ক্যাটেগরিঃ ভ্রমণ

পোরিজ নয়, ভুট্টার চিনিযুক্ত ডাল
স্বাভাবিকভাবেই গত রাতটা ভাল কাটেনি। শেষ রাতে ঘুম ভাংলে তার আর জোড়া লাগল না। অতি ভোরে উঠেই নাস্তার টেবিলে গেলাম। নিয়মানুসারে হোটেল ভাড়ার সাথে সকালে নাস্তাও অন্তর্ভুক্ত থাকে। এর জন্য আলাদা দাম দিতে হয় না। কিন্তু কোন বাঙালির কাছে খাবার মতো ভাল কিছুই ছিল না এখানে। ভাত নেই, পরাটা নেই, নেই ডাল-ভাজিও। পাউরুটি দিয়ে আর কি নাস্তা চলে। সাথে মিষ্টি আলুর এক টুকরা নিলাম। পাশে ছিল সুপের মতো একটা কিছু। ওরা বলল, এটা পুরিজ।

পোরিজ শব্দটি আমার কাছে মাধ্যমিক স্কুলেই পরিচিত ছিল। তবে প্রথমবার পোরিজ খেয়েছিলাম ২০০৫ সালে সিংগাপুরে। রান্না করে মাড় না গাললে ভাতের অবস্থা যেমনটি হয়, পুরিজ হল তাই। এখানে লবণ মরিচ মিশিয়ে খেলে খারাপ লাগে না। মনে হয়, গরম গরম পান্তা খাচ্ছি। কিন্তু রাঙ্গুয়ে হোটেলের পুরিজ ছিল ভুট্টার আটার সরবৎ। সাথে প্রচুর মিষ্টি। খেতেই পারলাম না।

নাস্তা সেরে হোটেল কক্ষে ফিলে প্রস্তুত হয়ে একটু কম্পিউটারে ছিলাম। এর মাঝেই হয়ে গেল অনেকটাই দেরি যার ক্ষতি আর কোনভাবেই পুষিয়ে নিতে পারিনি। আমাকে ছেড়ে আমার দুজন সদ্য পাতানো দক্ষিণ আমেরিকান বন্ধু চলে গেছেন। আমি ছুটলাম টেক্সি করে ফেরিঘাটে তাদের ধরার জন্য। কিন্তু বিধিবাম।তাদের ধরার আগেই তারা আগের ফেরি ধরে জান্জিবারের উদ্দেশ্যে সাগরে ভাসা শুরু করেছেন।

ফেরিঘাটে সাহায্যকারীদের ঝামেলা
১৫ হাজার শিলিং ভাড়া পরিশোধ করে হোটেল থেকে ফেরিঘাটে নামলাম। টেক্সি থেকে নামার পরপরই কয়েজন দালাল এসে হাজির। তারা আমার ট্রলি ব্যাগটা নিয়ে ঘাটের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিল। আমাকে লঞ্চে ওঠার প্রবেশ পথে নিয়ে গেল। আমি বললাম, আমার টিকেট করা হয়নি। কিন্তু বেটা সেটা শুনল না। প্রবেশ পথ থেকে সে ফিরে এনে এখানে সেখানে নিল। আর এই ফাঁকে ছেড়ে দিল সকাল সাড়ে নয়টার কিলিমানজারো ফেরিটি।

এর পর যতটুকু খবর নিলাম পরের ফেরি ১২ টায় ছাড়বে । সবচেয়ে কম দামের ফেরিটি ছাড়বে ১২৩০ মিনিটে। ভাড়া মাত্র ২০ ডলার। স্থানীয় ব্যক্তি ও বিদেশিদের জন্য আলাদা আলাদা ভাড়ার হার আছে। আমি একটু দূরে এসে দেখলাম, আসলে ফেরির টিকেট বিক্রি করার জন্য অত্যন্ত সুন্দর কাউন্টার আছে। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত টার্মিনালে টিকিট বিক্রয় করা হচ্ছে। এখানে এসে বুঝলাম, এরা আমাকে নিয়ে কতটাই না টাল-বাহানা করেছে। একজন দালাল প্রস্তাব দিল, তুমি আমাদের পঁঞ্চাশ ডলার দাও, তোমাকে চলন্ত ফেরিতে উঠিয়ে দিয়ে আসি। কিন্তু আমার এত তাড়া ছিল না যে , যে যাত্রা মাত্র দু ঘন্টা পরে ৩৫ ডলারে করতে পারব, সেটা নিয়ে আবার এত তাড়াহুড়া করব। অধিকন্তু এ বিদেশ বিভূঁইয়ে এসে অর্থের ঝুঁকি, সময়ের ঝুঁকি নিতে পারি, কিন্তু জীবনের ঝুঁকিটা নিতে পারি না।

বুঝতে পারলাম আমি প্রতারিত হয়েছি
ভাবলাম, যখন আরো দু ঘন্টার বেশি সময় আছে, তখন আর তাড়াহুড়া কিসে? তাই কিছু আনুসঙ্গিক কাজকর্ম সেরে নেই। সাথে স্থানীয় মূদ্রা না থাকায় বেশ অসুবিধা হচ্ছিল। ভাগ্যিস হোটেল থেকে পঞ্চাশ ডলারের একটা নোট দিয়ে ৪০ ডলার ভাড়া পরিশোধ করে ১০ ডলারের ভাংতি নিয়েছিলাম। ওখানে প্রতি ডলারের বিপরীতে ওরা ২,০০০ সিলিং দিয়েছিল। তার মানে পেলাম ২০ হাজার সিলিং। কিন্তু টেকসি ভাড়া দিয়ে বাকি থাকল মাত্র পাঁচ হাজার শিলিং। ফেরির কাউন্টারে এসে মানি এক্সন্জের ডিরেকশন জেনে নিলাম। একটু দূরে গিয়ে এক শ ডলারের শিলিং কেনার জন্য এক্সচেন্জে একশ ডলারের একটি নোট দিলাম। কিন্তু এক্সচেন্জের মহিলা নোটটি হাতে নিয়ে ওলটপালট করে দেখে বলল, এটা নাকি নকল। নকল! আমি আকাশ থেকে পড়লাম। জুবার কেনিয়ান কমার্সিয়াল ব্যাংক থেকে আমি মিশনের এমএসএ (বেতন) তুলি। কিন্তু ওরা তো এমন নকল নোট দেবার কথা নয়।IMG_20160606_093157

আমি কষ্টই পেলাম । মনে পড়ল, তানজানিয়ায় ঢোকার সময় আমাকে এক ব্যক্তি প্রতারণা করে একটা মেকি বর্ডার চেক পয়েন্টে নিয়ে গিয়েছিল। তারা আমার কাছ থেকে ৫০ ডলার ফি এর জন্য পীড়াপীড়ি করছিল। কিন্তু আমি রাজি হলাম না। পরে একজন এসে বলল, তোমার জন্যই সবার দেরি হচ্ছে। তাই তাড়াতাড়ি করি। আমি অনিচ্ছা সত্ত্বেও তাকে একশ ডলারের একটি নোট দিয়েছিলাম। পরে আমার খোঁজে গাড়ির আসল লোক চলে এল। তিনি আমাকে একশ ডলার ফেরত দেয়ার ব্যবস্থা করল। তারা এই পরিবর্তনের কাজটি তখনই করেছিল। আসলে ঐ সময় আমার আসে পাশে যারা ছিল তারা সবাই ঐ প্রতারক চক্রের অংশ ছিল। এক শত ডলারের প্রতারণার শিকারে পরিণত হয়ে ভিতরে ভিতরে বড়ই কষ্ট হচ্ছিল হলেও কিছু করার ছিল না। অন্য একটি নোট দিয়ে একশ ডলারের পরিবর্তে পেলাম ২,১৯,২০০ শিলিং। এর অর্থ হল, হোটেলে আমাকে বেশ কম দেয়া হয়েছিল।

বুকিং অফিসে সময় কাটান
ফিরে এলাম কিলিমানজারো ফেরির বুকিং অফিসে। এখানে ডলার দিয়েই টিকিট কিনতে হবে। একবার ভাবলাম, নকল নোটটি দিয়ে পরীক্ষা করব নাকি? কিন্তু আবার ভাবলাম, এটা সত্য যে এ নোটটা ভূয়া। যদি একই ঘটনা এখানেও ঘটে তাহলে ঐ মানি এক্সেজেনজের মহিলার আচরণের মতো একই আচরণ নাও পেতে পারি। পুলিশ বলেই বুঝতে পারি, নকল মূদ্রা/নোট যার কাছে পাওয়া যাবে সেই দোষি। সে তো আমাকে পুলিশেও ধরিয়ে দিতে পারে। আবার এও ভাবলাম যে কাউন্টারের লোক যদি বুঝতে না পেরে আমার এ নকল ডলারের নোটখানা গ্রহণও করে তবে সেটা হবে জেনে শুনে কাউকে প্রতারণা করা। পরবর্তীতে যখন এটা ধরা পড়বে, তখন এই নিরীহ কর্মচারীটিকেই গচ্ছাটা দিতে হবে। তাই যে প্রতারণার ফলে নিজে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি, অন্যকে সেই ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত বা প্রতারণা করতে পারিনা।

কিলিমানজারো ফেরির বুকিং অফিসে এসে ৩৫ ডলার দিয়ে বিজিনেজ ক্লাসের টিকেট করলাম। সামনে আরো দু ঘন্টা সময়। এ সময়টা কি করা যায়? আমাদের দেশের বড় বড় বাসের বুকিং অফিসগুলোর মতো এখানে কোন চেয়ার টেবিল নেই। তবে মেঝেটা তক তকে ঝক ঝকে। কিছু মহিলা বসে বসে গল্প করছেন মেঝের এক কোণায়। তারাও আমার মতো ফেরির জন্য অপেক্ষা করছেন। গতান্তর না দেখে আমিও তাদের দেখাদেখি মেঝেতে বসে পড়লাম।

বাস, ফেরি কিংবা ট্রেন ধরার জন্য কোথাও অপেক্ষা করাটা বেশ বিরক্তিকর কাজ। সময় যেন কাটতেই চায় না। তবে সাথে একটা বই থাকলে কিংবা লেখার জন্য একটা ল্যাপটপ না হলেও অন্ততপক্ষে এক প্রস্থ কাগজ আর একটি কলম থাকলে আমার কাছে আর কিছু লাগে না। পড়ে, লিখে দিব্যি সময়টা কাটিয়ে দিতে পারি। এ মুহূর্তে আমার সাথে একটা ইংরেজি বই আছে। কারেন আর্মস্ট্রং এর লেখা ‘হিস্ট্রি অব গড’। জুবা থেকে নাইরোবি আসার পথে বিমানে বসে কযেক পাতা পড়েওছিলাম। কিন্তু সেটা এ মুহূর্তে আর পড়তে ইচ্ছা করছে না। তাই কুইকরান ব্যাগ থেকে বের করলাম নেটবুকটি। লেখা শুরু করলাম এই ভ্রমণ কাহিনীর কিছু অংশ। কিন্তু মানুষের যাতায়াতের জন্য কোন কাজেই এখানে মন দেবার ফুসরত নেই। এক সময় আমার সামনের মহিলা দলের সাথে গল্প করতে করতে এক মহিলা প্রায় আমার গায়ের উপর উঠে পড়ার অবস্থা করল। ‘ইক্সকিউজ মি’ বলে তাকে আমার গায়ে পড়া থেকে বিরত রাখলাম।

জান্জিবারের জন্য ইমিগ্রেশন
কিন্তু মাত্র আধা ঘন্টা পরেই খবর হল যে আমাদের চেক ইন করতে হবে। বেশি ঝামেলা নয়। শুধু ফটকে পাসপোর্ট আর টিকেট দেখাতে হবে। আমরা টাংগানিকা থেকে বিদায় নিয়ে জান্জিবারে যাচ্ছি। ১৯৬৪ সালের ২৬ এপ্রিলের পূর্বে মূল ভূমি টাঙ্গানিকা ও দ্বীপপুঞ্জ জানজিবার পৃথক দুটো দেশ ছিল। তখন জান্জিবারের শাসন ক্ষমতায় ছিল একজন মুসলিম সুলতান। ১৯৬৪ সালে এক গণঅভ্যূত্থানের মাধ্যমে সুলতানকে ক্ষমতাচ্যূত করা হয়। আর তার অল্প পরেই জান্জিবার মূল ভূখন্ডের সাথে একত্রিত হয়ে একটি বৃহত্তর ফেডারেশন গঠন করে। টাঙ্গানিকার ‘টান’ ও জান্জিবারের ‘জান’ মিলে হল টানজানিয়া যাকে আমরা বাংলা উচ্চারণে বলি তান্জানিয়া। কিন্তু একটি দেশের স্বায়ত্বশাসিত প্রদেশ হলেও স্বকীয়তা নিয়ে তারা প্রথম থেকেই সচেতন। তারা বিদেশিদের এখানে আসা যাওয়ার উপর এমন সব ব্যবস্থা করেছে যাতে মনে হবে এটা একটি পৃথক স্বাধীন দেশ। তবে তাদের স্বকীয়তার ধরন দ্রুত পাল্টে যাচ্ছে।

সাহায্যকারী ‘পাইপ’
যাহোক চেকইন এর সময় আমাকে পাসপোর্ট আর টিকেট দেখাতে হল। আমার ট্রলি ব্যাগটা একটি টেবিলে তুলে সেটা খুলে উল্টাপাল্টা করে দেখা হল। কিছু কুলি সোৎসাহে আমাকে সহায়তা করতে চাইল। কিন্তু ইতোপূর্বে তাদের সহায়তা পেয়ে আমি এত বেশি ক্ষতিগ্রস্ত ও বিরক্ত হয়েছি যে তাদের ব্যাগটি ধরতেই দিলাম না।

কিন্তু টুরিস্ট এলাকায় সহায়তাকারীদের হাত থেকে কোন নিষ্কৃতি নেই। আমি ভিআইপি ওয়েটিং রুমে বসে ব্যাগগুলো পাশে রেখে একটি প্লাস্টিকের টেবিলের উপর নেটবুকটা খুলে বসেছি কিছু লেখার জন্য। কিন্তু একটু পরেই হাজির হল এক বৃদ্ধলোক। অনেক বড় একটি নাম বলে সে নিজের পরিচয় দিল। কিন্তু শেষে বলল, তাকে পাইপ বলে ডাকলেই হবে। সে নাকি একজন রোমান ক্যাথলিক। আমি বললাম, আমি সাহায্য পেতে পেতে বিরক্ত হয়েছি। তাই আর কোন সাহায্যের দরকার নেই। সে বলল, তরুণ বন্ধু, আমি কোন খারাপ কোন লোক না। বন্দরের কাছে একটি গির্জা দেখিয়ে বলল, আমি একজন রোমান ক্যাথলিক। কোন প্রতারক নই।

পাইপ হল টেক্সি ড্রাইভারের দালাল। সে অল্প পরেই তার ব্যাগ থেকে অনেকগুলো কাগজ বের করে আমাকে তথ্য দেয়া শুরু করল। তার কথা হল, জান্জিবারে গিয়ে তোমার দরকার টেক্সি। তাই এখান থেকেই আমি তা ঠিক করে দিচ্ছি। তুমি ওখানে গিয়ে রেডিমেড পেয়ে যাবে সব কিছু। তার ভাষায় তার ছেলে মোহাম্মদ ওখানে টেক্সি চালায়। সে আমার জন্য দুই নম্বর গেটে প্লাকার্ড নিয়ে অপেক্ষা করবে। আমাকে স্বাগত জানাবে। সে একটা ফোন নম্বরও দিল +২৫৫৭৭৭৪১০৪৩৮। এ নম্বরে ফোন দিলে মোহাম্মদ টেক্সি নিয়ে হাজির হবে।

IMG20160519112734

কিন্তু তার কাছে সংরক্ষিত ভাড়ার হার দেখে সেটা অনেক বেশিই মনে হল। তাই সিদ্ধান্ত নিলাম, কোন বাঁধাধরা লোকের কাছে যাব না। আরও একটি বিষয় খটকা লাগল। জান্জিবারের মোহাম্মদ নামের টেক্সি চালক রোমান ক্যাথলিক পাইপের কোনভাবেই ছেলে হতে পারে না। কারণ খ্রিস্টানগণ আর যাই হোক, মুহাম্মদ নাম গ্রহণ করবে না। তাই সে যে তার টেক্সিভাড়া ঠিক করে দেয়ার দালাল, তা বোঝাই যাচ্ছে। পর্যটন এলাকায় কে যে কি প্রকারের কর্ম করে খায়, কিভাবে কোন সুতোয় দু চার পয়সা রোজগার করে তা ঠাহর করাও মুসকিল। এ পাইপ আমাকে সহায়তা করার বিনিময়ে যদি সেই মোহাম্মদের গাড়িতে ওঠাতে পারে, তাহলে সে অবশ্যই মোহাম্মদের কাছ থেকে এটা বখরা পাবে।

এক সময় পাইপ আমার কাছে জানতে চাইল, আমি কোন কোন স্থান ভ্রমণ করতে চাই। আমি কিলিমানজারো পর্বত শ্রেণি ভ্রমণ করতে চাইলে সে আমাকে ঘাটের বাইরে কোন অফিসে নিয়ে যেতে চাইল। আমাকে পরামর্শ দিল যে আমি আমার ট্রলি ব্যাগটা পাশের মহিলার কাছে রেখে যাই। কিন্তু ভরসা হল না। সাথে নিয়েই চললাম। ক্রমে আমরা ইমিগ্রেশন পার হলাম। কিন্তু সে যেতে থাকল দূরে। আমি বাধ্য হয়ে ফিরে এলাম। ভাবলাম, ইতোমধ্যেই অনেক শিক্ষা হয়েছে। আর নয়। শেষ পর্যন্ত আবার আগের পদ্ধতিগুলো, মানে পাসপোর্ট ও টিকিট দেখিয়ে আমাকে ঘাটের ওয়েটিং রুমে আসতে হল।

জান্জিবারের পথে সাগরে
কিলিমানজারো -৬, বারটা ৩৪ মিনিটে দারুস সালাম বন্দর ছেড়ে দিল। জানজিবারের স্টোন টাউনে পৌঁছিতে দেড় ঘন্টা লাগবে। সে অনুসারে আমার জান্জিবারে পৌঁছিতে দুপুর দুটো বাজতে পারে। জান্জিবারের ৯৯% অধিবাসী মুসলমান। তাই ফেরিতেও সেই মুসলমানির ছাপ আছে। এখানে যাত্রী-সম্ভাষণ থেকে শুরু করে ঘোষণা পর্যন্ত সবই মুসলমানি কায়দায় হয়। টিভিতে চলে কোরান তেলাওয়াত কিংবা ইসলামী গান।
13234796_10153714289113121_108446053_o

অল্প কিছুক্ষণ পরে উপকুল পার হয়ে ফেরি সাগরে পড়ল। অপার সমুদ্র! কী তার অনন্ত শোভা!! আমি ইতোপূর্বে টেকনাফ থেকে সেন্টমার্টিন গিয়েছিলাম দুবার। কিন্তু সেই সমুদ্র আর এ সমুদ্রের মধ্যে আকাশ পাতাল পার্থক্য। আমাদের সেন্টমার্টিন দ্বীপ টেকনাফ উপকুল থেকে মাত্র নয় কিমি দূরে। আর দারুস সালাম উপকুল থেকে জান্জিবারের দূরত্ব তার চারগুণ। এটা উপকুল থেকে ৩৭ কিলি দূরে সাগরের ভিতর একটি কোরাল দ্বীপ।

আমার টিকিট ছিল বিজনেস ক্লাসে। বিজনেস ক্লাসের সিটগুলো অত্যন্ত চমৎকার! দুই সিটের সারির মাঝখানে কোথাও কোথাও টেবিল আছে। যেখানে টেবিল নেই, সেখানে বিমানের সিটগুলোর মতো সিটের পিচনে একটি প্রলম্বিত টেবিল সদৃশ কাঠামো আছে।

ফেরির নিচ তলাতেই বিজনেস ও ভিআইপ শ্রেণি। পিছনের দিকটা বিজনেস ও সামনের দিকে ভিআইপি শ্রেণি।খুব দ্রুত এসে জানালার কাছে আসন নিলাম। এখানে কয়েকটি ইন্ডিয়ান পরিবার আর দু চারজন সাদা চামড়ার যাত্রী আছে। অন্যরা সবাই কালো চামড়ার। অনেক সিট ফাঁকাও রয়েছে। বর্তমানে পর্যটনের মন্দা মওসুম হওয়ায় এ অবস্থা। শীতকালে হয়তো এতো আসন ফাঁকা থাকত না।

 

জুমি ইদ্রিস ও জানজিবারের রাজনীতি
আমার পাশে বসলেন জুমি ইদ্রিস নামের এক জানজিবারের ব্যবসায়ী। তার প্রিন্টিং ব্যবসা আছে। আমাকে বেশ সহায়তা করলেন জনাব ইদ্রিস। আমি একা বলে আমার ছবি তুলতে সমস্যা। সেলফি দিয়ে আর কত? নিজেই নিজের ছবি তোলাটা বিড়ম্বনা বটে। নাইরোবিতে একটি সেলফি স্টিক কিনতে চেয়েছিলাম। কিন্তু গতকাল ছিল রোববার। খ্রিস্টিয় জগতে রোববারে সব কিছুই বন্ধ থাকে। তাই চেষ্টা করেও তা কিনতে পারিনি। জনাব ইদ্রিস আমাকে জানালার কাছে বসতে ও ছবি তুলতে সহায়তা করলেন।সবচেয়ে বড় কথা হল, আমাকে আলাপে, তথ্যে সম্মৃদ্ধও করলেন।

তার সাথে অনেক কথা হল। কথা প্রসঙ্গ এলো জান্জিবারের রাজনীতির। পর্তুগীজ, জার্মান, আরব আর সব শেষে ইংরেজদের হাত ঘুরে জান্জিবার স্বাধীন হয় ১৯৬৩ সালের ১০ ডিসেম্বরে। কিন্তু মাত্র ছয় মাসের মাথায় এক বিদ্রোহে ক্ষমতাসীন মুসলিম সুলতানের গদি চলে যায়। অতঃপর তার স্বাধীন অস্তিত্বের অবসান ঘটে। সে হয় বৃহত্তর তানজানিয়ার একটি প্রদেশ মাত্র। মূল দ্বীপ উনগুজা ও পার্শ্ববর্তী দ্বীপ পেমবাসহ অন্যান্য দ্বীপ নিয়ে এ মুসলিম প্রদেশটি গঠিত। ১৯৬৪ সালে টাঙ্গানিকার সাথে ফেডারেশন গঠন করলেও এর রাজনীতির একটি স্বকায়তা আছে। এখানে একটি পার্লামেন্ট ও সরকার রয়েছে। ইদ্রিসের মতে তার দেশের রাজনীতিবিদগণ সবকিছু একাই গলধকরণ করতে চায়। একে অপরকে নিশ্চিহ্ন করার মানসিকতা তাদের আছে। কয়েক বছর আগে তারা একটি সম্মিলিত সরকার তৈরি করেছিল। সেটা বেশ ভালই কাজ দিয়েছিল। কিন্তু সংকীর্ণ স্বার্থ তাদের আর এক থাকতে দেয়নি। তারা পুনরায় একে অপরকে নিশ্চিহ্ন করার তালে আছে। বাংলাদেশের রাজনীতি সম্পর্কে আমার ভিতরের গোপন কথাটি গোপনে রেখে আমি ইদ্রিসের জানজিবারিয়ান রাজনীতির গল্প শুনেই গেলাম।

ফেরির ছাদের শাহরুখ
ফেরিতে বসে ডেকের মধ্যে আরামে সময় কাটানো আমার স্বভাববিরুদ্ধ। বাইরে সাগর বা নদী। তার অপার শোভা, দিগন্ত ছোঁয়া আকাশ — এসব রেখে সিনথেটিকের গতিতে বসে বসে ঢুল ঢুল করার কোন মানেই হয় না। তাই জাহাজের ছাদে যাওয়ার জন্য মনটা উসখুস করছিল। কিন্তু সমুদ্র ছিল অত্যন্ত অশান্ত।ঢেউয়ের ধাক্কা ভিতর থেকেই অনুভব করা যাচিছল। তাই ক্যাপ্টেনের অনুরোধ ছিল যতদূর পারা যায় সিটে বসে থাকতে হবে। তারপরও আমি আমি কিছু পরে উপরে উঠতে লাগলাম। নিচ তলার চেয়ে দ্বিতীয় তলায় যাত্রী সংখ্যা ছিল অনেক বেশি। দ্বিতীয় তলায় ওঠার পথে জাহাজ ঢেউয়ের দোলায় এদিক ওদিক দুলছিল।

ছাদে উঠে আরও অধিক সংখ্যক যাত্রী চোখে পড়ল। নিচ তলা ও দ্বিতীয় তলার চেয়ে অনেক বেশি স্থানীয় লোক ছাদের উপর শুয়ে বসে আছে। অনেকে ঘুপছি কোণাতেও ঘুমাচ্ছেন। বুঝলাম, এ অংশটা আমাদের দেশের বরিশাইল্যাদের স্থল। যে যেমন পারে, আসন নিয়েছে। তবে একটি সাদা চামড়ার ছেমড়ি দলও আছে। এদের মধ্যে একজনকে লেকচার দিতে দেখা গেল। বুঝলাম, এটা এদের শিক্ষা ভ্রুমণ। ছাত্রীদের সাথে নিয়ে অধ্যাপিকা শিক্ষা সফরে এসেছেন। তবে গোটা দলকে এক সাথে দেখলে ওদের একটা হালকা মেজাজের পর্যটকই মনে হবে যারা কেবল আনন্দের জন্যই হাওয়া বদল করছে।hasan

আমি সঙ্গীবিহীন; ছবি তোলার সমস্যায় ভুগছি। আলাদা কোন ক্যামেরা নেই আমার সাথে। স্মার্ট ফোনেই সব কিছু। কিন্তু মোবাইলটা কার হাতে দেই, কাকে অনুরোধ করি- এসব নিয়েই আমার যত যন্ত্রণা।যার তার হাতে যেমন মোবাইল খানা দেয়া যায় না, তেমনি সবাই অনুরোধে সাড়াও দিতে চায় না। যারা আগ্রহ দেখায়, তাদের সন্দেহহীনভাবে বিশ্বাসও করতে পারি না। আর প্রত্যেক মোবাইলের ফাংশন ভিন্ন ভিন্ন। তাই কেউ আমার জন্য ছবি তুলতে রাজি হলে তাকে আবার প্রথমে কিছুটা কোচিং দিতে হয়।

জাহাজে পেয়ে গেলাম শাহরুখ তাহের নামে একাউন্টিং এর এক ছাত্রকে। প্রথমে তার সাথে আলাপ জমালাম। জানতে চাইলাম, তার পড়াশোনা, বসবাসের স্থান ও তার দেশের অবস্থা সম্পর্কে। নিজের পরিচায় খানাও দিলাম একই সাথে। এরপর তাকে অনুরোধ ছবি তুলে দেয়ার জন্য। সে আলবৎ রাজি হয়ে গেল। প্রথমে তাকে শিখিয়ে দিলাম। এর পর আমি কয়েকটি ছবি তুলে তাকে দেখালাম। ভিডিও শর্ট নেয়ার কলাকৌশলও দেখিয়ে দিলাম।

শাহরুখ তাহেরের সহায়তায় জাহাজের ছাদে বেশ কিছু ছবি তুললাম, ভিডিওও করলাম। কিন্তু এ মনোরম দৃশ্য আসলে ভিডিওতে পুরোটা আসবে না। দূরে উপকুলের দারুস সালাম শহর, পাহাড় শ্রেণি আর সাগরের ঢেউয়ের উপর গাঙচিলদের ওড়াওড়ি। মাছ ধরার নৌকাও প্রচুর। নীলতোয়া পানির উপর হাজার হাজার গাঙচিলের আনাগোনাই প্রমাণ করে এখানে প্রচুর মাছ পাওয়া যায়। (০৭, জুন, ২০১৬, ইউএন হাউজ, জুবা, দক্ষিন সুদান)