    আমার মতে বিগব্যাং তত্ত্বের বিপছনে বড় ধরনের বৈজ্ঞানিক ব্যাক আপ রয়েছে। কিন্তু আদিতে মহাবিশ্বের সব বস্তু যদি একত্রি থেকেও থাকে সে্ বস্তুগুলো সৃষ্টির একটি বিষয়তো থেকেই যায়। আবার এ সব বস্তু কেন এত দিন একত্রে ছিল আর কেনই বা তারা কোন এক সময় একটা বিকট বিস্ফোরণের মধ্য পড়ল। এ বস্তুগুলো কি নিজেরাই আলাদা হবার সিদ্ধান্ত নিল, না কারও আদেশে এটা হল? এ সবই হল দার্শনিক তত্ত্ব।

    এবার চমৎকৃত হল মেজর রেন। তিনি চিন্তা করতে লাগলেন। তিনি আবার বললেন, আমরা এভাবে চিন্তা করি না। তিনি ঠিকই বলেছেন, কমিউনিজমের অধীন ক্ষমতাসীনগণ নাগরিকদের ধর্ম নিয়ে ভাবতে দেয় না, তাদের আধ্যাত্মিক চিন্তা তো বটেই এমনকি বিরুদ্ধ মতের রাজনৈকিত চিন্তাও সেখানে নিষিদ্ধ। কমিউনিজমের কাছে ধর্ম নাকি আফিমের মত। এটা একটা ক্ষতিকারক নেশা। তাই কমিউনিজমের ধারকগণ তাদের জনগোষ্ঠীর কাছ থেকে ধর্মকে সযত্নে দূরে রাখেন।

    অথচ পৃথিবীতে এমন কোন সময় ছিল না, এমন কোন স্থান ছিল না, এমন কোন জাতি বা জনগোষ্ঠী ছিল না যেখানে মানুষ কোন না কোন ভাবে বা উপায়ে বস্তুগত জগতের বাইরে একটি আধ্যাত্মিক জগতের চিন্তা করেনি। অর্ধাৎ পৃথিবীর ইতিহাস মূলত ধর্মেরই ইতিহাস। ধর্ম তার আদি সরল রূপ থেকে ক্রমান্বয়ে আজকের মতো জটিল রূপে প্রবেশ করেছে। উঁচু টিলা, বড় বড় গাছ, পাহাড়, নদী সমূদ্র ইত্যাদির পূজা করা মানুষ ক্রমান্বয়ে এ্মন একটি শক্তিকে তাদের স্রষ্টা, নিয়ন্ত্রক হিসেবে বেছে নিয়েছে যাকে দেখা যায় না, ছোঁয়া যায় না, যিনি সৃষ্টি করেছেন, কিন্তু নিজে সৃষ্ট নন, যিনি সব কিছু নিয়ন্ত্রণ করেন কিন্তু নিজে নিয়ন্ত্রিত হন না। এসবই হল ধর্মীয় চিন্তার বিবর্তন। এবং আমরা বর্তমানে এ বিবর্তনের চরমতম রূপে অবস্থান করছি।

    যারা বিজ্ঞানী তারাও তো ধর্মে বিশ্বাসী । আইনস্টাইন নাস্তিক ছিলেন বলে আমার জানা নেই, নিউটন একজন ধর্মপ্রাণ খ্রিস্টান ছিলেন। এমনিভাবে প্রায় সব বিজ্ঞানীর ধর্মহীনতা নয়, ধর্মনিষ্ঠতার ইতিহাস রয়েছে। কিন্তু কমিউনিস্ট চিনের সরকারি কর্মচারিদের কাছ থেকে কিভাবে ঈশ্বর বিদায় নিলেন, সেটা আসলেই ভাবনার বিষয়।

    আমি রেন কে বললাম, তুমিই ভাল আছ। তোমার কাছে কোন ঈশ্বর নেই, যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন। তোমার কাছে কোন ধর্ম নে্ই যার অনুশাসন তোমাকে মেনে চলতে হবে। তোমার কাছে পরকাল নেই, তোমার কাছে পরজন্ম নেই। তাই তুমি অনেকটাই ভাবনাহীন থাকতে পার। তোমার এ নশ্বর দেহখানা যখন প্রাণহীন হবে, তখন সব কিছু্ই শেষ হবে। তোমাকে মৃত্যুর পরে কৃত কর্মের জন্য জবাবদিহি করতে হবে না। তোমার কাছে যেমন সীমাহীন সুখদায়ি স্বর্গের আশ্বাস নেই, তেমনি নেই অনন্ত নরকের যন্ত্রণারও ভয় নেই। একটি ইহজগতেই সব কিছুই তোমার শেষ হয়ে যাবে।তাই তোমার চিন্তা আমাদের চিন্তার চেয়ে অত্যন্ত সহজ। আমরা, ধর্ম বিশ্বাসীরা এ জগতকে অতিক্রম করে একটি পর জগতের সুখ-দুঃখ নিয়ে চিন্তা করে করে নিজেদের অস্থির করে তুলি। তুমি তা কর না।

    মেরজ রেন আমার কথাগুলো তন্ময় হয়ে শুনলেন, শুনলেন নেপালি হিন্দু, ইথিওপিয়ান খ্রিস্টানগণও। আমাকে ওরা বিজ্ঞতার তকমা পরিয়ে দিলেন। কেউ কেউ মন্তব্য করলেন, তুমি পুলিশ না হয়ে ধর্মতত্বের প্রফেসার হলেও পারতে।

    কিন্তু আমি জানি, আমি বিজ্ঞ নই। তবে চিন দেশের কমিউনিস্ট আদর্শের ধর্মহীন একজন মানুষকে ঈশ্বর চিন্তার একটু আভাস দিতে পেরেছি– এই যা। কোন এক দার্শনিক বলেছিলেন, মরণশীল মানুষের জন্য একজন সৃষ্টিকর্তা খুবই দরকার। একজন সৃষ্টিকর্তা আছেন কি না সে প্রশ্নের প্রশ্নের উত্তর না পেলে মানুষ একজন সৃষ্টিকর্তাকে নিজেরাই তৈরী করে নিত। চাইনিজ মেজর রেন কি এর পর তার জন্য একজন ঈশ্বর বা সৃষ্টিকর্তা খুঁজে নিবেন? (১৪ মার্চ, ২০১৬, ইউ্এন হাজউজ, জুবা দক্ষিণ সুদান)