ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

গত ২৩ জুলাই, ২০১৬ তারিখ বিকালে রাজধানীর ধানমন্ডি ৭/এ সড়কে কর্মরত শিক্ষানবিশ পুলিশ সার্জেন্ট মেয়েদি এক চালকের কাছে গাড়ির কাগজপত্র চাইলে তা নিয়ে দুই জনের মধ্যে কথাকাটাকাটি হয়। এ সময় ওই সার্জেন্ট চালক ইউসুফ ফরাজীকে বেধড়ক মারধর করেন। এ ঘটনাটি উপস্থিত ব্যক্তিদের মধ্যে কেউ ভিডিও করে তা ফেইসবুজে আপলোড করেন। দ্রুত তা ভাইরাল আকারে ছড়িয়ে পড়ে। পরে তা ২৪ জুলাই, ২০১৬ ইউডিউবে আপলোড করা হয়।

ভিডিওটিতে যা এসেছে তার প্রতিবাদ করেছেন শিক্ষাণবিশ সার্জেন্ট মেহেদি। তার মতে ভিডিওটি সম্পূর্ণ আসেনি। আসলে ঐ ড্রাইভার কাগজপত্র চাইলে তার সাথ দুর্ব্যবহার করে এবং এক পর্যায়ে তার গায়ে তা তোলে। তখন বাধ্য হয়েই সার্জেন্ট ড্রাইভারকে পাল্টা ঘুষি মারেন। আর তাকে গ্রেফতারের কৌশল হিসেবেই তাকে মাটিতে ফেলে দেন।

কিন্তু ভিডিওটি পর্যালোচনা করলে বোঝা যায়, সার্জেন্ট মেহেদির দাবি সর্বাংশে সত্য নয়। ভিডিওটিতে দেখা যায় যে সার্জেন্ট এর কাছে ঐ গাড়ির চালক অনেকটাই শান্ত ছিল। তাকে মোবাইলে কথা বলতেও দেখা যায়। কথা বলার সময়ও সে পুলিশের নাগালের মধ্যেই ছিল। সার্জেন্ট তার হাতটি শক্ত করে ধরেই ছিল। কিন্তু হটাৎ করে সার্জেন্ট ঐ ড্রাইভারকে চড় থাপ্পড় দেয়া শুরু করেন এবং এক পর্যায়ে তাকে মাটিতে ফেলে দিয়ে তার উপর বুটসহ পা তুলে চাপতে থাকেন।

অনুমান করা যায়, ঐ ড্রাইভার সার্জেন্টকে উত্তেজিত করার মতো কোন মন্তব্য করেছিল। তাই সার্জেন্ট ক্ষেপে গিয়ে এই কাজটি করেছেন। কিন্তু সার্জেন্ট যা করেছেন তা রীতিমত বাড়াবাড়ি। ভিডিওটি দেখে আমার মনে হয়েছে ঐ সার্জেন্ট বিষয়টিকে যতটা না পেশাগত দিক থেকে দেখেছেন তার চেয়েও বেশি ব্যক্তিগতভাবে নিয়েছেন। যার ফলে তার আচরণ পুলিশ নৈতিকতার বাইরে চলে গেছে। তিনি তার মেজাজ ঠিক রাখতে ব্যর্থ হয়েই একজন গাড়ি চালককে রাস্তায় ফেলে বুটের বাড়ি দিয়েছেন।

ভিডিওটিতে দেখা যায়, তার সহকর্মী ট্রাফিক কনস্টেবলটি এ ঘটনার সহযোগী না হয়ে বরং এটাকে প্রতিহত করতেই চেয়েছেন। এ কনস্টেবল নিঃসন্দেহে সার্জেন্টের চেয়ে বয়স্ক ও চাকরিতে অনেক বেশি পুরাতন। হয়তো তিনি কনস্টেবল না হয়ে সার্জেন্ট এর উপরওয়ালা হলে তিনি এঘটনা ঘটতেই দিতেন না।

ভিডিওটিতে আরো দেখা যায়, আসে পাশের সাধারণ মানুষ ও অন্যান্য গাড়ির চালকরা সার্জেন্টের এ কর্মকে অনেকটাই প্রতিহত করেছেন। তারা সোর-চিৎকার করে সার্জেন্টের কাছে এসে মার খাওয়া ড্রাইভারকে বাঁচানোর চেষ্টা করেছেন। অনেকে সার্জেন্টের গায়ে হাত দিয়ে তাকে সরিয়ে নেয়ার জন্য চেষ্টা করেছেন।

প্রসঙ্গত বলা যায় ১৯৯১ সালে আমেরিকা যুক্ত রাষ্ট্রের লজ এন্জেলস শহরের পুলিশ রোডনি কিং নামের এক টেক্সি ড্রাইভারকে ধাওয়া করে ধরে বেধড়ক মারপিট করেছিল। এ ঘটনা পাশের বিল্ডিং থেকে এক ব্যক্তি ভিডিও করেছিল। এ ব্যক্তি তার ভিডিওটি নিয়ে লজ এন্জেল পুলিশ কমিশনারের কাঝে গিয়েছিলেন। তিনি দাবি জানিয়েছিলেন যে এর প্রেক্ষিতে দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক। কিন্তু পুলিশ কমিশনার ঐ ভিডিওকে কোন পত্তাই দেননি। পরে ঐ ভদ্রলোক ভিডিওটি একটি টিভি চ্যানেলের কাছে বিক্রয় করে দেন। এটা টিভিতে প্রকাশিত হলে গোটা যুক্তরাষ্ট্রে হৈ চৈ পড়ে যায়। চাপের মুখে দায়ি পুলিশ অফিসারদের বিরুদ্ধে মামলা হয়। কিন্তু এক বছর পর সেই মামলা থেকে দায়ি ব্যক্তিরা বেকসুর খালাস পায়। বিচারের রায়ের পর কৃঞ্চাঙ্গ জনগোষ্ঠী অসম্ভব ক্ষেপে যায়। লজ এন্জেলস শহরসহ অন্যান্য শহরে দাঙা ছড়িয়ে পড়ে। এই দাঙায় ৫৫ জন মারা যায়, আহত হয় প্রায় ২০০০ মানুষ। একই সাথে ক্ষতি হয় লক্ষ লক্ষ ডলারের সম্পদ। পরবর্তীতে বিষয়টিকে ফেডারেল আদালতে বিচার করে দুজন পুলিশ অফিসারকে শস্তি দেয়া হয়, আর ছাড়া পায় দুজন।

২০১৬ সালের ২৩ জুলাই ঢাকার ধানমণ্ডিতে ট্রাফিক সার্জেন্ট মেহেদি কর্তৃক গাড়ি চালক ইউসুফ ফরাজিকে মারপিট করার ভিডিওটি আমাদের ১৯৯১ সালের যু্ক্তরাষ্ট্রের এন্জেলস শহরের রোডনি কিং এর ঘটনাটিকে স্মরণ করিয়ে দেয়। ফরাজিকে মারধরের ঘটনাটি এখনও ছোট আকারেই রয়েছে। কিন্তু রেডিনি কিং এর মতো এটা বড় হতে হয়তো তেমন সময় লাগবে না।

খবরে জানা যায়, ঐ সার্জেন্টকে ইতোমধ্যেই দায়িত্ব থেকে সরিয়ে নিয়ে ঘটনাটির তদন্ত করার জন্য একজন উচ্চ পদস্থ পুলিশ কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। কিন্তু ফেইসবুক ও ইউডিউবে ভিডিওটি যেভাবে ছড়িয়ে পড়ছে তাতে এ সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্তৃপক্ষকে দ্রুতই শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিয়ে তা জনগণকে জানাতে হবে। অপ্রতুল শাস্তি ও সে সম্পর্কে জনগণকে অবহিত না রাখলে গুজব ছড়াতে পারে। পুলিশ বিদ্বেষী মহল বিষয়টিকে বৃহত্তর করে ছড়াতে পারে।

(২৫ জুলাই, ২০১৬, ইউএন হাউজ, জুবা, দক্ষিণ সুদান)