ক্যাটেগরিঃ পাঠাগার

 

পড়ে শেষ করলাম কারেন আর্মস্ট্রং এর লেখা Islam : A Short History বইটির এর বাংলা অনুবাদ। অনুবাদক শওকত হোসেন। বইটি সংগ্রহ করেছিলাম এআইজি (গোপনীয়) মনিরুজ্জামান স্যারের কাছ থেকে। পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সে এআইজি (গোপনীয়) এর অফিসে একটি চমৎকার ক্ষুদ্র অথচ সম্মৃদ্ধশালী পুস্তক সংগ্রহ রয়েছে। এটা আমাদের পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের লাইব্রেরির অংশ নয়। এআইজিদের ব্যক্তিগত উদ্যোগে কেনা কিংবা উপহার দেয়া বইগুলো দিয়েই এ সংগ্রহশালা তৈরি।

যাহোক, কারেন আর্মস্ট্রং এর সাথে এ বইটির মাধ্যমেই আমার প্রথম পরিচয়। এটিই তার লেখা আমার প্রথম পঠিত বই। স্বদেশ প্রকাশনি থেকে ২০০৪ সালে বের হয়েছিল এ অনুবাদ গ্রন্থটি। তবে মূল বইটি প্রকাশিত হয়েছিল ২০০০ সালে।

একজন অমুসলিমের লেখা ইসলামের ইতিহাসে কি আছে, বইটি পড়ার আগে সেটাই ছিল আমার আগ্রহের মূল কারণ। হ্যাঁ, চমৎকার বই এটি। বইটির প্রথম অধ্যায়গুলোর চেয়ে শেষের অধ্যায়গুলো আমার কাছে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে। প্রথম থেকে চতুর্থ অধ্যায়ের মধ্যে ইসলামের আবির্ভাব, প্রতিষ্ঠা ও বিস্তারের আলোচনা আছে যেগুলো আমি ইতোপূর্বেই অন্যান্য বই থেকে পড়েছিলাম। শেষ তথা পঞ্চম অধ্যায়টির নাম দেয়া হয়েছে ‘প্রতিরুদ্ধ ইসলাম’। এখানে ‘পশ্চিমের আবির্ভাব (১৭৫০-২০০০)’, ‘আধুনিক মুসলিম রাষ্ট্র কী?’, ‘মৌলবাদ’, ‘সংখ্যালঘু হিসাবে মুসলিম’ ও ‘আগামীর সম্ভাবনা’ নামে পাঁচটি রচনা রয়েছে। এর বাইরেও পরিশিষ্টে একটা উপসংহার সংযোজন করা হয়েছে। এসব রচনাই আমার জন্য নতুন। এসব নিবন্ধে ইসলামের সাথে পাশ্চাত্য জগতের বৈরিতার অসার কারণগুলো উল্লেখ করা হয়েছে।

islamAshortStory

‘মৌলবাদ’ নামক নিবন্ধটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের ধারণার সংকীর্ণতা হল যে মৌলবাদকে আমরা কেবল ইসলামের উপরই আরোপ করে বসি। যার কারণ হল, পাশ্চাত্যের প্রচারণা ও আমাদের অজ্ঞতা। কিন্তু কারেন অর্মস্ট্রং এর মতে, মৌলবাদ এক বিশ্বজনীন ব্যাপার এবং আমাদের আধুনিকতার সমস্যাদির প্রতি সাড়া হিসেবে সকল প্রধান ধর্মবিশ্বাসের ক্ষেত্রেই তা আবির্ভূত হয়েছে। মৌলবাদী ইহুদিবাদ যেমন আছে, মৌলবাদী খ্রিস্টানিটিও আছে, মৌলবাদী হিন্দুধর্মমত, মৌলবাদী বৌদ্ধধর্ম, মৌলবাদী শিখধর্ম এমন কি মৌলবাদী কনফুসিয়বাদ পর্যন্ত আছে। বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের খ্রিস্টান জগতে প্রথম এ ধরনের ধর্ম বিশ্বাস আবির্ভূত হয়েছিল। এটা কোন ঘটনা চক্রের সংঘটন ছিল না। মৌলবাদ কোন মনলিখিক আন্দোলন নয়। মৌলবাদ সার্বজনীন।

লেখকের মতে, ইসলাম নিয়ে পাশ্চাত্য জগতের একদিকে ভয়, অন্যদিকে ঈর্ষা থেকেই ইসলামে মৌলবাদের উৎপত্তি হয়েছে। ভয় এই জন্য যে ইসলাম একটি দ্রুত বর্ধনশীল ধর্ম। অন্যান্য ধর্ম মতের চেয়ে এটা আধুনিক এবং ইসলাম অন্যান্য ধর্মগুলোর চেয়ে অনেক বেশি স্বয়ংসম্পূর্ণ। ইসলাম ধর্মে কেবল মানুষের আধ্যাত্মিক বিষয়াদি নিয়েই সীমাবদ্ধ থাকা হয়নি, বরং এখানে ইহজাগতিকতার বিষয়টি বিস্তারিতভাবেই আলোচিত হয়েছে।

যদিও আর সব ধর্মের ব্যাপারে পাশ্চাত্য বেশ উদার। ইসলামের ব্যাপারে তারা বড়ই অনুদার। ব্রিটেনে মুসলিমরা তাদের সন্তানদের জন্য পৃথক স্কুল প্রতিষ্ঠার অনুরোধ তুললে ক্ষোভ দেখা যায়, অথচ ইহুদি, রোমান ক্যাথলিক বা কুয়েকারদের জন্য বিশেষ স্কুলের বেলায় কেউই কোনও উচ্চ বাচ্য করে না। মুসলিমদের যেন পশ্চিম বাহিনী হিসেবে দেখা হয়, তারা যেন ব্রিটিশ সমাজকে ধ্বংসের ষড়যন্ত্র করছে। ক্রুসেডের সময় খ্রিস্টানরাই মুসলিম বিশ্বের বিরুদ্ধে একাধিক নৃশংস পবিত্র যুদ্ধের সূচনা করেছিল, অথচ এখন ইউরোপের শিক্ষিত পণ্ডিতরা মনে করে ইসলাম উৎপত্তিগতভাবে সহিংস এবং অসহিষ্ণু ধর্ম বিশ্বাস হিসেবে বর্ণনা করেছে।

বর্তমানে মিশরের ক্ষমতাসীনগণ জনপ্রিয় ব্রাদারহুড সরকারকে নাস্তানাবুদ করে যেমন তেমন একটি সরকার দাঁড় করিয়েছে। পূর্বে আলজেরিয়া, তিউনেসিয়া প্রভৃতি দেশের ইসলামী ভাবাপন্ন দলগুলো গণতান্ত্রিক উপায়ে ক্ষমতাসীন হলেও তাদের জোরপূর্বক ক্ষমতার বাইরে রাখা হয়েছে যে সব ঘটনা ক্রমান্বয়ে ঐসব দেশে মৌলবাদী ভাবধারার বিকাশ ঘটিয়েছে। আর মজার ব্যাপার হলো, পাশ্চাত্য এখন ঐসব মৌলবাদী চরমপন্থীদের দমনের জন্য মরিয়া হয়ে ক্ষমতাসীনদের মদদ দিচ্ছে। পাশ্চাত্য সবদিক দিয়ে বৈচিত্র্য ও নাগরিক মতের মূল্য দিলেও মুসলমানদের চিন্তা, চেতনা ও ধর্ম পালন কিংবা অর্থনীতি, রাজনীতির ক্ষেত্রে কোন বৈচিত্র্য বা ভিন্ন মতকে প্রশ্রয় দিতে চায় না। এসব বিষয়ই মুসলিম বিশ্বকে দ্রুত পাশ্চাত্য বিরোধীতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে, আর পাশ্চাত্য জগত মুসলিমদের আরো বেশি ঘৃণার বস্তুতে পরিণত করছে।

কারেন আর্মস্ট্রং এর বিশ্লেষণ অত্যন্ত বাস্তবধর্মী। একজন অমুসলিম হলেও তিনি মুসলিমদের বিরুদ্ধে অবৈধ, অনৈতিক ও সাম্রাজ্যবাদী অপপ্রচারের কারণটি  উদঘাটনে সক্ষম হয়েছেন।