মামলার জট কমানো ও দ্রুত মামলা নিষ্পত্তির জন্য অতি শিঘ্রই নাকি চালু হতে যাচ্ছে সান্ধ্যকালীন আদালত। গত ১ এপ্রিল সাভারে বিচারকদের এক কর্মশালায় মাননীয় প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা এ কথা জানিয়েছেন।
আমাদের দেশের আদালতগুলোতে মামলার জট সম্ভবত পৃথিবীর যে কোন দেশের চেয়ে বেশি । প্রধান বিচারপতির ভাষ্যমতেই তার সংখ্যা ত্রিশ লাখ। এত অধীক সংখ্যক বিচারাধীন মামলা নিয়ে আদালতকে সব সময় বিব্রতকর অবস্থায় থাকতে হয়। প্রতিনিয়তই এই সংখ্যা বাড়ছে। এটা কমাতে না পারলে অল্প দিনের মধ্যেই হয়তো আমাদের বিচার ব্যবস্থায় একটা ভূমিকম্প দেখা দিবে। বিচারিক প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতার ফলে আমাদের দেশের অনেক মানুষই ন্যায় বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এর ফলে এক দিকে অপরাধী তথা দুষ্ট লোকরা যেমন ধরাকে সরা জ্ঞান দাপিয়ে বেড়াচ্ছে,
তেমনি বিচার ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থাতেও চিড় ধরছে। তাই মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি করে মামলা জট কমানোর কোন বিকল্প নেই। সান্ধ্যকালীন বিচার প্রক্রিয়া আদালতগুলোতে মামলার জট কমানোর মাধ্যমে মানুষকে দ্রুত ন্যায় বিচার প্রদানেরই একটি প্রক্রিয়া বা কৌশলমাত্র।
পৃথিবীর অনেক দেশে,এমনকি আমাদের প্রতিবেশী ভারত ও নেপালেও নাকি সান্ধ্যকালীন কোর্ট চালু আছে। তাই আমাদের দেশে এ ব্যবস্থার বাস্তবায়ন নতুন কিছু নয়।
তবে আমাদের মনে রাখতে হবে, বিচারকের স্বল্পতা কিংবা বিচারিক কর্মঘন্টার সীমাবদ্ধতাই কিন্তু মামলা জটের একমাত্র কারণ নয়। এর সাথে নিম্নতম স্তরে পুলিশ থেকে শুরু করে উচ্চতম স্তরের বিচারিক আদালত পর্যন্ত সবারই কোন না কোন দায় রয়েছে। অন্যদিকে মামলার বাদী-বিবাদী-সাক্ষী থেকে শুরু করে মামলা পরিচালনাকারী আইনজীবীরাও এর দায় থেকে মুক্ত নয়। অধিকন্তু এর সাথে কতিপয় বিশুদ্ধ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড যেমন হরতাল , অবরোধ, ধর্মঘট ইত্যাদির সম্পৃক্ততা রয়েছে। রাজনৈতিক কর্মসূচির কারণে আদালত তার নির্ধারিত সময়ে বিচারকাজ সম্পাদন করতে পারেন না।
বিচারকের স্বল্পতা দেশের অন্যান্য সেকটরের কর্মকর্তা/কর্মচারীর স্বল্পতার মতো প্রকট। যদিও সরকার বিচারকের সংখ্যা বৃদ্ধির জন্য অনেক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে, তবুও এটার পর্যাপ্ততা এখনও অর্জিত হয়নি।
অন্যদিকে বিচার কার্যক্রমের জন্য অবকাঠামোগত সুবিধাও অপ্রতুল। অনেক স্থানে জেলা জজশিপের নতুন ভবন হলেও অনেক স্থানে তা নেই। আবার বিচারকের সংখ্যাবৃদ্ধির ফলে তাদের অফিসকক্ষ থেকে শুরু করে এজলাশের স্বল্পতা পর্যন্ত রয়েছে।
এখন যদি সান্ধ্যকালীন আদালত চালু করা হয় সেটা এক দিকে যেমন অবকাঠামোগত সুবিধাদি বাড়িয়ে দিবে ,অন্যদিকে বিচারের জন্য কর্মঘন্টাও বৃদ্ধি পাবে। আর যদি এসব আদালতের জন্য চুক্তিভিত্তিতে অতিরিক্ত বিচারক নিয়োগ করা হয়, সেটা অতিদ্রুততার সাথে এই সেকটরে জনবল বৃদ্ধিতেও সহায়তা করবে।
কিন্তু এক্ষেত্রে দুইটি সমস্যা প্রকট হতে পারে। প্রথমত, আমাদের আদালতসমূহের অবকাঠামোতে রাত্রিকালীন বিচারিক প্রক্রিয়া চালানোর মতো পর্যাপ্ত ব্যবস্থা হয়তো নেই। অবশ্য এটা অল্প খরচেই সমাধান করা যেতে পারে।
দ্বিতীয়ত, বিচার প্রক্রিয়া চলাকালীন আদালতের জন্য পর্যাপ্ত নিরাপত্তা প্রদান, আসামীদের আনা নেয়াসহ বড় ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণের প্রয়োজন হবে। এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বিচারালয়ের অধীক্ষেত্রে দায়িত্বরত পুলিশ প্রশাসনকে বাড়তি চাপ সামলাতে হবে। এজন্য আদালতের নিরাপত্তা থেকে শুরু করে অন্যান্য সংশ্লিষ্ট কাজেকর্মে নিযুক্ত পুলিশ সদস্যদের সংখ্যাও বাড়াতে হবে। এতে পুলিশও জনবল সংকটে পড়তে পারে।
বলাবাহুল্য, সান্ধ্যকালীন বিচারালয় চালুর জন্য সরকারসহ সংশ্লিষ্টদের দৈনন্দিন কর্মপদ্ধতি থেকে শুরু করে বাজেটিং পর্যন্ত সব স্থানেই কোন না কোন প্রকার পরিবর্তন, পরিবর্ধন, উন্নয়ন, সম্প্রসারণ কাজ করতে হবে। তবে সংশ্লিষ্ট সকল মহলের সদিচ্ছা, আন্তরিকতা ও পেশাদারিত্ব বজায় রাখলে এধনের একটি নতুন রেওয়াজ চালু করে সফল হওয়া সম্ভব।
সূত্রাবলীঃ
1. http://www.amadershomoys.com/newsite/2016/04/01/559385.htm
2.http://archive.samakal.net/2014/04/04/50343

কাজী শহীদ শওকত বলেছেনঃ
শতভাগ সহমত। নিঃসন্দেহে চমৎকার উদ্যোগ। সদিচ্ছা, আন্তরিকতা ও পেশাদারিত্বের জয় হোক।
অনেক ধন্যবাদ আপনাকে, রাজ্জাক ভাই।
জাহেদ-উর-রহমান বলেছেনঃ
রাজ্জাক ভাই,
আইন নিয়ে জ্ঞান কম। কমন সেন্স, আর কিছু তথ্য থেকেই কিছু কথা লিখতে ইচ্ছে হলো।
সান্ধ্য আদালত মামলা জট কমাতে বেশি কার্যকর হবে বলে আমার মনে হয় না। আমাদের মামলার দীর্ঘসূত্রিতার পেছনে তো পুরো সিস্টেমটার ডে আছে। হ্যাঁ বিচারক স্বল্পতা একটা কারণ বটেই। কিন্তু যতটা জানি, নিম্ন আদালতে প্রধানত আইনজীবী এবং কিছু বিচারক মিলে একটা চক্র তৈরী করেছে যাতে বিচারের দীর্ঘসুত্রিতা অনিবার্য। বিচার যত লম্বা আইনজীবীর ততো লাভ না? এদিকে ফৌজদারি অপরাধের ক্ষেত্রে পুলিশি তদন্তের ও তো দীর্ঘসূত্রিতা আছে – সিস্টেম বা পুলিশ স্বল্পতার কারণে।
সান্ধ্য আদালতের চাইতে অনেক বেশি কার্যকরী হতো পারতো ‘বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি’, যেখানে মামলা করার আগে দুই পক্ষকে নিয়ে এক ধরণের আরবিট্রেশন বাধ্যতামূলক করার কথা ছিল। বিগত আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ এটা নিয়ে বেশ উচ্চকিত ছিলেন, কিন্তু বিষয়টা খুব একটা এগোয়নি। অনুমান করি, এটা কাজ করেনি আইনজীবীদের কারণে।
এরশাদ অনেক খারাপ লোক সন্দেহ নেই, কিন্তু এই লোক নিম্ন আদালতকে উপজেলা পর্যায়ে আর বিভাগীয় পর্যায়ে হাইকোর্টের বেঞ্চ নিয়ে যাবার মতো গণমুখী পদক্ষেপ কি আইনজীবীদের নোংরা স্বার্থের কারণে বাতিল করতে হয়নি? তাই আমি মনে করি, এই বিষয়গুলোর সুরাহা না করে, সান্ধ্য আদালত করা সমস্যা সমাধানে খুব একটা প্রভাব ফেলবে না।
মোঃ আব্দুর রাজ্জাক বলেছেনঃ
ধন্যবাদ, জাহেদ। আমি নৈশকালীন আদালতকে বিচারের ক্ষেত্রে মামলার জট কমানোর অন্যতম একটি পথ বলেই উল্লেখ করেছি। এক্ষেত্রে বিচারিক কর্মঘন্টা ও বিচারক স্বল্পতাহেতুর কিছুটা লাঘব হবে। কিন্তু মামলা জট লাগানোর জন্য ক্রিয়াশীল অন্যান্য কারণগুলো অক্ষত থাকলে এতে তেমন বেশি ফল পাওয়া যাবে না।
বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির ধারণাটি আমরা নাড়াচাড়া করছি। কিন্তু এখনও কর্মক্ষেত্রে প্রয়োগ করতে পারিনি। কিন্তু এটাও প্রতিক্রিয়াশীল ব্যবস্থা। বিচার ব্যবস্থাকে জনমুখী করতে হলে আমাদের প্রতিরোধমূলক বা Proactive ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তিমূলক ব্যবস্থা হয়তো কিছুটা অবদান রাখবে। কিন্তু সবচেয়ে যুগান্তকারী যে ব্যবস্থাটা গ্রহণ করা যায়, সেটা হল কমিউনিটি পুলিশিং । এটা বাংলাদেশ পুলিশ তাদের সীমাবদ্ধ কর্তৃত্বের মধ্যেই করে যাচ্ছে। কিন্তু এটা এখনও আমাদের জাতীয় পর্যায়ে তেমন গুরুত্ব পায়নি। কমিউনিটি পুলিশিং এর আওতায় সমস্যার সমাধানমূলক কার্যক্রমই কেবল আমাদের সমাজে ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা করতে পারে বলে আমি মনে করি। কারণ যে ঘটনাগুলো শুরুতেই কিংবা ঘটনাগুলো গুরুতর হওয়ার আগেই যদি তা Win Win Situation তৈরির মাধ্যমে সমাধান করা যায়, সেটাই হবে সবচেয়ে লাভজনক, সবচেয়ে কম হয়রানিমূলক।
আর মামলার জট সংক্রান্ত সমস্যায় তদন্তের দীর্ঘসূত্রতা নিয়ে যে কথাটি প্রচলিত আছে সেটা আসলে শতভাগ অমূলক। কারণ, প্রতিবছর থানায় যে মামলাগুলো রুজু হয়, সেই বছরেই সেই সব মামলার শতকরা ৮৫-৯০ ভাগের তদন্ত শেষ হয়। এ সম্পর্কে আমার এ ব্লগের লেখাটা তদন্তের দীর্ঘসূত্রতা নয়, বিচারের দীর্ঘসূত্রতাই ন্যায় বিচারের প্রধান অন্তরায় – পুনর্বার পড়ার অনুরোধ করব।
নিতাই বাবু বলেছেনঃ
সন্মানীত মোঃ আব্দুর রাজ্জাক সাহেব,আমি এই বিডি নিউজ ব্লগটিমে অনেক দিন থেকে আপনার লেখা/নিবন্ধন গুলো পড়ে আসছি,কিন্তু কোন প্রকার মন্তব্য আমি দেইনি বা দিত সাহস ও পাইনি৷তার কারণ’টা হলো দাদা আপনি আইন বিষয়ে বেশী লেখেন,আর আইন বিষয়ে আমার ধারণা একেবারে নাই বললেও চলে৷দাদা আমি খুবই স্বল্প শিক্ষিত একজন মানুষ,তবু এই সন্ধ্যাকালীন আদালত চালুর ব্যাপারে চালু হলে লাভ হবে কি?দাদা আমাদের দেশে একটা চুরিচামারির মামলা যখন বছর গড়িয়ে যুগান্তর অতিক্রম করে সেখানে এইরূপ উদ্যোগ এর সুফল আমরা কতটুকু পাব সেটা’ই প্রশ্ন হয়ে উঠবে একদিন আমি মনে করি৷আমার মনে হয় দাদা বিচারক কাজে যদি সচ্ছ জবাবদিহিতা নিশ্চিন্ত হতো,তবে এই মামলা জটের সমস্যা দ্রুতগতিতে হ্রাস পেত৷ধন্যবাদ দাদা ভাল থাকবেন সারাজীবন এই কামনা রহিল৷
মোঃ আব্দুর রাজ্জাক বলেছেনঃ
ধন্যবাদ, নিতাই বাবু। আপনি নিজেকে অল্প শিক্ষিত বললেও আমি তা মনে করি না। রবীন্দ্রনাথকে যে কোলকাতা বিশ্ববিদ্যায় ইংরেজি জানা তো দূরের কথা সঠিক বাংলাই জানতনা বলে মনে করত, তারাইি একদিন আবার তাকে ডিলিট উপাধী দিয়ে রবীন্দ্রনাথকে নয়, নিজেদের ধন্য করেছিল। লেখক হতে হলে ডিগ্রির দরকার নেই বলেই মনে করি।
হ্যাঁ, বিচারের দীর্ঘসূত্রতার জন্যই এমনটি হয়। আমাদের আদালতগুলোতে নাকি ত্রিশ লাখ মামলার জট আছে। এত অধীক সংখ্যক বিচারাধীন মামলা নিয়ে আদালতকে সব সময় বিব্রতকর অবস্থায় থাকতে হয়। প্রতিনিয়তই এই সংখ্যা বাড়ছে। এটা কমাতে না পারলে অল্প দিনের মধ্যেই হয়তো আমাদের বিচার ব্যবস্থায় একটা ভূমিকম্প দেখা দিবে। সরকার বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন বলেই এটার সুরাহা করার নানা ধরনের পদক্ষেপ নিচ্ছে। সান্ধ্যকালীন আদালত তারই একটা ছোট্ট পদক্ষেপ মাত্র।
হ্যাঁ, আমার লেখার মধ্যে আইনি বিষয়াদি থাকে। কারণ আমি নিজেও আইনের লোক। আমি পুলিশিং বিষয়েই বেশি লেখি। ভিন্ন মাত্রার কিছু লিখা লিখলেও আমার ফোকাসটা কিন্তু থাকে আইন-শৃঙ্খলা ও পুলিশিং নিয়েই। আর আমি যেহেতু সাধারণ পাঠকদের জন্য লিখি তাই যতদূর সম্ভব সরল করেই লিখতে চেষ্টা করি। আমার মনে হয়, আইনি বিষয়াবলী দেখে দূরে না থেকে আমার লেখা পড়লে আপনার ভাল লাগবে। অনেক বিষয়েই আমি একটু ভিন্ন আঙ্গিকে ব্যাখ্যা দেয়ার চেষ্টা করি।
ধন্যবাদ আপনাকে।
নিতাই বাবু বলেছেনঃ
ধন্যবাদ দাদা প্রত্যুত্তরের জন্য,খুব ভাল লাগল দাদা আমার দেওয়া মন্তব্যের প্রত্যুত্তর৷দাদা আপনাদের ভালবাসায়’ই বিডি নিউজ ব্লগ টিমে আমার এই লেখা৷আশা রাখি আমার প্রতি এই ভালবাসা অব্যাহত থাকবে৷ধন্যবাদ দাদা ভাল থাকবেন সারাজীবন এই কামনা রহিল আমার৷