ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

সম্প্রতি গণমাধ্যমের একটি বড় খবর অভিজ্ঞ মহলে তেমন কোন গুরুত্ব পায়নি বলে আমি মনে করি। খবরটি হল, ভুয়া ক্রসফায়ার: ৪৭ ভারতীয় পুলিশের যাবজ্জীবন।

ঘটনাটি আজ থেকে প্রায় সিকি শতাব্দী আগের। ১৯৯১ সালের ১২ জুলাই, ভারতের উত্তর প্রদেশের পিলিভিতে একটি বিলাসবহুল বাস থামায় পুলিশ সদস্যরা। বাসটি শিখ তীর্থযাত্রীতে পূর্ণ ছিল। কয়েকটি পরিবারের নারী ও শিশুদের রেখে ১০ পুরুষ যাত্রীকে বাস থেকে নামতে বাধ্য করে পুলিশ। অল্প সময়ের মধ্যে ঘটনাস্থলে আরো পুলিশ এসে যোগ দেয়ার পর তারা ওই ১০ জনকে কয়েকটি দলে ভাগ করে। এরপর তাদের জঙ্গলে আলাদা আলাদা জায়গায় নিয়ে গিয়ে ঠাণ্ডা মাথায় গুলি করে হত্যা করে। ঘটনার পর পুলিশ হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে মিথ্যা বিবৃতি দেয়। বিবৃতিতে পুলিশ দাবি করে, নিহত শিখেরা চরমপন্থি এবং ঘটনার সময় সশস্ত্র অবস্থায় ছিল। ১৩ জুলাইয়ের ওই বিবৃতিতে, ‘এনকাউন্টারে’ খালিস্তানপন্থি ১০ সন্ত্রাসী নিহত হয়েছেন বলে দাবি করে পুলিশ। এসব ‘সন্ত্রাসীর’ ‍বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা ছিল বলেও দাবি করা হয়।

কিন্তু এ পাইকারি এনকাউন্টারের যাবতীয় কর্মকাণ্ডই ছিল পুলিশি ধোকাবাজি। তবে পুলিশ কর্তৃপক্ষ সরকারকে কোন প্রকারে ‘ম্যানেজ’ করে কিংবা তারা স্বেচ্ছায় ‘ম্যানেজ’ হয়েই ছিল। তাই পুলিশের বিরুদ্ধে মামলাও হচ্ছিল না। অবশেষে ভারতের সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশে সেদেশের কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা সিবিআই মামলাটির তদন্ত করে। সিবিআইয়ের তদন্ত মতে এই ১০ নিরীহ তীর্থযাত্রীকে হত্যার পিছনে পুলিশ সদস্যদের ‘রাষ্ট্রীয় পুরস্কার অর্জন’ ও ‘সন্ত্রাসী’ হত্যার কৃতিত্ব জাহির করাই মূখ্য উদ্দেশ্য ছিল।

ভারতের মতো একটি অগ্রসরমান গনতান্ত্রিক দেশে,যেখানে উচ্চ আদাতসহ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো অনেকটাই পরিপক্ক হয়েছে, সেখানে ভুক্তভোগীদের ন্যায় বিচার পাওয়ার রাস্তাটি খোলাই থাকে। পাপ যে বাপকেও ছাড়ে না, ভারতের উচ্চ আদালত তা প্রমাণ করেছে। এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ৫৭ জন পুলিশ সদস্যকে অভিযুক্ত করা হয়। কিন্তু এদের মধ্যে ১০ জন রায় ঘোষণার আগেই মারা গিয়ে বেঁচে গিয়েছেন। আর জীবিত ৪৭ পুলিশ সদস্যকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডসহ জরিমানাও করা হয়েছে। যে পুলিশের পক্ষে গোটা রাজ্য সরকার ছিল সেই পুলিশকেই একটি বিশেষ আদালতের রায়ে এখন যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের শাস্তি ভোগ করতে হচ্ছে।

বিডিনিউজ২৪.কম থেকে শুরু করে প্রায় সব কয়টি দৈনিকে ভারতের প্রচার মাধ্যমগুলোর বরাত দিয়ে এ খবরটি ছাপা হলেও এ নিয়ে দেশে বিদেশে তেমন কোন আলোচনা-সমালোচনা দেখি না। ক্রসফায়ারের নিত্যদিনের খবরের মতো এটাও যেন সবার গা-সওয়া হয়ে গেছে। কিন্তু অপরাধ প্রতিরোধের একজন কর্মী ও অপরাধ বিজ্ঞানের ন্যূনতম পাঠধারী হিসেবে আমি এ খবরটিকে উপেক্ষা করতে পারিনি। এর উপর আমার প্রতিক্রিয়া বা পর্যালোচনা তাই অনিবার্য ছিল বলেই মনে করি।

বলতে বাধা নেই, রাখঢাকও নেই, এমনকি লজ্জাও নেই যে বিশ্বব্যাপী আমজনতা, এমনকি কিছু কিছু অদূরদর্শী শিক্ষিত, তথাকথিত সচেতন মানুষের কাছেও ক্রসফায়ার বা এনকাউন্টার একটি অতি জনপ্রিয় পুলিশি প্রক্রিয়া। কথিত সন্ত্রাসীদের ধরে এনে তৎক্ষণাৎ যমঘরে পাঠান জনগণের কাছে একটি কঠিন কাম্য বস্তু। দেশে-বিদেশে কেথায় জনগণ এই শর্টকার্ট পদ্ধতিটিকে স্বতঃস্ফূর্ত অনুমোদন দেয়নি, তা বলাই মুসকিল। কিন্তু জনগণের এ স্বতঃস্ফূর্ততা আবার কালের প্রবাহে ফ্যাকাসে হযে যায়। ক্রমান্বয়ে এটাকে মানুষ ভিন্ন চোখে দেখতে শুরু করে। প্রথম দিকের পাইকারি সমর্থন আর শেষ দিকে বজায় থাকে না। যে জনগণ একদিন কথিত সন্ত্রাসীদের জনসম্মুখে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে মারাকে শুধু সমর্থনই করত না, পুলিশকে বাহবা দিত, কালক্রমে তারাই পুলিশকে ঘাতক হিসেবে বিশ্বাস করতে শুরু করে; পুলিশের বিরুদ্ধে বিশ্লেষণধর্মী কলাম লেখে পত্রিকায়, টকশোতে পুলিশকে তুলোধুনো করে, নির্দ্বিধায় দাঁড়ায় আদালতের সাক্ষীর বেদিতে । বিষয়টি এমন, যেন তারা সবাই মিলে মারদাঙ্গা ছবির শুটিং দেখছিলেন। কিন্তু পুলিশ যে আসলেই বিনা বিচারে একজন নাগরিককে হত্যা করছে, সেটা তারা বুঝতেই পারেনি।

কিন্তু আইন প্রয়োগে এ বেআইনি পদ্ধতিটি যে সব সময় একইভাবে কর্তাব্যক্তিদের পছন্দ বা অনুমোদনের তালিকায় থাকে না, সেটা আমজনতা তো বটেই, এমনকি যারা এই ক্রসফায়ারকর্মে নিজেদের সাচ্চা দেশপ্রেমিক, জনদরদী ও সমাজপ্রেমিক বলে দাবি করেন, তারাও জানেন না। জানলেও সঠিকভাবে উপলব্ধি করতে পারেন না। তাই তো নিজের তৈরি করা জালে বাচ্চা প্রসবকারী ঊর্ণাভের মতো তারা নিজেরাই আটকা পড়ে মৃত্যুর প্রহর গোনেন। যে সরকারের এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য তারা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড চালান কিংবা যে আইনকে রক্ষা করতে তারা আইন ভঙ্গ করেন, কালক্রমে তারা নিজেরাই সেই আইনের হাতে ধন-মান-ইজ্জত-কর্তৃত্বদায়ী চাকরি খানা এমনকি স্রষ্টা প্রদত্ব জান খানাও খুইয়ে বসেন। এ শর্টকার্ট পুলিশি পদ্ধতি কিভাবে পুলিশ অফিসারদের জন্য গলার ফাঁস হয়ে দাাঁড়ায় তার চলমান ও জ্বলন্ত উদাহরণ হল, ভারতের উত্তর প্রদেশ পুলিশের এই ৪৭ সদস্যের কারাদণ্ড।

এ ঘটনাটি ছিল ভূয়া এনকাউন্টার। মানে যাদের হত্যা করা হয়েছে তার সন্ত্রাসী ছিলেন না কিংবা তাদের সাথে সন্ত্রাসী গ্রুপের কোন সংশ্রবও ছিল না। কিন্তু যদি তারা প্রকৃত পক্ষেই সন্ত্রাসী হত তাহলেও তো কাজটি আইনসম্মত হত না। অর্থাৎ বিনা বিচারে তাদের হত্যা করা কোনভাবেই সমর্থনীয় ছিল না। প্রকৃত এনকাউন্টার কিংবা সাজান এনকাউন্টারে যেখানে স্বীকৃত সন্ত্রাসীরা মারা যায়, সে ঘটনাগুলোও কি পুলিশের জন্য নিরাপদ? এক আমলের অনুমোদিত অথচ আইনবহির্ভুত এ হত্যাকাণ্ডগুলো কি কখনই বর্ষার প্রথম বর্ষণের সাথে সাথেই অঙ্কুরোদ্গম করবে না? হ্যাঁ, করবে। এবার এর সপক্ষে কয়েকটি উদাহরণ দিব।

ভারতের মহারাষ্ট্রের এনকাউন্টার মাস্টার হলেন দয়া নায়েক। তিনি ১৯৯৫ সালে পুলিশের জীবন শুরু করে ২০০৬ সাল পর্যন্ত ৮৩ জনেরও বেশি কথিত সন্ত্রাসীকে হত্যা করেছেন। কিন্তু রাষ্ট্রের জন্য তিনি যতই কাজ করুন, ব্যক্তিগত জীবনে তিনি তেমন সুখে থাকতে পারেননি। তাকে অবৈধ সম্পদ আহরণ, সন্ত্রাসীদের সাথে গোপন যোগাযোগ ইত্যাদি অভিযোগে শেষ পর্যন্ত হাজতবাসও করতে হয়েছে। তিনি চাকরি থেকে দুবারেরও বেশি বরখাস্ত হয়েছিলেন। যদিও এ এনকাউন্টার স্পেশালিস্ট ভারতের বেশ কয়েকটি ব্লক বাস্টার ফিলমেরও বিষয় বস্তু (যেমন অব তক ছাপ্পান্ন) হয়েছেন, তবুও তার শেষ জীবন কিভাবে কাটবে তা বলা মুসকিল। অব তক ছাপ্পান্ন ছবির নায়ক নানা পাটেকারও শেষ পর্যন্ত চাকরি ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছিলেন।

শ্রীলঙ্কায় বিংশ শতাব্দীর আশির ও নব্বইয়ের দশকে তামিল গেরিলাদের বিরুদ্ধে তুমুল গৃহযুদ্ধ চলে। এ সময় সরকারি বাহিনী ও তামিল ইলাম বা এলটিটিই– উভয়পক্ষই ব্যাপক হারে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, গুম, খুন, অপহারণ ইত্যাদি বেআইনি কর্মকাণ্ডের আশ্রয় গ্রহণ করে। তৎকালীন সরকার নিরাপত্তাবাহিনীর এ ধরনের কার্যক্রমকে অনেকটাই বৈধতা দিয়েছিল। কিন্তু কালের প্রবাহে সরকারের সিদ্ধান্ত এক রকম থাকেনি। তামিলদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ জয়ের পরে সরকার মানবাধিকার রক্ষায় সচেষ্ট হয়। এ সময় সামনের দিকে উঠে আসে দেশের উত্তরাঞ্চলে তামিল অধ্যূষিত জাফনাসহ অন্যান্য এলাকায় গুম হওয়া ব্যক্তিদের স্বজনদের অভিযোগগুলো। সরকার গুম হওয়া ব্যক্তিদের সম্পর্কে তদন্তের জন্য একটি কমিশন গঠন করে। কমিশনে প্রায় সাড়ে আঠার হাজার অভিযোগ জমা পড়ে যাদের মধ্যে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর বিরুদ্ধে পড়েছে পাঁচ হাজারের মত অভিযোগ। উচ্চ পর্যায়ের এ কমিশন এখন সে সব পুলিশ ও সেনা অফিসারদের বিরুদ্ধে অপহরণ, গুম ও খুনের অভিযোগ তদন্ত করছেন। ১৯৮৩ সাল থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত যেসব কর্মকর্তা ‘ধরাকে সরা জ্ঞান’ করতেন তারা এখন ইয়া নফসি, ইয়া নফসি করছেন। তারা এখন অবসর জীবনে এসে ফাঁসিকাষ্ঠে যাবার মত দুঃস্বপ্নে কাতর।

একই রকম ঘটনা ঘটেছিল ভারতের কাস্মীর ইসু নিয়ে। কাস্মীরিদের সাথে গৃহযুদ্ধে ব্যাপক হারে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড চলে। তৎকালীন সরকার এ সব কর্মকে যুদ্ধাবস্থায় বৈধতা দিলেও শান্তিকালীন অবস্থায় সেগুলোর পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত করে। এর ফলে বেশ কিছু উচ্চ পদস্থ পুলিশ কর্মকর্তাকেও পদচ্যূত হতে হয়েছিল।

বলা বাহুল্য, ক্রসফায়ার বা এনকাউন্টারকে জনপ্রিয় করে তোলার জন্য গণ মাধ্যমগুলোও বেশ বড় ভূমিকা পালন করে। এর কারণ প্রচার মাধ্যমগুলো সাধারণত আমজনতার তাৎক্ষণিক চাহিদা পূরণে অভ্যস্ত। বিচার ব্যবস্থ্যার দুর্বলতার জন্য জনগণ সঠিক সময়ে সঠিক বিচার পান না বলে বিশ্বাস করেন। তারা সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, অপহরণ, হত্যা ইত্যাদি অপরাধের শিকার হওয়া কিংবা এসব খবরের পরবর্তী ভীতেতে সর্বদা সন্ত্রস্ত থাকেন।তারা এ ধরনের অবস্থা থেকে আসু উত্তরোণের পথ খোঁজেন। কিন্তু বিচার ব্যবস্থার দুর্বলতা তাদের এ প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হয়। তাই তারা যে কোন প্রকারেই কথিত সন্ত্রাসীদের দৃশ্যপট থেকে বিদায় হওয়াকে সমর্থন করেন। আর প্রচার মাধ্যমগুলো তাদের চটকদার খবরের মাধ্যমে জনগণের সেই অবৈধ অথচ যৌক্তিক প্রত্যাশারO গোড়ায় প্রত্যহ পানি ঢালতে থাকে।

নাকট, সিনেমা, উপন্যাসে আন্ডারওয়ার্ডের গড ফাদারগণ যেমন কেন্দ্রীয় চরিত্রে চলে আসেন, তেমনি তাদের বিরুদ্ধে বিচারবহির্ভূত কর্মকাণ্ড পরিচালনাকারী পুলিশ অফিসারগণও তাদের কাহিনীর নায়কে পরিণত হন। এসব ফিলম বা নাটক উপন্যাসও নানাভাবে আমজনতাকে ক্রসফায়ার বা এনকাউন্টারের গোড়া সমর্থক হিসেবে গড়ে উঠতে সহায়তা করে। কিন্তু নাটক বা চলচ্চিত্রের নায়কদের শেষ পর্যন্ত যে দুরবস্থা হয়, বাস্তবের এনকাউন্টার স্পেশালিস্টগণ তার চেয়ে কোন অংশেই কম দুরবস্থায় পড়েন না।

যারা কথিত অপরাধীদের আইনের প্রাপ্য পদ্ধতিতে বিচারের সম্মুখিন হওয়ার ন্যূনতম সুযোগটুকুও দিতে রাজি হন না, কালক্রমে তারাও যে একইভাবে ন্যায় বিচার বঞ্চিত হতে পারেন কিংবা আইনের প্রাপ্য সুযোগটুুকু গ্রহণ করার পরেও তাদের কৃতকর্মের জন্য শাস্তিভোগ করতে পারেন– এ উপলব্ধি সারা বিশ্বের আইন প্রয়োগকারীদের অন্তরে আসা তাই একান্ত জরুরি। (১৯ এপ্রিল, ২০১৬, ইউএন হাউজ, জুবা, দক্ষিণ সুদান)