ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

সমতার বিষয়টি সভ্যতার সমান বয়সী হলেও সর্বক্ষেত্রে সমতা যেমন অপ্রাসঙ্গিক তেমনি তা বিড়ম্বনার বস্তুও বটে। সমতার পাশাপাশি তাই ন্যায্যতা নামের একটি শব্দ বা ধারণার সৃষ্টি হয়েছ। ইংরেজিতে সমতা হল, Equility ও ন্যায্যতা হল, Equity । শব্দ দুটো সমান মাপের হলেও এর ব্যবহারিক ওজন কিন্তু সমান নয়। যেমন একই পরিবারের সকল শিশুই সমান। তাই অসুস্থ হলে তাদের সমান চিকিৎসা সুবিধা পাওয়ার কথা। এখন যদি আমি সমতার কথা বলি তাহলে দুই শিশুর একই সাথে ভিন্ন ভিন্ন অসুখ হলে তাদের একই ধরনের ঔষধ দেয়ার বাধ্যবাধকতা এসে যায়। তাই প্রাপ্তির ক্ষেত্রে এখানে সমতা নয়, অন্য কিছু দরকার। সেটা হল ন্যায্যতা। এখানে প্রত্যেক শিশুর প্রয়োজনমত তার চিকিৎসার সুবিধা পাবে। যার সাধারণ জ্বর হয়েছে সে পাবে প্যারাসিটামল। আর যার ডিসেন্ট্রি হয়েছে তাকে দিতে হবে ফ্লাজিল জাতীয় কিছু। এ দুই ঔষধের দামও কিন্তু ভিন্ন ভিন্ন হতে পারে। তাই সমতার পাশাপাশি ন্যায্যতা শব্দ বা ধারণাটিও চলে এসেছে। যেখানে সমতা রক্ষা করা সম্ভব নয়, সেখানে অবশ্যই ন্যায্যতার নীতি অবলম্বন করতে হবে। এক্ষেত্রে বলা যায়, সমতাকে ন্যায্যতা দিয়েও অতিক্রম করা যায় কিংবা ন্যায্যতাকে সমতা দিয়ে। তাই সব ক্ষেত্রে সমতা নয়, বরং ন্যায্যতাই কাম্য।

বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের ২৮ টি ক্যাডারের মধ্যে সমতা রক্ষা করা রাষ্ট্রের জন্য একটি বড় ধরনের চ্যালেন্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সিভিল সার্ভিসের বিভিন্ন ক্যাডারের মধ্যে সমতা আনায়নের জন্য সরকারের উপর নানা দিক থেকে নানা প্রকার চাপ রয়েছে। কোন কোন ক্যাডার কর্মকর্তাদের অভিযোগ, কোন কোন ক্যাডারের কর্মকর্তারা অন্যান্য ক্যাডারের কর্মকর্তাদের চেয়ে বেশি সুবিধা পেয়ে থাকেন, বেশি কর্তৃত্ব ও ক্ষমতা ভোগ করেন। সেই তুলনায় অনেক ক্যাডার আছে যেখানে এধরনের সুবিধা নেই। আবার অনেক ক্যাডার আছে যেগুলোকে বলা হয় টেকনিক্যাল বা প্রফেশনাল। শিক্ষক, ডাক্তার, অর্থনীতি প্রভৃতি ক্যাডারগুলো এ প্রফেশনাল ক্যাডারের অন্তর্ভুক্ত। এসব ক্যাডারের কর্মকর্তারা প্রায়সই অসমতার শিকার হওয়ার জন্য অভিযোগ করে আসছেন।

জন প্রশাসন বা বিসিএস (প্রশাসন) ছাড়া অন্য ক্যাডারের কর্মকর্তাগণ মিলে একটি গ্রুপও তৈরি করেছে। এটা বাংলাদেশের সংবিধান বা সরকারি কর্মচারী শৃঙ্খলার দিক দিয়ে অবশ্যই সঠিক ও বৈধ। সরকারি কর্মকর্তারা নিজেদের পেশার উন্নয়ন ও ব্যক্তিগত কল্যাণের জন্য সম্পূর্ণ অরাজনৈতিক চরিত্রের সমিতি বা সঙ্ঘ তৈরি করতে পারেন। সেক্ষেত্রে প্রশাসন ক্যাডারকে বাদ দিয়ে অন্যান্য ক্যাডার মিলে যদি কোন সংগঠন গড়ে তোলা হয় এবং তা সরকারি নীতির সাথে সুসামঞ্জস্যপূর্ণ কর্মকাণ্ডে লিপ্ত থাকে সেটা দোষের কিছু নয়। কিন্তু ২৭টি ক্যাডারের ঐ সংগঠনে আজকাল কিছু কিছু বৈপ্লবিক মানসিকতার সদস্যদ্যের উপস্থিতি লক্ষ করা যায়।

ফেইসবুকে ‘ক্যাডার সমতা দর্পন’ নামে একটি গ্রুপও রয়েছে। এ গ্রুপে অনেক সদস্য এমন সব পোস্ট দিচ্ছেন যা সরকারি কর্মকর্তাদের পক্ষে দেয়া উচিৎ নয় বলেই মনে করি। এসব পোস্টে আমি একটি বিশেষ ক্যাডারকে বিশেষভাবে চিত্রায়িত করার চেষ্টা লক্ষ করছি। আমি এ ধরনের ছাপোষা বিপ্লবের ঘোর বিরোধী। কোন কিছু আদায় করতে হলে সরকারি কর্মচারীদের বিপ্লবী হবার কোন সুযোগ নেই। তাদের হতে হবে আলোচক, প্রেসার গ্রুপ কিংবা নিবেদক। যুদ্ধাংদেহী মনোভাব ট্রেড ইউনিয়নে কাজ দিলেও সর্বোচ্চ শ্রেণির সরকারি চাকুরিতে তা একেবারেই অচল ও অগ্রহণযোগ্য।

ফেইসবুকের পাতার বাইরেও অনেক অনলাইন পত্রিকায় ক্যাডার সমতার কিছু বিপ্লবী সদস্য নানা ধরনের কথা লিখছেন। এ লেখকগণ সরকারি কর্মচারী বলে লেখার মধ্যে ততো বেশি উগ্র না হলেও তারা নিজেদের বিষয়েই বেশি হীনমন্যতামূলক পোস্ট দিয়ে যাচ্ছেন। এমনি একটি পোস্ট পড়লাম, গোয়ালন্দ নিউজ. কম নামের একটি অনলাইন পত্রিকায়।
রাজবাড়ির গোয়ালন্দ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিকেল অফিসার ডা. রাজিব দে সরকার তার নিবন্ধে এমন সব কথা লিখেছেন যার মাধ্যমে তিনি নিজেরই মহান পেশাকে অত্যন্ত নিচু আকারে চিত্রায়িত করেছেন। তার এ লেখায় ব্যক্তিগত হীনমন্যতা প্রকাশিত হয়েছে যা তার গোটা চিকিৎসা পেশাকেই ছোট করে তুলেছে। আর সব চেয়ে বেদনার বিষয় হল, তিনি তিনি এখানে বিসিএস পুলিশকে নিয়ে অনেক অসত্য, অর্ধ সত্য ও কাল্পনিক কথার জাল বুনেছেন।

তার লেখাটা একদিক দিয়ে ভালই হয়েছে । ডাক্তার সাহেবের প্রকাশভঙ্গী অত্যন্ত চমৎকার! তার লেখার হাত আছে, শব্দের শীর্ষে তীক্ষ্ণতা রয়েছে। কিন্তু আমার মন্দ লাগার দিকটা হল, তিনি তার ক্ষুরধার লেখনির মাধ্যমে তার মহান পেশাটাকে যেভাবে খাট করে দেখছেন। এটা আমাকে প্রবল পীড়া দিয়েছে। আমাদের আত্ম সমালোচনার দরকার আছে। কিন্তু এ সমালোচনা যেন আত্মহনন না হয়ে ওঠে সেটাও একই সাথে নিশ্চিত করতে হবে।

পীড়া নিয়ে আমরা যাদের কাছে উপসমের জন্য যাই, তারাই যখন লিখনীর মাধ্যমেও পীড়া দেন, তখন আর যাব কার কাছে? লেখক পুলিশের পেশার সাথে ডাক্তারি পেশার তুলনা করতে গিয়ে একজন পুলিশ অফিসারের লেখার উদ্ধৃতি দিয়েছেন । কিন্তু ঐ সব উদ্ধৃতিতে যা লেখা হয়েছে কিংবা সেটাকে বিশ্লেষণ করতে তিনি যা বলেছেন ও বুঝেছেন, তার অনেক কিছুই অসঙ্গত ও অসঠিক। পুলিশ অফিসারদের বহু প্রকার ভাতার কথা তিনি বলেছেন। কিন্তু এসব ভাতার সবগুলো চালু নেই। ডিএমপি ভাতা কোথায় পেলেন তিনি। আর পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সে চাকরি করলেই বা কোথায় ভাতা পাওয়া যায়?

ঝুঁকি ভাতা, ট্রাফিক ভাতা, র‌্যাব ভাতাসহ আরো কিছু ভাতা আছে পুলিশ বিভাগে। কিন্তু পুলিশের সকল কর্মচারীই শ্রেণি নির্বিশেষে তো সে ভাতা ভোগ করতে পারেন না। বিসিএস কর্মকর্তাদের জন্য কোন ঝুঁকি ভাতার প্রচলন নেই। আর যে সব কর্মকর্তা কর্মচারী ঝুঁকিপূর্ণ কাজে (যেমন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে) নিয়োজিত নেই, তারা তো এ ভাতা পান না। আর এ ভাতার পরিমাণও কিন্তু যৎ সামান্য। তবে এটা অস্বীকার করা যাবে না যে, সরকারের যতটুকু সামর্থ্য তাই দিচ্ছেন। এর মাধ্যমে সরকার বা রাষ্ট্র স্বীকার করে যে এসব কাজে বা এসব স্থানের কাজে বিশেষ প্রণোদনা কিংবা ক্ষতিপূরণ দেবার প্রয়োজন রয়েছে।

লেখক কোথায় যেন পেয়েছেন পুলিশ অফিসারগণ মাসে বিশ দিন ৫০০ টাকা হারে অতিরিক্ত ভাতা আদায় করে। কিন্তু সেটা তিনি যে অর্থে ব্যবহারের চেষ্টা করেছেন সেটা সঠিক নয়। কোন সরকারি কর্মচারী যখন টিএ বা ডিএর অধিকারী হন, তখনই এমন কিছু পেয়ে থাকেন। সেটা কেবল তো পুলিশের বেলায়ই নয়, যে কোন সরকারি কর্মচারীর বেলাতেও প্রযোজ্য। ডাক্তারগণ যখন বণ্যা দুর্গত এলাকায় বিশেষ চিকিৎসা শিবির স্থাপন করেন, কিংবা এক স্থান থেকে অন্য স্থানে সরকারি কাজে ভ্রমণ করেন, তখনও তারা সেটা দাবি করতে পারেন।

পুলিশের বিশেষ সুবিধার ক্ষেত্রে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে কাজ করার সুবিধার কথা তিনি বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন। পুলিশ বা সেনা সদস্যদের ক্ষেত্রে এটা যে একটা বিশেষ সুবিধা এবং এর ফলে ছাপোষা পুলিশ কর্মকর্তারা কিছু বাড়তি ডলার রোজগার করে নিজেদের সম্মৃদ্ধি নিয়ে আসতে পারছেন, সেটা অস্বীকার করার কিছু নেই। কিন্তু এ সুবিধা কোন স্থায়ী সুবিধা নয়।

আমাদের দেশের সরকারি কর্মচারীগণ অন্যান্য দেশের, বিশেষ করে উন্নত দেশের সরকারি কর্মচারীদের তুলনায় অনেক কম বেতন পান। তাই শান্তিরক্ষা মিশনের এমএসএ ( Mission Subsistence Allowance) টুকু তাদের কাছে অনেক বেশি আকর্ষণীয়। কিন্তু যে সব দেশের সরকারি কর্মচারীদের বেতন পর্যাপ্ত, সেসব দেশের কর্মচারীগণ এ মিশনে আসতে আগ্রহী নয়। কারণ এখানে ঝুঁকির পাশাপাশি পরিবার থেকে দূরে থাকার যন্ত্রণা, সভ্য জীবন যাপনের জন্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদির দুষ্প্রাপ্যতা ইত্যাদি মিলে ইউরোপ আমেরিকার মতো দেশগুলোর পুলিশ সদস্যদের অতিরিক্ত ভাতা দিয়ে এখানে নিয়ে আসতে হয়। তাই এ মিশনের চাকরিকে সার্বজনীনভাবে আকর্ষণীয় বলার কোন কারণ নেই।

কিন্তু তারপরও এটা সশস্ত্র বাহিনী পলিশের জন্য আশীর্বাদই বটে। তবে এটা সব সময় সবার বেলায় জোটেও না। এক লাখ ৭৫ হাজার পুলিশের সবাই কি মিশনে আসার সুযোগ পায়? রীতিমত হাড্ডাহাড্ডি লড়াই করে এটা জিতে নিতে হয়। সেক্ষেত্রে Servival of the fittest নীতি এখানে দারুণভাবে প্রযোজ্য। পুলিশের কনস্টেবলরা তো বটেই, এমনকি অনেক ক্যাডার অফিসারের ভাগ্যেও মিশনের পদগুলো সমানভাবে জোটে না।

অন্যদিকে, পুলিশের কিছু কিছু শান্তিরক্ষী পদে ডাক্তারগণও যান। কিন্তু পুলিশের তো কোন স্বাস্থ্য কোর/ইউনিট নেই। তাই এসব পদে স্বাস্থ্য ক্যাডারের লোকজনই নিয়োগ পান। এক্ষেত্রে পুলিশের সুবাদে সেই সুযোগ তো ডাক্তারগণও পাচেছন।

পুলিশ বিভাগের বিপরীতে স্বাস্থ্য বিভাগের ঐ ডাক্তার বন্ধুর আরো একটি কষ্ট আছে। কারণ, পুলিশের জন্য আলাদা হাসপাতাল আছে। কিন্তু ডাক্তারদের বা তাদের পরিবারের জন্য দেশে আলাদা কোন হাসপাতাল নেই। এটা অবশ্য ঠিক। কিন্তু এটাকে কষ্টকররূপে চিত্রায়িত করার কিছু নেই। পুলিশ ও সশস্ত্রবাহিনীর সদস্যদের জন্য আলাদা হাসপাতালের ব্যবস্থা কেন রয়েছে সেটা বিবেচক নাগরিক মাত্রই জানেন। প্রথমেই বলা দরকার, সরকারি কর্মচারী ও তাদের পরিবারের সদস্যদের জন্য কিন্তু সরকারের বিনামূল্যে চিকিৎসাদানের প্রকল্প বা নীতি রয়েছে। যে কোন সরকারি হাসপাতালে তাদের চিকিৎসা যতদূর সম্ভব বিনামূল্যে হবার কথা। আর যদি সরকারি ছাড়া বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা করান হয়, সেক্ষেত্রেও ক্ষতিপূরণ পাওয়ার পদ্ধতিও রয়েছে।

ঢাকা মেট্রোপলিটনে বসবাসকারী সকল পুলিশ সদস্য ও তাদের পরিবারকে যদি ঢাকা মেডিকেলে যেতে হয়, তবে সেটা তো তারা সামলাতে পারবেন না। তাই রাজারবাগ কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতাল এখন অন্যান্য সরকারি হাসপাতালের মতোই একটি হাসপাতাল যেখানে কেবল পুলিশ সদস্যদের চিকিৎসা দেয়া হয়। আর এ হাসপাতালের ডাক্তারগণ তো স্বাস্থ্য ক্যাডারেরই (সামান্য ব্যতীক্রম আছে)। ডিএমপির সদস্য সংখ্যা এখন ২৭ হাজারের বেশি। তার সাথে অন্যান্য পুলিশ ইউনিটের সদস্য ও তাদের পরিবার মিলে এটার কার্যক্রম এখন ঢাকা মেডিকেলের চেয়েও অনেক সময় বড়। সরকার যে কেবল পুলিশ তোষণের জন্যই এটা করছে তা নয়, তারা জনগণকে স্বাস্থ্য সেবা দিচ্ছে। আর পুলিশের সুবিধা এখানেই যে এর পরিচালনার ভার পড়েছে পুলিশের উপর।

আবার রাজারবাগ কিংবা বিভাগীয় পুলিশ হাসপাতালগুলোর বর্তমান সেবা একদিনে গড়ে ওঠেনি। পূর্বে কেবল নিম্ন পদস্থ পুলিশ কর্মচারীদের জন্যই ছিল। তারো পূর্বে ছিল কেবল ব্যারাকের পুলিশ সদস্যদের জন্য। ২০০৪ সালে আমি আমার অসুস্থ্য বাচ্চাকে নিয়ে রাজারবাগ হাসপাতালে ভর্তি করাতে পারিনি। তাকে ভর্তি করাতে হলে সেই সরকারি হাসপাতালেই(যেমন ঢাকা মেডিকেল) যেতে হত। কিন্তু সরকার তো সরকারি কর্মচারিদের জন্য চিকিৎসার ব্যবস্থা করছে।

বাংলাশের বেসামরিক পদগুলোর মধ্যে পুলিশ সার্ভিসেই সর্বাধিক সংখ্যক কর্মচারী নিয়োজিত। অন্যান্য বেসামরিক পদের চেয়ে পুলিশ অনেকটাই আলাদা। তাদের প্রশাসনও অনেকটাই কেন্দ্রীভূত। তাই এসব কর্মচারীদের জন্য আলাদা হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করা হলে সেটা একদিক দিয়ে যেমন দক্ষতার সাথে পরিচালিত হয়, তেমনি অন্যদিক দিয়ে সরকারের আর্থিক সাশ্রয়ও হয়। তাই পুলিশ হাসপাতালের ধারণাটা যতটা না পুলিশকে সুবিধা দেয়ার জন্য, তার চেয়েও বেশি দক্ষতা, মিতব্যয়ীতা ও সহজীকরণের সাথে সংশ্লিষ্ট বলেই মনে করি।

এক অর্থে সরকারের সব হাসপাতালই তো স্বাস্থ্য ক্যাডারের ভাইদেরই হাসপাতাল। আর যে সব হাসপাতালে তারা সেবা দেন, সে সব হাসপাতালে তাদের নিজেদের পরিবারের সদস্যদের চিকিৎসা দিতে তো কোন বাধা নেই। কারণ এগুলোর পরিচালনা, সেবাদান, প্রশাসন সবই তো ডাক্তারদের হাতেই ন্যাস্ত। কোন হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার, মানে যিনি রোগীদের ভর্তি করার কাজে থাকেন, তিনি নিজেও তো ডাক্তারই—পুলিশ কিংবা ম্যাজিস্ট্রেট নন। বাইরের রোগী ভর্তি করাতে গিয়ে কোন হাসপাতালে কর্মরত কোন ডাক্তার সাহেবের পরিবারের কোন সদস্যকে (তিনি যদি হাসপাতালে ভর্তি হয়ে থাকেন) বাইরের হাসপাতালে পাঠিয়ে দিতে হয়েছে, এমনটা তো শুনিনি। একই সাথে শুনিনি যে কোন ডাক্তারের পরিবার কোন সরকারি হাসপাতাল থেকে সেবা নিতে গিয়ে ফেরত এসেছেন।

আমার মতে ডাক্তারের চিকিৎসা সেবা দেয়া আর পুলিশের থানায় পুলিশি সেবাদানের মধ্যে বে সাদৃশ্য রয়েছে। ডাক্তার নিজেকে যেমন চিকিৎসা সেবা দিতে পারেন, পুলিশও তেমনি নিজেকে পুলিশি নিরাপত্তা দিতে পারেন। তবে ডাক্তারের কাজটি যেমন তার সম্পূর্ণ নিজের উপর নির্ভর করে, পুলিশের কাজ কেবল পুলিশের উপর নির্ভর করে না। তারপরও কেবল পুলিশ সদস্যদের পরিবার বা তাদের জন্য আলাদা থানা স্থাপনের দাবি বাস্তবসম্মত নয়। একইভাবে ডাক্তারগণ কিংবা তাদের পরিবারের সদস্যদের জন্য আলাদা হাসপাতাল স্থাপনও বাস্তবসম্মত নয়। এতে অর্থের অপচয় হবে, দক্ষতা বিঘ্নিত হবে। আর ডাক্তার সাহেব তো নিজেই একটি হাসপাতালের অর্ধাংশ। তিনি যেখানেই যান সেখানেই ডাক্তার । কিন্তু পুলিশ সদস্যগণ যেখানেই যান, সেখানেই পুলিশ নয়।

তাছাড়া, সরকারি কর্মচারিদের জন্য আলাদা হাসপাতাল তো রয়েছে। ঢাকার আব্দুল গণি রোডে বিশাল হাসপাতাল রয়েছে যেখানে শুধু সরকারি কর্মচারী ও তাদের পরিবারদেরই সেবা দেয়া হয়। সরকারের আর্থিক অসামর্থ্যের জন্য পূর্বে এ হাসপাতালের করুণ অবস্থা ছিল। কিন্তু বর্তমানে এর সব কিছুই উন্নত মানের। ভাল ডাক্তার রয়েছে, ভাল যন্ত্রপাতি রয়েছে, ঔষধ রয়েছে এবং সেবার মানও ভাল। আর এগুলো তো বিসিএস স্বাস্থ্য ক্যাডারের বন্ধুরাই পরিচালনা করছেন। এর বাইরেও সরকার চাইলে প্রত্যেক জেলায় সরকারি কর্মচারীদের ও তাদের পরিবারের জন্য আলাদা হাসপাতাল স্থাপন করতে পারে। জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে আমাদের বেশি সংখ্যক হাসপাতালের প্রয়োজন রয়েছে। সে ক্ষেত্রে সরকারি কর্মচারীদের জন্য আলাদা হাসপাতাল হলে তো সেবার মান বাড়বেই।

এটা স্বীকার করতেই হবে যে প্রত্যেক পেশারই কিছু বিশেষ সুবিধা-অসুবিধা রয়েছে। একজন সচেতন মানুষ ও সর্বোচ্চ শ্রেণির সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে সেটা আমাদের প্রত্যেকেরই বোঝা উচিৎ। সরকারি চাকরিতে ক্যাডারের ধারণা এসেছে প্রত্যেক সেক্টরে কিছু বিশেষজ্ঞ সৃষ্টির জন্য। ডাক্তারের কাজ যদি পুলিশ করেন, আর পুলিশের কাজ প্রশাসক; তবে বিশেষজ্ঞতা অর্জিত হয় না। যেহেতু আমাদের প্রত্যেকেরই লক্ষ এক ও অভিন্ন, তাই এখানে রেসারেসির বিষয়টি অপ্রাসঙ্গিক ও অনাকাঙ্খিত। পুলিশকে যেমন বিনা পরোয়ানায় গ্রেফতারের ক্ষমতা দেয়া হয়েছে, তেমনি ডাক্তারকে দেয়া হয়েছে বিনা পরোয়ানায় রোগীকে কাটা ছেঁড়ার ক্ষমতা। ডাক্তারদের অনুমোদন ছাড়া তো কোন গেজেটেড সরকারি কর্মকর্তা বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদন (এসিআর) খানা সম্পূর্ণ হয় না। প্রতি বছরই ইনকাম টেক্স রিটার্ন দাখিলের জন্য সকল সরকারি কর্মকর্তাদের কর বিভাগের লোকদের কাছে ছুটতে হয়। এয়ারপোর্ট থেকে বের হওয়া আর এয়ারপোর্ট দিয়ে দেশে আসার ক্ষেত্রে পুলিশের পাশাপাশি তো সবাইকে কাস্টমস অফিসারদের মুখোমুখি হতে হয়। এমনিভাবে সব ক্ষেত্রেই আমরা পরষ্পরের সাথে অঙ্গাঅঙ্গীভাবে জড়িত, একে অপরের উপর নির্ভরশীল। ।তাই সব কিছু মিলে আমাদের উচিৎ, প্রত্যেক পেশাকে সম্মান করা; শ্রদ্ধা করা।

প্রত্যেক সরকারি কর্মচারীকে স্মরণ রাখতে হবে যে তারা জনগণকে সেবাদানের মাধ্যমে তাদের বেতন ভাতা সংগ্রহ করেন। এ সেবাদানের অপরিহার্য চাহিদা হিসেবে কারো কারো গ্রেফতারি কিংবা তদন্তের ক্ষমতা থাকে। কারো কারো থাকে বিচারিক ক্ষমতা। আবার অনেক সরকারি কর্মচারীর হাতে তো নাগরিকদের জীবন মরণও নির্ভরশীল। তাদের পেশার সাথে সম্পর্কিত আনুসঙ্গিক সুবিধা, ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব সব কিছুই নাগরিকদের সেবাদান নিশ্চিত করার যন্ত্রমাত্র। আর যারা সরকারি চাকুরিতে এসে সরকারের বা রাষ্ট্রের দেয়া ক্ষমতার বড়াই করেন, অপ্রয়োজনীয় কিংবা অতিরিক্ত কর্তৃত্ব প্রদর্শন করেন, কেবল নিজস্ব ক্যাডারকে প্রয়োজনীয় এবং অন্য ক্যাডারগুলোকে সরকারের সারপ্লাস কর্মচারী মনে করেন; অন্য ক্যাডারের সদস্য বা সাধারণ মানুষকে হেয়জ্ঞান করেন, তারা নিতান্তই আহম্মক। কারণ তারা ভুলে যান যে যে ক্ষমতা বা কর্তৃত্বের তারা বড়াই করছেন, সেটা আসলে তার নিজস্ব নয়, তার উপর আরোপকৃত মাত্র। যখন তার সরকারি পদ যাবে, তখন তিনি অন্যকে পদাঘাত করা তো দূরের কথা নিজ পদের উপর দাঁড়াতেই পারবেন না।

(২৩ মে, ২০১৬ জোমো কেনিয়াত্মা আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর, নাইরোবি, কেনিয়া)