ক্যাটেগরিঃ পাঠাগার

 

‘জেলেরা মাঝে মাঝে ইলিশ মাছের জাল তুলত। জালের কালো সুতোর আড়ালে রৌদ্রে উজ্জ্বল রূপার ঝকমকি। ইলিশ মাছ জলের বাইরে দু-এক সেকেন্ড মাত্র বাঁচে। সেই সদ্য ধরা ইলিশ মাছ জেলেদের কাছ থেকে কিনে ভেজে খাওয়া হত। ও বস্তু পেলে দেবতারা তুচ্ছ অমৃত খেতে যেতেন না – এ বিষয়ে আমি নিঃসন্দেহ।’

হ্যাঁ এটা একজন খাঁটি বাঙালের বিশ্বাস এমনিই। তপন রায় চৌধুরীর লেখা আত্মস্মৃতিমূলক গ্রন্থ বাঙাল নামায় ইলিশ মাছ সম্পর্কে এমনিই লেখা আছে। গাঙেয় উপদ্বীপের উপকূলীয় নদনদী আর সমুদ্র ছাড়া এই ইলিশ অন্য কোথাও পাওয়া যায় না। ইলিশের স্বাদের উপাদান দিয়ে বাঙালির জিহ্বার স্বাদগ্রন্থিগুলো তৈরি, না বাঙালির রসনার কোষ দিয়ে ইলিশ তৈরি তা গবেষণার বিষয় হতে পারে। কিন্তু বাঙালিমাত্রই যে ইলিশের ভক্ত হবে, সেটা নিয়ে গবেষণা কেবল অপ্রসঙ্গিকই নয়, তর্কও অমূলক!

বাঙাল নামা বইটি সম্পর্কে আমার প্রথম দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন আমার পুলিশ রিফর্ম প্রোগ্রাম (পিআরপি) এর সহকর্মী তপন দা। সেটা ২০১০/১১ সালের কথা। কিন্তু পড়ব পড়ব করে বইটি পড়া হয়নি। অন্যদিকে ঐ সময় পুলিশ বিষয়ক বই পুস্তক ছাড়া অন্য কোন বই তেমন হাতেই নিতাম না। পুলিশ রিফর্মে কাজ করতে গিয়ে আমি নিজেও রীতিমত ‘পুলিশ-পড়ুয়ায়’ পরিণত হয়েছিলাম। শান্তিরক্ষা মিশনে কাজ করতে এসে পুলিশিং এর বাইরের বই পড়া শুরু করতেই বাঙাল নামার খোঁজ পড়ল। জনপ্রিয় ব্লগার ও তরুণ লেখক ড. জাহেদ-উর-রহমানকে বইটির খোঁজ নিতে বললাম। বাঙাল নামাসহ আরো কয়েকটি বই জাহেদ কিনে দিল। অপ্রাসঙ্গিক হলেও এখানে বলার লোভ সংবরণ করতে পারছি না যে, আমার অনেক সহব্লগার বন্ধুরা জাহেদের ডাক্তারি ব্যাকগ্রাউন্ড সম্পর্কে জানেন না। কিন্তু সে যে ঢাকার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ থেকে পাশ করার এমবিবিএস ডাক্তার সে পরিচয় জাহেদ নিজেও যেমন গোপন রাখে, তেমনি অন্যরা জানতেও চাননা। আমার এ পরিচয় প্রকাশে জাহেদ হয়তো মনক্ষুণ্ন হবে। কারণ, ডাক্তারি বিদ্যা সে নাকি মেডিকেল কলেজে জমা রেখে কেবল সার্টিফিকেটখানা সাথে নিয়ে বের হয়েই বিদগ্ধতার মুক্ত আকাশে উড়াল দিয়েছিল।অক্টোবরের শেষে রুমমেইট ইন্সপেক্টর শব্দুল বইটি দেশ থেকে নিয়ে এলেন। পড়ে তৃপ্ত হলাম।

আনন্দ পাবলিশার্স কর্তৃক ২০০৭ সালে প্রকাশিত বইটির যে কপিটি আমার হাতে আছে তা দ্বিতীয় সংস্করণের পঞ্চম মূদ্রণ। এটা ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে ছাপা হয়েছিল। বই আকারে ছাপার পূর্বে লেখাগুলো ধারাবাহিকভাবে কোলকাতার দেশ পত্রিকায় নিয়মিত কিস্তিতে ছাপা হয়েছিল। তাই ২০০৭ সালের অনেক পূর্ব থেকেই এটি ছিল বাঙালি পাঠকদের একটি কাঙ্খিত বই। নির্ঘন্টসহ বইটি মোট ৪১৯ পৃষ্ঠার। ফর্মার সাইজও বড়। একটু সময় নিয়ে প্রায় এক সপ্তাহ ধরে পড়ে শেষ করলাম বইটি।

তপন রায় চৌধুরী একখন খাঁটি বাঙাল। তিনি ১৯২৬ সালে বাংলাদেশ, তৎকালীন পূর্ব বঙ্গের কুমিল্লা শহরে তার নানার বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। কিন্তু তার পৈতৃক নিাস ছিল বর্তমান ঝালকাঠি জেলার কীর্তিপাশা গ্রামে। বরিশাল শহরের মাত্র ২০ কিমি দক্ষিণ-পশ্চিমে ঝালকাঠি জেলা। জেলা শহর থেকে উত্তর-পশ্চিম দিকে মাত্র ৫/৬ কিমি দূরে র্কীতিপাশা গ্রাম। আমি ২০০৭/০৮ সালে অল্প দিনের জন্য ঝালকাঠি জেলায় ভারপ্রাপ্ত পুলিশ সুপার হিসেবে কাজ করার সুবাদে কীর্তিপাশার জমিদার বাড়ি দেখতে গিয়েছিলাম। ধ্বংসপ্রায় দালানগুলো দেখে সেই সময় দুঃখই পেয়েছিলাম। এ জমিদার বাড়িতে যারা বসবাস করত তারা কিংবা তপন রায়ের জন্যও নয়, দুঃখ পেয়েছিলাম এ ঐতিহাসিক ইমারতগুলোর দুর্দশা দেখে। এটা রীতিমত পুরাকীর্তি। অথচ এটা সংরক্ষণের কোন প্রচেষ্টা লক্ষ করিনি। তবে জমিদার বাড়ির কাছাকাছি একটি চমৎকার স্কুল আছে। আমি সেই সময় জানতাম এটা জমিদার বাড়ি। কিন্তু এই বাড়িই যে ছিল কীর্তিমান বাঙালি তপন রায়ের সেটা জানতাম না। বইটি পড়তে গিয়ে যখন এর পরতে পরতে লেখকের বাল্যস্মৃতির আকুতি পড়ছি তখন নিজেকেও তার সাথের সারথী বলেই মনে হল।

বইটিতে বাঙালি জীবনের অনেক সুখ-দুঃখের ছোটখাট কথাই লেখা হয়েছে। লেখকের বাল্যকালের বরিশাল শহরের প্রকৃতি থেকে শুরু করে তার পৌঢ় জীবনে বিশ্বভ্রমনের অভিজ্ঞতাবলীর মধ্যে বহির্বিশ্বের অনেক দেশের ও স্থানের প্রাকৃতিক দৃশ্যের ছোটখাট বর্ণনা আছে। কিন্তু তার বাল্যকালের কীর্তিপাশার কীর্তিগুলোই যেন এর মূল আকর্ষণ।

দেশ বিভাগের পর ১৯৪৮ সালে চির দিনের জন্য নিজভূমি ছেড়েছিলেন তপন রায় ও তার পরিবার। জমিদার ছিলেন বাংলাদেশে। কিন্তু ভারতের কোলকাতায় গিয়ে তারা হয়েছিলেন রীতিমত রিফিউজি। সেই রিফিউজি জীবনের অনেক স্মৃতিও এখানে লিপিবদ্ধ রয়েছে।

বইটির অন্যতম আকর্ষণ হল বাঙালি সমাজে নির্মম সাম্প্রদায়ীকতার চর্চার চরম ব্যপ্তি সম্পর্কে লেখকের নির্মোহ বিশ্লেষণ। এর মধ্যে আছে ১৯৪৬ সালে মুসলিম লীগ তথা জিন্নার আহুত প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবসকে কেন্দ্র করে কোলকাতা শহরে ও তারও পরে বাংলাদেশের নোয়াখালী ও বিহারে অনুষ্ঠিত হিন্দু-মুসলিম সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার বর্ণনা ও মূল্যায়ন। এসব সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সম্পর্কে হিন্দু-মুসলমানগণ পরষ্পরকে দোষারোপ করেন। হিন্দুদের দোষারোপের পাথরগুলো নিক্ষিপ্ত হয় অবশ্যম্ভাবীরূপে শহীদ সোহরাওয়ার্দীর উপর। কিন্তু এ দাঙ্গার ভিলেন হিসেবে সোহরাওয়ার্দীকে শনাক্ত করার কোন কারণ লেখক খুঁজে পাননি। লেখকের ভাষায়-

কলকাতা শহরে ১৯৪৬ সনে অমানুষিক দাঙ্গা তথা গণহত্যার আমি একজন প্রত্যক্ষদর্শী – আর কয়েক লক্ষ মানুষের মতো। তার বিবরণ দিতে গিয়ে আমি নাকি মুসলমানদের পক্ষ টেনে কথা বলেছি, সরোয়ার্দি সাহেব যে ওই দাঙ্গার মূল নায়ক এমন কথা আমি নির্দ্বিধায় বলিনি। আমি দাঙ্গার যে ঘটনাগুলো স্বচক্ষে দেখেছি, তারই বর্ণনা দিয়েছি। হিন্দু পাড়ায় থাকতাম সুতরাং হাদের সুকীর্তিই চোখে পড়েছে বেশি। আর ভাগ্যদোষে আমি আমি ঐতিহাসিক। সরোয়ার্দি সাহেবের অপরাধ প্রমাণ হওয়ার পথ বন্ধ, কারণ সে বিষয়ে দলিরপত্র যদি কিছু থাকে তা কেউ দেখেনি, দেখবার উপায়ও নেই। আর বিনা প্রমাণে ফাঁসির আদেশ দিতে আমার পেশাগত অসুবিধা আছে। জুরির বিচারেও লোকটি বেনিফিট অব ডাউট পেতেন। আমিও তাকে তার বেশি কিছু দেইনি।

বইটি দ্বিতীয় সংস্করণের ভূমিকায় তিনি ভারতীয় হিন্দুদের আরো কিছিু ভুল ধারণার উত্তর দিয়েছেন। তিনি আসঙ্কা ব্যাক্ত করেছেনে ভারতীয় কতিপয় হিন্দু নেতাদের ক্রমবর্ধমান সাম্প্রদায়িক উসকানি নিয়েও।

পথেঘাটে ক্লাবে রেস্তোরাঁয় শিক্ষিত হিন্দু ভদ্রলোকদের কথাবার্তায় এক মারাত্মক প্রবণতা দেখি যার তুলনীয় কিছু ইম ৪৬-৪৭ এর প্রাণঘাতী বর্বরতার সময়েও দিখিনি। আমাদের জীবনের যাতীয় দুর্ভাগ্যের কারণ নাকি মুসলমান তোষণ। এর থেকে সম্ভাব্য মুক্তিদাতা একমাত্র গুজরাট গণহত্যার নায়ক নরেন্দ্র মোদী। এই জাতীয় চিন্তা এবঙ রাজনৈতিক প্রবণতার পথেই জার্মানিতে নাৎসিরা ক্ষমতায় এসেছিল। আমরাও কি সেই পথেই চলেছি?’

এ কথাগুলো তপন বাবু লিখেছিলেন ২০০৯ সালে। ঐ সময় নরেন্দ্র মোদী ছিলেন গুজরাটের মূখ্যমন্ত্রী (২০০১-২০১৪)। কিন্তু এর পর কেটে গেছে অনেক সময়। ২০১৪ সালের ২৬ মে থেকে সেই গুজরাটী মোদীই ভারতের প্রধানমন্ত্রীর চেয়ারটি দখল করেছেন। যে মানুষটি ভারতের ১৫ কোটি মুসলমানদের চোখে একজন গণহত্যাকারি, অসম্প্রদায়ীক বুদ্ধিজীবী মহলে হিটলারের ভারতীয় সংস্ককরণ সেই মানুষটি এখন ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের প্রধানমন্ত্রী। ধর্ম নিরপেক্ষ ভারতের সুখ-দুখের চাবী এখন চরম সাম্প্রদায়িক ও ধর্মাশ্রয়ী দল ভারতীয় জনতা পার্টির হাতে। তপন রায়ের লেখায় বলায় যতবারই নরেন্দ্র মোদীর প্রসঙ্গ এসেছে ততোবারই তিনি মোদীকে ‘নরাধম মোদী’ বলে সম্বোধন করেছেন।

বাঙাল নামা পড়ে বুঝলাম, বাঙালি আর বাঙালের মধ্যে কিঞ্চিত পার্থক্য রয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার ভারতের পশ্চিম বঙ্গ, আসাম, ত্রিপুরাসহ বহির্বিশ্বে বসবাসকারী ও বাংলাদেশের অধিবাসী মাছ-ভাতের কাঙাল কিংবা পূজারী (বিশেষ করে পন্তাভাত আর ইলিশ মাছ) হাজারও জাতী-গোষ্ঠীর সঙ্করায়নে স্বকীয় সত্তায় বৈশিষ্ট্যমান নৃতাত্ত্বিক মানব গোষ্ঠীই হল বাঙালি। কিন্তু পূর্ব বাংলায় বসবাসকারী বাঙালিরা হল বাঙাল। তবে গোটা ভারতবর্ষের হাজারো ধর্মের মানুষদের পালিত, চর্চিত ধর্ম ও বৃহত্তর পরিচয় ‘হিন্দু’ শব্দটি যেমন বাইরের মানুষ মুসলামন তথা পারশ্যবাসীর দেয়া, তেমনি বাঙাল অভিধাটিও কোলকাতার বাঙালিদের দেয়া।

১৯৪৮ সালে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব বিসর্জন দিয়ে লেখক ভারতীয় নাগরিক হয়েছিলেন। কিন্তু ১৯২৬ সালে যে তিনি বাঙাল হয়েই জন্মগ্রহণ করেছিলেন, সেই পরিচয় তার বর্ণিল জীবনে কোন মুহূর্তের জন্যও বিশ্রুত হননি। বইটি পড়ে বুঝলাম, তিনি কেবল বাঙালই নন, খাঁটি বরিশাইল্যা। তার বইয়ের পরতে পরতে ছড়িয়ে আছে, আমরা বরিশালবাসীরা— এমন ধরনের আত্ম পরিচয়।

বাঙাল নামা বইটি নাকি আত্মজীবনী বা আত্ম কথা নয়, স্মৃতি কথা। আত্মকথা বা আত্মস্মৃতি ও স্মৃতি কথার মধ্যে সূক্ষ্ণ যে পার্থক্য তা বাঙালনামার প্রারম্ভিক পর্যায়েই শিখলাম। নির্মোহভাবে জীবনের অন্তর-বাহির, গোপন-প্রকাশ্য,সাদা-কালো, যৌন-অপত্য সব ধরনের ঘটনাবলীর নির্মোহ ও সত্য স্বীকারোক্তিই হল আত্মকথা বা আত্মজীবনী। কিন্তু সমাজস্বীকৃত সামান্য কিছু সুখ-দুঃখে স্মৃতির বর্ণনাই হল স্মৃতিকথা। তবে আমার কাছে বাঙাল নামা একটি উৎকৃষ্ট সামাজিক ইতিহাস গ্রন্থ যার কেন্দ্রে রয়েছে একজন বরিশাইল্যা বাঙালি। ( ১৩ নভেম্বর, ২০১৬, ইউএন হাউজ, জুবা, দক্ষিণ সুদান)