ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

দৈনিক কালের কণ্ঠ পত্রিকায় প্রকাশ, গাজীপুর মহানগরীর হায়দারাবাদ পশ্চিম হাজীপাড়া এলাকার বাসিন্দা নুরুল ইসলামের ছেলে রুবেলকে বিয়ের অনু্ষ্ঠান থেকে গ্রেফতার করতে গিয়ে পুলিশ বরের দুই পায়ের নালাই নাকি ভেঙ্গে দিয়েছে। ঐ রাতে ছিল রুবেলের গায়েহলুদ, তারপর দিন বিয়ে ও তার পরের দিন ছিল বউ ভাতের অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠেয় বৌভাতের প্রস্তুতিও ছিল চূড়ান্ত পর্যায়ে। কিন্তু গায়েহলুদ অনুষ্ঠানের আগের রাতেই পুলিশি হানায় সব হয়েছে পণ্ড। পুলিশ পিটিয়ে দুই পায়ের হাড় ভেঙে দিয়েছে বর মোহাম্মদ রুবেলের (২৫)। রাতের বেলায় সংঘটিত নিষ্ঠুরতার এ ঘটনায় ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী দুই এসআই ও চার পুলিশ সদস্যকে আটকে রেখেছিল ঘটনাস্থলে। পরে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা পৌঁছে সুষ্ঠু তদন্তের আশ্বাসে তাঁদের উদ্ধার করেন।

রুবেল টঙ্গীতে একটি কেবল টিভি অফিসে চাকরি করে। রুবেলের বিয়ে উপলক্ষে বাড়িতে চলছিল নানা আয়োজন। বাড়ির সামনে তৈরি করা হয়েছিল গেট। অতিথিদের বসার জন্য আনা হয়েছিল চেয়ার-টেবিল। বাজার-সদাইয়ের সঙ্গে কেনা হয়েছিল গরু। গায়েহলুদের আগের রাতে আকস্মিক পুলিশ হানা দেয় ওই বাড়িতে। বর রুবেলকে একটি মামলার আসামি হিসেবে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চালায়। জয়দেবপুর থানার এসআই আলী আকবর ও এসআই ফিরোজ মিয়া সঙ্গের পুলিশ সদস্যদের পাশাপাশি মামলার বাদীকেও মারপিটের সুযোগ করে দেন। পুলিশের নির্যাতনে একপর্যায়ে রুবেল অচেতন হয়ে পড়লে এলাকাবাসী পুলিশ সদস্যদের আটকে ফেলে।

তবে ঘটনার ভিন্ন ব্যাখ্যাও আছে। জয়দেবপুর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মাহফুজুর রহমান বলেন, ‘পুলিশ দেখে আসামি রুবেল পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। দৌড়ানোর সময় রেললাইনে আছাড় খেয়ে পড়ে গিয়েছিল। এতে তার পা ভাঙতে পারে। কিন্তু রুবেলের পা যেভাবেই ভাঙ্গুক না কেন, তার পা যে ভেঙ্গেছে এবং সে যে এখন ঢাকার পঙ্গু হাসপাতালে চিকিৎসাধীন এটা সত্যি।

এখন প্রশ্ন হল, বিয়ের আসরে কিংবা গায়েহলুদের অনুষ্ঠfন থেকে রুবেলকে গ্রেফতার করতে যাওয়া পুলিশের উচিৎ ছিল কি না। যদি না হয়, তাহলে তারা সেখানে কেন গেল? নিশ্চয়ই প্রতিপক্ষের দ্বারা প্রভাবিত হয়েই সেখানে গিয়েছে? রুবেলের বাবার ভাষ্য মতে, এলাকার চাল ব্যবসায়ী সোহেল রানা ও তাঁর ভগ্নিপতি রহিমের সঙ্গে বিরোধ চলছিল। তাঁরা কয়েক মাস ধরে রুবেলের বিরুদ্ধে নানা মিথ্যা অভিযোগ করছিলেন। একাধিকবার কাউন্সিলরের কাছে অভিযোগ করেছেন, কিন্তু প্রমাণ হয়নি। গত সপ্তাহে মারপিটের মিথ্যা অভিযোগ নিয়ে থানায় যান সোহেল রানা। জয়দেবপুর থানার এসআই অজয় কুমার এলাকায় এসে ঘটনা তদন্ত করেন এবং সত্যতা না পেয়ে ফিরে যান। কিন্তু বুধবার রাতে এসআই আলী আকবর রুবেলকে গ্রেপ্তার করতে আসেন এবং জানান, মারপিটের মামলা হয়েছে।

বস্তুত ঐ মামলার আসামী হওয়াই রুবেলকে পুলিশ গ্রেফতার করতে গিয়েছিল। তার মানে হল, পুলিশ সটিক কাজটি করার জন্যই গিয়েছিল। এজাহারভুক্ত মামলার আসামী হলে পুলিশ যে কোন ব্যক্তিকে আইনগতভাবেই গ্রেফতার করতে পারে। অর্থাৎ পুলিশের এক কাজ বৈধ ছিল, ছিল আইনসিদ্ধ ।

হ্যাঁ, স্বাভাবিক প্রশ্ন আসতে পারে, আইনগত কাজ করতে গিযে কোন আসামির পা ভেঙ্গে দেয়া যায় কি না। আইনের কথা হল, না। আসামীকে গ্রেফতার করতে গিয়ে বল প্রয়োগ অত্যাবশ্যক নহে। তবে একই সাথে এটাও ঠিক কোন আসামীর গ্রেফতার কার্যকর করার জন্য যতটুকু বল প্রয়োগ করা আবশ্যক পুলিশ কিন্তু তাও করতে পারে। এমনকি গ্রেফতার কার্যকর করতে গিয়ে যদি কোন ব্যক্তির প্রতি গুলি ছুড়তে হয় বা অন্য কোন উপায়ে মারাত্মক বল প্রয়োগ করা হয়, আইনগতভাবে তাও পুলিশের জন্য বৈধ। তবে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড কিংবা মৃত্যুদণ্ডযোগ্য অপরাধে জড়িত না হলে পুলিশ গ্রেফতার কার্যকর করতে গিয়ে কোন ব্যক্তির মৃত্যু ঘটাতে পারে না। তার মানে গ্রেফতার কার্যকর করতে গিয়ে ক্ষেত্রমতে পুলিশ কোন ব্যক্তিকে নিহতও করতে পারে।

কিন্তু কোন কাজ আইনগতভাবে সঠিক হলেও জনপ্রত্যাশিত কিংবা জনঅনুমোদতি নাও হতে পারে। তাই পুলিশকে সব সময় এমনভাবে কাজ করতে হয় যেন জনগণের প্রাত্যাশা যতদূর সম্ভব পূরণ হয়। এজন্য পুলিশকে, বিশেষ করে তদন্তকারী কর্মকর্তাদের ফৌজদারি কার্যবিধিতে প্রভূত ক্ষমতা, কর্তৃত্ব ও স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ দেয়া হয়েছে।

এবার আসুন আমরা জয়দেবপুর থানা পুলিশের রুবেল গ্রেফতার অভিযানটি আইন,বিধি, জন প্রত্যাশা ও আইনের ফাঁকে ফাঁকে তদন্তকারী কর্মকর্তাকে দেয়া স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেবার সুযোগগুলোকে পর্যালোচনা করি।

পূর্বেই বলা হয়েছে, কোন এজাহারভূক্ত আসামীকে তদন্তকারী কর্মকর্তা কিংবা তার দ্বারা নির্দেশিত যে কোন পুলিশ কর্মকর্তা গ্রেফতার করতে পারেন। তাই রুবেলকে গ্রেফতার করতে যাওয়া আইনগতভাবে শতভাগ সঠিক ছিল। কিন্তু একই সাথে এটাও ঠিক যে কোন ব্যক্তির নামে মামল হলেই তিনি যে অপরধী হয়ে যাবেন, মানে, তদন্তে তার বিরুদ্ধে অপরাধ প্রমাণিত হবে এমন তো নিশ্চয়তা নেই। পুলিশ তদন্ত করে অপরাধের। কোন ব্যক্তির তদন্ত করে না। তাই তাকে প্রথমেই খুঁজে বের করতে হবে অপরাধটি আসলে ঘটেছিল কিনা। আলোচ্য ঘটনায় রুবেলের বাবার দেয়া তথ্যমতে মামলাটি ছিল প্রতিহিংসা বা হয়রানিমূলক। বাদী ও বিবাদী পুলিশের কাছে অজানা ছিল না। তাই অপরাধটি সংঘটিত হয়েছিল কিনা সেটা আবিষ্কার করাই তদন্তকারী কর্মকর্তার সর্ব প্রথম কর্তব্য ছিল। কিন্তু এখানে আমরা দেখতে পাচ্ছি তদন্তকারী কর্মকর্তা আসলে অপরাধ উদ্ঘাটনের চেয়ে কথিত অপরাধীকে গ্রেফতারের কাজটিই আগে করতে চেয়েছিলেন।

ঘটনার নানামাত্রিক বর্ণনা আছে। রুবেলের পাদুটো পুলিশ, না পুলিশের সাথে থাকা তার প্রতিপক্ষ মারপিট করে ভেঙ্গেছিল কিংবা পালাতে গিয়ে গর্তে পড়ে ভেঙ্গেছিল তা পরিষ্কার না। কিন্তু এখানেও কিছু প্রশ্ন এসে যায়। রুবেলের বিরুদ্ধে প্রতিপক্ষের মামলার যে ধরন তাতে তাকে গ্রেফতারের ক্ষেত্রে পুলিশ বল প্রয়োগ করতে পারলেও পা ভেঙ্গে দেয়ার মতো বড় ধরনের বল প্রয়োগ করার আইনি সুরক্ষার অধিকারী নয়। অন্যদিকে, যদি রুবেলের প্রতিপক্ষই পুলিশের সাথে থেকে রুবেলের পা ভেঙ্গে দেয়, সেটাও অমার্জনীয়। কারণ গ্রেফতারকৃত কিংবা গ্রেফতার করতে উদ্দত ব্যক্তির নিরাপত্তার ভার পুলিশের উপর। আর যদি সে পালাতে গিয়ে পা ভেঙ্গে ফেলে এবং পুলিশ যদি তাকে গ্রেফতার করতে সমর্থ হয়, তবে পুলিশের প্রথম আইনি কর্তব্যই হল, গ্রেফতারকৃত আহত আসামীর চিকিৎসার ব্যবস্থা করা। এ ক্ষেত্রে এর কিছুই করা হয়নি। তাই রুবেলকে গ্রেফতার চেষ্টাকালীন পুলিশের কার্যক্রম সঠিক ছিল না বলেই আমি মনে করি।

এখন আসা যাক গায়ে হলুদ কিংবা বিয়ের আসর থেকে কোন আসামীকে গ্রেফতার করা সঠিক কিনা। আগেই বলেছি আইনগতভাবে এক কাজ সঠিক। কিন্তু সঠিক কাজটি করার জন্য পুলিশকে সঠিক কৌশলও অবলম্বন করতে হয়।যেমন বিক্ষুব্ধ অবৈধ জনতাকে ভাংচুর, রাস্তা অবরোধ ইত্যাদি কাজ থেকে বিরত রাখা পুলিশের পেশাগত দায়িত্ব, আইনগত তাগিদ। কিন্তু তাই বলে এমন ধরনের জনতাকে নাঙ্গা হাতে কোন প্রকার লাঠি, ঢাল, বন্দুক-বুলেট ছাড়া প্রতিরোধ করতে যাওয়া পুলিশের জন্য বিজ্ঞোচিত নয়।

অন্য দিকে আসামী গ্রেফতারের ক্ষেত্রেও পুলিশকে অগ্রাধিকার নির্ধারণ করতে হয়। কারণ রুবেল এমন কোন মামলার আসামী ছিল না যে তাকে গ্রেফতার করা আশু কর্তব্য। মামলাটি যেমন হত্যা মামলা ছিল না, তেমনি কোন সন্ত্রাসী কার্যকলাপের মামলাও ছিল না। আবার রুবেল এমন কোন পলাতক বা হুলিয়াওয়ালা আসামী ছিল না যে তাকে বিয়ের আসর ছাড়া অন্য সময় পাওয়া যাবে না। আর যদি ঐ দিন ছাড়া তাকে গ্রেফতার করা সম্ভব নাও হত, তবে বাংলাদেশের অপরাধ বিচারব্যবস্থার এমন কোন ক্ষতি হত না কিংবা ন্যায় বিচার থেকে কেউ বঞ্চিত হত না।তাই বিয়ের আসর থেকে রুবেলকে গ্রেফতার করার কার্যটি আইনগতভাবে সঠিক থাকলেও পুলিশের জন্য বিজ্ঞোচিত ছিল না।

এখানে আরও একটি বিষয় স্মর্তব্য। পুলিশের জন্য মামলার আসামীদের গ্রেফতারের নানাবিধ কারণের মধ্যে প্রথমটি হল, তাকে পরবর্তী অপরাধ থেকে বিরত রাখা। দ্বিতীয়টি, মামলার রহস্য উদ্ঘাটন করা। তৃতীয় কারণটি আসামীকে আদালতে উপস্থাপনের মাধ্যমে বিচারের প্রক্রিয়াগুলোকে ত্বরান্বিত করা এবং সর্বশেষ কারণটি হল, বাদীর সন্তুষ্টি আদায় করা। এসবের বাইরে কোন মামলার আসামীকে গ্রেফতার করার আশু জরুরত নেই।

থানায় রুজুকৃত সকল মামলার সকল এজাহারভুক্ত আসামীকে পুলিশ গ্রেফতার করতে পারে , কিংবা সাদামাটা কথায় গ্রেফতার করে, এমনটি নয়। আর কোন মামলার তদন্ত নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে আসামীদের গ্রেফতার কাঙ্খিত হলেও জরুরিও নয়, সম্ভবও নয়। কারো বিরুদ্ধে মামলা হলে সেই ব্যক্তি যেমন আদালতে গিয়ে আগাম জামিন নিতে পারেন, তেমনি ওয়ারেন্ট বের হলে কিংবা না হলেও যে কোন সময় আদালতে আত্মসমর্পণ করতে পারেন। অর্থাৎ রুবেলকে গ্রেফতার করার সিদ্ধান্ত না নেবার পক্ষে পুলিশের কাছে অনেক যুক্তি ছিল। কিন্তু সেগুলোর ধার না ধারিয়ে পুলিশ গায়ে হলুদের আসর থেকে তাকে গ্রেফতার করতে গিয়ে সব কিছুকে গোমাল পাকিয়ে ফেলেছে। এক কথায়, হাজারও দায়িত্বের মধ্যে জয়দেবপুর থানা পুলিশ তাদের ক্রমাগ্রাধিকার নির্ধারণ করতে পারেনি। এটা যেমন অদক্ষতার জন্য হতে পারে, তেমনি হতে পারে ব্যক্তিগত অনৈতিক লাভালাভের জন্যও। কিন্তু আমাদের আলোচ্য বিষয় সেটা নয়।

সবশেষে পেশাগত দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে প্রভূত ক্ষমতার অধিকারী পুলিশের উভয়সংকট অবস্থা সম্পর্কে দু একটি কথা না বললেই নয়। পুলিশ এমন সব দায়িত্ব পালন করে যার সবগুলোই সমালোচনার বিষয় হতে পারে। পুলিশকে জনগণের জানমালের নিরাপত্তা রক্ষার জন্য নিয়োজিত করা হয়েছে। কিন্তু সেই দায়িত্ব পালনকালে আবার পুলিশকে মানুষের জান কবজ করার ক্ষমতাও দেয়া হয়েছে যা নীতিগতভাবে অবশ্যই স্ববিরোধী। আইন পুলিশের কাছে ‘আজব দেশের ধন্য রাজার’ মতো। আইন পুলিশকে চলতে বলার পরক্ষণই থামতে বলে। এ চলা আর থামার মধ্যে রয়েছে একটি অতি সূক্ষ্ণ বিবেচনাগত সীমারেখা। এই সীমাটুকু মেনে চলা সব সময় সম্ভব হয়না বলেই পুলিশ এত আলোচিত হয়, এত সমালোচিত হয়।

রুবেলকে গ্রেফতার করার কার্যটি যেমন সমালোচিত হয়েছে, তেমনি তাকে গ্রেফতার না করার জন্যও জয়দেবপুর থানাপুলিশ পত্রিকার শিরোনাম হতে পারত। রুবেলের প্রতিপক্ষের পক্ষ নিয়ে যে কোন পত্রিকা এমনকি এখন যারা পুলিশের বর্বরতা নিয়ে বড়সড় প্রতিবেদন ছাপাচ্ছেন তারা এমনও শিরোনাম করতে পারতেন, ‘পুলিশের নাকের ডগায় আসামীর গায়েহলুদ’,। সম্ভবত পৃথিবীতে পুলিশের কাজটিই একমাত্র কাজ যা একই সাথে করা কিংবা না করার জন্য সমালোচনা করা যায়। এমনকি কোন আইনগত কাজ যদি পুলিশ আইনগতভাবেও করে; সঠিককাজটি যদি পুলিশ সঠিক সময়ে সঠিকভাবেও করে ,তবুও পুলিশকে পত্রিকার শিরোনাম করা যায়। তাই তো হারম্যান গোল্ডস্টাইনের ভাষায় “The police, by the very nature of their function, are an anomaly in a free society.”
(২৭ এপ্রিল, ২০১৬, ইউ্এন হাউজ, জুবা, দক্ষিন সুদান)