ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

ক্ষুরধার লেখনির অধিকারী জনাব মিজানুর রহমানের ‘তনু হত্যার বিচারের পথ খুলে দিন‘ নামের কলামটি গত ১৭ জুন, ২০১৬ তারিখের প্রথম আলো পত্রিকায় হয়তো অনেকেই পড়েছেন। বরাবরের মতো তার এ লেখাটাও চমৎকার! আমি জনাব মিজানুর রহমানের একজন সচেতন ভক্ত। আলোচ্য নিবন্ধে তিনি কিছু মূল্যবান কথা বলেছেন। কিন্তু এসব মূল্যবান কথার পাশাপাশি কিছু অবাস্তব প্রস্তাবও রয়েছে তার কলামে। এ নিবন্ধে আমি এক এক করে এস সব নিয়ে আলোচনা করব-

১. তনু হত্যার তদন্ত নিয়ে বিশেষ কমিটি গঠনঃ
প্রস্তাবটি আমজনতার কাছে আপাতত যৌক্তিক বলেই মনে হবে। বিশেষজ্ঞ কমিটির প্রস্তাবকে যে কেউ সমর্থন করবে। কিন্তু স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কোন কমিটির সুপারিস আদালতে গ্রহণযোগ্য হবে কি না তিনি তা উল্লেখ করেননি। আসলে তদন্তের ক্ষেত্রে পুলিশ ও ডাক্তার/ পরীক্ষক ভিন্ন অন্যকোন কমিটির প্রতিবেদন বাস্তবে কোন কাজই আসবে না। আর যে কমিটির কথা তিনি বলেছেন এবং সেই কমিটির যে কাজের কথা উল্লেখ করেছেন, তার সবই তদন্তকারী কর্মকর্তা করবেন। আর এ তদন্তকারী কর্মকর্তাকে দিক নির্দেশনা দেয়ার জন্য রয়েছে তার উপরে এক বা একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। এমতাবস্থায়, প্রস্তাবিত কমিটিটি কতটা যৌক্তিক, প্রাসঙ্গিক ও তদন্ত সহাযক হবে সেটা ভেবে দখা দরকার।

২. বিচার বিভাগীয় কমিটিঃ
বহুল আলোচিত, কাঙ্খিত, প্রার্থিত বিচার বিভাগীয় কমিটির কার্যক্রম দেশের বিচার ব্যবস্থায় যে কোন প্রকার আঁচড়ই কাটতে পারে না, তার ইতিহাস বহু পুরানো ও নজির অতি শোচনীয়। ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত বহু বিচার বিভাগীয় কমিটির কথা আমরা জানি। কিন্তু কোন বিচার বিভাগীয় কমিটি/ কমিশনের মাধ্যমে কোন যোগসূত্রহীন অপরাধ উদ্ঘাটনের কোন নজির এদেশে নেই। কেউ যদি এটা দাবি করেন, আমি তার সাথে চ্যালেঞ্জে যেতে রাজি আছি। বিচার বিভাগীয় তদন্ত বা অনুসন্ধান কমিটি জানা বিষয়ের তদন্ত করতে পারলেও যেখানে অপরাধী অজানা, যেখানে পুলিশ হাবুডুবু খায় বা খেতে পারে বলে মনে করা হয়, সেখানে এ কমিটি সম্পূর্ণ আইওয়াস ভিন্ন অন্য কিছুই নয়।

বরং এমন নজিরও আছে যেখানে বিচার বিভাগীয় অনুসন্ধান দিয়ে নিরপরাধ মানুষকে জেল খাটানা হয়েছে। এমন একটি ঘটনা ঘটেছিল মৌলভীবাজার জেলার একটি নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ আইনের মামলায়। এই মামলায় কাজের মেয়েকে গুম/অপহরণ করার অভিযোগের জামালপুরের এক দম্পত্তির যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়। পরবর্তীতে জামালপুরের এসপির মহানুভবতায় সেই দম্পতি খালাস পান। এ বিষয়ে আমার লিখিত নিবন্ধটি পাঠকগণ পড়ে নিতে পারেন।

৩. ঘটনাস্থল থেকে ডিএনএ আলামত সংগ্রহঃ
আমার মনে হয়, মিজানুর রহমান ভুলেই গেছেন যে পুলিশ ইতোমধ্যেই তাদের সাধ্যে যা কুলায় তার সবটুকু ব্যবহার করে কযেকবার ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে ঘটনাস্থল থেকে যাবতীয় আলাতম সংগ্রহ করেছে। এসব আলামতের মধ্য থেকেই তারা ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে তিনজন পুরুষের শুক্রাণুজাত সম্পূর্ণ ডিএনএ প্রোফাইল তৈরি করেছে। মিজানুর রহমান সাহেব অপরাধীদের নখের আঁচড়, চুল বা অন্যান্য আলামত উদ্ধারের কথা বলছেন। তার সুপারিসগুলো থেকে মনে হবে, পুলিশ যেন এ সম্পর্কে কিছুই জানে না। তারা ঘটনাস্থল বা ক্রাইম সিনের তদন্ত কেবল মিজানুর রহমানের কাছ থেকেই শুনছেন। তার এ ধরনের মন্তব্য প্রমাণ করে যে পুলিশের তদন্ত সম্পর্কে জনাব মিজানুর রহমানের সম্মক ধারণা নেই।

এথানে উল্লেখ করা অপ্রাসঙ্গিক হবে না যে অত্যধুনিক ডিএনএ প্রযুক্তির ব্যবহার সম্পর্কে ইতোমধ্যেই বিপুল সংখ্যক পুলিশ অফিসারকে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। পুলিশের সিআইডিতে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ ডিএনএ ল্যাবও প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যেখানে বিনামূল্যে ফৌজদারি মামলার সাথে সংশ্লিষ্ট যে কোন আলামত পরীক্ষা করে তার ডিএনএ প্রোফাইল তৈরি করা যেতে পারে।

অধিকন্তু ক্রাইমসিন ম্যানেজমেন্ট বিষয়ে শুধু পুলিশ অফিসারদেরই নয়, সাধারণ মানুষকে সচেতন করার জন্য প্রচারকার্য চালান হচ্ছে। দেশের প্রতিটি বিভাগীয় শহরে অন্তত একটি করে পরিপূর্ণ সজ্জিত ক্রাইমসিন ভ্যান রয়েছে যেগুলো মাঠ পর্যায় থেকে খবর পাওয়ার সাথে সাথেই ক্রাইম সিনের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিতে পারে।

৪. সরকারি চাকরি বা সরকার বদলি করতে পারে এমন সব লোক বাদ দিয়ে একটি তদন্ত কমিটিঃ
জনাব মিজানুর রহমানের এই প্রস্তাবটি অসম্পূর্ণ। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, এই প্রস্তাবটি দিয়েই তিনি চট করে অন্য প্রসঙ্গে চলে গেছেন। তিনি ময়না তদন্ত কাজের জন্য একটি আইন তৈরির কথা বলেছেন। তার মতে আইন হলে ময়না তদন্তকারী বিশেষজ্ঞগণ যেমন তেমন প্রতিবেদন দিতে পারবেন না। তারা আইনের আওয়তায় এসে সঠিকভাবে কাজ করতে বাধ্য হবেন কিংবা কর্তব্যে অবহেলা বা অসদুপায় অবলম্বন করলে শাস্তির আওতায় আসবেন। আইন তৈরির বিষয়টি অবশ্যই সমর্থনযোগ্য।তবে এ প্রস্তাবটি জনাব মিজান ব্যাখ্যা করেননি তাই আমি সেটাই ব্যাখ্যা করতে চাই। সরকারি চাকরি বা সরকার বদলি করতে পারে — এমনসব ব্যক্তিদের বাদ দিয়ে তিনি একটি তদন্ত কমিটি তৈরি করতে বলেছেন। এর অর্থ কিন্তু সম্পূর্ণরূপে বেসরকারি ব্যক্তিদের নিয়ে তিনি কমিটি তৈরি করতে বলছেন। তবে যদি সুপ্রিম কোর্টের কোন বর্তমান বিচারপতিকে প্রধান করে, বেসরকারি ব্যক্তিবর্গের সমন্বয়ে কোন কিমিটি নয়, কমিশন তৈরি করা যায়, তাহলে এ প্রস্তাব কিছুটা বাস্তবায়িত হতে পারে।কিন্তু তবুও প্রশ্ন থেকে যায়, যে কমিটি সরকারই তৈরি করবে, সেই কমিটিতে সরকারের কেউ থাকতে পারবে না– এমন উদ্ভট প্রস্তাব যেমন অনুমোদনযোগ্য নয়, তেমনি বাস্তবায়নযোগ্যও নয়।

একটি বিষয় মনে হয়, মিজানুর রহমান ভুলে গেছেন যে যে কাজের জন্য সরকার কর্তৃক তৈরি করা বিশেষজ্ঞ পাওয়া যায় না, সেই কাজে বেসরকারি বিশেষজ্ঞ পাওয়া কিভাবে সম্ভব। এটা অতি বহুল চাহিদাযুক্ত কমপিউটার কিংবা যোগাযোগ প্রযুক্তি সম্পর্কে হলেও মেনে নেয়া যেত। কিন্তু যে বিষয়টি সম্পূর্ণরূপে সরকার নিয়ন্ত্রিত এবং একান্তই মেডিকো-লিগ্যাল বিষয়ের সেখানে বেসরকারী বিশেষজ্ঞ কোথায়?

এর চেয়েও বড় বিষয় হচ্ছে, তার এ প্রস্তাবটি গোটা সরকারি যন্ত্রকে বিশ্বাসের অযোগ্য বলে প্রতিপন্ন করে যা আদৌ সঠিক নয়। (১৭ জুন, ২০১৬, ইউএন হাউজ, জুবা, দক্ষিণ সুদান)