ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

ফেইসবুকের মাধ্যমে জানতে পারলাম। ৩০তম বিসিএস এ কাস্টম এন্ড ই্ক্সাইজ ক্যাডারে কর্মকর্তা সুশান্ত পালের নামে নাকি তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারায় একটি মামলা হয়েছে। মামলার বাদী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের পক্ষে জনৈক মোতাকাব্বির খান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মিথ্যা, বানোয়াট ও কুরুচিপূর্ণ লেখা প্রকাশ করা হয়েছে বলে দৈনিক প্রথম আলো মারফত জানতে পারলাম।

সুশান্ত পাল নামের ভদ্রলোকটিকে আমি আগে চিনতামই না। তবে মামলার খবরের পর তার সম্পর্কে উৎসাহী হয়ে ফেইসবুকে ঢুকে গেলাম তার প্রোফাইলে। দেখি তিনি কেরিয়ার ডেভেলপমেন্ট নিয়ে নানাবিধ লেখা লিখেন, নানা স্থানে লেকচার দিয়ে বেড়ান। এক স্থানে দেখলাম জনাব সুশান্ত পাল নাকি বিসিএস পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকার করেছিলেন। তিনি ফেইসবুকে নানা পোস্টের মাধ্যমে চাকরিপ্রার্থীদের উপদেশ দেন, উৎসাহ দেন।

আমি ফেইসবুকে আমার বন্ধুদের তালিকায় গিয়ে দেখি সুশান্তের সাথে আমার ৩৪ জন সাধারণ বন্ধু আছে। এ সূত্রে হয়তো আমার পোস্টগুলো সুশান্তের কাছে যায়, আর আমিও হয়তো সুশান্তের পোস্ট অনেক ক্ষেত্রেই পড়ি। কিন্তু তাকে আলাদাভাবে স্মরণ করার কোন হেতুই ইতোপূর্বে জন্মায়নি।

কিন্তু সুশান্তের বিরুদ্ধে মামলা হওয়ার খবরটি পড়ে আমার বেশ খারাপই লাগল। একজন বিসিএস ক্যাডারের সরকারি কর্মকর্তা। অবশ্যই মেধাবী। এর বাইরেও কথা হল, সুশান্ত তরুণ-যুবকদের উৎসাহ দেন। তার অসংখ্য ফলোয়ার বা ভক্তও রয়েছে। তরুণদের উদ্বুদ্ধ করতে পারা সরকারি কর্মকর্তার সংখ্যা বেশি নয়। আর মেধাবী হলেই তার মাথা থেকে আইডিয়া বের হবে কিংবা কলম দিয়ে কলাম বের হবে এমন কোন কথা নেই। দেশে হাজার হাজার মেধাবী মানুষ ছিল, এখনও আছেন। কিন্তু তারা অন্যের জন্য কাগজে কলমে কিছু লিখে যেতে পারেননি। জ্ঞান-বিজ্ঞানের ইতিহাসও একই সাক্ষ্য দেয়। সক্রেটিসকে সর্বকালের জ্ঞানী মানুষ বলে আমরা সবাই স্বীকার করি। কিন্তু প্লেটো নামে তার একজন লেখক ছাত্র যদি পৃথিবীতে জন্ম না নিতেন, তবে সক্রেটিসকে হয়তো কেবল গবেষকরাই জানত, আমাদের মতো আমজনতারা নয়। বলাবাহুল্য, সুশান্ত পালের লেখার অভ্যাস আছে। তিনি তার আইডিয়া লিখে সবাইকে জানাতে পারেন।

এ সুশান্ত পালের বিরুদ্ধে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারায় মামলা হওয়ায় আমি যারপর নেই আশ্চর্যান্বিত হয়েছি, ব্যথিত হয়েছি এবং ব্যক্তিগতভাবে উদ্বিগ্নও হয়েছি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে সুশান্ত তার ফেইসবুকের দেয়ালে কি লিখেছিলেন সেটা তাজা অবস্থায় আমার পড়া হয়নি। তবে সুশান্তের বিরুদ্ধে মামলা হওয়ার পর একটু উৎসাহিত হলে নানা সূত্র থেকে তার কয়েকটি ভার্সন আমার দৃষ্টিগোচর হয়েছে। অনেক সাইটে তার চুম্বক অংশও পাওয়া গেছে। হ্যাঁ, কিছু কিছু লেখা আছে যা সম্পূর্ণ মিথ্যা, কল্পনাপ্রসূত কিংবা কোন বিরুদ্ধসূত্র( hostile source). থেকে নেয়া। আর তার শব্দচয়নও মার্জিত নয়। আমি জানি না, এটা তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে হেয় প্রতিপন্ন করার জন্য লিখেছিলেন কিনা। যদি তাই হয়, সুশান্তের বিরুদ্ধে আমিও পুরোমাত্রাই কুপিত, বিতশ্রদ্ধ। কারণ, আমি নিজেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েরই সাঁচ-সন্তান (diced mould)।

বলতে দ্বিধা নেই, একজন অজ পাড়াগাঁর মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান হয়ে বিশেষ কিছু কারণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে না পড়ে আমি যদি অন্য কোথাও পড়তাম, আমার জীবনটা হয়তো ভিন্ন রকম হতো, বর্তমানের চেয়ে অনুন্নত হত। তাই আমার ব্যক্তিগত সাফল্যের জন্য আমি আমাকে যতটা প্রস্তুত করেছিলাম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যায় আমাকে তার চেয়ে বেশি প্রস্তুত করেছিল।।

যদি বলি আমার বর্তমান প্রতিষ্ঠার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সর্বতোভাবে দায়ী, সেটা কোনভাবেই অসত্য হবে না।এমতাবস্থায়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে কেউ যদি অবমাননাসূচক কিংবা মিথ্যা কুৎসা রটনা করে, সেই কুৎসা রটনাকারীর উপর আমি স্বাভাবিক আবেগেই রাগান্বিত হব, তাকে আচ্ছা করে চোখা চোখা শব্দে, এমনকি আমার বাল্যকালের গ্রাম্য ভাষায় দুচারটি বাক্য বলে গালিও দিব।

কিন্তু তাই বলে কলমের ডগা দিয়ে কুৎসা রটনাকারীর বিরুদ্ধে যতই বিরক্ত হইনা কেন, তাকে মামলা দিয়ে হেনস্থা করার চিন্তা কোন দিনই করব না। কেউ যদি কলমের মাধ্যমে আমাকে হেয় করতে চায়, আমি তাকে কলম দিয়েই প্রতিরোধ করব। সুশান্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে যা অসত্য বা বানোয়াট কথা লিখেছেন, আমি তার তীব্র প্রতিবাদ করি, তার বিরুদ্ধে আমার কলম তরবারির চেয়েও ধারাল। তবে তার দেয়া তথ্য বা উপাত্তগুলোকে পাল্টা তথ্য-উপাত্ত দিয়ে খণ্ডন করব। সুশান্ত কলম দিয়ে আমার যে ক্ষতি করেছে বা অপমান করেছে, তাকি আইনী মারপ্যাঁচ বা খড়্গ দিয়ে পুনরুদ্ধার করা যাবে?

যতটুক জানি, সুশান্ত নিজেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন।হয়তো আমাদের মতো কচি অবস্থায় অনার্স প্রথম বর্ষে ভর্তি হয়ে তার জীবনকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাঁচে তৈরি করেননি। কিন্তু তিনি তো এ বিশ্ববিদ্যালয়ের আলো বাতাসটুকু গ্রহণ করেছেন। আর তিনি তার ফেইসবুকের ওয়ালে যা লিখেছেন, সেটা একটি গল্প বৈ কিছু নয়। একজন দৃষ্টি প্রতিবন্ধী যুবকের বেঁচে থাকার সংগ্রাম লিখতে গিয়ে তিনি তার বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবনের বর্ণনা করেছেন। সুশান্তের লিখনিতে দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে যে তার গল্পের নায়ক সায়ং সব স্থানেই লাঞ্ছিত হয়েছিল, এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়/হল ক্যাম্পাসেও। বিশ্ববিদ্যালয়ের লাঞ্ছনা বর্ণনা করতে তিনি যেসব কথা লিখেছেন সেগুলোর মধ্যে অনেক সত্যতাও রয়েছে আবার রয়েছে অতিরঞ্জনও। কিন্তু এই বর্ণনা যদি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস বা হলের জন্য বলা হয়, তবে তার প্রায় সবটুকুই কাল্পনিক। RAG DAY বলে কোন কিছু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নেই। এখানে আছে নবীন বরণ। এই নবীন বরণগুলো অতি মার্জিত অনুষ্ঠান।

১৯৮৭ এর ডিসেম্বর থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে থেকে এমন কোন খবর কোন দিক থেকে শুনিনি বা অভিযোগও শুনিনি যা সুশান্তের বর্ণনার সাথে মিলে যায়। তবে RAG DAY তে অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সতীর্থগণ তাদের জুনিয়রদের নানারূপ লাঞ্ছনা দিয়ে থাকে। জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যায়ের RAG DAY তো প্রতি বছরই পত্রিকার শিরোনাম হয়।কিন্তু সেখানেও সুশান্তের গল্পের অনুরূপ অশ্লীল লাঞ্ছনাদানের খবর কোন পত্রিকায় পড়িনি।

আমর মনে হয়, সুশান্ত তার ফেইসবুকের ওয়ালের গল্পটিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে যা লিখেছিলেন, তা হয়তো বিশেষ কোন কারণে বিরক্ত হয়েই লিখেছিলেন। কারণ তার ওয়ালের পোস্টটি তিনি ইতোমধ্যেই বিলুপ্ত করেছেন। আর এ জন্য প্রতিবাদের মুখে নাকি ক্ষমাও চেয়েছেন। তাই তাকে মামলা দিয়ে নতুন করে হেনস্থা করা অপ্রয়োজনীয়।

বড় কথা হল, সুশান্ত পাল এমন কেউ নয় যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে কয়েকটি মনগড়া কথা লিখলেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তার শত বছরের গৌরব ও ঐতিহ্যহারা হয়ে পথে বসবে। আমি তো মনে করি দেশে যদি আরো এক হাজার বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হয়, সেগুলোর কোনটিই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থান দখল করতে পারবে না। এ বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্যের দেয়াল নিরেট কংক্রিটে তৈরি। তাই এর গায়ে সুশান্ত কেন, বারাক ওবামার আঁচড়ও কোন দাগ ফেলতে পারবে না। তাই সুশান্তের বিরুদ্ধে মামলা করে অযথা সময়-শ্রম নষ্ট করার দরকার কী?

তবে একটি বিষয় জেনে বেশ স্বস্তি পাচ্ছি যে সুশান্তের বিরুদ্ধে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ কোন মামলা করেনি। মামলা করেছে জনৈক ছাত্র। এখন কোন প্রতিষ্ঠানের মানহানীর জন্য কোন ছাত্র মামলা করতে পারবে কি না, সেটা আইনবিধগণ বলতে পারবেন। আমার মতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নানা পথ, মত আর ধর্মীয় সহনশীলতার পীঠস্থান। তাই তার বিরুদ্ধে কয়েকটি কথা লিখে ফেইসবুকে পোস্ট দিলে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু হবার কথা নয়।

তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারা নিয়ে ইতোমধ্যেই নাগরিকদের মধ্যে একটি বিরূপ ধারনার জন্ম হয়েছে। এখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে অবমাননার জন্যও যদি এই আইনের প্রয়োগ শুরু হয়, তাহলে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশালত্ব কিছুটা হলেও ক্ষুণ্ন হবে বলে মনে করি।