ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪১৬৭ ধারার উপর বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড এন্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট(ব্লাস্ট) এর করা ১৯৯৮ সালের একটি রিট পিটিশনের উপর প্রথমে হাইকোর্টের রায় ও পরে সরকার কর্তৃক করা তার উপর আপিলের রায় অবশেষে ১৩ বছর পরে বের হয়েছে। এ রায়ের ফলে বিচারপতি হামিদুল হক ও বিচারপতি সালমা মাসুদ চৌধুরির বেঞ্চের দেয়া নির্দেশনাসমূহ পুরোপুরি বহাল থাকল। কেবল পূর্বের রায়ের সবটুকু নির্দেশনা বহালই নয়, আপিলের সংক্ষিপ্ত রায় ঘোষণার সময় প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহা এর সাথে আরো কিছু নির্দেশনা দিবেন কিংবা কিছু কিছু পরিবর্তন করবেন বলে মন্তব্য করেছেন। এ রায়ের ফলে গ্রেফতার ও সন্দিগ্ধদের জিজ্ঞাসাবাদের সময় পুলিশি দায়িত্বে বেশ কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে বলে আশা করা যায়।

বলাবাহুল্য, ১৮৯৮ সালে রচিত ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪ ধারায় যে কোন পুলিশ অফিসারকে বিনা পরোয়ানায় গ্রেফতারের ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। এ ধারায় বর্ণিত নয়টি ক্ষেত্রে ক্ষেত্রে পুলিশ অফিসারগণ যে কোন ব্যক্তিকে আদালতের পরোয়ানা ছাড়াই যে কোন সময় গ্রেফতার করতে পারে। এ ধারাটি পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে এর এক নম্বর ক্ষেত্রটি ছাড়া বাকি আটটি ক্ষেত্রই সুস্পষ্ট। যেমন কোন ব্যক্তির কাছে যদি ঘর ভাংগা বা সিঁদ কাটার যন্ত্রপাতি পাওয়া যায় এবং সে সম্পর্কে সে সদুত্তর দিতে না পারে, যদি কোন ব্যক্তি ঘোষিত অপরাধী হয়, কোন ব্যক্তির কাছে যদি চোরাই মাল পাওয়া যায়, কোন ব্যক্তি যদি পুলিশের আইনসঙ্গত কাজে বাধার সৃষ্টি করে, কোন ব্যক্তি যদি কোন সশস্ত্র বাহিনী থেকে পলাতক হয়, কোন ব্যক্তি যদি বিদেশে গিয়ে গ্রেফতারযোগ্য কোন অপরাধ করে বাংলাদেশে এসে আত্মগোপন করে, কোন সাজা প্রাপ্ত ব্যক্তি যদি শর্ত সাপেক্ষে জেলখানা থেকে ছাড়া পাওয়ার পর সেই শর্ত ভঙ্গ করে, কোন ব্যক্তিকে গ্রেফতার করার জন্য যদি অন্য কোন থানা থেকে অধিযাচন দেয়া হয় তাহলে সেই ব্যক্তিকে বিনা পরোয়ানায় গ্রেফতার করা যাবে।

৫৪ ধারার প্রথম ক্ষেত্রটিতে পুলিশকে সন্দেহবসত গ্রেফতারের ব্যাপক ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। এখানে বলা হয়েছে যদি কোন ব্যক্তি ধর্তব্য অপরাধের সাথে যুক্ত থাকে কিংবা তার বিরুদ্ধে ধর্তব্য অপরাধে জড়িত থাকার জন্য অভিযোগ করা হয় কিংবা সে ধরনের খবর পাওয়া যায় কিংবা তার কোন ধর্তব্য অপরাধের সাথে জড়িত থাকার বিষয়ে যুক্তিসঙ্গত সন্দেহ হয়, তাহলে যে কোন পুলিশ অফিসার তাকে বিনা পরোয়ানায় গ্রেফতার করতে পারবে।

পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে এ অংশটিরও প্রথম দুটি ক্ষেত্রও অনেকটাই স্পষ্ট। কিন্তু শেষ অংশটিতে যে যুক্তিসঙ্গত সন্দেহের (Reasonalbe Suspicion) কথা বলা হয়েছে, মূলত সেটা নিয়েই যতসব কথা, আলোচনা, সমালোচনা, ভুক্তভোগীদের আকুতি। আইনে যে যুক্তিসঙ্গত সন্দেহের কথা বলা হয়েছে সেটা বিভিন্ন জনের ক্ষেত্রে বিভিন্ন হতে পারে। ব্যক্তি তার নিজের রুচি, মেধা, শিক্ষা, বিশ্বাস, মূল্যবোধ এমনকি নিজের জন্য সুবিধাজনক হয়, এমন সব বিবেচনায় কোন কাজের স্বপক্ষে যুক্তি দাঁড় করায়। একজন পুলিশ কনস্টেবলের কাছে যা যুক্তিসঙ্গত তা একজন সাব ইন্সপেক্টরের কাছে নাও হতে পারে। এমনিভাবে একজন উচ্চশিক্ষিত পুলিশ সাবইন্সপেক্টরের যুক্তিসঙ্গতা একজন পদোন্নতি পাওয়া স্বল্প শিক্ষিত পুলিশ সাবইন্সপেক্টরের চেয়ে বহুলাংশে পৃথক হতে পারে। যেহেতু এ অংশে যে কোন পুলিশ অফিসারের কথা বলা হয়েছে তাই এর অপপ্রয়োগ হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।

ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৭ ধারাটি পুলিশকে ম্যাজিস্ট্রেটের অনুমতিসহ তদন্তের স্বার্থে আসামীকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নিজেদের হেফাজতে নেয়ার ক্ষমতা দিযেছে। এখানে বলা হয়েছে যে আসামীকে/সন্দিগ্ধকে গ্রেফতারের ২৪ ঘন্টার মধ্যে যদি তদন্ত সমাপ্ত করা না যায় তাহলে পুলিশ আদালতে আসামীকে তাদের হেফাজতে দেয়ার আবেদন করতে পারে। তবে একটি মামলায় কোন আসামীকে এক নাগাড়ে হোক আর দফায় দফায় হোক ১৫ দিনের বেশি পুলিশ হেফাজতে দেয়া যাবে না।

বলতে কি কোন আসামীকে পুলিশ হেফাজতে দেয়া না দেয়া সম্পূর্ণরূপে ম্যাজিস্ট্রেট বা বিচারকের স্বাধীন বিবেচনার উপর পুরোপুরি নির্ভরশীল। ঘটনার সাথে আসামীর জড়িত থাকার সন্দেহের সপক্ষে পর্যাপ্ত তথ্য তুলে ধরে যুক্তি দেখাতে না পারলে আদালত সাধারণত আসামীকে পুলিশ হেফজতে দেন না। পুলিশ হেফাজতকে বলা হয় রিমান্ড। এ রিমান্ড নিয়ে আমাদের দেশেই কেবল নয়, পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই নানা প্রকারের কথাবার্তা রয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদ মানেই মনে করা হয় আসামীকে নির্যাতন করা, মারপিট করা কিংবা এ সবের ভয়ভীতি দেখিয়ে আসামীর কাছ থেকে বা তার আত্মীয় স্বজনদের কাছ থেকে অর্থ আদাযের অভিযোগ পুলিশের বিরুদ্ধে প্রায় পুরনো।

আসামীকে রিমান্ডে নিয়ে কিভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করতে হবে, তার সাথে কিরূপ আচরণ করতে হবে, যদি আসামীর প্রতি নির্যাতন করা হয় সে ক্ষেত্রে রিমান্ড মঞ্জুরকারী আদালতের কি ভূমিকা হবে তার সবকিছুই আইন, বিধি, পুলিশ প্রবিধান এমনকি আদালতের রুলিং এ বিস্তারিতভাবে আছে। কিন্তু আমাদের দেশের আইন-বিধি কিংবা প্রশাসনিক হাজারও নির্দেশনাগুলোর মতো রিমান্ড সম্পর্কিত নির্দেশনাগুলো্ও প্রতিনিয়তই লঙ্ঘিত হচ্ছে।

এবার আসুন দেখা যাক বিনাপরোয়ানায় গ্রেফতার ও আসামীর রিমান্ড সম্পর্কে মাহামান্য হাইকোট কি কি নির্দেশনা দিয়েছেনঃ
১. আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো শুধু নিবর্তনমূলক বা ডিটেনশন দেবার মানসে কোন ব্যক্তিকে গ্রেফতার করবে না,
২. কোন ব্যক্তিকে গ্রেফতারকালে তারা অবশ্যই তাদের পরিচয়পত্র প্রদর্শন করবে,
৩.গ্রেফতারের তিন ঘন্টার মধ্যেই গ্রেফতারকৃত ব্যক্তিকে গ্রেফতারের কারণ জানাতে হবে,
৪. কোন ব্যক্তিকে তার বাড়ি বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে গ্রেফতার না করে অন্যকোন স্থান থেকে গ্রেফতার করা হলে গ্রেফতারের এক ঘন্টার মধ্যে তার আত্মীয়-স্বজনদের টেলিফোন কিংবা বার্তাবাহকের মাধ্যমে গ্রেফতারের বিষয়ে অবহিত করতে হবে,
৫. গ্রেফতারকৃত ব্যক্তিকে আইনি সহায়তা পাওয়ার জন্য তার আত্মীয়-স্বজন এবং আইনজীবীদের সাথে সাক্ষাতের সুযোগ দিতে হবে,
৬. গ্রেফতারকৃত ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে চাইলে আইনপ্রয়োগকারীগণ তা ম্যাজিস্ট্রেটের অনুমতি নিয়ে জেলখানায় একটি কাঁচ নির্মিত ঘরের মধ্যে করবেন। গ্রেফতারকৃত ব্যক্তির আইনজীবী এবং আত্মীয় স্বজনগণ বাইরে থেকে এ জিজ্ঞাসাবাদ প্রক্রিয়া প্রত্যক্ষ করতে পারবেন।
৭. গ্রেফতারকৃত ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসাবাদের আগে ও পরে ডাক্তার দিয়ে পরীক্ষা করাতে হবে।
৮. গ্রেফতারকৃত ব্যক্তি ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগ করলে ম্যাজিস্ট্রেট একটি মেডিকেল বোর্ড গঠন করে তার স্বাস্থ্য পরীক্ষা করবেন । যদি মেডিকেল বোর্ডের অনুসন্ধানে আসামীর করা অভিযোগ সত্য হয় তাহলে ম্যাজিস্ট্রেট সংশ্লিষ্ট পুলিশ অফিসারদের বিরুদ্ধে পেনাল কোডের ৩৩০ ধারা অনুসারে ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।

এবার আসুন আমরা পর্যালোচনা করি, মহামান্য হাইকোর্টের উপর্যুক্ত নির্দেশনাসমূহ প্রাতিপালন করা আমাদের আইন প্রয়োগকারী ও তদন্ত-সংস্থাগুলোর পক্ষে কতটুকু সম্ভব।

এ রায়ে মোটামুটিভাবে পুলিশসহ অন্যান্য আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর জন্য ৭টি এবং আদালত বা ম্যাজিস্ট্রেটের প্রতি একটি নির্দেশনা দেযা হয়েছে।আমি তো মনে করি, এ রায়ের নির্দেশনাগুলোর প্রায় সবগুলোই প্রতিপালনযোগ্য। তবে একটিমাত্র নির্দেশনা প্রতিপালনে সরকারের দায় সবচেয়ে বেশি পড়বে। আসুন একটু ব্যাখ্যা করে দেখি–

১. এ রায় অনুসারে কোন ব্যক্তিকে ডিটেনশন দেয়ার জন্য ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪ ধারায় গ্রেফতার করা যাবে না। কিন্তু ডিটেনশনের জন্য ৫৪ ধারায় গ্রেফতার না করেও সেটা করা খুবই সম্ভব। যদি কাউকে ডিটেনশন দেয়ার প্রয়োজন পড়ে, সেটার জন্য যেমন দেশে আইনের অভাব নেই তেমনি পুলিশের খাতায় পেন্ডিং মামলার অভাব নেই। আর প্রয়োজনে কোন ব্যক্তির বিরুদ্ধে নিয়মিত মামলার করা তো সময়ের ব্যাপার মাত্র? ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪ ধারার প্রয়োগের উপর যে হাইকোর্টের নির্দেশনা যে সীমাবদ্ধতা আরোপ করেছে, একই আইনের ১৫৪ ধারায় কোন ব্যক্তির বিরুদ্ধে সত্য-মিথ্যা কিংবা অসত্য-অর্ধসত্য মামলা রুজু এবং তার প্রেক্ষিতে পুলিশের তদন্ত শুরু করার উপর তো কোন বিধি নিষেধ নেই।

এ সম্পর্কে আরো একটি কথা বলতে হয়। আমাদের ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ(ডিএমপি) এলাকাসহ সকল মেট্রোপলিটনে নিজস্ব আইন রয়েছে। এসব আইনে ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪ ধারার বিকল্প এক বা একাধিক ধারা রয়েছে (যেমন ডিএমপি একটের ৮৬ নম্বর ধারা)। তাই এসব অধিক্ষেত্রে ৫৪ ধারায় কোন মানুষকে গ্রেফতার করা জরুরী নয়। এর বাইরে সংসদ কর্তৃক পাশ করা পুলিশ কর্তৃক প্রয়োগযোগ্য প্রায় সকল প্রকার বিশেষ আইনে বিনা পরোয়ানায় গ্রেফতার করার সুযোগ রয়েছে। আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় দেখেছি দেশের থানাগুলোতে ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪ ধারায় গ্রেফতারের সংখ্যা অনেকটাই নিম্নগামী। অনেক থানায় দুই তিন মাসেও কোন ব্যক্তিকে এ ধারায় গ্রেফতার করা হয়নি।

২. কোন ব্যক্তিকে গ্রেফতার করার কারণ তো পুলিশ সহজেই জানাতে পারে। যদি ৫৪ ধারায় গ্রেফতার করি, তো বলে বলা হবে, তোমাকে সন্দেহজনকভাবে ঘোরাঘুরির জন্য আমার মনে হয়েছে যে তুমি হয় কোন ধর্তব্য অপরাধ করেছ, কিংবা অপরাধ করার পরিকল্পনা করছ। কিংবা বলা যাবে তোমাকে অমুক মামলায় আমরা সন্দেহ করি। বাস হয়ে গেল সব। বিষয়টা জিডিতে নোট করে রাখলেই হল।

৩. গ্রেফতারকৃত ব্যক্তির আত্মীয়দের খবর দেয়া কোন ব্যাপার হল? এটা তথ্য প্রযুক্তির যুগ। মোবাইলে, ইমেইলে, এসএসএসএ কত প্রকার উপায়ে তার আত্মীয় স্বজনকে কিংবা কাছের বন্ধুদের জানান তো যাবেই।

৪. পুলিশ হেফাজতে নেয়ার আগে ও পরে ডাক্তারি পরীক্ষা করা্ও কঠিন কিছু নয়। থানার পাশেই তো ডাক্তারখানা আছে। একজন ডাক্তার ডাকলেই হয়। কিংবা ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেলেই হয়। যদি কোন ব্যক্তিকে নির্যাতন করা হয়, সে যদি অসুস্থ হয়, রিমান্ডদানকারী আদালত তো চিকিৎসা দেয়া ছাড়া তাকে জেলহাজতে গ্রহণই করেন না। এটা তো পুলিশ পালন করে আসছেই। এ রায়ের ফলে যে বাধ্যবাধকতার তৈরি হয়েছে সেটার জন্য হয়তো ডাক্তারের সংখ্যা বাড়ানোর দরকার পড়বে। আর যখন তখন পুলিশের ডাকাডাকিতে ডাক্তারগণ বিরক্ত হতে পারেন। কিন্তু এক্ষেত্রে বাধ্যবাধকতা তো ডাক্তার বা স্বাস্থ্য বিভাগের উপরও এসে পড়ে।

৫. এবার আসি জিজ্ঞাসাবাদের জন্য কাঁচ নির্মিত বা কাঁচের দেয়ালওয়ালা কামরা নিয়ে। হ্যাঁ, এ রায়ের নির্দেশনা প্রতিপালনের ক্ষেত্রে এ বিষয়টি বড় কষ্টকর হয়ে দেখা দিবে আইনপ্রয়োগকারীদের জন্য। কোন আসামীকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সাধারণত থানায় নিয়ে যা্ওয়া হয়। থানার বাইরেও কতিপয় আসামীকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য যৌথ জিজ্ঞাসাবাদ কেন্দ্র রয়েছে যা পুলিশের সিআইডির তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হয়।

এখন যদি এ জিজ্ঞাসাবাদের স্থানটি জেলখানাতেই নির্ধারিত থাকে তবে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আসামীকে থানা কিংবা অন্য কোন স্থানে যেমন ডিবি, র্যাব, দুদক, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অফিস ইত্যাকার কোন স্থানে নেয়ার সুযোগ থাকবে না। আর এটা যদি বাস্তবায়ন করা হয় তবে প্রত্যেকটি জেলখানার ভিতর কেবল পুলিশসহ অন্যান্য আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর হেফাজতে নেয়া আসামীদের জিজ্ঞাসাবাদরে জন্য পর্যাপ্ত সংখ্যক কাঁচের ঘর নির্মাণ করতে হবে।

এ ক্ষেত্রে একটি ছোট কাল্পনিক হিসাব করা যাক। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের ৫৪ থানার বাইরেও ডিবিসহ প্রায় সকল স্থানেই প্রতিদিনই কোন না কোন আসামী রিমান্ডে থাকে। এর বাইরেও আছে র‌্যাব, সিআইডি, মাদকদ্রব্য অধিতফতর, দুর্নীতিদমন কমিশন ইত্যাদি। যদি একটা দিনের কথা বিবেচনা করি আর প্রত্যেকটি ইউনিটের কাছে একজন করে আসামী ধরি, তাহলে ঐ দিন কমপক্ষে ৬০ জন আসামীকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে হবে এবং এর জন্য ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে কমপক্ষে ৬০টি কাঁচের ঘরের প্রয়োজন হবে। ঐ দিন কারাগারে কমপক্ষে ৬০ জন তদন্তকারী অফিসার, ৬০ জন আসামীর ৬০ জন আইনজীবী ও ৬০ জনেরও বেশি আত্মীয়-স্বজনের উপস্থিত থাকার ব্যবস্থা করতে হবে। কেবল আসামীদের জিজ্ঞাবাদের জন্য এই বিশাল যজ্ঞ সামলানো জেলখানা কর্তৃপক্ষের পক্ষে কতটুকু সম্ভব সেটা ভাবলে সবকিছুই ওলটপালট বলে মনে হয়।

একইভাবে যদি জেলাগুলোর হিসেব নেই তবে দেখব কোন একটি ছোট জেলাতেও প্রতিদিন বিভিন্ন আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর কাছে কমপক্ষে ৮ জন করে আসামী থাকতে পারে। এখন একটি ছোট জেলার জেলখানাতে যেখানে সরকার কয়েদি-হাজতিদের জন্যই পর্যাপ্ত থাকার স্থান করতে পারেনি, যেখানে জেলখানায় ধারণ ক্ষমতার তিন/চারগুণ বন্দী অবস্থান করছে সেখানে পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য কমপক্ষে আটটি কাঁচের ঘর নির্মাণ করা কতটুকু সম্ভব? আর কি শুধু ঘর নির্মাণ করলেই হবে? জিজ্ঞাবাদের জন্য আনুসঙ্গিক আসবাবপত্রসহ অন্যান্য সুবিধাটাও নিশ্চিত করতে হবে। আর যদি বলা হয়, জেলখানায় যেমন গাদাগাদি করে আসামীরা থাকে, পুলিশও তেমনি একটি মাত্র কাঁচের ঘরে গাদাগাদি অবস্থায় আসামীদের জিজ্ঞাবাদ করবে, তাহলে জিজ্ঞাবাদ যাকে বলে সেটা হবে না।

হাইকোর্টের সর্বশেষ নির্দেশনায় রিমান্ড প্রদানকারী ম্যাজিস্ট্রেটকে দোষী পুলিশ অফিসারদের শাস্তির আওতায় আনার বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়েছে। বিষয়টি নতুন কিছু নয়। সাধারণভাবে কোন আসামী নির্যাতনের অভিযোগ করলে ম্যাজিস্ট্রেট তা আমলে নেন। তবে মেডিকেল বোর্ডের ধারণাটি নতুন। এক্ষেত্রে তাকে একটু বাড়তি কাজ করতে হবে এবং এর সাথে অধিকসংখ্যক ডাক্তার বা অন্যান্য ব্যক্তিদের সম্পৃক্ততার প্রয়োজন রয়েছে। তবে এটা প্রতিপালন করা অসম্ভব হবে না।

তবে একথা অবশ্যই স্বীকার করতে হবে যে ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪ ও ১৬৭ ধারা সম্পর্কে মহামান্য হাইকোর্টের এসব নির্দেশনা নাগরিকদের গ্রেফতার ও সন্দিগ্ধদের জিজ্ঞাসাবাদ কার্যক্রমের ক্ষেত্রে যথেষ্ঠ ইতিবাচক পরিবর্তন নিয়ে আসবে। জিজ্ঞাসাবাদ সম্পর্কিত নির্দেশনাগুলো বাস্তবায়নে যে বাস্তব সমস্যা দেখা দিবে সেটা দূর করার জন্য সরকারসহ অন্যান্যদের অতিরিক্ত কিছু ব্যবস্তা গ্রহণ করতে হতে পারে। রিমান্ডের আসামীদের জিজ্ঞাবাদের জন্য একমাত্র জেলখানাকে নির্ধারণের নির্দেশনাটি যে বিশেষ অসুবিধার সৃষ্টি করবে তা দূর করা অনেকটাই অসম্ভব হবে। বাস্তব ক্ষেত্রে কাজ করতে গিয়ে সমস্যা হলে সেটা দূর করার জন্য মহামান্য হাইকোর্টের নির্দেশনাও চাওয়া যেতে পারে।

এ সব নির্দেশনা বাস্তবায়নের দায়িত্ব মূলত পুলিশের। কিন্তু পুলিশের বর্তমান কর্মক্ষতা, সক্ষমতা ও দক্ষতা কাঙ্খিত মানের নয়। তাই পুলিশকে এজন্য যথাযথভাবে দক্ষ করে তুলতে হবে। বদলাতে হবে তাদের সনাতনী মনোভাবকে। জিজ্ঞাসাবাদের আধুনিক ও বৈজ্ঞানিক কৌশল তাদের আয়ত্ব করতে হবে। এজন্য দরকার যেমন পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ, তেমনি তাদের বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতিসহ অন্যান্য লজিস্টিক সরবরাহ করতে হবে।

অনেকে বলেন, এসব নির্দেশনা বাস্তবায়ন নিশ্চিত করার জন্য একটি আলাদা কমিটি বা সংস্থা করা দরকার। কিন্তু সারাদেশের পুলিশ ইউনিটিগুলোকে মনিটর করার মতো কোন আলাদা সংগঠন তৈরি করার মতো বিশাল যজ্ঞের আয়োজন করা সরকারের পক্ষে সম্ভব নয়। এসব নির্দেশনা বাস্তবায়ন কার্য মনিটরিং করার দায়িত্ব পুলিশ নেত্বের উপরই ন্যাস্ত থাকবে। বলাবাহুল্য, ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪ ধারায় আসামী গ্রেফতার ও তার বিহিতকর্ম মনিটর করার জন্য পুলিশের ইতোমধ্যেই পর্যাপ্ত ব্যবস্থা রয়েছে। ৫৪ ধারায় গ্রেফতারকৃত ব্যক্তিদের জন্য থানায় আলাদা রেজিস্ট্রার সংরক্ষণ করা হয়। ঊর্ধ্বতন কর্মকতারা থানা পরিবর্তনকালে তা পর্যালোচনা করেন। একইভাবে রিমান্ড বা জিজ্ঞাসাবাদ কার্যক্রম মনিটর করার দায়িত্বও তাদের উপরই বর্তায়। তাই মাঠ পর্যায়র অফিসারদের দক্ষতা বৃদ্ধির সাথে সাথে ঊর্ধ্বতন অফিসারদের দক্ষতা ও সামর্থ্যও বৃদ্ধি করতে হবে।

লিঙ্ক/সূত্রাবলী-
http://bdlaws.minlaw.gov.bd/sections_detail.php?id=75&sections_id=14518
http://bdlaws.minlaw.gov.bd/sections_detail.php?id=75&sections_id=20861
http://bdlaws.minlaw.gov.bd/sections_detail.php?id=75&sections_id=20845
http://bdlaws.minlaw.gov.bd/sections_detail.php?id=11&sections_id=3182