ক্যাটেগরিঃ চিন্তা-দর্শন

 

পিতামাতা তাদের সন্তানদের প্রতি যে আবেগীয় দায়িত্ব পালন করেন, যে ভালবাসা দেন, তার তুলনা যেমন হয় না; তেমনি হয় না তার প্রতিদানও। কিন্তু এর বিনিময়ে সন্তানগণও তাদের পিতামাতাকে অন্য একটি অনন্য বস্তু উপহার দেন যার প্রতিদানও পিতামাতা দিতে পারেন না। এ বস্তুটি আর কিছুই নয়, এটা হল নির্মল আনন্দ। শিশুরা তাদের নিষ্পাপ চাহনি, অনাবিল হাসি, আধো আধো বোল আর বাঁধো বাঁধো ভঙ্গির যে চলাফেরা, হাঁটা-পড়ার মাধ্যমে পিতামাতাকে শৈশবই যে আনন্দ দেয় তার তুলনাও তো নেই। তাই পিতামাতাই যে কেবল সন্তানদের ঋণের জালে আবদ্ধ করেন, শিশু বা সন্তানরা কেবলই ঋণী, এমন ভাবনাও, আমার মতে, বড় স্বার্থপরতা ও একান্তই একপেশে। আমি তো মনে করি, পিতামাতার সাথে জন্মের পূর্বেই সন্তানদের যে সম্পর্কটি তৈরি হয়, সেটা দ্বিপাক্ষিক পারষ্পরিক। এরা একে অপরকে ঋণের বাঁধনে বেঁধে ফেলে এবং তা নিজেদের অজান্তেই।

বিষয়টি আরো খোলাসা করে বলার জন্য একটি উদাহরণের অবতারণা করব। পিতামাতার আদোর-সোহাগ আর স্নেহ-ভালবাসা কেবল মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এটা জীবমাত্রেরই মধ্যে লক্ষ করা যায়। উদ্ভিদ তার বংশধরদের প্রদর্শনযোগ্য আদোর-সোহাগ দেখাতে পারে না। তাই বলে তারা যে সন্তান বা বংশধরদের ব্যাপারে সম্পূর্ণ উদাসীন, এটা ভারলে ভুল হবে। সাগর তীরের বনভূমির লবণাম্বু বৃক্ষরাজি তাদের পরিষ্ফুট ফল এমন সময় মাটিতে ফেলে দেয় যখন উপকূলে ভাটার টান থাকে। জোয়ারের সময় এ ফল মাটিতে পড়লে তা উপকূলের স্পর্শ না পেয়ে জোয়ারের জলে ভেসে যাবে।তাদের বংশধররা মাটিতে শেকড় গাড়তেই পারবে না। এটা কি সন্তানরূপী চারাদের প্রতি মাতৃবৃক্ষের মঙ্গল কামনার ফল নয়?

উদ্ভিদ ছাড়াও ইতর প্রাণীদের মধ্যে যে সন্তান বাৎসল্য দেখা যায়, তা একদম নিঃস্বার্থ। মানুষের মতো আদান-প্রদানের তেমন কোন বিষয় নেই এ অপত্যপ্রেমে। কাকের মতো একটি কুৎসিত প্রাণীও তো তার সন্তানকে পরম স্নেহে লালানপালন করে। নিজের পেটের খাবার উগরে দিয়ে তার বাচ্চাকে খাওয়ায়। কিন্তু এ কাক কি কখনও প্রত্যাশা করে যে, তাদের বৃদ্ধ বয়সে তার সন্তানরা তাকে এভাবে খাওয়াবে? না কখনও খাওয়ায়? আমার জানা মতে, মানুষ ভিন্ন এমন কোন প্রাণী জগতে নেই যার সন্তানগণ তাদের পিতামাতার ভরণপোষণের মতো কোন গুরুভার গ্রহণ করে।

কিন্তু মানুষ সেটা কামনা করে। মানুষ যে প্রেমভালবাসা, আদোর-সোহাগ সন্তানদের না দিয়ে সুস্থই থাকতে পারে না, সেই প্রাকৃতিক ভালবাসার আবার কৃত্রিম প্রতিদান দাবি করে। এ থেকে প্রমাণিত হয়, আমাদের সন্তানদের প্রতি যে ভালবাসা, তা ইতর প্রাণীদের মতো নিঃস্বার্থ নয়। আমরা আসলে স্বার্থপর। শৈশবে যে সন্তানটি আমাকে অনাবিল আনন্দ দিয়েছে , তার কৈশোর ও যৌবনের প্রয়োজনটুকু আমি কি পুরণ করতে পেরেছি? তাকে প্রয়োজনীয় খাবার ও পুষ্টি দিতে কি পেরেছি? তাকে কি উপযুক্ত শিক্ষা দিতে পেরেছি? এসব প্রশ্নের ধারা ধারেন না মানবকুল।

কিন্তু আমি যদি ভাবি যে, আমার সেই স্নেহের সন্তাটিকে আমি দিতে পারিনি মাথা গোঁজার মতো কোন ঠাঁই। আমি আমার পিতা থেকে যে সম্পদ বা সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হয়েছিলাম, আমি আমার সন্তানকে সেটুকু সম্পত্তিও দিয়ে যেতে পারিনি। আর না পাওয়ার সমীকরণ মেলাতে গিয়ে সন্তানের মনে যদি এধরনের কোন ক্ষোভ তৈরি হয়, তাহলে শুধু নীতিকথা দিয়ে কি পিতৃভক্তি কিংবা শেষ বয়সের শ্রুশ্রূষা কি অর্জন করা সম্ভব?

পৃথিবীতে নিঃস্বার্থ ভালবাসা যেমন নেই, তেমনি নিঃশর্ত সম্মান-শ্রদ্ধাও নেই। আর এ জন্যই তো বৃদ্ধ বয়সে আমরা সন্তানগণ কর্তৃক পরিত্যাক্ত হই। আমি তো মনে করি, পৃথিবীতে মানুষই সবচেয়ে বড় স্বার্থপর প্রাণী, একই সাথে সবচেয়ে ইতর প্রাণীও বটে যারা তাদের নাবালক সন্তানদের শ্রমের উপর নিজেদের জীবীকা নির্মাণ করতে চায় ও করে।

এখনও গ্রামাঞ্চলে এক কৃষকের পাঁচটি সন্তান হলে তার সবগুলোকেই তিনি পাঠিয়ে দেন কর্মক্ষেত্রে। রোজগার করে তারা। তাদের নেই স্কুল, নেই পড়াশোনা, নেই ভবিষ্যতে পরিবর্তনশীল পৃথিবীতে টিকে থাকার মতো কোন বৃত্তিমূলক শিক্ষা । আমাদের সমাজের একটি বড় সংখ্যার মানুষ এখনও তাদের নাবালক সন্তান-সন্ততির রোজগারে নিজের বাকি জীবনটুকুর জন্য কিছু সঞ্চয় করার স্বপ্ন দেখে। তারা সন্তানদের ভবিষ্যৎ দেখেন না। কলে কারখানায়, পথেঘাটে যেসব শ্রমজীবী শিশুকে আমরা দেখি, তারা সবাই যে এতিম এটা ভাবার কোন কারণ আছে কি? বরং এতিম শিশুরাই থাকে বন্ধনহীন। তারা পিতামাতার স্নেহের জালে যেমন আটকা পড়ে না, তেমনি তাদের দেয়া ঋণের বন্ধনেও আবদ্ধ থাকে না।

এমতাবস্থায়, কোন সন্তান তার অবচেতন মনে যদি ভাবতে থাকে, এ লোকগুলোকে আমি শৈশবে আনন্দ দিয়েছি। কিন্তু আমার কৈশোরে যা পাওয়ার কথা, আমি তা তার কাছ থেকে পাইনি। যৌবনে যা অর্জন করার কথা, আমি তা অর্জন করতে পারিনি। কারণ তারা আমাকে সেরূপভাবে সুযোগ দেননি কিংবা তৈরিই করেননি। তাহলে আমি কেন তাদের দিকে তাকাব? আমি যখন তাদের আনন্দ দিতে পেরেছি, তখন তারা আমাকে আদোর করেছে। কিন্তু আনন্দ দেবার স্তর পার হতেই তারা আমাকে রোজগারে লাগিয়ে দিয়েছিল। আমি তখনও বুঝতাম না। তাই আমার রোজগার চলে গেছে তাদের পকেটে। এখন আমি যখন বুঝতে শিখেছি, তখন তো তারা আমার কাছে স্নেহময় বা স্নেয়মীয় নন। তারা এখন আমার রোজগারের রীতিমত পাওনাদার হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন।

আর যদি তাদের কোন প্রতিদান আমাকে দিতেই হয়, তাহলে সেটার উত্তরও তো প্রকৃতিই দিয়ে রেখেছে। তারা যেমন আমাকে ভালবেসেছেন, আমিও তেমনি আমার সন্তানদের ভালবাসব। তাদের জন্য খাদ্য সংগ্রহ করব। তাদের পুষ্টি যোগাব। এতে কি আমার সেই ঋণ শোধ হয় না? বিগত বয়সী মানুষের বেঁচে থারার স্বাচ্ছন্দ খুঁজতে গিয়ে আমার সন্তানদের ভবিষ্যত তো আর বন্ধক রাখতে পারি না।

এভাবে যুক্তির পর যুক্তি যোগাড় করা যায় যেখানে বৃদ্ধ পিতামাতাকে ভরণপোষণ করার কোন দায়িত্বই সন্তানের উপর বর্তায় না। কিন্তু তারপরও তো আমরা মানুষ। আমাদের মন আছে, হৃদয় আছে, প্রেম আছে, ভালবাসা আছে। আমরা কেবল পৃথিবীর অভ্যন্তরেই নয়, পৃথিবীর বাইরেও চিন্তা করতে পারি। আমাদের যেমন ইহকাল আছে, তেমনি পরকালও আছে। আমাদের যেমন শৈশব আছে, তেমনি বার্ধক্যও আছে।

ইতর প্রাণীর বার্ধক্য আর মানুষের বার্ধক্যের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। বার্ধ্যক্যে মানুষ পরিপূর্ণ মানুষই থাকে। তখন তার সকল মনোবৃত্তির বিকাশ ঘটে। কিন্তু শরীরগত দিক থেকে তারা হয় দুর্বল। সামাজিক দিক থেকে হয় নিঃসঙ্গ। যেগুলো মনুষ্য শিশুর পারিপার্শ্বিক অবস্থার পুরোপুরি অনুরূপ। একটি অসহায় শিশু যেমন অন্যের সাহায্য ছাড়া বেঁচে থাকতে পারে না, তেমনি একজন বৃদ্ধ/বৃদ্ধাও অপরের সাহায্য সহায়তা ছাড়া বেঁচে থাকতে পারেন না।

তার যৌবনে ও পরিণত বয়সে তিনি এ সমাজকে অনেক কিছুই হয়তো দিযেছেন। তিনি যদি কৃষক হন, তো কেবল তার জন্যই তিনি শস্য ফলাননি, তার ফলানো শস্যের ভাগ অন্যরাও পেয়েছে। তিনি যদি শিক্ষক হন, এ সমাজে তিনি শিক্ষা আলো ছড়িয়েছেন; তিনি যদি এক রিকসা চালকও হন, তিনি সমাজের লোকগুলোকে তাদের গন্তব্যে আনা নেয়া করে সমাজকে সচল রেখেছেন। তিনি যদি রাজনীতিবিদ হন, তিনি দেশ পরিচালনা করে আমাদের অগ্রগতিতে অবদান রেখেছেন। এভাবে একজন মানুষ তার পরিণত বয়স অতিক্রম করে যখন প্রৌঢ়ত্বে উপনীত হন, তখন তিনি সমাজকে নানাভাবে ঋণী করেন। এখন এ গোটা সমাজেরই উচিৎ একজন বৃদ্ধ মানুষকে তার অসহায় অবস্থা থেকে মুক্তি দেয়া।

আমি তো মনে করি, একজন সন্তান তার বৃদ্ধ পিতামাতার ভরণপোষণ ও সুখ সাচ্ছন্দের প্রতি খেয়াল রাখবেন প্রথমত, এ জন্য যে সে সমাজের একজন সদস্য। তার পিতামাতা সমাজের প্রতি যে কর্তব্যগুলো পালন করেছেন কেবল সন্তান হিসেবেই নয়, সমাজের সদস্য হিসেবেও সেগুলো ভোগ করেছে বা করবে । তাই সমাজের সদস্য হিসেবেও তার প্রতিদান তাকে দিতে হবে।

দ্বিতীয়ত, আসবে তার রক্তের সম্পর্ক, বাল্যকালের লালন পালন ইত্যাদি বিষয় এবং তারও পরে আসবে নৈতিক ও ধর্মীয় প্রসঙ্গগুলো।

অনেকে বলবেন, না, নৈতিক ও ধর্মীয় বিষয়গুলো আগে আসবে। আমার যুক্তি হল, ইতর প্রাণীদের মধ্যে তো নৈতিকতা বা ধর্মবোধ নেই। তাই বলে তারা কি সন্তানদের প্রতি অপত্য স্নেহ প্রদর্শন করে না? বুঝলাম, অনেক ইতর প্রাণির কাজ হল ডিম পাড়া। এরপর ডিম থেকে আপনাআপনি বাচ্চা বের হয়ে তা নিজ শক্তিবলে পৃথিবীতে বেঁচে থাকে।

কিন্তু স্তন্যপায়ী প্রাণীদের সন্তান তো মনুষ্য সন্তানের মতোই প্রাথমিক পর্যায়ে অসহায় থাকে। যারা মায়ের দুধ ছাড়া বাঁচতে পারেন না, সে যে মায়ের দুধই হোক না কেন (যেমন গরুর দুধ), দুধই হতে হবে, তাদের শৈশবকাল সবচেয়ে বেশি। আর তাই তাদের প্রতি পিতামাতার অপত্য স্নেহও বেশি। এ অপত্য স্নেহ কোন নৈতিকতা বা ধর্মীয় তাগিদ কিংবা বিধি নিষেধের ধার ধারে না। এখানে পারস্পরিক আদান প্রদানই মুখ্য।তাই পিতামাতা ও সন্তানের মধ্যে যে পারস্পরিক চাহিদা, নির্ভরশীলতার সম্পর্ক তৈরি হয় সেটা নৈতিকতা কিংবা আইনের বিধানের আওতার বাইরেও টিকে আছে, টিকে থাকবে। (০৮ মে, ২০১৬, ইউএন হাউজ, জুবা, দক্ষিণ সুদান)