ক্যাটেগরিঃ ফিচার পোস্ট আর্কাইভ, শিল্প-সংস্কৃতি

 
15_Pohela+B0oishakh_piparation_110416_0020

বাংলা নববর্ষ উদযাপনের অবিচ্ছেদ্য অনুসঙ্গ হলো পান্তা-ইলিশ। কিন্তু ইলিশের দুষ্প্রাপ্যতার জন্য অনেকে পান্তা নিয়ে কিছু না বললেও ইলিশ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাদের কথা পান্তা খেতে বাঙালি অভ্যস্ত হলেও ইলিশ পান্তার সাথে জরুরী নয় কিংবা বাঙালিরা সেটা খেত না। শহুরের আনুষ্ঠানিকতায় নববর্ষ প্রবেশ করায় এক শ্রেণির টাউট-বাটপাড় আর অসাধু ব্যবসায়ী অবৈধভাবে লাভবান হচ্ছে। নববর্ষের নামে অযথাই দুষ্প্রাপ্য ইলিশকে সোনার হরিণ করে তুলেছে। তাই নববর্ষ বাঙালির জন্য এখন একটি ব্যয়বহুল অনুষ্ঠানে পরিণত হয়েছে যার সাথে আবহমান বাংলার সাদৃশ্য নয়, বৈসাদৃশ্যই বেশি।

এটা ঠিক যে সম্রাট মহামতি আকবরের অর্থ মন্ত্রী টোডরমলের পরামর্শে বাংলায় যখন সৌর বর্ষকে সরকারিভাবে স্বীকৃতি দেয়া হয়, তখন এমন জাকজমকের সাথে নববর্ষ পালিত হত না। নববর্ষের এই জাকজমকের সূচনা হয় মূলত পাকিস্তান আমলে ষাটের দশকে। এটা পাক সরকারের আনুকুল্য নয়, বরং আমাদের সংস্কৃতির উপর ন্যাক্কারজনক নির্যাতন, নিপীড়ন ও কৃত্রিমভাবে ইসলামীকরণের প্রতিবাদের ভাষা হিসেবেই এটা চালু হয়েছিল। আর উদীচী এটাকে এতটা জনপ্রিয় করে তুলেছে।

এখন প্রশ্ন উঠেছে, পান্তা-ইলিশ আমাদের ঐতিহ্যের অংশ কি না। আকবর কিংবা তার মন্ত্রীগণ পান্তা কিংবা ইলিশ খেতেন কিনা কিংবা আদৌ পছন্দ করতেন কিনা তা আমার জানা নেই। আমি বলব, তারা এটা পছন্দ করতেন না। কারণ আমার অভিজ্ঞতায় ইলিশ যেমন গাঙ্গেয় উপদ্বীপ তথা বঙ্গোপসাগর ও তার উপকূল এবং একে জলদায়ি নদ-নদীগুলোর নিজস্ব মাছ, তেমনি এ অঞ্চলের মানুষেরও এটা ব্যতীক্রমীভাবে পছন্দের মাছ। বাঙালিরা ছাড়া পৃথিবীর অন্যান্য অঞ্চলের মানুষ এতটা ইলিশ ভক্ত নয়। এমনকি অনেকে একে নিয়ে এত মাতামাতির বিপক্ষেও। তবে বাঙালির কাছে ইলিশ যে অত্যন্ত সুলভ একটি মাছ বরাবরই ছিল, সেটা নব্বইয়ের দশকেও সত্য ছিল যার সাক্ষী আমি নিজেই।

আর পান্তা তো ভাতের পচন রোধ করার বাঙালি কৌশল। অপচয়ের হাত থেকে ভাতকে রক্ষা করার জন্য ঠাণ্ডা ভাতে পানি দিয়ে পান্তা তৈরি করা হয়। শীতকালে দেখেছি ভাতে পানি না দিলেও তা সহজে পচে না। আর ঠাণ্ডার জন্য পানিযুক্ত ভাত খাওয়াও সহজ না।পান্তা আমাদের গ্রামের খেটে খাওয়া মানুষের সকালের নাস্তা। একটি পিঁয়াজ, দু একটি মরিচ আর কিছু নুন হলেই খেটে খাওয়া বাঙালির সকালের নাস্তা হয়ে যায়। তাই পান্তা আবহমান বাঙালির জন্য কোন বিলাশতা নয়, এটা তাদের প্রাত্যহিক খাবার।

বলাবাহুল্য, বিজ্ঞানের অগ্রগতি, সমাজের পরিবর্তন, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি ইত্যাদি কারণে বাঙালির জীবনযাত্রায় নানামুখী পরিবর্তন এসেছে। ধানের জাতে পরিবর্তনের জন্য কার্তিক এখন আর অভাব বা মঙ্গার মাস নয়। এখন কার্তিকে ফসল ওঠে। আবার আমন বাঙালির এখন আর প্রধান ফসল নয়। বাঙালির প্রধান ফসল এখন শীত কালে রোপন করা আর বৈশাখ মাসে ঘরে তোলা ইরি বা উফসি ধান। অতএব নবান্নের ধারণাটি বাঙালি কৃষকের কাছে অনেকটাই পাল্টে গেছে।

কিন্তু কৃষকের কাছে কোন উৎসবের সময় পাল্টে গেলেও সাংস্কৃতিক কর্মীদের কাছে এগুলোর আবেদন এখনও ফুরায়নি। আবহমান বাংলার আচার-অনুষ্ঠানগুলো এখন শহুরে মানুষদের ড্রয়ই রুমে কিংবা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ক্যাম্পাসে আশ্রয় পেয়েছে। অন্য দিকে বনের গাছকে রুচিমত সাজিয়ে, অনেক সময় দেশের নানা প্রান্ত থেকে এমনকি বিদেশ থেকেও নতুন জাতের গাছ বা চারার এনে বাগানে রোপন করে প্রয়োজনমতো যেমন বাগান তৈরি করা হয়, তেমনি কোন জাতির সদস্যদের মধ্যে ছড়িয়ে ছিঁটিয়ে থাকা আচার, আচরণ ও উৎসব-পার্বণগুলোকে শহুরে পরিবেশে বা সাংস্কৃতিক রুচিতে তুলে ধরলেও তার সৌন্দর্য বাড়ে।

অনুশীলনের মাধ্যমে যেমন নতুন কোন সাংস্কৃতিক আচরণকে সার্বজনীন ও জনপ্রিয় করে তোলা যায়, তেমনি অনুশীলন করা না হলে অনেক আচরণ বা পার্বণেরও মৃত্যু ঘটে। আবার অনুশীলনের মাধ্যমে কোন মৃতপ্রায় উৎসব বা সাংস্কৃতিক আচরণকে পুনজীবনদানও করা যায়।

পান্তা ইলিশ বাঙালির নববর্ষের প্রাথমিক পর্যায়ে হয়তে ছিল না। আমাদের গ্রাম বাংলার মানুষ বর্তমানে নিশ্চিতভাবে পান্তা পেলেও ইলিশ যে পাচ্ছে না, সেটা অস্বীকার করার কোন উপায় নেই। কিন্তু অতীতে তারা যে ইলিশ খাওয়ার সামর্থ্য রাখত না, সেটা সঠিক নয়।আমার নিজের অভিজ্ঞতায় এটার সমর্থন নেই। এমনকি নব্বইয়ের দশকে ১৯৯৫/৯৬ সালেও ইলিশ মাছ ব্রয়লার মুরগীর চেয়েও সস্তা ছিল। মনে পড়ে, আমি সেই সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ চুকিয়ে হল ছেড়ে দিয়ে একটি মেসে উঠেছিলাম। গরু, বকরি, মুরগী খেয়ে খেয়ে যখন মেসের মিল চার্জ বেশি হয়ে যেত, তখন মেসের মিল চার্জ কমানোর জন্য আমরা পর পর কয়েক দিন ইলিশ মাছ খেতাম। কারণ সকল প্রকার আমিষের উৎসের মধ্যে ইলিশ মাছই ছিল তখন সস্তা।

তাই পান্তা-ইলিশ নতুন সংযোজন হলেও সেটা যে আমাদের সামর্থ্যের সাথে বর্তমানের মতো অতীতে একদম মানানসই ছিল না তা ঠিক নয়। হয়তো আগের মতো আর ভাত সংরক্ষণের জন্য পান্তা করার প্রয়োজন হয় না। কারণ এখন বর্তমানে গ্রাম দেশেও রিফ্রিজেটার চলে গেছে। কিন্তু তাই বলে পান্তার প্রচলন যে গ্রাম দেশ থেকে উঠে গেছে কিংবা শহুরে মানুষগণ পান্তা খাওয়াকে একদিনের বাঙালি হওয়ার আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ করেছে সেটা আমি কোনভাবে মানতে পারি না। এখনও বাংলাদেশের অনেক শহুরে মানুষ নিয়মিত না হলেও মাঝে মধ্যেই পান্তা খান। বলাবাহুল্য, এ ধারাটি আমার পরিবারেও প্রচলিত আছে।

তাই পান্তা-ইলিশ নিয়ে কোন বিতর্ক অর্থহীন। একশ বছর আগে এটা চালু হয়নি বটে, কিন্তু যে আচারটি গত পঞ্চাশ/ষাট বছর থেকে চর্চিত হয়ে আসছে তাকে আমাদের সংস্কৃতির অংশ নয় বলে দাবি করাটা আর যাই হোক সংস্কৃতিপ্রেম হতে পারে না।

 

(০৯ এপ্রিল, ২০১৬, ইউএন হাউজ, জুবা, দক্ষিণ সুদান)