ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

আত্মহত্যা কোন অপরাধ নয়। কিন্তু আত্মহত্যার চেষ্টা, আত্মহত্যায় সহায়তা, প্ররোচনাদান কিংবা আত্মহত্যায় বাধ্য করা রীতিমত অপরাধ। যে আত্মহত্যা করে, সে তো পার্থিব চাওয়া-পাওয়া, দুঃখ-কষ্ট,পুরস্কার-শাস্তি সব কিছুর ঊর্ধ্বে উঠে যায়। তাই তার জীবিত অবস্থার কৃতকর্মটিকে পার্থিব আইনে অপরাধ বলার কোন হেতু নেই।

 

তবে রাষ্ট্রীয় আইনেই কিন্তু মানুষের জন্য সব কিছু নয়। রাষ্ট্রীয় আইনের বাইরেও রাষ্ট্রসমূহের রাষ্ট্র এবং সেই রাষ্ট্রের সত্তাধিকারী যে মহান আল্লাহ তার কাছে আত্মহত্যা একটি পাপ। তাই এ পাপের বিচার তিনি করবেন। তার মানে আত্মহত্যাকারী পার্থিব শাস্তি এড়াতে সক্ষম হলেও অপার্থিব বা পারলৌকিক শাস্তি থেকে মুক্ত থাকতে পারবে না। পৃথিবীতে একেশ্বরবাদী সকল ধর্ম তো বটেই এমনকি বহুঈশ্বরবাদী কিংবা নিরীশ্বরবাদী কোন ধর্মেই আত্মহত্যাকে বৈধতা দেয়া হয়নি।

 

এখন প্ৰশ্ন হল, পার্থিব ও ঐশ্বরিক আইনে আত্মহত্যা নিষিদ্ধ হওয়ার পরেও কেন কিছু মানুষ  আত্মহত্যা করে? এর কারণ নানাবিধ। তবে কারণ যাই হোক আত্মহত্যাকারী মানুষরা যে এ পৃথিবীকে আর জরুরি মনে করেন না, কিংবা পৃথিবীর যাবতীয় বিষয়ের প্রতি তিনি আকর্ষণ হারিয়ে ফেলেন অথবা মনে করেন, এ পৃথিবীতে যা কিছু তার দেবার ছিল তিনি তা দিয়ে ফেলেছেন, এ পৃথিবী থেকে তার যা কিছু পাওয়ার ছিল তিনি তা পেয়েছেন। এখন তার চাওয়া-পাওয়া, আবেদন-নিবেদনের কিছু নেই– এ ধরনের একটি মানসিক অবস্থা তার মধ্যে বিরাজ করে।

 

কোন সমাজে আত্মহত্যাসহ অন্যান্য অপরাধ বেড়ে যাওয়ার কারণ হিসেবে অপরাধ বিজ্ঞানীগণ নানা ধরনের তত্ত্বের অবতারণা করেন। এসব তত্ত্বের সবই যে আত্মহত্যার ঘটনাগুলোকে ব্যাখ্যা করতে পারে  তা  নয়। তবুও আমরা দেখি এ সম্পর্কে ফরাসি সমাজ বিজ্ঞানী/অপরাধ বিজ্ঞানী এমিল দুর্খেইম কি বলেন।

দুর্খেইমের মতে সমাজে যখন মূল্যবোধের অবক্ষয় ঘটে অথচ নতুন কোন মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠিত হয় না তখন ছড়িয়ে পড়ে অস্থিরতা। এ অস্থীর ও জায়মান অবস্থাকে দুর্খেইম নাম দিয়েছেন ‘এনোমি’।
anomie arises more generally from a mismatch between personal or group standards and wider social standards, or from the lack of a social ethic, which produces moral deregulation and an absence of legitimate aspirations

 

এনোমি বলতে দুর্খেইম সমাজ বা কোন স্থানে বসবাসরত গোষ্ঠীর মধ্যে চরম বিশৃঙ্খল অবস্থাকে বুঝিয়েছেন। কিন্তু তার অনুসারীগণ সমাজের যে কোন দোদুল্যমানতাকেই এনোমি বলতে চান। এ অর্থে আমাদের সমাজ আসলে একটি এনোমিক অবস্থা অতিক্রম করছে। বিভিন্ন ক্ষেত্রে আমাদের নানা মাত্রিক উন্নতি হচ্ছে, আমরা অবশ্যই সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি; সমাজের প্রতিষ্ঠানগুলো সম্পূর্ণ কর্মক্ষম না হলেও এগুলো অন্তত তাদের অস্তিত্ব নিয়ে টিকে আছে। কিন্তু তারপরও আমরা সন্তুষ্ট থাকতে পারছি না। কোথায় যেন হারিয়ে গেছে আমাদের বিশ্বাস, মূল্যবোধ, আশা-আকাঙ্খার আলোকবর্তীকাটি। অতএব, দুর্খেইমের তত্ত্বানুসারে এ অবস্থায় যদি বাংলাদেশে আত্মহত্যা বেড়ে যায়, কিংবা আত্মহত্যার প্রক্রিয়ায় অভিনব নৃসংশতা কিংবা চাঞ্চল্য (sensation) যুক্ত হয়, তাহলে অবাক হবার কিছু নেই।

 

আত্মহত্যাকে আমি একাধারে একটি সামাজিক ও একটি ব্যক্তিগত সমস্যা বলে মনে করি। যে দুর্খেইমের এনোমি তত্ত্বে দাবি করা হয়, সুনির্দিষ্ট মূল্যবোধহীন (normless) সমাজে অন্যান্য অপরাধের সাথে সাথে আত্মহত্যার হারও বেড়ে যায়। কিন্তু সমাজের সব লোক যেমন অপরাধ করে না, তেমনি জীবন ও জগতের প্রতি বিতশ্রদ্ধ সবাই আত্মহত্যাও করে না। যারা সমাজ, পরিবার,রাষ্ট্র ইত্যাদি দ্বারা সৃষ্ট এনোমির চাপ ব্যক্তিগতভাবে সহ্য করতে পারেন না, তারাই মূলত আত্মহণনে প্রবৃত্ত হন।

 

এ পার্থক্য বোঝাবার জন্য আমি সামপ্রতিক কালের সাবিরার আত্মহত্যা এবং নাট্যকর্মী প্রভার আত্মহত্যা না করার ঘটনা দুটি বিশ্লেষণ করতে পারি। সাবিরা ও প্রভার পরিচয় আমি আলাদা করে দিব না। আমি ধরে নিব পাঠক এদের কম বেশি চিনেন।

আত্মহত্যাকারী সাব্বিরকে আমি ব্যক্তি হিসেবে অপেক্ষাকৃত দুর্বলই বলব। আত্মহত্যা করার পূর্বে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সাবিরা তার আত্মহত্যার একটি মহড়া ভিডিও প্রচার করেছিল। এ নিয়েও চলেছিল বেশ হই চই। এটা ছিল তার ব্যর্থ প্রয়াস। যারা আত্মহত্যা করে, তাদের অধিকাংশই কিন্তু একাধিকবার চেষ্টা করে শেষ পর্যন্ত সফল হয়। তাদের এ আত্মহত্যা প্রচেষ্টা হয়তো তারা নিজেরা এবং কিছু ঘনিষ্ঠ বন্ধুবান্ধব ছাড়া আর কেউ জানে না। এক্ষেত্রে সাবিরা অবশ্য ছিল ব্যতিক্রম। কারণ সে তার আত্মহত্যার প্রচেষ্টার খবর সবাইকে জানিযে দিয়েছিল। একান্ত নিজস্ব বিষয়টিকে জনসম্মুখে নিয়ে আসাটা অনেকটাই ইতিবাচক। কারণ এতে আত্মহত্যার প্রচেষ্টাকারীর অন্তরের অবদমিত আকাঙ্খা, দুঃখ-দুর্দশাগুলো অনেকটাই দূর হয়। এতে বন্ধুবান্ধবদের সহানুভূতি ও সহযোগিতার ফলে সে আশাবাদী হয়ে ওঠে। কিন্তু সাবিরার ক্ষেত্রে সেটা হয়নি। আত্মহত্যার প্রচেষ্টার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে প্রকাশিত হওয়ার পরেও সে বন্ধুবান্ধব ও আত্মীস্বজনদের খুব একটা সহানুভূতি অর্জন করতে পারেনি। তার হতাশা ও একাকিত্ব দূর করতে কেউ এগিয়ে আসেনি । তাই জীবনের চরম অস্বস্তি থেকে আত্মরক্ষার জন্য আত্মহত্যাই তার কাছে একমাত্র পথ বলে মনে হয়েছিল ।

 

সাবিরার বিপরীতে আমরা নাট্যকর্মী ও মডেল প্রভাকে সামনে আনতে পারি। প্রভাও তার প্রেমিক কর্তৃক প্রতারিত হয়েছিলেন। এ প্রতারণা এমন একটি অবস্থায় গিয়েছিল যে তার প্রেমিক ইন্টারনেটে তাদের একান্ত গোপনীয় কর্মের ভিডিও ছড়িয়ে দিয়েছিল। এ নিয়ে কত হই চই, কত আলোচনা সমালোচনা। এজন্য তার স্বামীও তাকে পরিত্যাগ করল। আমাদের সমাজে একজন মেয়ের জন্য এটা যে কত বড় ক্ষতি, কত বড় মানসিক চাপ আর ব্যক্তিগত অস্থিরতার বিষয় সেটা হয়তো প্রভা ভিন্ন কেউ বুঝতে পারবে না।

 

এই ইন্টারনেটে ছড়ান ভিডিও প্রভার উপর যে প্রভাব ফেলেছিল তাতে অনেকে মনে করেছিলেন প্রভা হয়তো আত্মহত্যাই করে বসবেন। অনেকে প্রভাকে আকারে ইংগিতে, লেখাতে আড্ডাতে প্রভাকে আত্মহত্যার পরামর্শ পর্যন্ত দিয়েছিলেন।

 

আর যারা একটু বেশি আশাবাদী, তারা মনে করেছিলেন, প্রভা আত্মহত্যা না করলেও সে আর মিডিয়া জগতে ফেরত আসতে পারবে না। কারণ আমাদের দর্শকগণ তাকে হয়তো গ্রহণ করবে না।

কিন্তু এর কোনটিই ঘটেনি। প্রভা আত্মহত্যা করেনি। সে মিডিয়া জগৎ থেকে নিজেকে গুটিয়েও নেয়নি। সে কিছুদিন পর রীতিমত অভিনয় শুরু করল। আর আমাদের দর্শক-সমাজও তাকে মেনে নিল।

বলা বাহুল্য, প্রভার মধ্যে এই যে আত্মপ্রত্যয়, তার ব্যক্তিত্বের এই যে দৃঢ়তা, সেটা কিন্তু সাবিরার মধ্যে ছিল না। প্রভার ক্ষেত্রে যা ঘটেছে সাবিরার ক্ষেত্রে হয়তো তার চেয়ে কম কিছু ঘটেছে। সাবিরা তার প্রেমিককে বিয়ে করার জন্য খুঁজে পায়নি। সে তাকে কেবল প্রতারণাই করেছে। কিন্তু প্রভার প্রেমিক কেবল তাকে প্রতারিতই করেনি, তাকে সমাজে কলঙ্কিতও করেছে। এক্ষেত্রে সাবিরার চেয়ে প্রভা অনেক বেশি আত্মহত্যার ঝুঁকিতে ছিল। কিন্তু প্রভার আশাবাদী ও কলঙ্ককে পরাজিত করার মতো শক্তিশালী ব্যক্তিত্ব তাকে এ সমাজে টিকে থাকতেই কেবল নয়, ভালভাবে টিকে থাকতেই সাহায্য করেছে। আমি বলব, সাবিরা এ সমাজের কষ্ট সহ্য করার মতো যথেষ্ঠ শক্তিশালী ব্যক্তিত্বে অধিকারিনী ছিল না।

 

অন্য একটি বিষয় অবশ্য এখানে বিবেচনায় আনতে হবে। ব্যক্তিগত অর্জনে সাবিরা প্রভার চেয়ে অনেক কম সফল ছিল। প্রভা যখন বিপর্যস্ত ছিল, তখন সে অনেকটাই মিডিয়া জগতে প্রতিষ্ঠিত ছিল। কিন্তু সাবিরার প্রতিষ্ঠা ততোটা মজবুত ছিল না।Travis Hirschi এর Control Theory অনুসারে এ ক্ষেত্রে সাবিরার Commitment ও Achievemnt — এ দুয়েরই প্রবল ঘাটতি ছিল। এ সব বিবেচনাও তার আত্মহত্যায় প্রণোদনা দিয়েছে।

 

পারিবারিক সংশক্তি ( Attachment) এর অভাব অপরাধ বা আত্মহত্যা সংগঠনের জন্য একটি বড় উপাদান হিসেবে কাজ করে। পারিবারিক বন্ধন যেখানে অসংলগ্ন, সেখানে মানুষ সহজেই অসামাজিক আচরণে জড়িয়ে পড়ে। পারিবারিক আকর্ষণ সাবিরার ছিল না। তার পরিবার তাকে পরিত্যাগ করেছিল। অন্যদিকে তার নিজেরও কোন পরিবার ছিল না। এ পারিবারিক বন্ধনহীনতা ও পবিারহীনতা তার ভিতরে কোন সংশক্তির জন্ম দিতে পারেনি। আর পূর্বে যা ছিল তাও ধূলিস্যাৎ হয়ে গেছে। এমতাবস্থায়, সাবিরার আত্মহত্যার পথটা আরো একটু প্রসারিত হয়েছিল।

 

অপর পক্ষে প্রভার পারিবাকি সংশক্তি ও আকর্ষণ, সমর্থন সব কিছুই ছিল। আর এটাই হয়তো তাকে তার পূর্বের প্রতিশ্রুতি ও অর্জণগুলোর কাছে ফিরে আনতে সহায়তা করেছে। সে আত্মহত্যার মতো চরম পন্থায় জীবনকে শেষ করতে চায়নি। অর্জন ও প্রতিশ্রুতির মাধ্যমে সে তার কলঙ্ককে মুছে ফেলতে চেয়েছে এবং সেটা সে পেরেছেও।

 

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এর মতে বাংলাদেশে প্রতি বছর এক লাখের লোকের বিপরীতে ১২.২ জন মানুষ আত্মহত্যা করে।  কিন্তু International Academy for Suicide Research এর একটি গবেষণা মতে এই হার হল ৭.৩। এ হিসেবে প্রতি বছর বাংলাদেশে প্রায় দশ হাজার মানুষ আত্মহত্যা করে।

বাংলাদেশের শহারাঞ্চলের চেয়ে গ্রামাঞ্চলের মানুষ অনেক বেশি আত্মহত্যা প্রবণ। উপরোক্ত গবেষণানুসারে গ্রামের প্রতি এক লাখ নারীতে প্রতি বছর ১৫.৫ জন নারী আত্মহত্যা করে। পুরুষের ক্ষেত্রে এ হার হল ১১.৩। অন্যদিকে প্রতি একলাখে শহরাঞ্চলে মাত্র ০১.০০ জন পুরুষ ও মাত্র ০.৫ জন নারী আত্মহত্যা করে।

সাধারণত শহরাঞ্চলে গ্রামের তুলনায় হতাশার তীব্রতা বেশি বলে আমরা মনে করি। কিন্তু আত্মহত্যার হারের তুলনা করলে সেটা প্রমাণিত হয় না। আরো একটি বিষয় এখানে উল্লেখ্য যে গ্রামের অশিক্ষিত ও অতি দরিদ্ররাই আত্মহত্যা করে বেশি। এ বিবেচনায় বলা যায় আমাদের দেশের শহরাঞ্চলে স্বাভাবিকভাবে দ্রুত পরিবর্তনশীলতায় যে এনোমির জন্ম হওয়ার কথা ছিল তা হয়নি।

 

 পুলিশ পরিসংখ্যান বলছে বাংলাদেশে প্রতি বছর গড়ে প্রায় চার থেকে ৫ হাজার মানুষ খুন হয় । সেক্ষেত্রে আত্মহত্যার হার হত্যার হারের দিগুণ যা আমাদের জন্য অবশ্যই চিন্তার বিষয়। এক্ষেত্রে আমাদের নীতিনির্ধাকদের অবশ্যই নজর দেয়া উচিৎ। ব্যাপকভিত্তিক গবেষণার ভিত্তিতে আত্মহত্যা প্রতিরোধের জন্য একটি সমন্বিত কর্ম কৌশল গ্রহণ করা অপরিহার্য। অধিকন্তু বিষয়টি কেবল সরকারি পর্যায়ে নয়, বেসরকারি ও ব্যক্তিগত পর্যায় পর্যন্ত সম্প্রসারিত করতে হবে।আসুন আমরা কামনা করি আমাদের সমাজে প্রভার সংখ্যা বাড়ুক আর সাবিরার সংখ্যা হ্রাস পাক।

(৩১ মে, ২০১৬, ইউএন হাউজ, জুবা, দক্ষিণ সুদান)