ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস

site

সাম্প্রতিক জঙ্গি হামলাগুলোতে অংশগ্রহণকারী জঙ্গি যুবকদের জীবন বৃত্তান্ত ঘাটলে যে কেউ একটি প্রশ্ন তুলবেন, কি কারণে আমাদের তরুণ সমাজের মধ্যে অনেকেই আত্মঘাতী জঙ্গি হয়ে উঠছে? প্রাচুর্যশীল পরিবারের আধুনিক শিক্ষিত যুবকদের সাথে পুরাতনপন্থী মাদ্রাসা-শিক্ষিত যুবকরা কোন সাধারণ সূত্রের প্রেক্ষিতে একত্রিত হয়ে আত্মাহুতি দিচ্ছে সে বিষয়ে আমার ব্যাখ্যাটি ছিল, আমরা তরুণদের গ্রহণযোগ্য কোন আদর্শ দিতে পারছি না বলেই হয়তো তারা নিষিদ্ধ আদর্শের অনুগামী হচ্ছে।

কিন্তু এতে গোটা বিষয়টি ব্যাখ্যা করা যায় না। সাম্প্রতিক হামলায় জড়িত ও পরে নিহত পাঁচজন জঙ্গির মধ্যে তিনজন ছিল ঢাকার উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তান। তারা বড় হয়েছিল প্রাচুর্যের মধ্যে। তাদের শিক্ষাজীবন কেটেছিল ইংরেজি মাধ্যমের বিলাশবহুল স্কুল এবং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে। তারা তাদের পরিবার ও সমাজ থেকে যা পেয়েছিল এ সমাজের খুব সামান্য কয়েকজন মানুষের ভাগ্যেই তা জোটে।

কিন্তু জঙ্গিদের মধ্যে দুজন ছিল বগুড়ার অজপাড়াগাঁয়ের নিতান্তই দরিদ্র পরিবারের সন্তান। অভাব অনটনের মধ্যে কেটেছিল তাদের শৈশব ও কৈশোর। তাদের শিক্ষাজীবন শুরু হয়েছিল গ্রামের পশ্চাদপদ ধারার মাদ্রাসায়। তবে তারা বহু কষ্টে আধুনিক শিক্ষার দ্বারপ্রান্তে উপস্থিত হয়েছিল। একজন বগুড়ার আজিজুল হক কলেজে অন্যজন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কলেজেও নাকি ভর্তি হয়েছিল। তবে এরা দারিদ্যের কারণে ছোটবেলা থেকেই জীবীকার অন্বেষণে ব্যস্ত ছিল।

এই দুই পরষ্পর বিপরীত সামাজিক অবস্থানের যুবকগণ একত্র হয়ে কিভাবে ও কি কারণে একটি আত্মঘাতী অভিন্ন আদর্শে উদ্বুদ্ধ হল তার ব্যাখ্যা পাওয়া সত্যিই দুষ্কর। কিন্তু ০৬ জুলাই, ২০১৬ তারিখে এটিএন নিউজ চ্যানেলের ‘নিউজ আওয়ারে’ পুলিশের অতিরিক্ত আইজিপি জনাব বেনজীর আহম্মদ এ প্রশ্নটির একটি সুন্দর ব্যাখ্যা উপস্থাপন করলেন। তার মতে, সমাজের প্রাচুর্যের শীর্ষে থাকা ইংরেজি মিডিয়ামে শিক্ষিত এবং দারিদ্র্যের কষাঘাতে জর্জরিত সমাজের নিচু তলার তরুণদের মধ্যে একটি সাধারণ বিষয় আছে যা তাদের আত্মঘাতীর পথে একত্রিত করেছে। এটা হল, উভয়েরই সামনে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যের অনুপস্থিতি।

উঁচুতলার সন্তানগণ এত উঁচুতে উঠে গেছে যে তাদের আর উপরে ওঠার কোন পথ নেই। তারা আমাদের গোটা সমাজ থেকে অনেকটাই বিচ্ছিন্ন। তারা জীবন-যাপন, পড়াশোনা, উঠাবসা ও আশাআকাঙ্খার নিরিখে গোটা সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন। তাই সমাজের প্রতি তাদের যেমন আসক্তি নেই, তেমনি কোন কমিটমেন্ট বা প্রতিশ্রুতিও নেই। তাই গোটা সমাজে যেখানে কোন বাস্তব সমস্যা নিয়ে হাবুডুবু খাচ্ছে তখন তারা বসবাস করছে শ্রেফ ফ্যান্টাসির মধ্যে। হয়তো এদের ‘জীবনে সব ভালবাসা শেষ হয়ে গেছে, তাই তারা এখন ‘মৃত্যুকে ভালবেসে’ দেখছে। জঙ্গি আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে আত্মঘাতী হওয়াটা মৃত্যুকে ভালবাসারই সামীল নয়কি?

বিপরীত দিকে প্রাচীনপন্থী মাদ্রাসায় শিক্ষালাভ করা সমাজের হত দরিদ্র অংশের যুবকরাও চিন্তা চেতনায়, আশা-নিরাশায় সমাজের অন্য অংশ, বিশেষ করে, মধ্যবিত্ত সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন। মধ্যবিত্ত সমাজের তরুণদের মতো তারা ভবিষ্যতে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার কোন সম্ভাবনাই দেখছে না। তাদের সামনেও আসলে তেমন কোন সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নেই। তারা তাদের ভবিষ্যত নিয়ে একেবারেই হতাশ। নিজেদের দারিদ্র্যকে তারা সামান্নীকরণ করে গোটা সমাজকেই তারা বেঁচে থেকে উপভোগ করার জন্য অনুপযোগী মনে করছে। এমতাবস্থায়, তারাও মৃত্যুকে ভালবাসার স্তরে নিজেদের ঠেলে দিচ্ছে।

আমাদের এ সহনশীল সমাজে চিরাচরিত ঐতিহ্যকে ভেঙ্গে তৈরি হচ্ছে একের পর একটি জঙ্গি সংগঠন। কতিপয় বিপথগামী বুদ্ধিজীবী এসব সংগঠনে এসব সমাজের উচ্চবিত্ত আর নিচু তলার যুবকদের নানা ছলনায় ঢুকিয়ে তাদের মধ্যে সুপ্ত ফ্যান্টাসিকে আরো উসকে দিচ্ছে। এ উসকানি ক্রমান্বয়ে ছেড়ে যাচ্ছে দেশের সীমানা। দেশি হতাশা আর আন্তর্জাতিক চক্রান্তের কবলে পড়ে আমাদের তরুণগণ নিজেদের মৃত্যুর তালিকায় না লেখাচ্ছে। আইএস এর দাবি করা ছবিগুলোতে গুলশান ট্রাজেডির খলনায়ক যুবকগণ যেভাবে মোহনীয় হাসিতে অস্ত্রহাতে পোজ দিয়ে আছে তা আমাদের গোটা সমাজের প্রতিই সীমাহীন উপহাস ছাড়া আর কি বলা চলে? এই উপহাসের ধারা রুদ্ধ করতে হলে আমাদের সামাজিকভাবেই কিছু একটা করতে হবে।

 

(খসড়া ০৮ জুলাই, ২০১৬, রংপুর, বাংলাদেশ, পরিমার্জন ৬ আগস্ট, ২০১৬, জুবা, দক্ষিণ সুদান)