ক্যাটেগরিঃ পাঠাগার

ভাষার শুদ্ধতার প্রশ্নে আমি নিজেকে আচারনিষ্ঠ বলে দাবি করি। প্রত্যেক ভাষার কতিপয় বিশিষ্ট রীতি, ঢঙ বা স্বকীয়তা আছে। এসব কিছুই তার বানানরীতি থেকে শুরু করে বাগধারার প্রয়োগ পর্যন্ত বিস্তৃত।

তবে আমরা নিজেদের স্বার্থে বা প্রয়োজনে আমাদের ভাষার লিখন, পঠন ও বলনে কিছু পরিবর্তন নিয়ে আসতে পারি। এ পরিবর্তন যে একমাত্র
বৈয়াকরণগণের মাধ্যমেই আসতে হবে, তা নয়। অনেক সময় সাধারণ মানুষের কথায়, বলায়, চলায়, সহায় বা অনুমোদনে অনেক কিছুই অনেক রূপ ধারণ করতে পারে। কিন্তু তাই বলে ইচ্ছাকৃত ভাষাবিকৃতি কোনভাবেই মেনে নেয়া যায় না।

ইদানীং অনেকে বাংলা ভাষায় ণ-ত্ব বিধান আর ষ-ত্ব বিধান নিয়ে বিষোদ্গার করেন। বলা বাহুল্য, এ বিষোদ্গার যতটা না বিজ্ঞতাপ্রসূত তার চেয়ে অনেক বেশি আসে অজ্ঞতাবসত। এ সম্পর্কিত আলোচনায় একবার এক বন্ধু বলে বসল,, আজ কাল আর ণ-ত্ব- বিধান, ষ-ত্ব বিধান, হ্রস্ব-ই কার, দীর্ঘ-কার বলে কোন কিছুই মানতে হয় না। উদাহরণ হিসেবে সে বলল, এই ধর ‘শ্রেণী’ বানানটি। এটা দেখি এখন ‘শ্রেণি’ লেখা হচ্ছে। কিন্তু আমার এ বন্ধুটি আসলে বাংলা বানানরীতির আধুনিক রূপটি সম্পর্কে একেবারেই সচেতন নয়। আধুনিক বানানরীতি অনুসারে যে সব শব্দ সংস্কৃত ভাষা থেকে বাংলা ভাষায় এসেছে, সেগুলোর আদিতে যদি দীর্ঘ-ই থাকে তবে বাংলায় তা অবিকৃত রাখা যাবে, কিংবা হ্রস্ব -ই দিয়েও লিখা যাবে। তবে হ্রস্ব -ই দিয়ে লেখাটা বেশ উৎসাহ পাচ্ছে। ‘শ্রেণি’ শব্দটি অনুরূপ। একইভাবে ‘বাড়ি’ শব্দটি এসেছে ‘বাটী’ থেকে, ‘পাখি’ শব্দটি এসেছে ‘পক্ষী’ থেকে। তাই এখানে হ্রস্ব-ই আর দীর্ঘ-ই উভয়েই শুদ্ধ।

কমপিউটারের ব্যবহার আমাদের ভাষার বানানরীতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছে। কি-বোর্ডে বাংলা লিখতে কোন কোন বর্ণ নিয়ে দারুণ সমস্যায় পড়তে হয়। কিন্তু বর্তমানে এ সমস্যার সুন্দর সমাধানও বের হয়েছে। আমাদের প্রযুক্তিবিদগণ এমন ধরনের কি-বোর্ড আবিষ্কার করেছেন যাতে ক-তে কাকা আর চ-তে চাচা বোঝান সম্ভব। আর ণ-ত্ব বিধান আর ষ-ত্ব বিধানেরও একটা স্বয়ংক্রিয় সমাধানও আছে তাতে।

কিন্তু যাই বলি না কেন, ভাষা হল শেখার বিষয়। আপনি যদি শুদ্ধরূপে ভাষা বলতে, পড়তে, লিখতে না জানেন, মানে ঐ ব্যাকরণের পাঠ না নেন, তাহলে অশুদ্ধির যন্ত্রণা থেকে কিছুতেই নিষ্কৃতি পাবেন না। ঐ যে বন্ধুটির কথা বললাম, যে মনে করে, হ্রস্ব -ই আর দীর্ঘ-ই এর জাতপাত নেই। সামনে যা আছে তা বসিয়ে দিলেই চলে। কিন্তু আমার মতে, বন্ধুবর আসলে ব্যাকরণের সঠিক পাঠটি নেননি। তাই মনে করেন, আমাদের বাংলা এখন ফ্রি-স্টাইলে চলে। ব্যাকরণ-ট্যাকরণ আর মানতে হয় না।

আরও একটি বিষয় ইদানীং লক্ষ করছি। আমাদের তরুণ প্রজন্মের একটি অংশ আমাদের প্রিয় মাতৃভাষার শব্দগুলো যেমন-তেমন করে এমনকি অনেকটাই বিকৃত করে উচ্চারণে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে। রাজধানীর অভিজাত এলাকাগুলোতে, বিশেষ করে ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছাকাছি গেলে ছেলেমেয়েদের কোলাহলে মনে হয়, এসব স্থানের গাছের ডালে, বিজলীবাতির তারে, ছাদের চিলেকোঠায় ভুল করে ভিনদেশি কিছু পাখি এসে বসেছে। ওরা দেখতে আমাদের দেশের পাখিগুলোর মতোই কিন্তু ডাকটা বেশ বিকৃত। কোকিল এখন আর কুহু, কুহু করে না, করে কওহু, কওহু (মুখের বিকৃতি ভাষা প্রকাশ করতে পারছি না)। কাক আর কা, কা করে না, করে খা, খা ইত্যাদি।

কিছুক্ষণ থাকলে বোঝা যাবে এরা আসলে বাংলা ভাষাতেও কথা বলছে না, বাংলা ইংরেজির সংমিশ্রণে গঠিত একটি বিশেষ ভাষায় তারা কথা বলছে। এটাকে কেউ কেউ বাংরেজি বলেন। কিন্তু আমি তাও বলি না। কারণ, এতে বাংলা ও ইংরেজি দুই ভাষারই বদনাম করা হয়। কারণ এই কুলঙ্গাররা বাংলা, ইংরেজির কোনটাই শুদ্ধরূপে জানে না।

ইদানীং কিছু কিছু পোলাপান তাদের কথোপকথোনে যতটুকু বাংলা বলেন, তারচেয়ে বেশি বলেন ইংরেজি। আধুনিককালের যেখানে সেখানে গড়ে ওঠা এফএম রেডিওগুলো শুনলে এ বিকৃত ভাষার একটা বোধগম্য রূপ ধরা পড়বে।

মনে পড়ে, তখন আমি সবে মাত্র ছাত্রত্ব শেষ করেছি। ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ড. আহম্মদ শরীফের আড্ডাখানা তার মৃত্যুতে শূন্য পড়ে আছে। তবে এ আড্ডায় হটাৎ আসা শুরু করলেন অধ্যাপক হুমায়ুন আজাদ। কথায় কথায় আমি তাকে প্রশ্ন করলাম, স্যার, আমাদের অনেক শিক্ষিত মানুষ পর্যন্ত বাংলার সাথে ইংরেজি মিসিয়ে কথা বলেন, যা শুনতে বিশ্রি লাগে। অনেক ব্যাকরণ জানা লোককেও আমি এমনটি বলতে শুনি। এর কারণটা কি হতে পারে? হুমায়ুন আজাদ বললেন, ভাইরে, আমরা যখন কথা বলি তখন আমাদের ভাণ্ডারে যে শব্দাবলী আছে সেগুলোই ব্যবহার করি। কথা বলার সময় কোন ক্ষেত্রে তুমি কোন শব্দটি ব্যবহার করবে, তা নির্ভর করবে তোমার ভিতরের শব্দভাণ্ডারের আকারের উপর। তোমার শব্দ ভাণ্ডার যদি ছোট হয়, আর তুমি একটা বড় বা গুরুত্বপূর্ণ কিংবা গুরুগম্ভীর বিষয় নিয়ে কথা বলা শুরু কর, তবে তোমাকে তো শব্দের সঙ্কটে পড়তে হবে। ঐ সময় তুমি কথোপকথন চালিয়ে যাওয়ার জন্য হাতের কাছে যা পাও তাই দিয়েই কাজ চালাবার চেষ্টা কর। আর ইংরেজি বাংলা মিলিয়ে তুমি ঐ অবস্থা থেকে কোন প্রকারের উত্তরণ ঘটাতে চাও। বলতে কি আমরা যতই বাঙালি হই, আমাদের শিক্ষার ভাণ্ডার যতই সম্মৃদ্ধ হোক, আমাদের ভিতরের বাংলা ভাষার শব্দ ভাণ্ডারটি বেশ ছোট। আমাদের যেমন পরিভাষাগত শব্দের ঘাটতি আছে, তেমনি আমাদের শিক্ষিত লোকদের বাংলা ভাষার শব্দাবলীর ভাণ্ডারটি গড়ে তোলার ব্যপারেও গাফিলতি আছে।

হুমায়ুন আজাদ স্যারের সেই দিনের কথাটি আমি এখন প্রতি পদে পদে স্মরণ করি। তার ব্যাখ্যাটি কেবল আমার সেই বন্ধু কিংবা রাজধানীর ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সংলগ্ন এলাকার জন্যই সত্য নয়, এটা আমার মতো বোদ্ধা ব্লগারদের জন্যও সত্য। তবে আমি মনে করি এ দৈন্য থেকে আমাদের বের হয়ে আসার অনেক উপায় আছে।

অনেক সময় কথা বলার কিংবা লিখার সময় সর্বতভাবেই যে ইংরেজি কিংবা ভিনদেশি শব্দ পরিহার করতে হবে– এমন কথা নেই। বরং আমাদের মনের ভাব প্রকাশ কিংবা লেখার মাধুর্যের জন্য যথা স্থানে যথা শব্দটির প্রয়োগই বাঞ্ছনীয়। যেসব শব্দ একান্তই অপ্রচলিত তা দিয়ে আমি সব সময় তো মনের ভাব প্রকাশ করতে পারব না। অধিকন্তু বিদেশি ভাষার বহু শব্দ প্রতিনিয়তই আমাদের ভাষায় স্থান করে নিচ্ছে। যদি তাদের এই স্থানগ্রহণ যথাযথ হয়, কিংবা অপরিহার্য হয়, তাহলে বিদেশি শব্দ বলে তাকে অচ্ছুৎ ভাবলে তো চলবে না। বরং অনেক সময় খাটি বাংলা কিংবা ইতোমধ্যে প্রচলিত শব্দ ব্যবহারে ভাষার শ্রীবৃদ্ধি তো ঘটেই না বরং ভাষা শুধু শ্রীহীনই হয়না কর্কশ বা কদর্যও হতে পারে।

যেমন, আমি যদি কমপিউটার না বলে গণকযন্ত্র কিংবা পুলিশ সুপার না বলে আরক্ষক কিংবা কৃত্বক বলা শুরু করি, তাহলে আমার ভাষার বা লেখার বারটা বাজবে। তাই আমার কথোপকথনের সাথে বেমানান কোন শব্দ ব্যবহার সমীচীন নয় বলেই মনে করি।

উপসংহারে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে প্রচলিত একটি অসমর্থিত সূত্রের গল্প দিয়ে লেখনির ইতি টানব। বিলেতে থাকাকালীন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের সাথে এক বাঙালি ছাত্রের দেখা হয়। ঐ ছাত্র রবীন্দ্রনাথের সাথে বাংলার পরিবর্তে ইংরেজিতে কথাবার্তা শুরু করলেন। কবি অবাক হয়ে বললেন, তুমি বাঙালি হয়ে আমার সাথে ইংরেজি বলছ কেন? তখন ছাত্রটি গর্বের সাথে বলল, অনেক দিন বিলেতে আছি তো। তাই বাংলাটা বেশ ভুলে গেছি। কবি বিরক্তির সাথে বললেন, বাপু বাংলা ভুলে গেছ, তাতে কোন দুঃখ নেই। আমার দুঃখ হল, তুমি ভাল করে ইংরেজিটিও শিখতে পারনি।

আমাদের আধুনিক-শিক্ষিত, উচ্চশিক্ষিত আর প্রযুক্তির বরপুত্র বাঙালি যুবক, বিশেষত লেখকদের অবস্থা যেন রবীন্দ্রনাথের কাছে আসা সেই যুবকটির মতো নায় হয়।