ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

ছাত্রজীবনেই একটি ছায়াছবির গান শুনেছিলাম। অনেক করুণার প্রত্যাশা আর দুঃখ-প্রাপ্তির গান। সুবীর নন্দীর কণ্ঠে মোহনীয় বেদনা জাগানিয়া গানটি যে কেউ পছন্দ করবেন। (লিংক)

বন্ধু হতে চেয়ে তোমার,
শত্রু বলে গণ্য হলাম,
তবু একটা কিছু হয়েছি যে,
তাতেই আমি ধন্য হলাম!

হ্যাঁ, কোন দিন ভাবিনি যে এ গানের কথাগুলো একদিন এভাবে আমার জন্য উদ্ধৃতিযোগ্য হবে। কিন্তু একজন সহব্লগার বন্ধু এগুলোকে প্রাসঙ্গিক করে তুলেছেন।। আসলে কোন লেখনির/ পোস্টের শিরোনামে আমার নামটি আসবে, এমনটি তো কখনও ভাবিনি। তাই ব্লগের একটি পোস্টে সেটা দেখে ভালই লাগছে। যদিও আমি সদ্বিশ্বাসেই তার একটি লেখায় আমার মতামত জানিয়েছিলাম, তিনি আমাকে রীতিমত ভুল বুঝেছেন, তিনি রীতিমত বিরক্ত হয়েছেন। আর তার বিরক্তিকে প্রকাশ করতে তিনি রীতিমত একটা পোস্টেই লিখে ফেলেছেন। তার ধারণা আমি বেশামাল হয়ে এমন অগ্রহণযোগ্য মন্তব্য করেছি।

যাহোক, ঐ মন্তব্যে কি বোর্ডের একটু খোঁচা যে তাকে দেইনি, সেটা অস্বীকার করাটা সত্যের অপলাপ হবে। তবে সাহিত্য জগতে কলমের খোঁচাখুঁচির ঘটনা বিরল নয়। আর আমিও যতদূর সম্ভব আলঙ্কারিক উপায়েই তাকে খোঁচানোর চেষ্টা করেছি। কিন্তু তিনি যে জলজ্যান্ত একটি শিরোনাম দিয়ে আমাকে পাল্টা খোঁচাবেন– এমনটি ভাবিনি। তারপরও এতে আমার নিজেকে ধন্যই মনে হচ্ছে।

বলাবাহুল্য, ঐ পোস্টের একটি আগাম উত্তর কিন্তু আর একজন ব্লগার দিয়েই দিয়েছেন। তারপর তার গোটাপোস্টের মন্তব্যেও এক সহব্লগার তার কথার অনেকাংশেই উত্তর দিয়েছেন। যেহেতু সহব্লগারদের ঐ সব মন্তব্যকে আমি যথার্থ বলেই মনে করি, তাই তার সুনির্দিষ্ট অভিযোগুলোর উত্তর আমি দিব না। আমি বিষয়টিকে ভিন্ন আঙ্গিকে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করব যাতে পুলিশের বিরুদ্ধে আনীত সস্তা-মঙ্গা সকল অভিযোগের প্রকৃতি বুঝতে আমাদের সুবিধা হয়।

আমার সহব্লগার বেঁচে গেছেন যে তিনি নিজে পুলিশ নন; তার বন্ধুটি হল পুলিশ। কিন্তু পুলিশের ভিতরের দোষত্রুটিগুলো যে তার নিজের মধ্যে নেই, সেটা তো তিনি দাবি করতে পারেন না। কেননা, তার মাছরাঙার উদাহরণটা তাই বলে। সব পাখিই মাছ খায়, কিন্তু দোষ পড়ে মাছরাঙার ঘাড়ে। এ বিষয়টি বোঝাবার জন্য বহুবিধ প্রবাদ আছে তার সবগুলো অবশ্য শ্লীল নয়। যেমন যত দোষ, নন্দ ঘোষ; সব মাছেই কি যেন খায়, কেবল চ্যাঙ বা টাকি মাছেরই দোষ হয়, ইত্যাদি ইত্যাদি। তার মানে আমাদের সহব্লগারটির মধ্যেও মাছ খাওয়ার অভ্যাস কম বেশি আছে।

তবে মাছরাঙার উদাহরণটা এখানে পুরোপুরি প্রযোজ্য নয় বলেই আমার ধারণা। কারণ মৎস্যকে যদি তিনি উৎকোচের সাথে তুলনা করেন, তবে এটা তিনি দাবি করতে পারেন না যে মৎস্যরূপী অবৈধ রোজগারটি দিয়েই পুলিশের রক্তমাংস গঠিত। মাছরাঙার মতো পুলিশের ধ্যান-জ্ঞান কেবল ঐ মাছের দিকে, দায়িত্ব পালনে তারা একেবারেই ঠন্ ঠন্। কারণ, ভাল- মন্দ গুণগুলোর একটি সার্বজনীনতা আছে যা তিনি নিজেই স্বীকার করে নিয়েছেন।

এখন বলা হয় যে হাটে বাজারে অভিযোগ বাক্স বসালে পুলিশের বিরুদ্ধে এনতার অভিযোগ জমা পড়বে। তবে শুধু যে পুলিশের বিরুদ্ধেই হাজারটা দরখাস্ত পড়বে, তা তো নয়। বাংলাদেশের সরকারি বেসরকারি এমনকি মাল্টি ন্যাশনাল কোম্পানিগুলোর কর্মকর্তা কর্মচারীদের বিরুদ্ধেও যদি বিধিবদ্ধভাবে অভিযোগ আহব্বান করা হয়, তবে সেখানেও ভাল সাড়া মিলবে।

তবে পুলিশ ছাড়া অন্যান্য পেশার সদস্যদের বিরুদ্ধে অভিযোগ রুজু করার তেমন কোন পদ্ধতির প্রচলন নেই। কাস্টমস কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ করাটা হয়তো আপনার কল্পনার বাইরে। যে পুরকৌশলী লোহার পরিবর্তে বাঁশ দিয়ে ইমারতের ছাদ তৈরি করে কোন ব্যক্তিকে নয়, গোটা কমিউনিটিকে ঠকিয়ে নিজের পকেট ভারি করল, তার বিরুদ্ধে স্থানীয়রা কোন অভিযোগ করেছে বলে মনে হয় না। অন্যদিকে দলীয় নাম পরিচয়ধারী যে মানুষগুলো টেন্ডারের শতকোটি টাকা সংশ্লিষ্ট অফিসের সামনেই ভাগবাটোয়ারা করছেন, তাদের সম্পর্কে কারো টু শব্দটিও নেই। আমাদের অভিযোগ কেবল পুলিশরূপী কিছু দ্বিপদ পাহারাদারদের প্রতি যারা দুর্নীতির মূল অংক নয়, বরং উচ্ছ্বিষ্টটুকু নিয়ে সন্তুষ্ট থাকে।

ইতোপূর্বেও আমি বলেছি, এখনও বলছি, আমাদের আগে সিদ্ধান্ত নিতে হবে কোন ধরনের পুলিশ আমরা চাই। আমাদের যাবতীয় দোষগুণের সমাহার দিয়ে পুলিশকে সাজাতে চাই, না আমজনতার চেয়ে পুলিশকে নৈতিক ও পেশাগতভাবে ভিন্নরকম, উন্নতরকম চাই। আর যদি সেটা চাই আমাদের সম্পূর্ণ সফল হবার আশা ক্ষীণ। কারণ একটি পুকুরের ঘোলাজলের সবটাই অক্ষুণ্ন রেখে যেমন মাঝের কোন নির্দিষ্ট এলাকার জলে ফিটকিরি ঢেলে পরিষ্কার বা বিশুদ্ধ করা যাবে না, তেমনি গোটা সমাজের দুর্নীতি আর দস্যুবৃত্তি অক্ষুণ্ন রেখে কেবল পুলিশকে ফিরিস্তা বানান যাবে না। এটা হয় না, কোথাও হয়নি।ইতিহাস, অপরাধ বিজ্ঞান, সমাজ বিজ্ঞান ও আমাদের এত কালের অর্জিত অভিজ্ঞতা তাই বলে। পৃথিবীর যে সব জাতি বা রাষ্ট্র তাদের পুলিশকে দুর্নীতির পঙ্কিলতা থেকে সততার চূড়ায় তুলে এনেছেন, তারা তাই করেছেন।তারা পুলিশকে বিচ্ছিন্নভাবে না দেশে সকল প্রতিষ্ঠানকেই একে অপরের পরিপূরক হিসেবে দেখেছেন। তাই তারা গোটা সমাজের সাথে সাথে পুলিশকেও শুদ্ধরূপে পেয়েছেন।এ বিষয়ে ভিনদেশের সাফল্যের প্রভাব নিয়ে কিছু ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা উল্লেখ করতে চাই।

সিংগাপুর নামক উদ্যান রাষ্ট্রটিতে সততা, দক্ষতা ন্যায় বিচার বা আইনের শাসনের ব্যবস্থা বিশ্বখ্যাত। ঐ রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো সম্পর্কে ওদেশের সাধারণ মানুষের ধারণা নিয়ে আমার একটা ব্যক্তিগত অভিজ্ঞা আছে। ২০০৫ সালে সিংগাপুরে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার উপর একটি প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণের সুবাদে সেই দেশের আমলাতন্ত্র সম্পর্কে আমার প্রথম বাস্তব ধারণা হয়। আমি জানতাম যে সিংগাপুর দুর্নীতি দমনের ব্যাপারে কেবল এশিয়ার নয়, সারা বিশ্বেই রোল মডেল। কিন্তু সেটার বাস্তব রূপ আগে দেখিনি বা উপলব্ধিও করতে পারিনি। এই উপলব্ধি হয়েছিল ঐ প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণের মাধ্যমে।

শ্রেণিকক্ষের পাঠ শেষে আমাদের সিংগাপুরের রাস্তায় বাস্তব অবস্থা দেখানোর জন্য নিয় যাওয়া হল। আমাদের সাথে ছিল একজন ন্যাশনাল সার্ভিসের কিশোর। সে সবে মাত্র মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরিয়েছে। সিংগাপুরে প্রত্যেক পুরুষ মানুষকে এই স্তরে এসে কমপক্ষে দুবছর দেশের জন্য সেবা দিতে হয়। এর পর তারা নিজ নিজ বিদ্যালয়/বিশ্ববিদ্যালয়ে ফেরত যাবে। ঐ কিশোরটি ছিল তেমনি একজন এনএস পুলিশ সদস্য।

ঐ সময় বছরের মে মাস ছিল। ছিল আমের ভরা মওসুম। গার্ডেন সিটির রাস্তায় কিছু আম গাছে আধাপাকা আম ঝুলছে। আমগুলো দেখে মনের ভিতর বাল্যকালের লোভটা নাড়া দিয়ে উঠল। আমি এনএস কিশোরের কাছ থেকে জানতে চাইলাম, রাস্তার আমগুলো চুরি হবে না। কিশোর এনএস বলল, না, হবে না। আমি আমার দেশের রাস্তার ফলগুলো সস্পর্কে বললাম। সে অবাক হল। আমি ওকে বললাম, আচ্ছা তোমার দেশের সব অফিস-আদালতই তো ভাল, সুশৃঙ্খল এবং দুর্নীতিমুক্ত। তারপরও তুমি বলতে পার, কোন বিভাগটা সবচেয়ে বেশি ভাল? সে কিছুক্ষণ চিন্তা করে বলল, সবই ভাল। আমি বললাম, তারপরও তো রেটিং করা যায়। সে একই উত্তর দিল, সব কিছুই ভাল, সন্তোষজনক।

গল্পটা এখানে টেনে আনার পিছনে কারণ হল, সিংগাপুরের মতো প্রায় দুর্নীতিমুক্ত একটি দেশের প্রত্যেকটি মানুষেরই এমনি মনোভাব, এমনি বিশ্বাস যে তারা কোন প্রতিষ্ঠানকেই অন্যটার চেয়ে খারাপ তো দূরের কথা একটার চেয়ে যে আর একটা ভাল সে তুলনাও করতে প্রস্তুত নয়।এটা সম্ভব হয়েছে গোটা সমাজের দুর্বৃত্ততাকে অপসারণের মাধ্যমে, কোন একক বিভাগে বিচ্ছিন্ন প্রচেষ্টা চালিয়ে নয়।

দ্বিতীয় ঘটনাটা হল আমার এক জাপান ফেরত বন্ধুর পুলিশ সম্পর্কে জুগুপ্সার মনোভাব নিয়ে। জাপান ফেরত ঐ বন্ধু একবার জাপানি সমাজের দারুণ সুনাম করছিল। সে বলল, ও দেশের পুলিশ ঘুষ খায় না। সে পুলিশের কথাটা আলাদা করে কেন বলছিল তা পাঠক মাত্রই ভেবে নিতে পারবেন। কিন্তু আমি নিজেও তো প্যাঁচ দেবার সুযোগ হাতছাড়া করার পাত্র নই। আমি বললাম, নিশ্চয়ই ঐ দেশের মেজিস্ট্রেট কিংবা আদালতে ঘুষ চলে। সে বলল, না, না, আদালত আরো ভাল। আমি বললাম, তাহলে ও দেশের কাস্টমস কিংবা গণপূর্ত বিভাগ মনে হয় ঘুষ খায়। আমার বন্ধু প্যাঁচটা বুঝতে না পেরে বলল, না না ওখানেও দুর্নীতি নেই। আমি অনেকটা অধৈর্য হয়ে বললাম, তাহলে ওদেশের কোন বিভাগে ঘুষ লেন দেন হয়। কারা আসলে ঘুষ খায়, দুর্নীতি করে, বলতে পার?

আমার বন্ধু বলল, ওদেশে কোথাও ঘুষ চলে না, সরকারি-বেসরকারি কোন সেবা পেতেই ঘুষ দিতে হয় না। সবাই সৎ, সাধু। আমি বললাম, তাহলে তুমি তো এ কথা আগেই বলতে পারতে যে ঐ দেশের সবাই সৎ, সব অফিসেই সততা, জবাবদিহিতা ও দক্ষতার চর্চা করা হয়। কিন্তু সেটা না বলে তুমি পুলিশকে আলাদাভাবে সৎ বলছ কেন?

পাঠকগণ, বুঝে নিবেন, আমার বন্ধু আলাদাভাবে পুলিশকে সৎ বলছেন কেন। তার কারণ এদেশের সব স্থানে ঘুষ চললেও আমার বন্ধুবরের কোন অসুবিধা হয় না। সে বিদ্যালয়ে ডোনেশন স্টাইলের ঘুষ দেয়, বিদ্যুৎ বিভাগের মিটার রিডারদের সন্তুষ্ট করে, যত বেশি পানি খরচ করুক না কেন ওয়াসা অফিসে তার জন্য অতিরিক্ত চার্জ দিতে হয় না। শুধু কর্মচারীদের একটু ধরিয়ে দিলেই চলে। বাড়ির হোল্ডিং ট্যাক্স তার দাদা যত টাকা দিত, সেও ততই দেয়। সরকারি-বেসরকারি ব্যাংক থেকে হাজার কোটি টাকা উধাও হলে তার কোনই অসুবধিা হয় না। তার কোন অভিযোগ নেই। কিন্তু রাস্তার পুলিশের দুই/চার টাকার ভিক্ষাবৃত্তি তার কাছে সব সময় দুর্নীতি, ঘুণার ও অভিযোগের।

যাহোক, দুই আর দুয়ে চার হয়। কিন্তু দুটো খারাপ কাজ একত্রিত করলে একটি পূণ্যের কাজ হয় না। যা দুর্নীতি, তাকে নানা ছলছুতায় সুনীতি বানাবার কোন অর্থ হয় না। কিন্তু কিছু কিছু মানুষের ধারণা এতটাই অগভীর যে সেগুলো ডোবা নালার হলপলে পানার চেয়ে দামী বা গুরুত্বের কিছু নয়। কিন্তু আমাদের দুঃখ হল, এরা এর পরেও নিজেদের গভীর জ্ঞান তাপস বলে নিজেদের জাহির করতে ভালবাসেন। যে বিষয়ে তারা তেমন কিছুই জানেন না, যে পুলিশের তারা র‌্যাংক-ব্যাজগুলোই ঠিক মতো শনাক্ত করতে পারেন না, সেই পুলিশিং নিয়ে তারা টিভির টকশো থেকে শুরু করে ব্লগের পাতা পর্যন্ত আগডুম-বাগডুম লেখেন। এ সব স্বঘোষীত, স্বকল্পিত অপরাধ বিশেষজ্ঞদের কি বোর্ডের খোঁচাখুচিঁ তাই সহ্য হয় না। এজন্য ‘দেখিয়া শুনিয়া ক্ষেপিয়া গিয়া’ কি বোর্ডে কিছুটা পাল্টা খোঁচা দেবার চেষ্টা করি। কিন্তু সেটাও যে তাদের জন্য অসহ্য হয়, তা তো কোন দিন ভেবে দেখিনি।

(০৯ মে, ইউএন হাউজ, জুব, দক্ষিণ সুদান)