ক্যাটেগরিঃ প্রশাসনিক

 

ফেইসবুকে কোন এক বন্ধুর মারফত একটা এটাচমেন্ট পেলাম। এখানে একটি সুলিখিত নাতিদীর্ঘ নিবন্ধ সংযোজন করা হয়েছে। নিবন্ধের মূল সুর হল, ইদানীং চাকরিপ্রার্থীরা বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস বা বিসিএসকে তাদের পছন্দের তালিকার প্রথম দিকেই শুধু রাখে না, তারা বিসিএস পরীক্ষায় কৃতকার্য হওয়ার জন্য রীতিমত খাওয়াদাওয়া ভুলে পড়াশোনা করতে থাকে। বিসিএস হল তাদের ধ্যান ও জ্ঞান। বিষয়টি লেখকের কাছে বিস্ময়কর কেবল নয়, মাতলামিও মনে হয়েছে।

লেখকের মতে, বিসিএস মেধাবী ছাত্রদের মোক্ষ হওয়া উচিৎ নয়। তারা উচ্চতর জ্ঞানের সন্ধানে দেশে বিদেশে ঘুরবেন। উচ্চতর ডিগ্রি নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হবেন, মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানীতে বড় বড় পদে চাকরি করবেন কিংবা অন্য কোন ব্যতীক্রমী তথা চ্যালেঞ্জিং পেশায় প্রবেশ করবেন।

লেখক নিজে জার্নালিজমের তুখোড় মেধাবী ছাত্র হওয়ার পরেও পত্রিকায় কাজ করছেন, মানে সাংবাদিকতা করছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরি সাইন্সের একজন অধ্যাপক দুই দুইটি বিসিএস এ প্রথম স্থান অধিকার করেও সিভিল সার্ভিসের কোন পদে যোগদান করেননি।

নিবন্ধটিতে সিভিল সার্ভিসকে অপ্রয়োজনীয় বলে লেখক মনে করেননি। কিন্তু তিনি যে ঘুরে ফিরে সেই দিকেই যুক্তির পাল্লা ভারি করেছেন, সেটা যে কোন পাঠকই বুঝতে পারবেন।

বলা বাহুল্য, পৃথিবীর সিভিল সার্ভিসের ইতিহাসে প্রথম শ্রেণির মেধাবীদের যোগদানের নজির খুব বেশি নেই। কারণ সরকারি চাকরি মুক্তিবুদ্ধি চর্চার ময়দান নয়। সুনির্দিষ্ট নিয়মাবলীর ভিতর থেকে সরকারের আমলাতন্ত্রকে পরিচালনা তথা সরকারের নীতি বা প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নেই সিভিল সার্ভেন্টদের আসল কাজ। সরকার পরিচালনা করেন অন্যরা। গণতান্ত্রিক দেশে জনগণের প্রতিনিধিরা। জনগণের কাছে দেয়া প্রতিশ্রুতি তথা নির্বাচনী মেনুফেস্টোর বাস্তবায়নে সিভিল সার্ভিসের কর্মকর্তারা কোন কোন স্থানে ম্যানেজার, কোথাও টেকনিশিয়ান আবার কোথাও বা ম্যাকানিক বা ড্রাইভারের কাজও করেন। সরকার অর্থের/বেতন-ভাতার মাধ্যমে সরকারি কর্মচারীদের সমূদয় সময় ক্রয় করে নেন। তাই বিধিগতভাবে সরকারি কর্মচারীদের নিজস্ব কোন সময় নেই। তাদের জীবনের সকল সময়ই সরকার বা রাষ্ট্রের। তাই সরকারের ইচ্ছ-অনিচ্ছার উপরই তাদের জীবনধারা পরিচালিত হয়। বলাবাহুল্য, এ ধরনের গত বাঁধা কাজে উচ্চতর মেধার প্রয়োজন থাকলেও তা অত্যাবশ্যক নয়। সুনির্দিষ্ট ছকে আঁকা সরকারি কাজকর্ম সারার জন্য উচ্চতর শিক্ষা নয়, প্রশিক্ষণই যথেষ্ঠ। এ বিষয়টি অবশ্য জেনালে ক্যাডারের ক্ষেত্রেই সমধিক প্রযোজ্য। কারণ টেকনিক্যাল বা প্রফেশনাল ক্যাডারে উচ্চতর ডিগ্রি গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। কিন্তু একজন সরকারি কর্মচারী তথা বিসিএস ক্যাডারের চাকুরে তার নিদিষ্ট চাকরি বা দয়িত্বের বাইরে যাই করুক না কেন তা সরকারি কাজের সাথে যে কোন ভাবেই হোক প্রাসঙ্গিক হতে হবে।

এর চেয়েও বড় কথা হচ্ছে সরকারি চাকরি কোন দেশেই উচ্চতর বেতন-ভাতার চাকরি নয়। যে দেশ বা সমাজে জনগণের কর্মসংস্থানের যথেষ্ঠ সুযোগ আছে, যে দেশে বেসরকারি খাত যথেষ্ঠ পক্ক ও প্রতিযোগিতামূলক সেসব দেশে বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ছাত্রদের কর্মজীবনের ছকে সরকারি চাকরি প্রথম দিকে থাকে না। কিন্তু যে সব দেশে বেসরকারি খাত যথেষ্ঠ পক্ক নয় সেসব দেশে তো সরকারি চাকরিই যুবকদের একমাত্র না হলেও প্রধানতম লক্ষ্য। বলাবাহুল্য বাংলাদেশের সমাজে এ অবস্থা এখানও বিরাজমান।

আমার মতে, সরকারি চাকরি বা বিসিএস ক্যাডারে উচ্চ শিক্ষিতরা চাকরি করার জন্য ঝুঁকে পড়ে নিম্নলিখিত কারণে-
১. চাকরির বাজার এখনও প্রতিযোগিতামূলক নয়। বেসরকারি খাত এখনও অবিকশিত ।
২. বিধিবিধানে চাকরির স্থায়ীত্ব বিদ্যমান। উপযুক্ত কারণ থাকলেও আত্মপক্ষ সমর্থনের পর্যাপ্ত সুযোগ না দিয়ে সরকারি চাকরির অবসান ঘটান যায় না।
৩. বেতন কম হলেও কিছু কিছু ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত ভাতা তথা অপ্রকৃত মজুরি পাওয়া যায়।
৪. সরকারি চাকরিতে প্রবেশ করে দেশে-বিদেশে উচ্চতর ডিগ্রি নেয়ার ব্যবস্থা আছে। সকল সরকারি সুযোগ সুবিধা বহাল রেখেও এসব ডিগ্রি গ্রহণ সম্ভব
৫.ব্যক্তিগত পেনশন, পারিবারিক পেনশন-গ্রাচুইয়িটি ইত্যাদি সুবিধা চাকরি অবসানে যথেষ্ঠ পর্যাপ্ত।
৬. কিছু কিছু চাকরিতে রেসন পাওয়া যায়, বিদেশে লিয়েনে, প্রেষণে, শান্তিরক্ষা মিশনে কাজ করে প্রচুর বৈদেশিক মূদ্রা অর্জন করা যায়।
৭. অপ্রিয় হলেও সত্য যে কোন কোন ক্ষেত্রে উপরি আয়ের সুযোগ আছ
৮. সরকারি চাকুরেদের এখনও বাংলাদেশি সমাজ যথেষ্ঠ শ্রদ্ধা ও সমীহ করে।

সিভিল সার্ভিসের সুবিধাসমূহ এখানেই শেষ নয়। আরো বহুবিধ সুযোগ সুবিধা রয়েছে যা অন্যান্য সার্ভিসে পাওয়া যায় না। রাষ্ট্র তার উপর অর্পিত দায়িত্ব যেমন সিভিল সার্ভিস তথা সরকারি কর্মকর্তা কর্মচারীদের পালন করে, তেমনি রাষ্ট্রের কর্তৃত্বও সরকারি কর্মচারী তা সিভিল সার্ভেন্টদের মাধ্যমেই প্রযুক্ত হয়। এ ক্ষমতা, কর্তৃত্ব, দায়িত্ব আর কর্তব্যের বহুমাত্রিক সমীকরণ এখনও বাংলাদেশি সমাজে সিভিল সার্ভিসকে মেধাবী চাকরি প্রার্থীদের পছন্দক্রমের প্রথম দিকেই রেখেছে।

বিসিএস পরীক্ষায় কৃতকার্য হয়ে আকর্ষণীয় ক্যাডারে চাকরি পেয়ে অনেক যুবক যেমন সেখানে যোগদান না করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হয়েছেন, তা যেমন সত্য তেমনি বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরিতে ইস্তফা দিয়ে সিভিল সার্ভিসে যোগদান করেছে এমন মেধাবীদের উদাহরণেরও অভাব নেই। এসব মেধাবী বিসিএস ক্যাডারের সিভিল সার্ভেন্টগণ খোদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েই বহিরাগত শিক্ষক( Adjunc Faculty) হিসেবে সুনামের সাথে সরকারি অনুমতি নিয়ে কাজ করছে। আর বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষকদের একটি বড় অংশ সিভিল সার্ভিসের কর্মরত বা সাবেক কর্মকর্তাদের মধ্য থেকেই আসছে।

পরিশেষে বলব, বাংলাদেশি সমাজে কেবল বিসিএস এর মত উচ্চতর স্তরের কর্মকর্তাদের নয়, সাধারণ সরকারি কর্মবর্তাদেরও সম্মানের চোখে দেখা হয়। অন্যদিকে নিয়ত অনিশ্চয়তার মধ্যে সরকারি চাকরি একজন মানুষকে নানা দিক দিয়ে নিশ্চয়তা এনে দেয়। তাই, বিসিএসকে যতই সমালোচনা করা হোক শিক্ষিত যুবকগণ এর প্রতি ঝুঁকবেই।