ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

যদিও ব্যবহার, দুর্ব্যবহার, সুব্যবহার; আচরণ, সদাচরণ, অসাদচরণ ইত্যাকার ধারণাগুলো নিয়ে এ ধরণীতে গোলক ধাঁধাঁর অন্ত নেই, তবুও এটা অস্বীকার করার উপায় নেই যে জগনগণের সাথে পুলিশের সম্পর্কের টানাপোড়েনে দুর্ব্যবহারের অভিযোগই হল প্রধান। অভিজ্ঞতায় হোক, আর শ্রুতিকথায় হোক আমাদের আমজনতা বিশ্বাস করে যে, পুলিশ মানুষের সাথে ভাল ব্যবহার করে না। তাই তাদের অনুযোগ, পুলিশ ঘুষ খাউক, অকাম করুক, কুকাম করুক, মানুষকে জিম্মী করুক, আমরা তাতে মাইন্ড করি না। কিন্তু ব্যবহারটা ভাল করলে দোষ কি,ভাই?

কথাটা একদম খাঁটি, অনুযোগ বা উপদেশটা একদম সাচ্চা। এ অনাটন অনাদরের দেশে যেখানে নুন আনতে পান্তা ফুরায়, সমাজের সবখানেই যেখানে অনিয়ম আর অপকর্মের ছাড়াছড়ি, তখন পুলিশকে ফিরিস্তা ভাবার কোন কারণই নেই।ঐ যে কি এক খান শ্লোগান চালু করেছে হাল আমলের পুলিশ, ‘পুলিশ হল জনতা আর জনতাই হল পুলিশ’। তাই জনতার সকল দোষগুণ তো পুলিশের মধ্যে থাকবেই।আর পুলিশের দোষগুণগুলোর মধ্যে কিছুই যে জনতার মাঝে নেই, সেটা কি আর বলতে! পুলিশ হল সমাজের সর্বোত্তম প্রতিচ্ছবি। যে দেশের জনগণ যেমন, সে দেশের পুলিশও তেমন। দুর্নীতি, অনিয়ম আর অসদাচরণের পঙ্কিলতায় পতিত কোন রাষ্ট্রের রাজপথে তো আর ‘ব্রিটিশ ববিদের’ অভিবাদন আশা করা যায় না।

কিন্তু পুলিশ অন্তত তার ব্যবহারটা ভাল করতে পারে। কারণ ঐ যে কথায় বলে, ‘ভাল হতে পয়সা লাগে না’। কিন্তু বিনা পয়সার ব্যবহারটাও যে পুলিশ আমজনতাকে দিতে কার্পণ্য করে, সেটা কি আর নতুন করে বলতে হবে? আসামী গ্রেফতার করতে গিয়ে আসামীকে না পেয়ে তার বাড়িঘরে দুরবস্থা করে, ভেঙ্গে দেয় চাল-চুলা, হাড়ি-পাতিল। ছেলেকে না পেলে বাবাকে ধরে, বাবাকে না পেলে মাকে শাসায়। আর থানার দরোজায় গেলে তো কথায় নেই। অভিযোগ নিয়ে গেলে উল্টো অভিযুক্ত হতে হয়। তাদের মেজাজকে ‘জাজ করাও’ মুসকিল। কখন যে কিরূপ ব্যবহার করবে, তা ব্যবহৃত না হলে বোঝা যাবে না। ওরা বিয়ের আসর থেকে যেমন বরকে গ্রেফতার করে, তেমনি গ্রেফতার করা ব্যক্তিদের বিনা কারণে বাপের নামও ভুলিয়ে দেয়। আরো বলা যায়, আরো শোনা যায়, আরো অভিযোগ আনা যায়। কিন্তু আমাদের গল্পের কলেবর বাড়িয়ে লাভ নেই।

এতো গেল জনতার কথা । কিন্তু পুলিশেরও তো কিছু বলার আছে।হয়তো তারা আইন ও বিধি-বিধানের মধ্যে থেকে, প্রচার মাধ্যমের প্রাত্যহিক শান দেয়া খড়্গের নিচে দাঁড়িয়ে অনেক কিছুই বলতে পারে না। কিন্তু মনে মনে বলে, ‘ভাল ব্যবহার পেতে গেলে যে ভাল ব্যবহার করতেও হয়, সেটাও তো স্বীকার করা উচিৎ। কি কি কারণে পুলিশ সদস্যরা জনগণের সাথে ভাল বা সুব্যবহার করে না কিংবা করতে পারে না সেগুলো খুঁজে বের করা দরকার। একই সাথে সেই কারণগুলো দূর করার জন্য পদক্ষেপ গ্রহণ করাও দরকার। শুধু মুখে বললেই তো হবে না, কিছু বাস্তব বাধা দূর করেই তা আমাদের অর্জন করতে হবে।

পুলিশ নেতৃত্ব ও পরিচালক/ব্যবস্থাপকদের কাছে যতগুলো অস্ত্র আছে, তারা আমার মনে হয়, সবগুলোই ব্যবহার করেন কেবল এই ভাল ব্যবহারটা নিশ্চিত করার জন্য। কিন্তু তারপরও পুলিশের বিরুদ্ধে দুর্ব্যবহারের অভিয়োগটি রয়েই গেছে। এমতাবস্থায়, নিশ্চয়ই এমন কিছু কারণ আছে এবং সেসব দূর করার জন্য এমন ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়তো দরকার যেগুলো পুলিশ ব্যবস্থাপকদের আয়ত্বের বাইরে।

পুলিশের দুর্ব্যবহার নিয়ে কথা হচ্ছিল খাদ্যবিভাগে কর্মরত আমার এক সহকর্মী বন্ধুর সাথে। ওরও একই অভিযোগ, পুলিশের ব্যবহার খারাপ। তার একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞা বর্ণনা করে সে বলল, পুলিশকে বাম হাতে কিছু ধরিয়ে দেয়ার পরও নাকি তারা তাদের ব্যবহার ভাল করতে পারেন না। মানে টাকাও নেয়, দুর্ব্যবহারও করে।

আমি তখন বললাম, দোস্ত যদি বাম হাতে দুপয়সা কামানোর জন্যই পুলিশ দুর্ব্যবহার করত, তাহলে তো সেটা দেয়ার পর তুমি সুব্যবহার পেতে। কিন্তু অবৈধ লেনদেনের পরেও যখন তুমি পুলিশের কাছ থেকে একই ধরনের দুর্ব্যবহার পাচ্ছ, তখন এর কারণ কিন্তু ভিন্ন।

আমার বন্ধু বলল, কি সে কারণ? আমি বললাম, তার আগে আমার পুলিশের কিছু কষ্টের কাহিনী শুনতে হবে।তুমি তো জান, পুলিশ তোমার বিভাগ থেকে সরবরাহ করা রেসনের চালগম খেয়ে বেঁচে থাকে। পুলিশের দুর্ভাগ্যে হল, তোমার গুদাম থেকে পুলিশ সাধারণত খাবারের যোগ্য চাল পায় না। আর খাবারযোগ্য চাল না পাওয়ার ফলে পুলিশ অফিসারদের প্রতি মাসে কি আর্থিক ক্ষতি হয় জান? বন্ধু বলল, তা আর জানার কি দরকার?

আমি বললাম, তবুও শোন।কষ্ট করলে কেষ্ট মেলে। কিন্তু কষ্টর কথা শুনলে তোমার কি মিলবে জানিনা, তবে আমি একটু সান্ত্বনা পাব।

আমি বললাম, চার সদস্যের পরিবারওয়ালা কোন পুলিশ অফিসার যদি প্রতিমাসে তার পরিবারের জন্য ৩০ কেজি চাল পান এবং সেটা তার পরিবারের জন্য প্রয়োজনীয় হয় অথচ সেই চাল খাবার অযোগ্য হয়, তবে তাকে সেই চাল বিক্রয় করে খাবারযোগ্য চাল কিনতে হয়। কিন্তু রেসনের অখাদ্য চাল বাজারে বিক্রয় করতে গিয়ে দেখা যাবে সেটার দাম কেজি প্রতি খুব বেশি হলে ১৫ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত হয়।

এবার যদি খাবারযোগ্য চাল কিনতে চায়, তবে তা কেজি প্রতি ৪০ টাকার নিচে হয় না। এর অর্থ হল, সরকার কর্তৃক সরবরাহ করা চালটুকু খাবার অযোগ্য হওয়ার জন্যই একজন পুলিশ অফিসারকে প্রতি কেজি চালের বিপরীতে ২০ থেকে ২৫ টাকা ভর্তুকি বা গচ্ছা দিতে হচ্ছে। তার মানে হল, সরকার বরাদ্দ করার পরেও কেবল সরবরাহের অদক্ষতা, অযোগ্যতা, কারচুপি, গাফিলতি বা দুর্নীতির জন্য প্রতি মাসে একজন পুলিশ অফিসারের পরিবারকে ৭৫০ টাকা করে গচ্ছ দিতে হচ্ছে। তুমি যদি বাংলাদেশের দেড় লাখ পুলিশ সদস্যের এক লাখ পরিবারকে চার সদস্যের রেসন সরবরাহ কর। তাহলে শুধু পচা চালের জন্য পুলিশ পরিবারগুলোর পকেট থেকে প্রতি মাসে সাড়ে সাত কোটি (সব মিলে কমপক্ষে আটকোটি) টাকা বের হয়ে যাচ্ছে।

তবে এ বলে যে সবাই রেসনের চাল কিক্রয় করে, এমনটিও নয়। নুন আনতে পান্তা ফুরানোর পুলিশ পরিবারগুলোতে ঐ পচা চালই ক্ষুন্নিবৃত্তি চলে। আর আমি ব্যক্তিগতভাবে ঐ চালেই খাই। তবে অর্ডারলি, বডিগার্ড ওরা রেসন স্টোরে গিয়ে, এসপি স্যারের রেসন, স্যার বিক্রি করেন না, নিজেই খান। তাই একটু ভালটা বেছে দেন– ইত্যাদি বলে উৎকৃষ্ট চালটুকু নিতে চেষ্টা করে। এর পরও কোন কোন সময় এতই খারাপ পাই যে আমাকে বাধ্য হয়ে বিক্রিই করতে হয়। আর যেটা খাই, তার ভার রান্না করে তোমার সামনে দিলে, আমার বাসায় তোমার পুনর্বার পা না দেবার জন্য ঐ রেসনের চালের ভাত পরিবেশনটাই যথেষ্ঠ হবে। আর বন্ধুও ভাঙ্গতে পারে।

বন্ধু বলল, রেসনের পচা চালের সাথে দুর্ব্যবহারের কি সর্ম্পক, যতসব আজগুবি কথা!

আমি বললাম, বন্ধু কোন কথাই আজগুবি নয়। আগের মানুষ চাঁদের দেশে যাওয়াটা আজগুবি খবর মনে করত। কিন্তু কালের প্রবাহে সব কিছু জানতে পেরে মানুষ এখন চাঁদের দেশে প্রমোদ ভ্রমণে যায়। তাই রেসনের চালের সাথে পুলিশের ব্যবহারের সম্পর্কটিও আজগুবি এখন মনে হলে, আমার পুরো কথা শুনলে আর এটা আজগুবি থাকবে না। চাঁদে অভিযানের মতোই সঠিক বলে মনে হবে।

আমি বললাম, বন্ধু ঐ গল্পটা তো জান যে শরীরের সকল অঙ্গ একবার সল্লা করে সিদ্ধান্ত নিল যে সবাই নিজ নিজ কাজে ব্যস্ত থেকে শরীরটিকে চালায়। কিন্তু পেট কেবল খায়, কোন কাম করে না। খায় আর বড় হতে থাকে। অথচ, হাত, পা, চোখ কান এমনকি মস্তিষ্কটা পর্যন্ত কোন কিছু না খেয়েই শরীরকে শুধু চলমানই রাখেনি, মানুষকে সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব করে তুলেছে। তাই পেটকে আর ভাত দেয়া হবে না। কিন্তু কয়েক দিন ভাত না খেয়ে যখন গোটা শরীরই অকেজো হয়ে গেল, তখন শেষ পর্যন্ত পেটেই জয়ী হল।

ঠিক একই রকমভাবে পুলিশেরও পেট আছে। এই পেটটাই সব কিছু না হলেও অনেক কিছু। এখন এ পেটটাতে যখন তোমার সরবরাহ করা পচা চাল পড়ে তখন ব্যবহার নষ্ট হয়ে যাওয়া তো খুবই সামান্য ব্যাপার, গোটা পুলিশ কর্মযজ্ঞই তো বিগড়ে যাবার কথা, অকেজো হয়ে যাওয়ার কথা।

তার মানে, তোমার ঐ পচা চাল খাবারের ফলেই পুলিশের মেজাজ বিগড়ে যায়, পুলিশ মানুষের সাথে, অন্তত তোমার সাথে দুর্ব্যবহার করে। তুমি যদি পুলিশের জন্য কেবল খাবারযোগ্য চাল সরবরাহের প্রতিশ্রুতি দাও। আমিও তোমাকে প্রতিশ্রুতি দিব যে পুলিশ তোমার সাথে কেন কোন নাগরিকের সাথেই দুর্ব্যবহার করবে না।

বন্ধু বললেন, এখানে ভাল চাল সংগ্রহ, সংরক্ষণ, পরিবহন ও সরবরাহ নিয়ে কি কি জটিলতা আছে তুমি তো সেগুলো জান না। আমরা ইচ্ছা করলেই কি সব করতে পারি? আমার বন্ধুটি খাবারযোগ্য চাল সরবরাহের প্রতিশ্রুতি দিতে পারেনি।

তবে, আমি আমার যাবতীয় দোষ স্বীকার করে নিয়েছি। আর জনগণের সাথে যে দুর্ব্যবহার করা পুলিশ অফিসারদের বিরুদ্ধে প্রধানতম অভিযোগ, আমি সেটা মেনে নিয়েই বলেছি, আমার পুলিশ মানুষের সাথে যাতে দুর্ব্যবহার না করে, সে জন্য আমি সব দায়দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিচ্ছি। কারণ, আমি নিয়োগ থেকে প্রশিক্ষণ পর্যন্ত কোন কাজটিই সুষ্ঠূভাবে, নিয়ম-নীতি মেনে করতে পারি না। আমার এ দক্ষতার আমার নিম্ন পদের অফিসার ও ফোর্সদের মধ্যে সঞ্চারিত হয়। তাই আমি তোমার প্রতি দুর্ব্যবহারের অভিযোগে প্রমাণিতভাবেই অভিযুক্ত। তবে, আমি তোমাকে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি, আমার পুলিশ জনগণের সাথে সুব্যবহার করতে বাধ্য। এটা এই মুহূর্তে নিশ্চিত করতে না পারলেও অদূর ভবিষ্যতে আমরা পারব, ইনশায়াল্লাহ। এমনকি তোমার সরবরাহ করা পঁচা চাল খেয়েও আমরা আর মেজাজ খারাপ করব না।(০৩ মে, ২০১৬, ইউএন হাউজ, জুবা, দক্ষিণ সুদান)