ক্যাটেগরিঃ আন্তর্জাতিক

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বহুল প্রতীক্ষিত রাষ্ট্রপতি নির্বাচনটি হয়ে গেল। দ্বিদলীয় গণতন্ত্রের এ দেশের রিপাবলিকান দলের প্রার্থী ছিলেন ডোনাল্ড জন ট্র্যাম্প। তিনি একজন ব্যবসায়ী। তার রাজনৈতিক কেরিয়ার বেশি দিনের নয়। অন্য দিকে ডেমোক্রাটিক পার্টির প্রার্থী ছিলেন হিলারি ক্লিন্টন। হিলারির রাজনৈতিক জীবন তার স্বামী প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিন্টনের সাথে সম্পর্কিত। ইতোপূর্বের ডেমোক্রাটদের হয়ে তিনি প্রার্থী হতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তার দল তাকে শেষ পর্যন্ত মনোনয়ন না দিয়ে মনোনয়ন দিয়েছিল বারাক হোসেন ওবামাকে। ওবামা নির্বাচিত হয়ে হিলারিকে তার পররাষ্ট্র মন্ত্রী (সেক্রেটারি অব স্টেটস) নিয়োগ করেছিলেন। তাই রাজনীতি ও প্রশাসনে হিলারি ক্লিন্টনের ব্যাপক অভিজ্ঞতা ছিল।

কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি নির্বাচিত হতে পারেননি। নির্বাচিত হয়েছেন রিপাবলিকান দলের অরাজনৈতিক ঘরানার প্রার্থী ব্যবসায়ী ধনকুবের ডোনাল্ড জন ট্র্যাম্প। যুক্তরাষ্ট্রের ভোটারগণ সরাসরি ভোট দিয়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করেন না। তারা সরাসরি ভোটে নির্বাচিত করেন কঙ্গেস ও সিনেট সদস্যদের আর নির্বাচিত করেন কিছু ইলেকট্রালকে। ৫০ অঙ্গ রাজ্যে জনসংখ্যানুপাতে ইলেকটরদের সংখ্যার তারতম্য আছে। তবে মোট ইলেকটরের সংখ্যা ৫৩৮টি। ইলেকট্ররাল ভোটগুলো এমন যে যে রাষ্ট্রে যে প্রার্থী সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট পাবেন, সেই রাজ্যের সাকল ইলেকট্ররাল ভোট সেই বিজয়ী প্রার্থী পাবেন বলে ধরে নেয়া হয়।এখন পর্যন্ত প্রাপ্ত ফলাফলে ( ১০ নভেম্বর, বিকাল তিনটা) ইলেকটোরাল ভোটের মধ্যে ট্র্যাম্প পেয়েছেন ২৭৯টি আর হিলারি পেয়েছেন ২২৮টি। তার মানে ট্র্যাম্পই বিজয়ী। এখানে বলে রাখা ভাল, এই ইলেকট্ররালগণ পরবর্তীতে ভোট দিয়ে প্রেসিডেন্ট ও ভাইস প্রেসিডেন্ট নির্বাচন করবেন। সংবিধান অনুসারে বিজয়ী রাজ্যের সাব ইলেকট্ররাল যে ট্র্যাম্পকে ভোট দিবেন এমনটি নয়। কিন্তু বছরের পর বছর ধরে এই ঐতিহ্যই চলে আসছে যে ইলেকট্ররালগণ তাদের বিজয়ী প্রার্থির সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেন না।

যুক্ত রাষ্ট্রের নির্বাচনকে ঘিরে বেসরকারি জরিপকারীদের বড় জয় জয়কার। বলা হয়ে থাকে এ সব জরীপ আগে থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনের ফলাফল নির্ধারণ করেন। এটা বিশ্ববাসির অনেক দিনের বাস্তব অভিজ্ঞতা। কিন্তু সেই অভিজ্ঞতা যে এবার ভিন্ন রকম ফলাফল দেবে সেটা হয়তো অধিকাংশ পর্যবেক্ষণকারী বুঝতে পারেননি।

দক্ষিণ সুদানের শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশিদের এক আড্ডায় আমাকে আমার সহকর্মীগণ জিজ্ঞেস করেছিলেন, এ সম্পর্কে আমার মতামত কি? আমি বলেছিলাম, জরিপের ফলাফল হিলারির পক্ষে, টিভি বিতর্কে হিলারিই জয়লাভ করেছেন। কিন্তু তারপরও বলা সম্ভব নয় যে হিলারিই জয়লাভ করবেন। আমি বলেছিলাম, যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচকগণ এ ব্যাপারে শেষ পর্যন্ত কি করে বসবেন সেটা আমার বোঝে আসছে না। ট্র্যাম্পই যে জয়লাভ করবেন, এমন কথা আমি জোর দিয়েও বলতে পারছিলাম না।

তবে আমার পর্যবেক্ষণ ছিল, ১. ডেমোক্র্যাটগণ ক্লিন্টন ও ওবামা মিলে সর্বমোট চার মেয়াদ মানে ১৬ বছর ক্ষমতায় আছে। যুক্তরাষ্ট্রের জনগণ পঞ্চম টার্মের জন্যও যে ডেমোক্র্যাটদের সুযোগ দিবে সেটা আমার মনে হয় না।

২. হিলারি একজন নারী । যুক্তরাষ্ট্রের জনগণ একজন নারীকে শেষ পর্যন্ত সারা বিশ্বের শাসনভার তুলে দিতে রাজি কি না সেটায় আমার সন্দেহ আছে।

৩. বর্তমান বিশ্বটা চরমপন্থীদের অনুকুলে। ধর্মে বল আর কর্মে বল, শাসনে বল, আর শোষণে বল- সর্বক্ষেত্রেই মানুষ চরমপন্থাকে তাদের জীবীকা ও আদর্শকেই যেন বেছে নিচ্ছে। আর ডোনাল্ড ট্র্যাম্প তার সব কিছুতেই চরম পন্থার আশ্রয় নিয়েছেন বলে মনে হয়। তিনি যেমন মুসলমানদের বিরুদ্ধে চরমপন্থার কথা বলছেন, তেমনি অর্থনীতির ক্ষেত্রেও। তাই শেষ পর্যন্ত ভোটারগণ যদি চরমপন্থার অনুকূলে রায় দেয়, সেটায় অবাক হবার কিছু নেই।

আমার এসব যুক্তির অনুসিদ্ধান্ত ছিল, যদিও হিলারি জরিপে এগিয়ে আছেন, টিভি বিতর্কে ট্র্যাম্পকে বিতর্কিত প্রমাণের সুযোগও পেয়েছে, তবুও শেষ পর্যন্ত যদি ট্র্যাম্পই হোয়াইট হাউজের পরবর্তী বাসিন্দা হয়ে যান, তাতে আমি অবাক হব না।

যাহোক, আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি কে হলেন, আর কে হলেন না সেটা নিয়ে আমাদের মাথা ঘামান হয়তো আদার ব্যাপারি হয়ে জাহাজের খবর নেওয়ার মতোই। কিন্তু যারা আদার ব্যাপারী তারাও এখন আর চোখমুখ বন্ধ করে কেবল গ্রামের হাটের বা শহরের বাজারের খবর নিয়েই আদা বিক্রয় করেন না। বিশ্বরাজনীতির গতি প্রকৃতির সাথে তারও আদার ব্যবসা এখন আক্রান্ত হয়। অবাক হবার কিছু নেই। উদারহণটা তো আমার সাথেই আছে। বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৬,৬২৫ কিলোমিটার দূরে এই দক্ষিণ সুদানেও আমি বাংলাদেশের আদা দিয়ে তরকারি রা্ন্না করি। আর বাংলাদেশের বাজারে এ মুহূর্তে আদার দর কত তা আমি মাত্র একটি ক্লিকেই জানতে পারি। না রাজধানী ঢাকা থেকে নয়, ঢাকা থেকে সাড়ে তিনশ কিলোমিটার দূরে আমার গ্রামের বাড়ির আদার ক্ষেত থেকেই আমার আত্মীয় স্বজনরা তা তাৎক্ষণিকভাবেই আমাকে জানাতে পারে। তাই বলছি, আদার ব্যাপারিগণ যদি বর্তমান যুগে জাহাজের খবর নেন, সেটাই হবে যৌক্তিক।

বাংলাদেশের অনেক মানুষই প্রত্যাশা করেছিল নির্বাচনে হিলারি জিতবেন। তারা ট্র্যাম্পকে সমর্থন করেননি। এর বহুবিধ কারণ আছে। এর মধ্যে মুসলমানদের নিয়ে ট্র্যাম্পের বিরূপ মন্তব্য, চরমপন্থী মতবাদ প্রচার ও তার সাথে বাংলাদেশিদের অপরিচিতি। আমি নিজেও নির্বাচনের হাওয়া বওয়ার আগে ট্রাম্পের নাম শুনিনি। কিন্তু হিলারি ক্লিন্টন আমাদের অতি পরিচিত। তার নিজগুণে ও স্বামীর গুণেই তিনি বিশ্বময় এক পরিচিত মুখ। আর আমাদের দেশের সাথে হিলারি ও ক্লিনটনের একটি বিশেষ যোযাগো আছে। আমাদের নোবেল বিজয়ী প্রফেসার ইউনুসের ক্লিন্টন দম্পতি ব্যক্তিগত বন্ধু। তাই আমাদের পরিচিত হিলারি যদি যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি হতেন, আমরা খুশী হতাম।

আমার ফেইসবুকে অনেক বন্ধুই ডোনাল্ট ট্র্যাম্প এর প্রেসিডেন্সি সম্পর্কে আমার মতামত জানতে চেয়েছেন। একজন তো বলেই বসলেন, ট্র্যাম্প ইসলাম বিদ্বেষী। কিন্তু বারাক ওবামার প্রশাসনের হিলারি ইসলামের বন্ধু ছিলেন।

আমার এই বন্ধুটিকে আদার ব্যাপারী বলে আমি ধমক দিয়েছিলাম। কিন্তু সে আদার ব্যাপারি হলেও তার চিন্তাটা যে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন নয়, সেটা যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে চোখ রাখলেই বোঝা যাবে। ট্র্যাম্প ইতোমধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রে মুসলমান জনগোষ্ঠীর কাছে অনেকটা ভীতিই ছড়িয়ে দিয়েছেন। তাই বিশ্বমুসলিম ভ্রাতৃগণ ট্র্যাম্পের বিজয়ে আশাহত হবেন, এটাই তো স্বাভাবিক।

কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র নীতির একটা ঐতিহ্যগত প্যাটার্ন রয়েছে। এটা এত সহজে পরিবর্তিত হয় না। যে লংকায় যায়, তারাই এখানে রাবণ না হলেও রাম বনে যান না। অধিকন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে মত প্রকাশের সীমাহীন স্বাধীনতা রয়েছে। যদি ট্র্যাম্পের কর্মকাণ্ড যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের জন্য ক্ষতিকর হয়, তাহলে তারা সেটা নিয়ে রাখঢাক করবেন না। অধিকন্তু যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতায় অনেকটাই চেক এন্ড ব্যালান্সের ব্যবস্থা আছে। এখানে আছে কঙ্গেস ও সিনেট। এসব প্রতিষ্ঠানে প্রায়ই সময় রাষ্ট্রপতির বিরোধী দলের সদস্যদের সংখ্যা গরিষ্ঠতা পরিলক্ষিত হয়। আবার এসব প্রতিষ্ঠানের সদস্যদের নির্বাচিত হওয়ার ঘূর্ণাবর্ত রয়েছে। রাষ্ট্রপতির মেয়াদ থাকা অবস্থায় প্রায়সই সিনেট নির্বাচন হবে। রাষ্ট্রপতি ক্ষতিকর কোন কারজ করলে সেই নির্বাচনে তার প্রভাব পড়বে। অধিকন্তু এখানে রাষ্ট্রপতিকে অভিংশনও করা যায় যে অভিসংশন প্রক্রিয়া সত্যিকারের হয়, প্রহসনের হয় না।

তাই সব কিছু মিলে পরবর্তী রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড জন ট্র্যাম্প যুক্তরাষ্ট্রের আপমর জনগণের প্রত্যাশার বিরুদ্ধে কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন না। তবে ভবিষ্যৎই বলে দিবে ট্র্যাম্প কতটুকু কার হবেন।