ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

সম্প্রতি গুলশানের হলি আর্টিজান রেস্তোরায় জঙ্গিদের হামলা করে প্রায় ২৩ জন নিরীহ মানুষকে হত্যা করা এবং একই সাথে জঙ্গিদের পাল্টা আক্রমণে নিহত হওয়া এবং তারও পরে কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়া ঈদগাহ জামাতে জঙ্গিদের হামলার ঘটনার পর সরকার জঙ্গি দমনে প্রচলিত পদক্ষেপের বাইরে ভিন্নধর্মী কিছু পদক্ষেপ গ্রহণের কথা ভাবছে। কিন্তু সরকারের সেই ভাবনাগুলো আমাদের কমিউনিটি পুলিশিং দর্শনের দিকেই সরকারকে পথচলার ইঙ্গিত দেয়।

কমিউনিটি পুলিশিং হল জনগণকে সাথে নিয়ে তাদের অংশীদারিত্ব প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে অপরাধ প্রতিরোধ করা। এ অংশীদারিত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য দেশের সকল ইউনিয়ন/পৌরসভা / সিটি কর্পোরেশনের ওয়ার্ড পর্যায় পর্যন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। পুলিশ রিফর্ম প্রোগ্রামের সহায়তায় এসব কমিটিগুলোর মধ্যে বেশি কিছু কমিটিকে মডেল আকারে গ্রহণ করে তাদের প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে, তারা কিভাবে পুলিশের সাথে কাজ করবে, পুলিশ কিভাবে এসব কমটিকে সাথে নিয়ে কাজ করবে তার হাতে কলমে শিক্ষাও দেয়া হয়েছে সীমীত আকারে।

দেশের প্রত্যেকটি থানায় একজন করে সাব ইন্সপেক্টরকে বিশেষ ভাবে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে এসব কমিটির সাথে পুলিশের সমন্বয় করার যারা কমিউনিটি পুলিশিং অফিসার বা সিপিও নামে পরিচিত।

সম্প্রতি জঙ্গিবিরোধী অভিযানের ক্ষেত্রে সরকারের উচ্চ মহল থেকে মাঠ পর্যায়ে যে সব নির্দেশনা দেয়া হচ্ছে বাংলাদেশ পুলিশ ২০০৬ সাল থেকেই অনুরূপ কাজ করে আসছে। কিন্তু নানা কারণে তাদের এ কাজ কাঙ্খিত সাফল্য পায়নি। তবে এ কাজগুলো যে একেবারে মূল্যহীন হয়েছে তাও নয়।

পুলিশের অপরাধ পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে প্রথাগত অপরারধগুলোর সংখ্যা যে কোন সময়ের চেয়ে কম। এর কারণ কিন্তু তৃণমূল পর্যায়ের জনগণের সহযোগিতা, অংশীদারিত্ব ও নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা যা কমিউনিটি পুলিশিং এর মূলনীতিরই অংশ।

কমিউনিটি পুলিশিং দর্শনের অধীন যে সব কর্মসূচি পুলিশ পালন করে আসছে, বর্তমানের যে উচ্চ পর্যায়ের নির্দেশনা তার চেয়ে ভিন্ন কিছু নয়। বরং এসব নির্দেশনায় বিষয়টিকে তৃণমূল থেকে এক ধাপ উপরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। আরও এক ধাপ এগিয়ে মন্তব্য করলে বলা যায়, সরকার থেকে যে সব নির্দেশনা দেয় হয়েছে, তা মাঠ পর্যায়ে কমিউনিটি পুলিশিং কার্যক্রম জোরদার করারই নামান্তর। এসব নির্দেশনার মাধ্যমে প্রমাণিত হয় যে জঙ্গিবাদের প্রসার ঠেকাতে গেলে আমাদের অবশ্যই তৃণমূলে যেতে হবে। সাধারণ মানুষের মাঝে গিয়ে তাদের নিয়েই সাধারণ মানের কাজই করতে হবে।

জঙ্গিবাদ মোকাবেলার জন্য চূড়ান্ত ব্যবস্থা হিসেবে পুলিশের আভিযানিক সক্ষমতা অবশ্যই বাড়াতে হবে। এজন্য একটি নিবেদিত-ইউনিট অবশ্যই দরকার। বাংলাদেশ পুলিশের পক্ষ থেকে এজন্য অনেক আগেই কর্তৃপক্ষ বরারবর সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবও প্রেরণ করা হয়েছিল। কিন্তু সারা দেশে অধিক্ষেত্র সম্পন্ন সেই ইউনিটটি প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে উপর মহলের কাঙ্খিত সাড়া পাওয়া যায়নি। তবে বিকল্প হিসেবে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের একটি ইউনিট হিসেবে একটি নিবেদতি-সাব-ইউনিট গঠন করা হয়েছে। বলা বাহুল্য ক্ষুদ্র পরিসরে ডিএমপির কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটটি যে সাফল্য দেখিয়েছে এবং এখনও দেখিয়ে যাচেছ তাতে সরকারের উপর মহল একে হয়তো একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ পুলিশ ইউনিট হেসেবেই প্রতিষ্ঠার সম্মতি দিবেন।

তবে এ ইউনিট যাই করুক সেটা তৃণমূলের সমস্যাগুলো শনাক্ত করে সমাধানের জন্য যথেষ্ঠ হবে না। যারা ইতোমধ্যেই জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়েছে তাদের কার্যক্রম সীমীত করা, তাদের গ্রেফতার করে আইনের আওতায় নিয়ে আসা–এধরণের সেকেন্ডারি বা টারসিয়ারি কাজ এ ইউনিটের মাধ্যমে করা সম্ভব। কিন্তু সাধারণ মানুষের জঙ্গি হয়ে ওঠার প্রাথমিক অবস্থায় হস্তক্ষেপ করার জন্য হাই-টেক কোন ইউনিট নয়, মানুষের হাতের কাছের থানা পুলিশই তার জন্য বিকল্পহীনভাবে উপযুক্ত। বড় রোগের জন্য আধুনিক যন্ত্রপাতিসম্পন্ন হাসপাতাল ও স্বনামধন্য ডাক্তারদের প্রয়োজন হয়। কিন্তু রোগ যাতে বড় না হয় তার ব্যবস্থা করার দায়িত্ব কিন্তু বড় ডাক্তারগণ কিংবা আধুনিক হাসপাতাল গ্রহণ করে না। এ কাজটি করতে হয় সাধারণ মানের ডাক্তারদের যারা রোগিদের হাতে কাছেই থাকেন, ডাকলেই সাড়া দেন, প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেন। অপরাধ প্রতিরোধের ক্ষেত্রে থানা/ফাঁড়ি কিংবা তদন্তকেন্দ্রের পুলিশও একই রকম দায়িত্ব পালন করবে । এটাই হল কমিউনিটি পুলিশিং এর মূল কথা।

অপরাধ প্রতিরোধের জন্য মানুষকে পুলিশের কাজে সম্পৃক্ত করার যে অভিজ্ঞতা বাংলাদেশ পুলিশ ইতোমধ্যেই অর্জন করেছে, এখন এই অভিজ্ঞতাগুলোকে কাজে লাগিয়ে কমিউনিটি পুলিশিং কার্যক্রমকে যদি জোরদার করা যায় এবং সর্বোপরি সরকার যদি কমিউনিটি পুলিশিং কার্যক্রমে পুলিশের অনুকুলে পৃথক বাজেট বরাদ্দ করে তবে জঙ্গিবিরোধী অভিযানে কাঙ্খিত ফল পাওয়া যাবে বলেই মনে করি।(২৫ জুলাই, ২০১৬, ইউএন হাউজ, জুবা, দক্ষিণ সুদান)